Stories

WhatsApp Image 2020-08-21 at 13.04.23

সকাল বেলা উঠে হাঁটা সোহিনীর অনেক দিনের অভ্যাস। এই দূর বিদেশে এসেও সেই নিয়মের কোন ব্যতিক্রম হয় না। আমেরিকার বিখ্যাত এক ইউভার্সিটির পাশেই সোহিনীর আবাসন।তার সংলগ্ন পার্কটাতে হাঁটার পরে রোজ কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকে সে। এই সময়টাতে সে বিশ্ববিদ্যালয়ের জনপ্রিয় অধ্যাপিকা নয়,বরং সে যেন এক মনযোগী শিক্ষার্থী, আর প্রকৃতি তার শিক্ষক। যে অকৃপণ হাতে রোজ সোহিনীকে একটু একটু করে শিক্ষা দিয়ে পৃথিবীর রঙ্গমঞ্চের উপযুক্ত করে তুলছেন। তাই এই সময় মধ্যচল্লিশের সোহিনী মনে মনে যেন ষোড়শী কিশোরী। দিনের মধ্যে এই সময়টা ভারী ভালো লাগে ওর। আজও তার ব্যতিক্রম হলো না। হাঁটার পরে বেঞ্চে বসে সোহিনীর মনে হলো, কাল রাতে ফোন করে ওর বান্ধবী ও সহকর্মী অ্যালিস বলেছিলো, ওকে আজ সকাল সকাল ফোন করে ডেকে দিতে। অ্যালিসের বেলা করে ওঠার অভ্যাস। অনেক সময় অ্যালামেও ঘুম না, তাই সোহিনীকে এই অনুরোধটা করেছিল অ্যালিস। আজ ওদের ফাদার্স ডে। আজ সকালে সকালই অ্যালিস যাবে ওর বাবার সাথে দেখা করতে । দুবার রিং হয়ে কেটে গিয়ে, তিনবারের বার ফোনটা ধরে অ্যালিস। সামান্য কথোপকথনের পরে সোহিনীকে ধন্যবাদ জানিয়ে ফোনটা কেটে দেয় সে। ফোনটা ট্রাকস্যুটের পকেটে ভরতে ভরতে সোহিনীর মনে হলো এখন তো ভারতেও ফাদার্স ডে, মাদার্স ডে পালনের হিড়িক উঠেছে। ফেসবুক, ইন্ট্রাগ্রাম সব জায়গায়ই সবাই নিজেদের বাবা, মায়ের ছবি পোস্ট করে। অথচ, সে নিজে এখনও এই দিনগুলোকে ওদের দিন ভাবে কেন ? কি জানি? এতো আধুনিক সে, অথচ এখনও এইসব দিনগুলোকে কেন যেন মনের থেকে ঠিক আপন করতে পারে না। সত্যিই কি বাবা, মাকে কেবল একটা দিন দিয়ে আটকে রাখা যায়! তারা তো দূরে থেকেও সন্তানের জীবনের সাথে আস্টেপিস্টে জড়িয়ে থাকেন। সন্তানের মননে তাদের অবাধ বিচরণ। তবে সোহিনী নিজে বিশ্বাস না করলেও, বাবা, মাকে ঘিরে এই উৎসবটা খারাপ লাগে না ওর। এই সুযোগে সব পুরোনো বন্ধুদের বাবা, মায়ের ছবি দেখা যায় । তাদের খবরও পাওয়া যায়। কতো পরিবর্তন হয়ে গেছে তাদের চেহারার, অথচ সন্তানের প্রতি তাদের স্নেহ, ভালোবাসা, উদ্বেগ একই রকম রয়েছে।

কথাগুলো ভাবতে ভাবতে উদাস হয়ে যায় সোহিনী। ফিরে যায় তিরিশ বছরেরও আগের দিনগুলোতে। মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে ছিলো সে। তার বাবা আর দুই জ্যাঠাদের একান্নবর্তী পরিবারে তখনও আধুনিকতার আলো সেভাবে ঢোকেনি। রক্ষণশীল, পুরুষতান্ত্রিক পরিবারে ছেলে আর মেয়ের ফারাক ছিলো প্রচুর। তার নিজের ও জেঠতুতো ভাই বা দাদারা যে ভালোবাসা পেত, সেটা কোনদিনই পায়নি ওরা। মানে সোহিনী আর ওর দিদি বা বোনেরা। সবসময়ই ওদের বলা হতো মেয়েরা কোনরকমে একটু পড়াশোনা করলেই চলবে। কারণ ওরা বিয়ের পরে পরের বাড়ী চলে যাবে, সেখানে সংসার সামলানোটাই প্রধান কাজ হবে। তাই সোহিনী ছাড়া ওর সব দিদি বা বোনেদেরই লেখাপড়ার থেকে ঘরসংসারের কাজ বেশী শেখানো হতো। ব্যতিক্রম ছিল কেবল সোহিনী। তবে সত্যিই কি সোহিনী ব্যতিক্রম ছিলো? না ওর বাবা ব্যতিক্রমী ছিলেন বলে ও আজ ব্যতিক্রমী হতে পেরেছে! বাবার কথা মনে হতে সোহিনীর মন চলে যায় হাজার হাজার মাইল দূরে থাকা ওদের পুরোনো সাবেকি বাড়ীটাতে। যেই বাড়ীটাকে আজও আঁকড়ে ধরে রয়েছেন ওর বাবা, মা। কিছুতেই ওনারা পারেননি ছেলেমেয়েদের সাথে তাদের ঝকঝকে ফ্ল্যাট বাড়ীতে যেতে। ‘পৈত্রিক ভিটের টানই আলাদা’, বলে রয়ে গেছেন ওদের পুরোনো বাড়ীটাতে। আবাক হয়ে ভাবে সে। কী করে একটা মানুষের ভেতরে সাবেকিয়ানা আর আধুনিকতার এমন মিশেল থাকতে পারে!

একে একে মনে ওর পড়ে যায় সব কথা। একমাত্র মেয়ের পড়াশোনার ব্যাপারে কোনদিনই কোন কার্পণ্য করেননি সোহিনীর বাবা বরং একটু বেশিই নজর দিয়েছিলেন। বাবার অনুশাসনেই খুব ভোরে উঠে পড়তে বসতে হতো সোহিনীকে । ওর বাবা বলতেন, ‘সকাল বেলায় মাথা পরিস্কার থাকে। তখন পড়া ভালো মনে থাকবে।’ তখনো সব কথার অতো যুক্তি দিয়ে বিচার করার বুদ্ধি ছিলো না সোহিনীর। তবে আজ বোঝে সকালবেলা অনেকটা সময় বাবা ফাঁকা থাকতেন। তাই হয়তো উনি চাইতেন মেয়ে ওনার সামনে বসে পড়াশোনা করুক। মেধাবী সোহিনীকে পড়াশোনার বাইরে কোন রকম ঘরের কাজ করতে দেখলেই উনি খুব রেগে যেতেন। মৃদুভাষী সোহিনীর বাবার কেবলমাত্র এই একটি ব্যাপারই সোহিনীর মা বা বাড়ীর অন্যদের সাথে মতানৈক্য ঘটতো। সেই নিয়ে বাড়ীর অন্যদের কাছের থেকেও অনেক বাঁকা কথা শুনতে হতো সোহিনীকে আর ওর বাবাকে। কিন্তু উনি এগুলোকে পাত্তাই দিতেন না। সোহিনীর বেশ মনে পড়ে, একজন অংকের শিক্ষক আসতেন ওকে আর ওর দাদাদের অংক শেখাতে। সোহিনী বরাবরই অংকে ভালো ছিলো। তাই দাদাদের দু ক্লাশ উঁচুর অংকও ও অনায়াসে করে দিতে পারতো। কিন্তু একদিন সে অংকে ভুল করে। তখন সোহিনীর দাদা বলে,’ মেয়েদের দ্বারা অংক হয় না। সেই মাথা মেয়েদের নেই। তুই শুধু শুধুই অংকের পিছনে সময় নষ্ট করছিস। তার থেকে বরং ঘরের কাজে মন দে।’ ছোট্ট সোহিনী দাদার কথায় খুব আঘাত পেয়েছিল। তারপর বাবা ঘরে ফিরলে বাবাকে, দাদার বলা কথাগুলো বলে মনটা হালকা করেছিল। প্রথমে কথাগুলো শুনে সোহিনীর বাবা চুপ করে থাকেন। তারপর মেয়েকে বৈদিক যুগের বিদুষী নারী, গার্গী, মৈত্রী, খনাদের কথা গল্পের ছলে বলেন। গল্প বলেন আধুনিক যুগের নারী, মানব কম্পিউটার শকুন্তলা দেবীর কথা। যিনি ৬১,৬২৯,৪৭৫ এর কিউব রুটও অনায়াস দক্ষতায় সলভ করতে পারতেন। তারপর বলেছিলেন, ‘মেয়েরা সব-ই পারে মা। দরকার শুধু একটু ধৈর্য্য আর অধ্যাবসায়।’ পরের দিন থেকে উনি তিন কিলোমিটার দূরে ওই শিক্ষকের বাড়ীতে সোহিনীকে নিয়ে যেতেন আলাদা করে অংক শেখানোর জন্য। বাবা এবং ওই শিক্ষকের মিলিত প্রচেষ্টায় কবে থেকে যেন সোহিনী পড়াশোনাকেই জীবনের ধ্যান,জ্ঞান করে ফেলে।

আজ যেন সোহিনীকে পুরোনো কথায় পেয়েছে। বেশ মনে পড়ে ওর, বি.এস.সিতে দারুণ রেজাল্ট করার পরে সোহিনীর বড় জ্যাঠা ওর জন্য বিয়ের সমন্ধ আনেন। কিন্তু সোহিনীর বাবা এই প্রথম, জীবনে দাদার অবাধ্য হন। ওনার আনা বিয়ের প্রস্তাবকে নাকচ করে সোহিনীকে, উচ্চ শিক্ষার জন্য উনি পাঠিয়ে দেন দিল্লীর জহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ে। আজও যে সে, বিয়ে না করে নিজের পড়াশোনা নিয়ে দিন কাটাচ্ছে, তার জন্য সবাই বিরূপ মন্তব্য করলেও সোহিনীর বাবা কোনদিন মেয়েকে কিছু বলেন নি। সব সময় বলেছেন, ‘ নিজের মনের কথা শোনো। ওখান থেকে যে কাজ করার তাগিদ পাবে, সেটাই করবে। অন্যের চাপে পড়ে কিছু করবে না।’ কি জানি বাবার এই কথাগুলোই কি সোহিনীকে জোর দেয় মেরুদণ্ড সোজা করে চলার। বুঝতে পারে না ও। তবে আজ কি করবে সে? ও কি যাবে? কদিন আগে বর্ণবিদ্বেষের কারণে এখানে খুন হয়ে গেল একজন অতি সাধারণ মানুষ। তাই আজ একটা প্রতিবাদ মিছিল হবে। সোহিনীর আজ সেই মিছিলে যাওয়ার কথা। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেকেই ওকে ওখানে যেতে বারণ করেছেন। বলেছেন, তার মতো সম্মানীয়া অধ্যাপিকার রাস্তায় নেমে এইসব মিছিলে না যাওয়াই ভালো। এতে ওর ক্ষতি হতে পারে। তাই আজ মনটা ভীষণ চঞ্চল সোহিনীর, সত্যি-ই তো! তার মতো আর কেউ যখন যাওয়ার কথা ভাবছে না, তখন কি তার যাওয়া উচিৎ? কিন্তু এতো বড়ো একটা অন্যায়ের তো প্রতিবাদ করা দরকার। মনটা ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে ওর। হঠাৎ করেই ওর মোবাইলটা বাজতে থাকে। বাড়ী থেকে দাদার ফোন। দাদা এইসময় ফোন করছে কেন? বাবা অথবা মায়ের কি কিছু হলো? বুকটা ছ্যৎ করে ওঠে ওর। ফোনটা ধরার পরেই দাদা অসহিষ্ণু গলায় বলে,’ বিয়ে থাওয়া করলি না, দূর দেশে একা পড়ে রইলি, আর তোর চিন্তায় দ্যাখ বাবা অস্থির!’ কথাটা শুনে একটু খারাপই লাগে সোহিনীর। তখন-ই পাশের থেকে সোহিনীর বাবার গলা ভেসে আসে,বিরক্ত হয়ে উনি বলেন,’ আঃ! বাজে কথা না বলে ফোনটা আমাকে দেও।’ সোহিনীর বাবা ফোনটা ধরে বলেন,’ কেমন আছিস মা? কাল তোর গলা শুনে মনে হলো কোনকিছু নিয়ে খুব দ্বিধায় আছিস তুই!’ সোহিনী বলে, ‘ হ্যাঁ। বাবা একটা ব্যাপার নিয়ে খুব অস্থির হয়ে রয়েছি। মন এক বলছে, কিন্তু সেটা করা ঠিক হবে কিনা বুঝতে পারছি না।’ সেই শুনে উনি বলেন,’ তোমার কি সমস্যা, তা আমি জানি না। আর তুমি নিজে না বললে, সেই ব্যাপারে কিছু জানতেও চাইবো না। তবে মা, আগেও বলেছি, আজও বলছি, নিজের মন যে কাজটা করতে বলবে, সেটাই করবে। ওই কবিতাটা মনে আছে তো মা,..৷
‘ মনেরে আজ কহ যে,
৷ ভালো মন্দ যাহাই আসুক
সত্যরে লও সহজে।…’

সবাই বিকিয়ে গেলে এই সমাজ সংসার চলতো না যে মা। তাই যে ঋজু, সত্যবাদী মনটা আমি তোমাকে তৈরী করে দিয়েছিলাম, তার কথা শোন। আশীর্বাদ করি, জয়ী হও।’ সোহিনীর স্বল্পভাষী বাবা এরপরে ফোনটা কেটে দেয়। ভোরের প্রথম সূর্যের আলো সোহিনীর মুখে এসে পড়ে। সেই আলোর ওমটুকু গায়ে মেখে সোহিনী উঠে পড়ে। হ্যাঁ, আজ সে যাবে। অন্যায়ের প্রতিবাদ সে করবে। বারার থেকে অমূল্য রত্ন স্বরূপ, তার যে মনটা ও পেয়েছে, তার অমর্যাদা সে কোন মতেই করতে পারবে না। বাড়ীর দিকে যেতে যেতে ভাবে সত্যি কতো ভাগ্যবতী সে, ফাদার্স ডের জন্য কোন একটা নির্দিষ্ট দিন তাকে পালন করতে হয় না। কারণ তার পিতা তো তার অন্তরেই সর্বদা রয়েছেন। মনে পড়ে ছোটবেলার সেই কবিতাটা,’ ঘুমিয়ে আছে শিশুর পিতা,সব শিশুরই অন্তরে।

WhatsApp Image 2020-08-21 at 13.05.05

সকাল বেলা উঠেই মাথাটা গরম হয়ে গেলো এনার। ওফ্ আর পারা,যায় না। ঘুম থেকে উঠেই শুরু করে দেয়। না! মোরগ আর অতীশের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। সারাদিন হারমোনিয়াম বাজিয়ে খালি কি যে প্যাঁ, পোঁ। আর গান! সেই এক প্যানপ্যানানি রবীন্দ্রসঙ্গীত বা নজরুল গীতি। এগুলো এখন চলে নাকি! ধুর! রীতিমতো মাথাগরম নিয়েই মোবাইলটা হাতে নেয় এনা। ফোনটা নিয়েই মনটা ভালো হয়ে যায় ওর। সানির মেসেজ। কি দারুণ একটা ভিডিও পাঠিয়েছে সানি। কি ফানি! প্রচলিত রবীন্দ্রসঙ্গীতের মধ্যে একটা নিজস্ব কাঁচা শব্দ ঢুকিয়ে দিয়ে, গায়ক বার বার নিজের সুরে গেয়ে যাচ্ছে, আর কলেজের ছেলেমেয়েরা নেচে চলেছে। এই ভিডিওটাই দেবে নাকি বক্সের সঙ্গে ফিট করে ওদের বাড়ীর দিকে ঘুরিয়ে। যেমন ভাবা, তেমন কাজ, মোবাইলটা বক্সে নিয়ে চালু করে দিতেই তারস্বরে বাজতে লাগলো..”শালা চাঁদ উঠেছিলে গগনে”।

কিছুক্ষন পরে অতীশ ওর বোকা বোকা মুখটা নিয়ে হাজির। তবে আজ ওর মুখটা রাগে গনগন করছে। এনাকে দৃঢ় গলায় বলে,’ রবীন্দ্র সঙ্গীত আমাদের কাছে অনেকটা পূজার মন্ত্রের মতো।তাকে সম্মান না দেও, অসম্মান করোনা।’ বলে এনার দিকে একবারও না তাকিয়ে চলে যায় নিজের বাড়ীতে। এবার এনার খুব খারাপ লাগে। অন্য দিন অতীশ এসে এনার সাথে গল্প করতে চায়, গুনগুন করে গানও করে। কিন্তু আজ, অতীশের মুখে খালি ঘৃণাই দেখতে পেলো এনা। ওর মনটা হঠাৎ করেই যেন ধূসর মেঘে ঢেকে গেলো। রাগ করে মোবাইল নিয়ে ওই ভিডিওটাই ডিলিট করে দিলো।

এনা,আর অতীশ পাশাপাশি বাড়ীতে থাকে। অতীশের ঠাকুরদাদা শাস্ত্রীয় সঙ্গীত শিল্পী। তার কাছেই অতীশের গান শেখা শুরু। তারপর বড় হওয়ার পর গানকেই জীবনের ধ্যান জ্ঞান করে নেয় ও। শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের পাশাপাশি নানা ধরনের গানে নিজের পারদর্শিতা দেখাতে থাকে অতীশ। তবে ওর ঠাকুরদার শিক্ষা সে ভোলেনা। তাই খুব ভোরে উঠে হারমনিয়াম নিয়ে রেওয়াজ করাটা নিত্যদিনের অভ্যাসে পরিনত করে ফেলেছে অতীশ। তারপর নিজের পছন্দের কিছু রবীন্দ্র সঙ্গীত, নজরুল বা দ্বিজেন্দ্র গীতির মাধ্যমে মনের শুদ্ধতা ও একাগ্রতা বৃদ্ধি করে ও।

অন্যদিকে ধনী ব্যবসায়িক পরিবারের একমাত্র মেয়ে এনা। বাবার অঢেল, অর্থ আর প্রশয়ের কারণে ছোটবেলা থেকেই সে জেদী,একগুঁয়ে, কিছুটা উশৃঙ্খলও। তবে অতীশকে এনার বাড়ীর সবাই খুব ভালোবাসে। বিশেষ করে এনার ঠাকুদা তো অতীশের গানের একনিষ্ঠ শ্রোতা।

স্কুল পাসের পরে এনা আর অতীশ একই কলেজে ভর্তি হয়। কলেজে গিয়ে এনা আরো উশৃঙ্খল হয়ে ওঠে। কিন্তু অতীশ হয় ধীর, স্থির, নম্র,ভদ্র। আস্তে আস্তে তার গানের সুখ্যাতি সারা কলেজে ছড়িয়ে পড়ে। অনেক মেয়েই তার কাছে আসতে চায়। কিন্তু সে খালি ভালোবাসে এনাকে। এনাই তার জীবনের সবচেয়ে ভালোবাসার ও গুরুত্বপূর্ণ মানুষ। তাই সে এনার কাছে প্রায়ই আসে,তার মনের কথা বলার জন্য। কিন্তু প্রতিবারই এনার থেকে আঘাত পেয়ে তাকে ফিরে যেতে হয়।

এই রকম এক সময় অতীশ জানতে পারে, যে এনা, কলেজের সব থেকে উশৃঙ্খল ছেলে সানির সাথে প্রেমের সম্পর্কে নিজেকে জড়িয়েছে।সানি অনেক মেয়ের জীবনে সর্বনাশ করছে। তাই অতীশ এনাকে সাবধান করতে যায়। কিন্তু ফল হয় উল্টো। এনা অতীশকে রীতিমতো অপমান করে ওর বাড়ীর থেকে তাড়িয়ে দেয়। এর কিছুদিন পর অতীশ কলেজ ছেড়ে ভিন রাজ্যে চলে যায়। এনা আর অতীশের খবরও রাখেনা।

অতীশ চলে যাওয়ার পর এনা, সানির সাথে আরো ঘনিষ্ঠ হয়ে পড়ে।এনার দিনগুলো সানির সাথে বেশ রঙ্গীন ভাবেই কেটে যাচ্ছিলো। প্রায়ই এনা, সানির সাথে একান্তে সময় কাটাতো। তবে মাঝে মাঝেই এনার মনে এক ফালি উড়ো মেঘের মতো অতীশের স্মৃতি এসে ছায়া ফেলতো। তখন অকারণ বিষণ্ণতা এসে এনাকে গ্রাস করে।

একদিন সকালে অতীশের মা এসে খবর দেয়, অতীশ, গানের একটা প্রতিযোগিতায় সারাদেশের মধ্যে প্রথম হয়েছে। ফলস্বরূপ মোটা অংকের টাকা পুরস্কার পাবে ও। এছাড়াও অনেক অনুষ্ঠানে ও সিনেমায় গান গাওয়ার সুযোগ পাবে। খবরটা ওদের পাড়ায়,ঝড়ের বেগে ছড়িয়ে পড়ে। পরদিন খবরের কাগজ, টি.ভিতে অতীশকে দেখায়।তার কন্ঠের জাদুতে মুগ্ধ হয় সবাই। এবার এনা, অতীশের গান ভালো করে শোনে। অতীশের কন্ঠমাধুর্যে মুগ্ধ হয় সে। খুব আফশোষ হয় ওর। কেন অতীশের গান আগে ভালো করে শোনেনি ও?

কদিন ধরেই এনার মন খারাপ। এনা তার শরীরে নতুন আগন্তুকের পদধ্বনি শুনতে পাচ্ছে। সে যে মা হতে চলেছে এটা সে বুঝতে পারছে। কিন্তু সানির পাত্তা নেই। ফোন করলেও সানি আর আজকাল ফোন ধরেনা। মেসেজেরও উত্তর দেয়না।এনা বেশ মনমরা হয়ে পড়ে। সানির বন্ধুদের কাছে জিজ্ঞেস করেও ওর খোঁজ পায়না এনা।

বেশ কদিন পরে কলেজে এসে এনা জানতে পারে সানি কলেজে এসেছে। সে তখন সানি খোঁজে, কলেজ ক্যন্টিনে গিয়ে দেখে সানি তার নতুন বান্ধবী নিয়ে ব্যস্ত। সেই দেখে এনা রাগে ফেটে পড়ে। সানিকে জানায় তার শরীরে সানির সন্তান এসেছে। কিন্তু সানি তা অস্বীকার করে। সবার সামনে এনাকে অপমান করে বলে,বলে অন্যের পাপ সানির উপরে এনা চাপাতে এসেছে। এনার চেনা বন্ধু,বান্ধবীরাও সানির কথাই মেনে নেয়। একমাত্র এনার সবথেকে প্রিয় বান্ধবী নিশা, এনার পাশে থাকে। নিশা, এনাকে বললো লোক জানাজানি হওয়ার আগেই বাচ্চাটাকে নষ্ট করে দিতে। নিরুপায় হয়ে এনাও রাজি হয়ে যায়।

আজ অতীশ বাড়ী ফিরে আসছে। এনাদের সারা পাড়ায় আজ খুশির ধুম। ঘরের ছেলের সাফল্যে তারা খুব খুশি। এনার ঠাকুরদা খুশি হয়ে অতীশের জন্য একটা দামী ঘড়ি কিনেছে।অতীশকে রাতের বেলা নিজের বাড়ীতে খাবারের নিমন্ত্রন করে এনার দাদু। অতীশ আসবে বলে এনাদের বাড়ীতে সাজ সাজ রব পড়ে যায়। একমাত্র এনাই এইসব কিছু থেকে দূরে রাখে নিজেকে। নিজের ঘরে, নিজেকে বন্দী করে রাখে সে। কাল বাচ্চাটাকে নষ্ট করে দেবে এনা। নিশা তার পরিচিত ডাক্তারের সাথে কথা বলেছে। কালই নিশা ওকে নিয়ে যাবে। তারপর সব শেষ। এনা, নিজের পেটের উপরে হাত বুলিয়ে বাচ্চাটাকে আদর করে। এবার খুব কান্না পায় ওর। ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদতে থাকে ও। ওর মনে পড়ে অতীশের সাবধান বানী। কেন যে তখন অতীশের কথা শুনলোনা!

এনার ঠাকুরদার আমন্ত্রনে অনেকদিন পরে এনাদের বাড়ী অতীশ আসে। এনাদের বাড়ীতে তখন অতীশকে ঘিরে উৎসব শুরু হয়ে যায়। কিন্তু অতীশের চোখদুটো খালি এনাকে খুঁজতে থাকে।

রাতের খাবারের সময় সবাই উপস্থিত থাকলেও এনাকে দেখতে পায়না অতীশ। একটু অন্যমনস্ক হয়েই খাবার খায় সে। এনার জন্য বেশ মন খারাপ লাগে ওর। এমন আনন্দের দিনেও এনা একবার তার সামনে এলোনা। তারপর ভাবে, আসবেই বা কেন। ও তো সানিকে ভালোবাসে। একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়েই খাওয়া শেষ করে অতীশ।

নিজের বাড়ী যাওয়ার আগে যাবোনা ভেবেও, এনার ঘরের সামনে এসে অতীশ দাঁড়ায়। এমন সময় ভেতর থেকে এনার কান্নার শব্দ শুনতে পায় সে । এবার আর অতীশ নিজেকে আর স্থির রাখতে পারেনা। দরজা ঠেলে এনার ঘরে ঢোকে। এনা তখন মাথা টেবিলে রেখে কাঁদছে। অতীশ ধীরে ধীরে এগিয়ে যায়, টেবিলের সামনে গিয়ে এনার মাথায় হাত বুলায়। এনা এবার মাথা তোলে। অতীশ দেখে এনার চোখ লাল। শান্ত গলায় বলে, ” কি হয়েছে?” হঠাৎ করে অতীশকে দেখে ঘাবরে যায় এনা। একটু চুপ থেকে, জোরে কেঁদে ওঠে সে। অতীশ এগিয়ে যায় এনার দিকে। এনার হাতটা ধরে বলে,” কি হয়েছে বলো?” তখন এনা অতীশকে বলে,’ যেকোন মায়ের জীবনেই তার সন্তান সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ, অথচ দেখো আমি আমার সন্তানকেই নষ্ট করে দিতে বাধ্য হচ্ছি।’ বলে কাঁদতে সব কথা বলে অতীশকে।

সব শুনে অতীশ, স্তদ্ধ হয়ে যায়। তারপর আস্তে আস্তে বলে,” সানির মতো একটা কাপুরুষের জন্য, তুমি তোমার সন্তানকে নষ্ট করবে এনা? ” এনা কাঁদতে কাঁদতেই বলে, “আর কি করবো বলো। বাড়ীতে তো আর এই খবরটা বলা যাবেনা। আর বলেই বা লাভ কি?” তখন অতীশ, এনাকে বলে,” জানি তুমি আমাকে পছন্দ করোনা। তবুও বলবো, আমি তোমাকে ভালোবাসি এনা। তুমি আমার জীবনের খুব গুরুত্বপূর্ণ একজন মানুষ। তাই তোমার জীবনের সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ যে মানুষ আসছে… তোমার সন্তান, তাকেও আমি ভালোবাসতে চাই। ওকে এই পৃথিবীতে আসতে দেও, এনা। এর জন্যই না হয় তুমি আমার হাতটা ধরলে।” কথাটা শেষ করার আগেই অতীশের চোখ জলে ভরে ওঠে। এনা আস্তে আস্তে বলে,” আমি ভুল করেছিলাম। সত্যিকারের মানুষ না চিনে, অমানুষের পিছনে দৌঁড়িয়েছি। আমাকে ক্ষমা করো।” একটু থেমে আবার বলে,” আমি এবার থেকে নিজেকে শুধরিয়ে নেব, দেখো। আমি বুঝতে পেরেছি।একটা সুযোগ আমাকে দেও। আজ তুমি আর আমার অনাগত সন্তানই আমার জীবনে সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ দুটো মানুষ। তোমাদের কোনদিন আমি অবহেলা করবোনা, দেখো।” অতীশের মুখে এবার হাসি খেলে যায়। এনাকে নিজের বুকের মধ্যে টেনে নিয়ে বলে,” পাগলী! একটা!”

WhatsApp Image 2020-08-21 at 13.05.43

এই গল্প আমার নয়, আমার এক কাছের বন্ধুর জীবনের ঘটনা, তার মুখ থেকেই শোনা। ধরা যাক তার নাম মীরা। তারই বয়ান কে নিজের মত করে প্রকাশ করার চেষ্টা করলাম।

এই ঘটনা প্রায় এক দশক আগের। তখন কলেজ ছাত্রী আমি। আমাদের বাড়ি টা বড্ড পুরনো বলে মেরামতের কাজ লেগেই থাকত, কখনো দেওয়ালের প্লাস্টার চটিয়ে নতুন করে প্লাস্টার করা, কখনো বাথরুমের ছাদ মেরামতি, কখনো ঘরের মধ্যে বিম মেরামতের কাজ– লেগেই থাকত। আমার বাবা মিস্তিরি দিয়ে কাজ করাতেও বড় ভালবাসতেন। সারাদিন ছাতা মাথায় দাঁড়িয়ে তদারকি চলত। কিন্তু আমি আর মা বড় বিরক্ত হয়ে যেতাম। ঘরের মধ্যে জিনিসপত্র তছনছ হয়ে যেত, ধুমধাম আওয়াজে শান্তি বিঘ্নিত হত, আর ধুলোবালির কথা তো ছেড়ে ই দিলাম। সবচেয়ে সমস্যা হত বাথরুম যাওয়া নিয়ে। ওইসব কাজের দিন গুলো তে স্নান করার জন্য পাশের বাড়ি যেতে হত। পাশের বাড়ির পাপান দার মা অবশ্য তাতে কখনো বিরক্ত হত না।
তো এরকমই একবার মিস্তিরির কাজ চলছে। আমি বাধ্য হয়ে বালতি, মগ, সাবান, গামছা আর শুকনো জামা নিয়ে চললাম পাশে পাপানদা দের বাড়ি। কিন্তু গিয়ে দেখি পাপানদার মা দরজায় তালা দিচ্ছে, কোথাও বেরচ্ছে, বাড়িতে আর কেউ নেই। কাজেই এখানে স্নান সারার আশা তিরোহিত হল । কিন্তু কাকিমা আমাকে বালতি হাতে ব্যাজার মুখে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বুঝে গেল, আর বলল -“এই রে, তুই এখন এলি! আমি তো একটু বেরচ্ছি রে, দশ মিনিট পরে যে বেরব সে উপায় নেই, দেরি হয়ে গেছে এমনিতেই “।
আমি “আচ্ছা” বলে ফিরে চলে আসছিলাম। কাকিমা ডাকেল আবার “দাঁড়া, কোথায় যাচ্ছিস! স্নান করবি না?”
আমি বললাম – “তুমি তো বেরচ্ছ”।
কাকীমা বলল- ” তাহলে অন্য ব্যবস্থা করতে হবে, তুই আয় আমার সাথে “।

কাকীমাদের বাড়ির পিছন দিক দিয়ে একটা রাস্তা ছিল, রাস্তা মানে পায়ে পায়ে হওয়া সরু পথ। ওরা ওটা দিয়ে গিয়ে দাসভিলার পাশ দিয়ে, ছোট মাঠ টা পেরিয়ে শর্টকাটে বড় রাস্তায় পৌঁছে যায়। এমনিতে সামনের রাস্তা দিয়ে গেলে অনেক টা ঘুর হয়। কাকিমারা এই পথেই যাতায়াত করে বেশি। সেইসূত্রে দাসভিলার বাসিন্দাদের সাথে ভালো সখ্যতাও গড়ে উঠেছিল ওদের। আমাদের বাড়ি থেকে দাসভিলা অনেকটাই দূর, মানে বড় রাস্তা হয়ে ঘুরে যেতে হয়, আর ওরা আমাদের প্রতিবেশীও নয়, কাকিমার বাড়ির পিছন দিক টা পড়ে। আমাদের ছাদ থেকে বাড়িটার একটা অংশ দেখা যায় মাত্র।

কাকিমা আমাকে পিছনের রাস্তা দিয়ে দাস ভিলায় নিয়ে গেল। বাড়িটা বড় রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় অনেক বার দেখেছি। এই প্রথম সামনে এলাম।এই এলাকায় এরকম প্রাসাদোপম বাড়ি একটু বেমানান লাগে। পুরনো বাড়ি সবই তো ভেঙে প্লট করে বিক্রি হচ্ছে, এটা এখনো রয়ে গেছে। আসল মালিক নাকি বিদেশে থাকে, বাড়িটা ভাড়া দেয়। ওই ভাড়াটেদের সাথেই কাকিমাদের ভালো সম্পর্ক। কাকিমা বড় গ্রিল ধরে দু তিন বার ঝাঁকাতেই এক ভদ্রমহিলা বেরিয়ে এলেন। মোটাসোটা, কোঁকড়া চুল, বড় সিঁদুর টিপ, মুখে পান চিবোচ্ছেন। কাকিমা আমাকে দেখিয়ে বলল-” এ হল মীরা, আমাদের ওইপাশের বাড়িতে থাকে, ওদের বাড়ি মিস্তিরির কাজ চলছে, তাই আমাদের বাড়িতে স্নান করতে এসেছিল, কিন্তু আমি তো বেরচ্ছি, পাপানের বাবা ব্যাংকে অপেক্ষা করছে, তাই ভাবলাম আপনার এখানে নিয়ে আসি, একটু স্নান করবে, বালতি মগ সব ও নিয়েই এসেছে, অসুবিধা নেই তো? “
ওই ভদ্রমহিলা পান খাওয়া দাঁত বার করে হেসে বিগলিত হয়ে বললেন -“আরে নানা অসুবিধা কিসের! আপনার প্রতিবেশী আমাদেরও তো প্রতিবেশী, এসো, এসো মা, কোন ব্যাপার না, এসো”।
ভদ্রমহিলা আমাকে হাত ধরে ভিতরে নিয়ে গেলেন, পিছন ফিরে একবার কাকিমার দিকে তাকালাম। কাকিমা আমাকে বলল “তাহলে আমি আসি, তুই স্নান সেরে বাড়ি চলে যাস”।

দাস ভিলার ভিতর টা অন্যরকম, আদ্যিকালের উঁচু সিলিং, মোটা মোটা দেওয়াল, ঠান্ডা লাল মেঝে। বড় ডাইনিং রুমের পাশ দিয়ে সিঁড়ি উঠে গেছে। ওইপাশে মনে হয় বাথরুম, কিন্তু ভদ্রমহিলা আমাকে উপরে যেতে বললেন, বললেন সিঁড়ি দিয়ে উঠে বাঁদিকে একটা ঘর, ওই ঘরে ঢুকে লাগোয়া বাথরুম আছে। আমি সিঁড়ি দিয়ে উঠতে আরম্ভ করছিলাম। সিঁড়ি আর নিচের তলার বাথরুমের মাঝের ঘর টা থেকে ছেলেদের গলার চটুল হাসিঠাট্টার আওয়াজ আসছিল। হটাৎ ওই ঘর থেকে একটা ছেলে বেরিয়ে এল আর আমাকে দেখিয়ে জিজ্ঞাসা করল -” এই মাল টা কে?” মুখ দিয়ে ভকভক করে মদের গন্ধ বেরচ্ছে ছেলেটির, চোখ লাল। আমি থমকে দাঁড়িয়ে পড়লাম। ভদ্রমহিলা ছেলেটিকে এক ধমক দিলেন -”বুবলাই!!! চুপ কর!! ছিঃ কি মুখের ভাষা, একদম মাতলামি করবি না, যা নিজের ঘরে যা!! দূর হ আমার সামনে থেকে! “
ছেলে টি মুখ বেঁকিয়ে ততধিক অশ্রাব্য একটা গালি দিয়ে আবার ওই ঘরে চলে গেল। ভদ্রমহিলা আমাকে বললেন “কিছু মনে কোরোনা, ও আমার ছেলে বুবলাই, আজ ওই ঘরে ওনার বন্ধুদের সাথে পার্টি লেগেছে, মচ্ছব! মদ খেলে জ্ঞান থাকে না, কারো কথা শোনে না, এই ছেলে নিয়ে যে আমার কি জ্বালা! তুমি উপরের বাথরুমেই যাও, নিচে থাকার দরকার নেই, যাও স্নান সেরে নাও, আমি নিচে রান্নাঘরে আছি, ওনাদের পার্টির খাবারের জোগান দিই এখন!”

আমি কথা না বাড়িয়ে উপরে উঠে গেলাম। উঠে বড় ডাইনিং, বাঁদিকে একটা ঘর খোলা, ডান দিকে সব ঘর পরপর তালাবন্ধ। উপরটা খুব একটা ব্যবহার হয়না বোঝাই যাচ্ছে। নীচতলার অতগুলো ঘরে ই হয়তো কাজ চলে যায়। ঘরে ঢুকে দেখলাম বড় ঘর, দেওয়াল জোড়া আয়না, বড় একটা পালঙ্ক। এই ঘর টা মনে হয় বাড়িওয়ালা আসলে ব্যবহার করে, জিনিসপত্র গুলো ও ওদেরই মনে হচ্ছে। কখনো প্রয়োজন পড়লে হয়তো ভাড়াটে ব্যবহার করতে পারে ভেবে খুলে দেওয়া। লাগোয়া বাথরুমে গিয়ে দেখলাম বিরাট বড় বাথরুম, একপাশে বাথটাব, চৌবাচ্চাতে জল ও ভরা আছে। একপাশে একটা আয়না। বাড়ির মালিক খুব সৌখিন ছিলেন বোঝাই যাচ্ছে। যাই হোক, স্নান করতে ঢুকে অমন বাথরুম দেখে আমাকে আদিখ্যেতায় পেল। শুকনো জামা কাপড় ঘরে ই রেখে ঘরের দরজা টা ভিতর থেকে বন্ধ করে দিয়ে আমি বাথরুমে ঢুকলাম। অনেক ক্ষন ধরে স্নান করে গা মুছে গামছাটাকে শরীরে বেড় দিয়ে তোয়ালের মতন করে জড়িয়ে নিলাম, যেমন টা সিনেমায় দেখেছি আর কি। নিজেকে নায়িকা ভাবছিলাম! বাথরুম থেকে ঘরে এসে বড় আয়নায় নিজেকে দেখছি, হঠাৎ মনে হল আয়নায় আমার প্রতিবিম্বের পাশে আরেকটি মেয়ের প্রতিবিম্ব ভেসে উঠল, বিষাদক্লিষ্ট ম্লান মুখ! এক ঝলকের জন্য এমন মনে হল। পরমুহূর্তেই দেখি না, কিছু নয়, মনের ভুল, আয়না জুড়ে কেবল আমি। শুকনো জামাটা পরব বলে সবে হাতে নিয়েছি, হঠাৎ দুম দুম দুম! বন্ধ দরজায় ঘা পড়ল বাইরে থেকে, সেই সাথে ওই বুবলাইএর গলা, “খোল শালী দরজা! বেরো খা………মা……”
সাথে আরও চার পাঁচ টা ছেলের গলার স্বর। একি ওরা উপরে উঠে এসেছে কেন! কি চায়! তাড়াতাড়ি জামা পরব বলে জামা হাতে নিতেই চড়াৎ করে একটা আওয়াজে দেখলাম দরজার পাশে যে জানলাটা ছিল, চাপ দিয়ে সেটা খুলে ফেলেছে ওরা। কিন্তু আমি তো একটা গামছা জড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছি, ওরা তো আমাকে দেখে ফেলবে! কোথায় লুকাব! মুহূর্তে নিজেকে আড়াল করার জন্য পালঙ্কের তলায় সেঁধিয়ে গেলাম। হাতের শুকনো জামা পরে রইল দূরে, আয়নার সামনে।
কিন্তু ওই ছেলে গুলো কি করছে। জানলা দিয়ে হাত ঢুকিয়ে একটা লাঠি মতো আঁকশি দিয়ে দরজা টা ভিতর থেকে খোলবার চেষ্টা করছে!! হে ঈশ্বর!! কি হবে এখন! কি করব! আমার জামাকাপড় তো ওই আয়নার সামনে, ওটা আনতে গেলে ওরা আমাকে এই গামছা মাত্র জড়ানো অবস্থায় দেখে ফেলবে। বাথরুমে ঢুকে যাব এক ছুটে? কিন্তু পালঙ্কের তলা থেকে বেরলেই তো ওরা আমাকে এভাবে দেখে নেবে! কিন্তু ওরা তো দরজার ছিটকানি টা খুলে ভিতরে ঢোকার চেষ্টা করছে। এখুনি খুলে যাবে ওটা। ওদের উদ্দেশ্য তো পরিস্কার, ভিতরে ঢুকে পালঙ্কের তলা থেকে আমার চুলের মুঠি ধরে টেনে বার করতে কতক্ষণ লাগবে ওদের, আর আমার গায়ে সেঁটে থাকা এই গামছা টান মেরে ফেলে দিতেই বা কতটুকু! আর ওই চার পাঁচ টা মদ্যপ জানোয়ার কে বাধা দেওয়া আমার পক্ষে অসম্ভব! ওই ভদ্রমহিলা কেন আসছেন না! কেন নিজের ছেলেকে কিছু বলছেন না!
পালঙ্কের তলায় প্রায় শোয়া আমি গামছাটাকে দু’হাতে আঁকড়ে রেখেছি, একটু দূরে আয়নার সামনে পড়ে থাকা আমার শুকনো জামা গুলো যেন এদিকে তাকিয়ে আমাকে ব্যঙ্গ করছে। বাইরে অবিশ্রান্ত গালাগাল আর কদর্য ভাষায় চিৎকার জানোয়ার গুলোর, ”লুকিয়ে বাঁঁচবি! শালী খা…………”
দরজা খোলার চেষ্টায় ক্ষান্তি নেই, ওই তো ছিটকানি টা নামছে, আর কিছুক্ষণ মাত্র, ওদের উল্লাসের শব্দ মাত্রাছাড়া! আমি পালঙ্কের তলায় জড়বৎ, কি হতে যাচ্ছে আমার সাথে!,কেন চটজলদি স্নান সেরে চলে গেলাম না! আর কয়েক মূহুর্ত মাত্র, তারপর ই শেষ হয়ে যাবে আমার সমস্ত চপলতা, উচ্ছ্বলতা! আমার কি খুব কষ্ট হবে?! আমি কি তারপর বেঁচে থাকব!? কেউ কি নেই আমাকে রক্ষা করার!? দেবতা- দানব, ভূত-প্রেত, রক্ষ-যক্ষ কেউই কি নেই যে আমাকে রক্ষা করতে পারে এই নিশ্চিত যন্ত্রণা আর অবমাননা থেকে!
যদি আত্মহত্যার উপায় থাকত এখুনি হয়তো তাই করতাম, কিন্তু তা যখন নেই তাহলে আমার সমস্ত চেতনা বিলুপ্ত হোক, সাক্ষী থাকতে চাইনা আমি নিজের সাথে ঘটতে যাওয়া অন্যায়ের! সমস্ত চেতনা বিলুপ্ত হোক, নিদ্রার শান্তি গ্রাস করুক আমার শরীর মন। প্রবল মানসিক চাপে ক্রমশ আমার চেতনা হারাচ্ছিল, সত্যিই যেন সব কিছু কোন বিস্মৃতির অতলে চলে গিয়ে চোখের সামনে কালো পর্দা নেমে এল। জ্ঞান হারানোর আগের মূহুর্তে শুধু কানে এল দড়াম করে দরজা টা খুলে যাওয়ার শব্দ।

দুম দুম দুম দুম! দুম দুম! দুম দুম দুম! ক্ষীণ থেকে স্পষ্ট হতে থাকল আওয়াজ টা কানে, তার সাথে আমার নাম ধরে কেউ ডাকছে, মীরা! মীরা!
বুবলাইয়ের মায়ের গলা না!? ভদ্রমহিলা আমার নাম ধরে ডাকছেন আর দরজা ধাক্কাচ্ছেন! একি আমি এখনো পালঙ্কের তলায় শুয়ে! বেরিয়ে এলাম। মাথা টা ভার। উত্তর দিলাম “খুলছি জেঠিমা”। তাকিয়ে দেখলাম দরজা ভিতর থেকে বন্ধ ই আছে, আর জানলাটাও বন্ধ ভিতর থেকে! চটপট জামাকাপড় পরে দরজা খুললাম। বুবলাইএর মা ওই জেঠিমা আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন -” তুমি ঠিক আছো তো?”
আমি ঘাড় কোনরকম নাড়লাম মাত্র, ভীষণ হতভম্ব হয়ে গেছিলাম পুরো ব্যাপার টা তে। জেঠিমা বললেন – “এদিকে আরেক কান্ড হয়েছে, বুবলাই অজ্ঞান হয়ে গেছিল, ওর বন্ধুরা বলল ওরা ওপরে এসেছিল, তখন নাকি কি দেখে ভয় পেয়েছে, ভেঙে বলছে না কিছু। তুমি আবার অনেকক্ষন উপরে আছো, আমি ভাবলাম তুমি আবার ঠিক আছো কিনা”। আমি ভেজা জামা আর গামছা বালতিতে নিয়ে জেঠিমার পিছন পিছন নিচে নেমে এলাম। ডাইনিং রুমের সোফায় বুবলাই জানোয়ার টা শুয়ে আছে। ওর বন্ধু গুলো পাশে দাঁড়িয়ে। আমার দিকে জুল জুল করে অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে তাকাল। মদের নেশা যে ছুটে গেছে সবকটার মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে। জেঠিমা গিয়ে ছেলের পাশে বসলেন। আমি বেরিয়ে এলাম দরজা দিয়ে। পিছন পিছন বুবলাইএর একটা বন্ধু বেরিয়ে এসে আমার পথ আটকে দাঁড়াল।- ” এই মেয়ে তুমি কালা জাদু জানো তাই না? বুবলাইএর যদি কিছু হয় না, তোমাকে দেখে নেব”।
আগুন জ্বলে উঠল আমার দু’চোখে- “চুপ একদম!!! বেশি বাড়াবাড়ি করলে তোদের হাল বুবলাইএর থেকে ও খারাপ হবে, বলব জেঠিমা কে তোরা উপরে গিয়ে কি করছিলিস? থানায় জানাব?”
কথায় কাজ হল। চুপসে গিয়ে কাঁচুমাচু মুখে দাঁড়িয়ে রইল। আমি কড়া গলায় জিজ্ঞাসা করলাম -“ঠিক করে বল তো কি হয়েছিল ওখানে “
ঝাপট খেয়ে সে যা বলল তার মর্মার্থ হল- বুবলাই ওদের বলে উপরে গিয়ে মেয়েটাকে নিয়ে ফূর্তি করার কথা। ওরা উপরে এসে দরজা বন্ধ দেখে জানলা খুলে সেখান দিয়ে আঁকশি ঢুকিয়ে টেনে ছিটকানি নামায়,সেটাও বুবলাইএর ই বুদ্ধি, এবং দরজাও খুলে যায়, ওরা ঘরে ঢুকতে যাবে এমন সময় বুবলাই কি দেখে প্রচন্ড ভয়ে চিৎকার করে ওঠে আর অজ্ঞান হয়ে যায়। আর ঘরের দরজা আর জানলা নাকি আপনিই ভিতর থেকে সশব্দে বন্ধ হয়ে যায়। ওরা বুবলাই কে নিয়ে পড়ি কি মরি করে নিচে চলে আসে।

আমি বাড়ি ফিরে আসি। পরে শুনেছিলাম বুবলাই নাকি বলেছে ঘরে এক ভয়ালদর্শন মহিলা, ঠিকরে বেরিয়ে আসা চোখ, মুখের বাইরে ঝুলতে থাকা জিভ, মুখেচোখে ভয়ানক জিঘাংসা নিয়ে হাত বাড়িয়ে বুবলাই এর দিকে তেড়ে আসছিল! সম্ভবত তা দেখেই বুবলাই অজ্ঞান হয়ে যায়। আর তারপর ই নাকি ঘরের দরজা ভিতর থেকে সশব্দে বন্ধ হয়ে যায়, আর জানলাও।
পরদিন সকালে ধুমজ্বর নিয়ে বুবলাই হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল, আর কোনদিন স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেনি, সারাক্ষণ বিড়বিড় করত পাগলের মতো। আর একমাস মাত্র দাসভিলায় বুবলাই এর পরিবার ভাড়া ছিল। তারপর ওরা অন্যত্র চলে যায় বুবলাই এর চিকিৎসার জন্য। যথেষ্ট শাস্তি হয়েছে দেখে আমিও আর কাউকে কিছু বলিনি।

তার বেশ কিছু কাল পরে আমার বড় পিসিকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম দাস ভিলার সম্পর্কে কিছু জানে কিনা (বড় পিসি বাবাদের থেকে বেশ খানিকটা বড়)। বড়পিসি বলেছিল দাস ভিলার আসল মালিকের সুখী পরিবারের করুণ পরিণতির কথা। তার একমাত্র মেয়ে টি স্কুল থেকে ফেরার পথে ধর্ষিতা হয়েছিল এবং বিচার না পেয়ে অবজ্ঞা আর অসম্মান থেকে মুক্তি পেতে অবশেষে বাড়িতে দোতলার একটি ঘরে গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করে। তার বাবা মাধব দাস মেয়ের মৃত্যু তে ভেঙে পড়েন, তিনিও আর বেশি দিন বাঁচেন নি। মেয়েটির মা অর্ধ উন্মাদ যখন, মেয়েটির মামা তাঁকে নিজের কাছে নিয়ে যান। পরে বাড়ি টি বিক্রি করে দেওয়া হয়।

বুবলাই কি সেই মেয়েটিকেই দেখেছিল?! কে সে!? মায়াবিনী? পিশাচিনী? প্রেতিনী? হতে পারে ; তবে আমার কাছে তো সে দেবীই! অসুর বিতাড়নে আবির্ভূত হয়েছিল যে, তাকে দেবী ছাড়া আর কি বলব!

প্রেসেন্টেশনটা আপাতত শেষ হয়েছে কিন্তু হাতে এখনও কয়েকটা কাজ বাকি, কিন্তু দিয়ার তখন চোখ ঘুমে বুজে আসছে, হবেনা বা কেন লাস্ট তিন চারদিন ধরে তো এই প্রেসেন্টেশনের চাপে রাতে ঘুমও হয়নি ঠিক করে। তাই একটু মাথাটা ডেস্কে রেখে সবে দিয়া একটু চোখ বন্ধ করেছে, হঠাৎ মনে হলো পিঠে একটা হাত, আর সঙ্গে সঙ্গে দিয়া হকচকিয়ে উঠে পিছনে তাকিয়ে দেখে দিয়ার অফিসের বস কিন্নর বাসু। দিয়ার ওনার দিকে তাকানোর পরেও হাতটা ঘুরেফিরে যাচ্ছে ওর পিঠের ওপরে ঠিক ব্রায়ের স্ট্র্যাপটার আশপাশে। দিয়া হঠাৎ এমন একটা আচরনে ঠিক কি করবে বুঝে উঠতে পারেনা, তবে উঠে দাঁড়িয়ে তাকায় ওর বসের দিকে। আর দিয়া উঠে দাঁড়াতেই উনি বলে বসেন, শরীর খারাপ নাকি? এরকম শুয়ে ছিলে তো তাই জিজ্ঞেস করলাম।
দিয়ার তখন রাগে আর কিছু বলে উঠতে না পারার অস্বস্তিতে ওনার মুখের দিকে তাকাতেই ইচ্ছা করছেনা, তাও উত্তর দিলো, না শরীর খারাপ না।
কিন্নর বাসু – কাজটা শেষ করে আমার কেবিনে এসো একবার।
এবার দিয়ার বেশ ভয় ভয় লাগছে। অফিসে ওর ডিপার্টমেন্টে তখন আর প্রায় কেউ নেই, কি জন্য ডাকতে পারে বস এটাই ভাবতে ভাবতে হাতের কাজটা কোনরকমে শেষ করে বসের কেবিনের দিকে পা বাড়ায়।
দিয়া – আসতে পারি?
কিন্নর বাসু – এসো এসো তোমার জন্যই তো অপেক্ষা করছি।
দিয়া – বলুন স্যার।
কিন্নর বাসু – আগে বসো তো। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সব কথা হয় নাকি?
দিয়া চেয়ারটা টেনে বসতেই ওর বস উঠে দাঁড়ায়, একটা সিগারেট জ্বালিয়ে নিয়ে জানলার কাছে গিয়ে দাঁড়ায়।
কিন্নর বাসু – আচ্ছা দিয়া তোমার কাজ করতে কেমন লাগছে এখানে?
দিয়া – ভালো স্যার।
কিন্নর বাসু – আর আমাকে তোমার কেমন লাগে?
দিয়া এই প্রশ্নটার জন্য একদমই প্রস্তুত ছিলনা, বরং প্রশ্নটার সাথে সাথেই কি উত্তর দেবে এটা ভেবেই একটা অস্বস্তি লাগতে থাকে। এরমধ্যেই আবার ওর পিঠে একটা হাতের ছোঁয়া টের পায়, আর সিগারেটের ধোঁয়ার সাথে গন্ধটা এসে লাগে নাকে, কানের কাছে ফিসফিস করে ওঠে বসের ঠোঁটদুটো, কি হলো দিয়া বললে না তো আমায় তোমার কেমন লাগে? আমার কিন্তু তোমায় বেশ লাগে।
কথাটা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ব্যাগটা বুকের সাথে জাপটে ধরে চেয়ার থেকে উঠে দৌড়ে বেরোতে যাবে এরমধ্যেই দিয়ার হাতটা চেপে ধরে ওর বস, আর তারপর কাছে টেনে নেওয়ার তীব্র চেষ্টা চালায়। দিয়া প্রানপনে ওনার হাত থেকে নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করতে থাকে, তারপর একটু আলগা হতেই টেবিলের ওপরে রাখা ফুলদানিটা দিয়ে মাথায় একটা জোড়ে আঘাত করে। কিন্নর বাসু এবার দিয়াকে ধরার আশা ছেড়ে দিয়ে হেল্প হেল্প বলে চিৎকার করতে থাকে।
ওনার চিৎকারে যে কজন ছিলো অফিসে সবাই চলে আসে। আর তখনও ওই ফুলদানিটা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে দিয়া। দিয়ার তখন ভয়ে হাত পা কাঁপছে থরথর করে, জামার একটা হাতা ছিঁড়ে ঝুলছে, বুঝে উঠতে পারছেনা কি করবে।
আর কিন্নর বাসু তখন চিৎকার করে সবাইকে বলছে, এই মেয়েটাকে আমি একটা কাজের জন্য ডেকে পাঠিয়েছিলাম, টেবিলের উপর থরে থরে সাজানো কাগজপত্রই তার প্রমান, এই মেয়েটা নিজেই আমাকে এতক্ষণ ধরে নানান কথা বলে প্রলোভন দেখানোর চেষ্টা করে যখন ব্যর্থ হলো, তখন নিজেই নিজের জামাটা ছিঁড়ে আমার মাথায় এই ফুলদানি ছুঁড়ে মারলো। তোমরাই দেখো এখনও ওটা হাতে নিয়েই দাঁড়িয়ে আছে।
দিয়া কি করবে না বুঝতে পেরে হা করে দাঁড়িয়ে আছে পাথরের মত। অফিসের কিছু লোকজন তখন বেশ কিছু নোংরা মন্তব্য ছুঁড়ে দিচ্ছে ওর দিকে। কেউ বলছে, একেবারে চরিত্রহীন, কেউ আবার বলছে কি নোংরা মেয়েছেলেরে বাবা। ফুলদানিটা মাটিতে রেখে দিয়ে ব্যাগটা হাতে নিয়ে যখন বেড়িয়ে যাচ্ছে দিয়া, তখনই ওদের অফিসের অন্য একটা ডিপার্টমেন্টের মেঘা ওর হাতটা ধরে বলে, একটু দাঁড়াও দিয়া, আমার কিছু বলার আছে। তারপর সবার সামনে বলে আজ তুমি যেটা পেরেছো, আমি পারিনি। আমার সাথেও এই লোকটা এইরকম করেছিল, আমাকে ভয় দেখাতো চাকরি চলে যাওয়ার। আমার বাড়িতে আমার অসুস্থ ভাই, তাই আমি চাইনি আমার চাকরিটা চলে যাক, আর এই কারনেই আমায় দিনের পর দিন মুখ বুজে অনেক কিছু সহ্য করে নিতে হয়েছে। তুমি যে কাজটা করেছো একদম ঠিক করেছো, এবার হয়তো ওই শয়তানটা কাউকে ছোঁয়ার আগে দশ বার ভাববে।
মেঘা দিয়ার হাতটা শক্ত করে ধরতেই দিয়ার চোখ দিয়ে জল পড়তে থাকে।
ওদের অফিসের আরেক ডিপার্টমেন্টের লিলিও এবার হাতটা ধরে দিয়ার, আর বলে, তুমি কেন কাঁদছো দিয়া, তোমার তো কাঁদার কথা নয়। কাঁদার কথা এবার ওই লোকটার। আমারও সর্বনাশ করেছে ওই লোকটা। আমার পরিবারের আর্থিক অবস্থা ভালো নয়, এই চাকরিটা আমার খুব প্রয়োজন। আর সেই সুযোগ নিয়ে আমাকেও বারবার অপমান করেছে এই কিন্নর বাসু। আজ তুমি একা নও, আমি মেঘা দুজনেই আছি তোমার সাথে, অফিসে আর অফিসের বাইরে হয়তো কত মেয়ের সাথে এমন অন্যায় করেছে এই লোকটা, এর একটা শেষ হওয়া দরকার। তারপর আর দেরি না করে পুলিশে একটা ফোন করে লিলি, আর তারপর পুলিশ এসে নিয়েও যায় কিন্নর বাসুকে।
পুলিশ যখন কিন্নর বাসুকে নিয়ে যাচ্ছে, মুখে একটা রুমাল চাপা দিয়ে গাড়ীতে উঠে বসলেন তিনি। আর লিলি, মেঘা আর দিয়া তিনজনেই সেদিন শপথ নেয় ওই রুমাল সরিয়ে কোন মেয়ের দিকে যাতে ওই লোভাতুর দৃষ্টিতে আর না তাকাতে পারে ওই কিন্নর বাসু সেই ব্যবস্থাই করতে হবে আজ থেকে, আর এই অপমানিত তিনটি মেয়ের বন্ধুত্বের শুরু হলো ওই অপমানের লড়াইয়ের হাত ধরে।

WhatsApp Image 2020-08-21 at 13.13.14

গানের রিয়ালিটি শো’তে এক অসামান্য গায়িকা হলেন আলো মুখার্জী।আজ গ্রাণ্ড ফাইনাল শো।আর এই ফাইনাল শো দেখার জন্য যাচ্ছেন মৈত্রেয়ী গঙ্গোপাধ্যায়।আলো মুখার্জীর গানের অন্ধ ভক্ত উনি।কতই বা বয়স হবে মেয়েটির ঊনিশ কি কুড়ি।দুটো চোখেই দেখতে পায়না অথচ এই বয়সে যে এত সুন্দর গান করে,সেটা ভেবেই অবাক হয়ে যান।সুদূর গ্রাম থেকে উঠে আসা একজন মেয়ে।অনেক প্রতিকূলতা জয় করে সে এই জায়গায় পৌঁছতে পেরেছে একথা তাকে বার বারই বলতে শুনেছে এই শো’তে।খুব ইচ্ছা মেয়েটিকে সামনে থেকে দেখার এবং মেয়েটির মায়ের সাথেও আলাপ করার ইচ্ছে আছে।কারণ মেয়েটির মা-ই নাকি তার জীবনের সব।আর গ্রাণ্ড ফাইনাল শো’তে মেয়েটির মা আজ আসবেন।গ্রামের একটা মেয়েকে কীভাবে এই জায়গায় পৌঁছে দিলেন ওই মা, আজ সেটাই জানার‌।মৈত্রেয়ী দেবী নিজেও একজন রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী।নিজের গানের স্কুলও আছে।মোটামুটি একটা নাম ডাক আছে মৈত্রেয়ী দেবীর।কারণ নিজের বাড়িতেই গান বাজনার চর্চা বহুকাল আগে থেকেই।

গানের ফাইনাল শো শুরু হয়েছে।অনেক নামী দামী মানুষ আজ এসেছেন। বলতে গেলে লোকজন ঠাসা।মঞ্চে একটার পর একটা গান গেয়ে যাচ্ছে আলো।অপূর্ব গানের গলা।বিচারকদের মন জয়ে করে নিয়ে প্রথম স্থান অধিকার করে নিয়েছে আলো মুখার্জী।আজ আলো মুখার্জীর জীবনে আলোয় আলো।চারিদিকে এত আলো সে আজ মনের চোখ দিয়ে দেখে নিচ্ছে।অনুষ্ঠান শেষ হলেই মৈত্রেয়ী দেবী পরিচয় করবেন আলোর সাথে।একটা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করা।

আলোর হাতে পুরষ্কার তুলে দেওয়া হবে কিছুক্ষণের মধ্যে।মঞ্চের মধ্যে আলো আলোকিত করে দাঁড়িয়েছে।করতালির বন্যা বয়ে যাচ্ছে চারিদিক।আজ আলোকে কিছু কথা বলার জন্য মাইকাফোনটা হাতে তুলে দেওয়া হয়।আলোর এই গানের জগতে আসা,তার পরিবারের সহযোগিতা ইত্যাদি বিষয় জানতে চাওয়া হয় আলোকে।তারপর আলো বলতে শুরু করে..

আমি আলো মুখার্জী।আজ আমি কী বলব নিজেই ভেবে পাচ্ছি না।বীরভূমের একটা প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে উঠে আসা একটি মেয়ে আমি।ছোটো থেকেই আমার গান ভাল লাগতো।নিজের মনে মনেই গান গাইতাম।মাকে বলতাম..

“-মা আমি গান শিখব।”

মা বলত..

“-আর একটু বড়ো হ।তারপর।”

ছোটো বেলায় একটা গান আমার খুব প্রিয় ছিল।স্কুলে গেলে বন্ধুরা বলত…

“-আলো একটা গান শোনা না?”

আমি শোনাতাম সেই প্রিয় গান..”চোখের আলোয় দেখেছিলেম চোখের বাহিরে”..আমার মায়ের থেকে শেখা এ গান‌।

জন্ম থেকেই চোখে দেখিনা আমি।অথচ আমার নাম আলো‌।বন্ধুরা হাসত,দৃষ্টি শক্তিই নেই, অথচ নাম আলো।এই নামটা আমার মায়ের দেওয়া।যে কোনো দিন জানলই না আলো কী।এটা নিয়ে কোনো দিনও কোনো আক্ষেপ করিনি আমি।ঈশ্বর আলো না দিক, কিন্তু আলোর মতো শক্তি আমাকে দিয়েছে।আজ আমার চারপাশে আলোয় ঝলমল করছে।আমি সব দেখতে পাই নিজের অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে।আজ আমি সেই সব মানুষদের দেখাতে পেরেছি,যারা বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছিল একদিন। মা’কে দিনের পর দিন চরম অপমান সহ্য করতে হয়েছে।অনেক অনেক খারাপ কথা বলেছে…

“তোমার মতো অপয়া মেয়ে একটাও দেখিনি।বিয়ের পর থেকে একটা না একটা অঘটন ঘটিয়েই চলেছো।তারপর এমন একটা মেয়ের জন্মদিলে সে আবার অন্ধ।পৃথিবীর আলোটাও দেখতে পেল না‌।এসব পাপের ফল বুঝলে তো,তোমার পাপের ফল।”

আমি নাকি আমার মায়ের পাপের ফল।এমন অভিযোগ করত আমার ঠাকুমা‌।মা ভীষণ কষ্ট পেত। শুধু মা নয়,আমার প্রতিও ছিল ঠাকুমার বিরূপ দৃষ্টি।যেহেতু জন্মের আগেই আমার বাবা মারা গেছেন।শুনেছি বাবা মারা যাওয়ার কারণ হচ্ছে লিভারে ক্যানসার।অত্যধিক পরিমাণে ড্রিঙ্ক করত।সেটা বিয়ের আগে থেকেই। বাবার এই অতিরিক্ত মদ্য পানে আসক্তি নিয়ে মায়ের সঙ্গে ভীষণ ঝামেলা হত।ঠাকুমা বলত..

“-আমার ছেলেটা জীবনে শান্তি পেল না।পুরুষ মানুষ ওরকম একটু আধটু নেশা করে।তা’বলে কি বাড়ি মাথায় করতে হবে?তোমার ইচ্ছে হয় থেকো,না হলে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেও।”

এই ধরনের কম কথাও মাকে শুনতে হয়নি।ঠাকুমার প্রশ্রয় যদি না থাকত,তাহলে বাবাও অকালে মারা যেত না‌।কিন্তু আর কত দিন এভাবে সহ্য করা যায়?ঠাকুমা আর পিসি খুঁটিনাটি নিয়ে অশান্তি করত এবং শেষমেষ আমাদের ঘর ছাড়া করল একদিন।তখন আমার বয়স তিন বছর।তবে আমার জীবনে যে মানুষটা এতোটা আলো ঢেলেছে সে মানুষটা আর কেউ নয়, তিনি আমার মা।আমি চাই আজ এই মঞ্চে একবার মাকে নিয়ে আসতে।যদি অনুমতি দেন….

মঞ্চে আসেন আলো মুখার্জীর মা।আলো বলতে থাকে….

“-এই হলো আমার মা‌।”….মায়ের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়ে আলো বলে… “আমি চাই মা কিছু বলুক” বলে মাইকা ফোনটা মায়ের হাতে দেয় আলো…..

আমার পরিচয় আপনারা পেয়েছেন।হ্যাঁ আজ আমার একটাই পরিচয়,আমি আলোর মা।আলোর কথা থেকে অনেকটাই হয়তো বুঝে গেছেন আপনারা।আজ থেকে তেইশ বছর আগে আমার বিয়ে হয়েছিল কলকাতার এক বনেদী বাড়িতে।শিক্ষা রুচি রীতি নীতি সব দিক দিয়ে বেশ উন্নত মানের মনে হয়েছিল তখন।কিন্তু এই মনে হওয়াটাই ভুল ছিল।পরে অবশ্য বুঝেছিলাম মানুষ গুলোই ভুল।কিছু মানুষ সংসারে থাকে যারা ঝগড়া করার জন্য কারণ খোঁজে।আর না পেলে পায়ে পা তুলে ঝগড়া করবেই।এরকম দুজন মানুষ হলো একজন আমার শাশুড়ি মা,আর অন্যজন হলো আমার ননোদ।শ্বশুর বাড়ি থেকে যখন তাড়িয়ে দেওয়া হলো তারপর থেকে শুরু হলো এক অন্য জীবন।এক অন্ধকারময় জীবনে মুখ থুবড়ে গিয়ে পরলাম একবারে।বাবার বাড়িতে গিয়ে ছিলাম কিছুদিন।কিন্তু কতদিন?আত্মসম্মান বলে তো একটা জিনিস আছে।বাপের বাড়িতে থাকাটা ভালো দেখায় না।তাই নিজের বাঁচার জন্য নিজেকেই চেষ্টা করতে হবে।খবরের কাগজের বিজ্ঞাপন দেখে একটা প্রাইমারী স্কুলে চাকরি পেলাম বীরভূমের একটি প্রত্যন্ত গ্রামে।কলকাতা ছেড়ে কাউকে না জানিয়েই চলে এলাম বীরভূম।আমার বাবা অবশ্য আটকে ছিল আমাকে,কিন্তু কোথায় যাচ্ছি আমি সেটা বলে গেলাম না আর।

তারপর থেকে জেদ চাপল মেয়েকে মানুষ করতেই হবে।ভগবানের ওপর বিশ্বাস রাখলাম।ভগবান দৃষ্টি শক্তি না দিলেও এমন কিছু তো একটা শক্তি দিয়েছেন যার জন্য সে অনেক বড়ো হতে পারে।এটুকু বিশ্বাস ছিল নিজের মধ্যে।পড়াশোনার পাশাপাশি গান শেখাতে লাগলাম।কণ্ঠে সুর দিয়েছেন ভগবান।আর সেই সুরের ছোঁয়া আজ আলোকে পৌঁছে দিয়েছে এক নতুন জগতে।আজ এই মঞ্চ আলোকে যেমন অনেক বড়ো সম্মান দিল,তেমনি আমাকে পরিচিত করালো আলোর মা হিসেবে।মেয়ের সম্মানে আমিও আজ সম্মানিত,আমি গর্বিত” কথা গুলো বলে মাইকাফোনটা হাতে দিয়ে মঞ্চের ওপর দাঁড়িয়ে কেঁদে ফেলেন।

মঞ্চে বহু গুণী মানুষজন উপস্থিত।আলোর হাতে তুলে দেওয়া হয় পুরষ্কার ও সম্মাননা পত্র।তারপর আলো বলে..

“এই পুরষ্কার আমার নয়,এ সব কিছু পাওনা আমার মায়ের।তাই আজ আমি আমার মায়ের হাতে তুলে দিলাম।কারণ এ পৃথিবীতে মা ছাড়া যে আমার কেউ নেই।কারণ পিতৃদেবের পরিচিতি খোলস “গঙ্গোপাধ্যায়” পদবী ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে আমি আজ মায়ের পদবী গ্রহণ করেছি।কারণ আমি মায়ের চোখ দিয়ে যে সমগ্র জগৎ দেখেছি।আজ আমার মাকে কেউ বলতে পারবে না অপয়া।এমন দিনটার আশাতেই ছিল আমার মা,আজ সে স্বপ্ন সার্থক।

কথা গুলো শোনার পর থেকে মৈত্রেয়ী দেবী নিজেকে আর স্থির রাখতে পারেনি।একটা অস্থিরতা কাজ করতে থাকে।একটা অপরাধ বোধের যন্ত্রণা দলা পাকিয়ে ওঠে মনের মধ্যে।তেইশ বছর আগে ঘটে যাওয়া সমস্ত ঘটনা মনের মধ্যে ভেসে ওঠে আর একবার।মঞ্চের চারিদিকে আলো আর আলো।এত আলোর মধ্যেও কোথাও যেন একটু অন্ধকার খোঁজে মৈত্রেয়ী দেবী।চোখটা কেমন ঝাপসা হয়ে ওঠে।মনের মধ্যেই একটা অচেনা অন্ধকারে হারিয়ে ফেলে নিজেকে।
(সমাপ্ত)

WhatsApp Image 2020-08-21 at 13.13.45

ছোট থেকেই বাবা ছিল আমার বন্ধুর মতো।মা মারা যাওয়ার পর থেকে বাবাই হয়ে উঠেছিল আমার কাছে সর্বেসর্বা।ক্লাস টেনে পড়ার সময় মা মারা গেল।আমাকে নিয়ে তো বাবার চিন্তার শেষ নেই। মেয়েরা বড়ো হলে বাবা মায়ের মনে অনেক চিন্তাই আসে।তাই টুয়েলভ পরীক্ষা দেওয়ার পর বাবা আমার বিয়ে নিয়ে অস্থির হয়ে উঠলেন।তো সেদিন বাবা বললেন..

“-তাহলে অনির্বাণ দের বাড়িতে গিয়ে কথা বার্তা বলে রাখাই ভালো,তাই না?”

“-কীসের কথা বার্তা বাবা?”

“-তোর বিয়ের।তোর মা নেই,এখন তো সবটাই আমাকে ভাবতে হবে তাই না?”

“-তা তুমি অনির্বাণের বাড়িতে কেন যাবে সেটাই তো বুঝতে পারছি না?”

“-আমি জানি তো তুই অনির্বাণকে ভালো বাসিস।”

“-কী যে বলো বাবা। অনির্বাণ আমার খুব ভালো বন্ধু। এর থেকে তো বেশী কিছু নয়।”

আসলে কাছের বন্ধুর সঙ্গে বিশেষ সম্পর্ক হতেই পারে।একটা ছেলে আর একটা মেয়েকে একসঙ্গে কোথাও দেখা গেলে অথবা তাদের মধ্যে খুব ভালো বোঝা-পড়ার সম্পর্ক দেখা মাত্রই ধরে নেওয়া হয় তাদের মধ্যে বন্ধুত্ব বাদেও সম্পর্ক আছে।তবে ছেলে বন্ধু মানেই যে প্রেমিক এমন ধারণাটা সত্যি নাও হতে পারে।ঠিক এই ভুলটাই করেছিল আমার বাবা।

পরিবারের বাইরে যার হাতে হাত রেখে অচেনা স্থানে চলে যাওয়া যায় সেই তো আসল বন্ধু।অনির্বাণ আমার জীবনে সে রকমই এক বন্ধু।স্কুলজীবনের শুরুতে জীবনের প্রভাতি বেলায় পরিচয় হয়েছিল অনির্বাণের সাথে।স্কুলে গিয়ে প্রথম দিন অনির্বাণকেই বন্ধু বলে জেনেছিলাম।এক সাথে স্কুলে যাওয়া, খেলাধূলা,হৈ হুল্লোড় সে এক রঙীন ছোটবেলা।আমাদের এই বন্ধুত্বের সূত্র ধরেই অনির্বাণের বাবার সাথে আমার বাবারও খুব ভালো বন্ধুত্ব হয়ে যায়‌।তারপর আস্তে আস্তে অনির্বাণ হয়ে গেল আমার বেস্ট ফ্রেন্ড। মনের যাবতীয় সুখ দুঃখের ভাগীদার হয়ে গেল অনির্বাণ।দুজনকে এক সঙ্গে মেলামেশা করতে দেখে অনেকেরই ধারণা ছিল অনির্বাণের সাথে আমার নিশ্চয়ই প্রমের সম্পর্ক।

সে যাই হোক, বাবা যখন জানতে পারল যে,অনির্বাণ আমার জীবনে খুব ভালো বন্ধু ছাড়া আর কিছুই নয়,তখন আমার জন্য অন্যত্র বিয়ের সম্বন্ধ দেখা শুরু করলেন। উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করার পরই আমার বিয়েটা হয়ে যায়।অনেকেই অবশ্য অনির্বাণকে জিজ্ঞেস করেছিল..

“-মধুরিমা তোকে ছেড়ে দিল কেন?”

অনির্বাণ হেসেই বলে ছিল…..

“-প্রকৃত বন্ধুত্ব সেটাই যেটা চিরকাল থাকবে।বন্ধুত্বকে তো প্রেমের জায়গায় নিয়ে যাই নি।তাই ছেড়ে যাওয়ার কথা আসে কোথা থেকে?”

আসলে বন্ধুত্ব হলো সেটাই যা চির দিন থাকে। জীবনের পথে হাঁটতে হাঁটতে যে যেখানেই থাক না কেন, চলার পথে বন্ধুত্ব নামের এই পাথেয়টির তুলনা বোধ হয় আর কিছুর সঙ্গেই চলে না।এ এমনই বিষয়, যেন কিছু না থাকলেও বন্ধুত্ব থাকলে চলে। আবার সব থাকলেও বন্ধুত্ব ছাড়া চলে না!

আমার বিয়ের পর আমার হাজব্যাণ্ডের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলাম অনির্বাণের।বন্ধুত্ব থেকেই বোধহয় নতুন বন্ধুত্বের সৃষ্টি হয়।অনির্বাণও আমার হাজব্যাণ্ডের ভালো বন্ধু হয়ে গেল।ছুটির দিনে আমার হাজব্যাণ্ড নিজেই অনির্বাণকে দুপুরে লাঞ্চের ইনভাইট করতো।এমন কত দিন গেছে এক সঙ্গে তিন জন রেস্টুরেন্টে খেয়েছি,ঘুরেছি,কত আনন্দ করেছি।

বিয়ের পর থেকে প্রায় আট বছর কেটে গেছে।ততদিনে অনির্বাণও ভালো চাকরি পেয়েছে একটা।একদিন অনির্বাণকে ফোন করেছে,এটা সেটা নানান কথা হচ্ছে, তা আমিই বললাম…

“-চাকরি তো পেয়েছিস, এবার বিয়েটা কর।”

“-হ্যাঁ রে বাড়ি থেকেও বলছে।”

“-সত্যিই তো অতো বড়ো বাড়িতে কাকিমা একা। একটা কথা বলার মতো বন্ধু তো দরকার।তাই না?”

“-ঠিক বলেছিস, আর দেরি করা যাবে না।”

তারপর থেকে অনির্বাণের পাত্রী খোঁজা শুরু হলো। যেখানেই পাত্রী দেখতে যায় সঙ্গে আমাকেও নিয়ে যায়। অন্যান্য বন্ধু থাকলেও আমাকে যেতেই হবে এমনটাই ওর দাবী। কখনো কখনো আমার হাজব্যাণ্ডও সঙ্গে গেছেন।কিন্তু পাত্রীপক্ষ এমনকি পাত্রী নিজেও অনির্বাণকে ক্যানসেল করে দিত। কারণ দেখতে গেলেই আমাকে দেখিয়ে অনির্বাণকেই জিজ্ঞেস করতেন, ইনি কে? যেই শোনে আমি ওর বান্ধবী, ওমনি না করে দেয়।আর ভাবে কিছু না কিছু একটা সম্পর্ক আছে। আমি অনির্বাণকে বলতাম..

“-এবার থেকে দেখাশোনার জন্য যখন যাবি, তখন আমাকে আর সঙ্গে নিস না।”

“-কেন?একটা মেয়ে কি একটা ছেলের বন্ধু হতে পারে না?এসব ভ্রান্ত ধারণা কেন? তুই যাই বলিস আমি তোকে সঙ্গে নিয়েই যাব, দেখিই না কী হয়। একটা ছেলের সাথে একটা মেয়ের বন্ধুত্ব গড়ে ওঠা তো অস্বাভাবিক নয়। আর বন্ধুত্ব গড়ে উঠে সুখ-দুঃখ সহভাগিতা, সহযোগিতা,বোঝাপড়া কিছু দায়িত্ব পালন আর খুনসুটির মধ্য দিয়ে। সুতরাং দুই ভিন্ন লিঙ্গে মানুষকে একসঙ্গে দেখা গেলেই তাদের মধ্যে প্রেম আছে বা নিশ্চয়ই আলাদা কোনো সম্পর্ক আছে এমনটা ধরে নেওয়ার তো কোনো কারণ নেই।”

অনির্বাণ নিজে যেটা ঠিক মনে করবে সেটাই ও করবে,আমি বললেও আমার কথা শুনবে না‌।তাই পরের বার আমাকে নিয়েই গেল দেখা শোনার জন্য‌।ওখানে যেতেই সেই একই প্রশ্ন।অনির্বাণের জবাব..

“-আমার ছোট থেকেই একে অপরকে চিনি।আমরা এক সঙ্গেই পড়াশোনা করেছি ছোট থেকেই, আমার ভীষণ ভালো একজন বন্ধু বলতে পারেন।”

সব শুনে মেয়েটি বলে…

“-এটা দেখে ভালো লাগছে ছোটো বেলার সেই বন্ধুত্বটা এখনো বজায় আছে। আসলে অনেক ছেলে মেয়েই বিয়ের পর আর বন্ধুত্ব রাখতে চায় না।যেটা আপনাদের আজও অটুট।বন্ধুত্ব হচ্ছে ট্রাডিশন,ধরে রাখতে হয়।”

এমন কথা বলা সেদিনের সেই মেয়েটিই আজ অনির্বাণের ঘরণী।ওর নাম অঙ্কিতা।আর এখন অঙ্কিতাও আমার ভালো বন্ধু।ইংরেজি সাহিত্যের লেখক ভার্জিনিয়া উলফ বলেছিলেন, “কেউ কেউ পুরোহিতের কাছে যায়, কেউ কবিতার কাছে, আমি যাই বন্ধুর কাছে।” তাই তো বিপদে আপদে সুখে দুখে আমরা ছুটে যাই একে অপরের কাছে।আসলে বন্ধুত্ব এক অসীম সম্পর্কের নাম। যার বিশালতা বা গভীরতা অপরিমেয়।অন্ধ বিশ্বাসে যার হাতে হাত রেখে পথচলা যায় সেই তো বন্ধু। বন্ধুত্ব একটি সম্পর্ক,যে সম্পর্কের মাঝে থাকবে দুটি সমমনস্ক মানুষ। সেখানে হতে পারে দুটি ছেলে, দুটি মেয়ে কিংবা ছেলে-মেয়ে উভয়ই।বন্ধুত্বের কোনো জেন্ডার হয় না। কর্ম সূত্রে অনির্বাণ এখন বাইরে থাকে।দেখা সাক্ষাৎ হয় না বললেই চলে।অঙ্কিতার সঙ্গেই বেশি কথা হয়।অনির্বাণ ও টাইম পেলেই ফোন করে। এখনো মাঝে মধ্যে হোয়াটস্যাপে ছবি পাঠিয়ে জিজ্ঞেস করে..

-তিনটে সার্টের মধ্যে একটা চুজ্ করে দে তো।আজকে অফিসের মিটিং আছে,কোন্ টা পড়ব ঠিক করতে পারছি না!

তখন মনে হয় না দূরে আছি।অনির্বাণের এমন দাবীই আমাদের বন্ধুত্বকে সারা জীবন অটুট রাখবে আশা রাখি।তবে বন্ধুত্ব টিকিয়ে রাখতে গেলে আমাদের পাশে থাকা মানুষ গুলোর সহযোগিতা ভীষণ কাম্য। আমার হাজব্যাণ্ড বা অঙ্কিতার মতো মানুষ গুলোরও খুব প্রয়োজন। কে বলেছে একটা ছেলে একজন মেয়ের ভালো বন্ধু হতে পারে না?অবশ্যই হয়ে উঠতে পারে প্রিয়জন,শুধু দরকার উন্নত মানসিকতা।
(সমাপ্ত)

কথাটা শুনে মুখের দিকে তাকিয়ে ছিলাম কিছুক্ষণ।কারণ এমন কথা আগে কখনো কারও মুখেই শুনিনি।তারপর মুখে একটু হাসি রেখে বলেছিলাম,”ও আচ্ছা।” সমাজের স্রোতে ভাসতে ভাসতে সচরাচর যা দেখে আমরা অভ্যস্ত হই, ভেবে নিই এটাই বোধহয় নিয়ম।এ নিয়মের ব্যতিক্রম হলেই মন মানতে চায় না।তখন সেটা ভুল বা অনাচার বলেই গণ্য হয়।

আমারই বন্ধু মনোময় মজুমদার।আজ থেকে বছর তিনেক আগে পরিচয় শ্রীরামপুর স্টেশনে।শ্রীরামপুর থেকে একই ট্রেনে উঠতাম।দুজনেরই গন্তব্য চন্দননগর।আমার অফিস চন্দননগর আর উনি চন্দননগর যেতেন ওনার ছেলেকে নিয়ে স্কুলে।সেদিন ট্রেন লেট থাকার জন্য ওনাকে একটু উদ্বিগ্নই দেখাচ্ছিল।নিজে থেকেই আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন…

“ট্রেনের কি গণ্ডোগোল আছে আজ?”

“না সেরকম তো কিছু শুনিনি।”

“আজ ছেলের পরীক্ষা আছে। টাইমে পৌঁছতে না পারলে কি যে হবে সেটাই ভাবছি।”

“চিন্তা করবেন না। টাইমেই পৌঁছে যাবেন। আসলে ছেলের এক্সাম বলেই এই টেনশনটা হচ্ছে।ট্রেন লেট তো নিত্য দিনের ব্যাপার।এ আর নতুন কি?”

“তা যা বলেছেন। প্রতিদিন আপনাকে এই ট্রেনেই যেতে দেখি। তা আপনার কি শ্রীরামপুরেই বাড়ি?”

“আমার বাড়ি শ্রীরামপুরেই।আপনাকেও তো প্রতিদিনই দেখি।ছেলেকে নিয়ে স্কুলে যান।”

“হ্যাঁ ছেলেকে স্কুলে নিয়ে যাওয়া আসা আমাকেই করতে হয়।আপনি তো সার্ভিস ম্যান?

“আমি গভমেন্ট সেক্টরে আছি।”

নানা কথোপকথনে মনোময়ের সাথে পরিচয়ের সূচনাটা সেদিনই।এই ভাবেই আস্তে আস্তে পরিচয় থেকে একপ্রকার বন্ধুত্বই তৈরি হয়ে গেল আমাদের।

মনোময় আর আমি সমবয়সীই হব।আপনি সম্বোধন থেকে “তুমি” হয়ে গেলাম।সব থেকে বড়ো কথা মনোময় ভীষণ মিশুকে মানুষ।খুব তাড়াতাড়ি মানুষকে আপন করে নিতে পারে।মুখে হাসিটুকু সর্বদাই লেগে আছে।পরিচয় হবার বেশ কয়েকদিন পর মোটামুটি মাস খানেক কেটে গেছে।মনোময়ের সাথে দেখা বলতে ওই সকালে অফিস যাবার পথে।ট্রেনের একটা বিশেষ কামরা যেন আমাদের জন্য নির্দিষ্ট।আমরা এক সঙ্গে বেশ কয়েকজন থাকতাম।ইতিমধ্যে মনোময়ের সাথে মোটামুটি সবারই পরিচয় হয়ে গেছে।তবে আমার সঙ্গে বন্ধুত্বটা একটু বেশি অন্যদের তুলনায়।তো সেদিন ট্রেনে যেতে যেতে মনোময়কে জিজ্ঞাসা করে বসলাম…

“মনোময় তুমি কি করো সেটাই তো জানা হয়নি।”

“আমি হাউস হ্যাজব্যাণ্ড।” মুখে হাসি রেখেই দ্বিধাহীন ভাবেই মনোময় বলে ওঠে।তারপর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে মনোময় বলতে শুরু করে…

“অবাক হলে তাই না?এরকম উত্তর আসবে এটা ভাব নি নিশ্চয়ই?”

“আসলে তা না… এরকম উত্তর আগে কারো কাছ থেকে পাইনি।”

যাইহোক,সেদিন মনোময়ের এই সাহসী প্রত্যুত্তর আমাকে একটু অবাক করেছিল বটে।”হাউস ওয়াইফ” শব্দটার সঙ্গে আমরা বোধহয় সকলেই পরিচিত।কিন্তু “হাউস হ্যাজব্যাণ্ড” কখনো কাউকে বলতে শুনিনি। নিজ মুখে এই অকপট স্বীকারোক্তি মানুষটার প্রতি অন্যরকম ভালো লাগা তৈরি হয়ে যায়।এরপর থেকে মনোময়ের সাথে বন্ধুত্বটা বেশ জমে ওঠে।যাতায়াতের পথে হাসি ইয়ার্কি ঠাট্টা বেশ চলতে থাকে।বন্ধুদের সঙ্গে যেমন কথা বার্তা হয় আর কি।

মনোময়ের বাড়ি শ্রীরামপুর মাহেশে।মাহেশের রথ মানে বিখ্যাত রথ।রথের দু তিন দিন আগে মনোময়কে বললাম…

“তোমার তো বাড়ির পাশেই রথ।রথ উপলক্ষে কিছু খাওয়া দাওয়া হলে তো মন্দ হয় না।তা কি খাওয়াবে বলো?

“নিশ্চয়ই।রথের দিন তাহলে বাড়িতে এসো।”

“বাড়িতে গেলে কি স্পেশাল মেনু?”

“আরে এসে তো দেখো।তারপর না হয় দেখা যাবে।”

“আচ্ছা মনোময়, বৌদিও কি জব করেন?”

“আরে সব কথা কি এখনই জেনে নেবে?বাড়িতে এসো।তখন না হয় সবটুকু জানবে।”

“বেশ ঠিক আছে, তোমার বাড়ি যাব” বলে মনোময়কে জানালাম।একজন হাউস হ্যাজব্যাণ্ড সংসার কীভাবে সামলাচ্ছে তা দেখার ইচ্ছা প্রবল হয়ে উঠল।আমি তো এক কাপ চা করে খেতে গেলেই হিমসিম খাই।আর মনোময়…

যথারীতি রথের দিন মনোময়ের বাড়িতে হাজির।বাড়িতে গিয়ে দেখলাম বেশ সুন্দর সাজানো গোছানো বাড়ি।তবে বাড়িখানা দারুণ বানিয়েছে।আমাকে দেখে মনোময় তো আপ্লুত। বাড়িতে তখন মনোময় আর মনোময়ের ছেলে।বসার সঙ্গে সঙ্গেই সরবৎ,চা,মিষ্টি একেবারে অতিথি আপ্যায়ন।

“বৌদিকে দেখছি না?” চা খেতে খেতে মনোময়কে জিজ্ঞাসা করলাম।

“এখনো ফেরেনি। তবে আজ অবশ্য একটু তাড়াতাড়ি ফেরার কথা বলেছি।তোমার আসার কথা আছে ও জানে।”

“বৌদি তাহলে জব করেন তো?”

“হ্যাঁ জব করে বলেই তো আমাকে সামলাতে হয়।আর বুঝতেই তো পারো ব্যাঙ্কের জব মানে কতোটা প্রেসার থাকে।”

“বড়ো ব্রাঞ্চ হলে তো দেখতেই নেই।”

“সত্যিই তাই।দেবাশিস,তোমার জন্য কিন্তু আমি নিজে বিরিয়ানি বানিয়েছি।খেয়ে বলো, আমার তৈরি বিরিয়ানি কেমন হয়েছে।”

মনোময় আমার সাথে কথা বলে যাচ্ছে, আর ওদিকে ডাইনিং এ খাবার সাজিয়ে যাচ্ছে।আমি তো অবাক।ছেলেরাও যে সমান তালে ঘরটাও সামলাতে পারে সেটা মনোময়কে না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না।

মনোময়ের বানানো বিরিয়ানি খাচ্ছি। সত্যিই খুব ভালো বানিয়েছে।বিরিয়ানি খেতে খেতে মনোময় কে বললাম…

“তুমি এতো কিছু পারো কি করে? তোমার হাউস হ্যাজব্যাণ্ড হয়ে ওঠার পিছনে গল্পটা জানতে ইচ্ছে করছে।”

“দেবাশিস, আর একটু বিরিয়ানি দিই?”

“আমাকে খাইয়ে মারবে নাকি?”

“না, না তা কেন। যাইহোক, তো কি যেন বলছিলে গল্পটা জানতে ইচ্ছে করছে তাই তো?আসলে কি জান তো দেবাশিস, আমি আর চন্দনা বিয়েটা করেছি নিজের পছন্দে। স্কুলে পড়তে পড়তে প্রেম। প্রথম প্রথম আমরা ভালো বন্ধু ছিলাম। কিন্তু কখন যে নিজেদের মধ্যে ভালোলাগা তৈরি হয়ে যায় বুঝতেই পারিনি।তবে আমরা কেউ কাউকেই প্রেমের প্রস্তাব দিইনি। ভালো লাগা থেকে ভালোবাসা তৈরি হয়ে গিয়েছিল।যখন কলেজ এ গেলাম তখন বুঝলাম আমরা একে অপরকে ভালবাসি।একদিন চন্দনা বলল, “তোমার কথা বাড়িতে জানিয়েছি।আর আমি তোমাকে বিয়েও করতে চাই।” ওর বাবা বলেছিল,”নিজে প্রতিষ্ঠিত হয়ে তবেই বিয়ে করো।” কলেজ, ইউনিভার্সিটি কমপ্লিট করলাম দুজনেই। ঠিক করলাম দুজনের একজন চাকরি পেলেই বিয়ে করব।ইতিমধ্যে, চন্দনা জবটা পেয়ে গেল আগেই।তারপর ও নিজেই বলল,”বিয়েটা এবার সেরে নিই।”

প্রথম প্রথম আমার একটু কি রকম লাগছিল। তারপর চন্দনা নিজেই জানালো…

“দুজনের একজন তো চাকরি করছি।জীবনে ভালো থাকার জন্য দুজনকেই চাকরি করতে হবে এমন টা তো কোথাও লেখা নেই ।স্বামী যখন চাকরি করে, তার স্ত্রী সংসার সামলেও স্বামীর উপার্জিত অর্থে যদি তার অধিকার থাকে, তাহলে স্ত্রীর উপার্জনেও স্বামীরও সমান অধিকার। একজন পুরুষ যদি চাকরি করেও একজন চাকরি না করা মেয়েকে বিয়ে করতে পারে, একজন মেয়ে কেন সেটা পারে না?আর আমরা তো দেখেশুনে এরেঞ্জড ম্যারেজ করছি না।আমরা যে একে অপরকে ভালোবাসি। ভালোবাসা কখনো চাকরির মানদণ্ডে বিচার চলে না।তাছাড়া যখন আমরা ভালোবেসে ছিলাম তখন তো এমন শর্ত ছিল না।ইগোকে দূরে সরিয়ে সম্পর্ক টাকে মূল্য দিতে হবে মনোময়।আমরা মেয়েরাও যে পারি নিজেদের উপার্জিত অর্থে সংসার চালাতে,সংসারের মানুষজনকে ভালো রাখতে।তুমি না হয় সংসারটা সামলিও আর আমি বাইরেটা।তবেই যে ভালোবাসাটা চিরকাল বাঁচবে।শুধুমাত্র তুমি চাকরি পেলে না বলেই আমরা ছন্নছাড়া হতে পারব না।

তারপর আমরা বিয়েটা করি। চন্দনার মতো মেয়ে যখন আমার পাশে থেকে এতো উদার মনের পরিচয় দিতে পারে, আমি কেন গর্ব করে বলতে পারব না “আমি হাউস হাজব্যাণ্ড।” রান্না করা থেকে ঘরের যাবতীয় কাজ কর্ম আমিই করি।না এতে আমার লজ্জা নেই, বরং হাসি মুখে চিৎকার করে বলতে পারি‌।তাতে কে কি ভাবল তাতে আমাদের কিছু যায় আসে না।আমাদের ভালো থাকার দায়িত্ব কেউ তো নেবে না।আর খারাপ থাকলেও সে খোঁজ নেওয়ারও কেউ নেই। তাই নিজেরাই নিজেদের দায়িত্ব নিতে হবে।আজ সাত বছর বিয়ে হয়ে গেল।আমাদের ছেলের বয়স পাঁচ বছর।কোনো ইগো নেই, সম্পর্কের মধ্যে ছোট বড়ো নেই। বেশ আছি, দিব্যি ভালো আছি। অনেকেই অনেক কথা বলে, মাঝে মধ্যে কানেও আসে।আমি তাতে কান দিই না।

মনোময়ের কথা গুলো বেশ মন দিয়ে শুনছিলাম।আর ভাব ছিলাম কথাগুলো যে বড়ো সত্যি বলছে মনোময়।মনোময়ের প্রতি ভালোবাসার পারদ টা আরো একটু ওপরে উঠে গেল।কথাগুলো শুনতে শুনতে বিরিয়ানির প্লেটটাও ফাঁকা করে ফেলেছি। ইতিমধ্যে দেওযালে টাঙানো একটা ছবির দিকে চোখ পড়ে। হাতে আঁকা ছবি যে এত সুন্দর হতে পারে তা নিজে চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। জিজ্ঞাসা করলাম…

“মনোময় এই ছবিটা কার?”

“চন্দনার।আমার হাতের আঁকা ছবি।”

“তুমি এতো সুন্দর ছবি আঁকো কই আগে বলনি তো?”

“আসলে সেই রকম বলার সুযোগ হয়নি বলেই বলা হয়ে ওঠেনি।আমার নিজের একটা ড্রয়িং স্কুলও আছে। সপ্তাহে একদিন ড্রয়িং শেখাই।”

মুগ্ধ না হয়ে পারলাম না মনোময়ের প্রতিভায়। কলিংবেলের আওয়াজ হতেই মনোময় বলে ওঠে.. “চন্দনা এল বুঝি।” মনোময় পরিচয় করিয়ে দেয় চন্দনা বৌদির সাথে।অনর্গল কথা বলতে পারেন উনি।

“আপনার কথা প্রায়ই শুনি।আপনি এসেছেন দেখে ভালো লাগলো।যাইহোক, ছুটির দিনে আর একদিন আসুন।অনেক গল্প করা যাবে।”

মনোময় তিনকাপ চা নিয়ে চলে আসে।চায়ের কাপটা ওয়াইফের হাতে ধরিয়ে দেয়।আর একটা কাপ আমার হাতে।

“তোমরা বেশ আনন্দে আছো, সুখে আছো।বৌদি আপনার কর্তা মানুষটিও বেশ ভালো।”

“তা বলতে পারেন।আমরা আনন্দেই থাকি। কোনো ইগো আমাদের মধ্যে কাজ করে না।পরস্পর পরস্পরের প্রতি রয়েছে আমাদের ভালোবাসা।”

সত্যিই তাই।সম্পর্কের মধ্যে শ্রদ্ধা, ভালোবাসা না থাকে সে সম্পর্ক কখনো চিরস্থায়ী হয় না।একটা ভালো চাকরি করেও একটা মানুষ যে কত সাধারণ হতে পারে তা চন্দনা বৌদিকে না দেখলে বোঝা যায় না। বর্তমান দিনে তো চন্দনা বৌদির মতো মেয়েও খুব কম আছে।আজকাল প্রায়ই তো দেখি, দীর্ঘদিন প্রেম করেও ছেলেটি শুধুমাত্র ভালো চাকরি পায়নি বলেই বিয়ে করতে রাজী হয়নি মেয়েটি। অনেক প্রেমের বিনাশ ঘটেছে ছেলেটির চাকরি না পাওয়ার জন্যই।প্রেম করার সময় কোনো শর্ত আরোপ হয় না, বিয়ে করতে গেলেই ছেলেটিকে ভালো চাকরি করতে হবে। নইলে বাবা মায়ের পছন্দ করা ছেলেকে বিয়ে করবে। আর সেটাই কেন হয় তা বুঝি না।মেয়েরাও তো পারে কোনো ভালো জব পেয়ে ভালোবাসার সম্পর্কগুলোকে পরিণতি দিতে।মেয়েদের জায়গাটা শুধুমাত্র সংসার ক্ষেত্রে আবদ্ধ নয় এটা যতদিন না মেয়েরা বুঝতে পারছে ততদিন এই পরনির্ভর হয়ে থাকার মতো একটা ব্যাধি মনের মধ্যে লালন করে যাবে।বিয়ে মানেই যে ছেলেটির দায়িত্ব, এই বোধ থেকে প্রত্যেকটা মেয়েকেই সরে আসতে হবে।দায়িত্ব দুজনেরই।একে অপরের।তবেই না ভালো থাকা যায়। চা এ চুমুক দিতে দিতে কথা গুলো ভাবছি। ঘড়ির কাঁটা যে থেমে নেই হঠাৎ দেওয়াল ঘড়িটার দিকে চোখ পড়ে…

“মনোময় এবার উঠতে হবে।অনেকটা টাইম তোমাদের সঙ্গে কাটালাম।” বলে উঠে আসব, তৎক্ষণাৎ মনোময় একটা বই নিয়ে এসে আমার হাতে ধরিয়ে দেয়। বলে “আমার তরফ থেকে তোমাকে দেওয়া একখানা উপহার।”

এতো সুন্দর একটা উপহারে মনটা ভরে ওঠে। ভাবিনি মনোময় কে নতুন রূপে চিনব।বইটির নাম “হাউস হ্যাজব্যাণ্ড”।লেখক মনোময় মজুমদার। সকাল দশটা পাঁচটা ডিউটির চাকরিটাই যে বড়ো কথা নয়,সেটা আরো একবার প্রমাণ হয়ে যায় মনোময়কে দেখে। মনে মনে অদ্ভুত প্রশান্তি অনুভব করতে করতে বাড়ি ফিরি। প্রার্থনা করি,ভালো থাকুক মনোময়।
(সমাপ্ত)

YOUNG ADULT

Read Now

BIOGRAPHY

Read Now

MANAGEMENT

Read Now

SHORT STORIES

Read Now

HORROR STORIES

Read Now

CHILDREN'S STORIES

Read Now

COMEDY

Read Now

CLASSIC LITERATURE

Read Now

SUSPENSE

Read Now

ACTION

Read Now

ADVENTURE

Read Now

SCIENCE FICTION

Read Now

SOCIETY

Read Now
error: