কাল রূপসার প্রথম জন্মদিন। বাড়িতে কত লোকজন। দুপুর বেলায় কলকাতা থেকে মামা মামী আসবে। রূপসার মা তনুজা আজ ভীষণ ব্যস্ত ।কী কী রান্না হবে? জলখাবার কী হবে ?গোটা বাড়ী কিভাবে সাজানো হবে এই নিয়ে চলছে নানা আলোচনা।রূপসার বাবা সমর রা তিন ভাই,তিন বোন । রূপসার বাবা ই ছোট। সকলের ছেলে ,কারো দুটি বা কারো একটি।আর মেয়ে বলতে শুধু ই রূপসা।দেখতেও ভারি মিষ্টি।ঘর আলো করে কন্যা সন্তান জন্ম নিলো বসু পরিবারে।ঠাকুর দা আদর করে নাম রাখলেন রূপসা। মেয়েজন্ম হয়েছে শুনে রূপসার মা তনুজা একটু ভয় পেয়ে গিয়েছিল,এই হয়তো সবাই বলবে মেয়ে!!না তার ঠিক উল্টো টা হলো।সবাই মিলে কি করবে ঠিক পাচ্ছেনা।জেঠু রা তো হসপিটালে সবাই কে মিষ্টি খাওয়া চ্ছে।আর রূপসার বাবা মেয়ে হয়ে ছে শোনা মাত্র আয়া মাসিদের টাকা দিচ্ছে।আর ঠাকুমা ঠাকুর ঘরে ডুকে জোরে জোরে শাঁখ বাজাচ্ছেন।এ যেনো বসু পরিবারে লক্ষী আগমন। সত্যি লক্ষী আগমন রূপসার জন্মের পর ব্যবসায় খুব উন্নতি করে রূপসার বাবারা। রূপসা দের বাড়ি ছিল জলপাই গুঁড়ি,আর ওদের ছিল কাঠের বহু পুরনো ব্যবসা। হসপিটাল থেকে ছুটি হলে বাড়ি আসে তনুজা কোলে রূপসা।জেঠিরা বরণ করে লক্ষী ঘরে তোলে। সকলের খুব সাধ ছিল ধুমধাম করে অন্নপ্রাশন দেয় কিন্ত তনুজার মা জানান কন্যা সন্তান এর অন্নপ্রাশন দিতে নেই।তাই সবার মন ভেঙে গেল। রূপসারঠাকুর দাদা বলেন জন্মদিন হবে ধুমধাম করে। তাই এই জন্মদিনের আয়োজন।
দুপুর বেলায় মামা মামী মাসী মনিরা সবাই এসে হাজির। সকলের কোলে কোলে ঘুরে বেড়াচ্ছে রূপসা রাণী। অনেক রাত পর্যন্ত সবাই মিলে কতগান ,নাচ,কত গল্প। ভোর থেকে সাজোসাজো রব। গোটা বাড়ী নানা রং এর বেলুন রকমারি রঙিন ফুলের কাগজ সাজানো হয়েছে।কত লোক জন কত উপহার রূপসা শুধু কেঁদে ই চলে,এত অপরিচিত মুখ দেখে। কিছু তেই মা কে ছাড়েনা। মায়ের বুকে জাপটে থাকে।যেন মাই শুধু ওর পরিচিত।আর সবাই অপরিচিত। অনেক রাত পর্যন্ত অনুষ্ঠান চললো। খুব মজা করল সবাই।কেক কাটা ছবিতোলা সবকিছুই হল। সবাই মিলে এক সাথেখেয়ে ।এক জায়গায় বিছানা করে রাতে কিছুক্ষণ হৈহৈ করে সবাই ঘুমিয়ে পরলো।
পরের দিন সকাল থেকে এত কাজ তনুজা দাদা বৌদি র সাথে একটুও গল্প করতে পারলনা।পরের দিন ই দাদরা চলে যাবে। তনুজা সমর কে গিয়ে বললো আজ একটু বিকালে বেরবে সবাই মিলে?একটু মার্কেটিং করবো। দাদারা আবার কবে আসবে? ওদের জন্য কি ছু কিনবো।সমর বললো বেশ তো চলো সবাই মিলে। দুপুর বেলায় খেয়ে উঠতেই অনেক দেরি হলো। তারপর সন্ধ্যায় সবাই মিলে মার্কেটিং এগেলো।
প্রচুর কেনাকাটা করে খাওয়া দাওয়া করে ফিরছে, বাস থেকে সবাই নামল। রূপসা দের বাড়ি টা একদম বড়ো রাস্তার ধারে । তনুজা মেয়ে কে বড়ো ঝা প্রীতির কোলে দিয়ে বললো বড়দিভাই তুমি রূপসা কে নেও । রূপসা বড়ো জে্্যঠিমার খুব নেওটা ছিল।আমি প্যাকেট গুলো নেই। তনুজা র হাতে অনেক প্যাকেট সবাই আগে আগে যাচ্ছে। তনুজা অনেক টা পিছনে।সমর কাছে এসে বললো আমাকে দেবে নাকি প্যাকেট গুলো। তনুজা বলে না না আমি পারবো। সবাই কে বলো রাস্তার এক পাশে দিয়ে হাঁটতে প্রচুর বড়ো গাড়ী আসছে।সমরগলির মুখে ঢুকতেযাবে এমন সমযবড়ো গাড়ীর চাকা ফেটে যাওয়ার এক বিরাট শব্দ। সবাই পিছনের দিকে তাকিয়ে দেখে চাকা ফেটে যাওয়ার সাথে সাথেই গাড়ীটা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে এসে ধ্বাক্বা মারল তনুজা কে। তনুজা ছিটকে গিয়ে পরলো রাস্তার ধারে। চারিদিক থেকে কত লোক জন ছুটে এলো তনুজা অচৈতন্য হয়ে পড়ে আছে। সঙ্গে সঙ্গে তনুজা কে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলো,ডাক্তার জানায় তনুজা মারা গেছে।শিড়দাড়ার হাড়টা ভেঙে লান্সে বুকে গেছে।আর কিছুই করা গেল না।রাস্তা জুরে ছিটিয়ে রয়েছে বাড়ির জন্য কেনাতনুজার গীফ্ট।
বাড়িতে কান্নার রোল পড়ে গেল।কেউ যেন তনুজা র মৃত্যু টা মেনেই নিতে পারলনা।সমর যেন একটা পাথরের মুর্তি। ছোট্ট রূপসা কিছু ই বুঝলনা।কখন তার মা তাকে ছেড়ে চলে গেছে। পোস্টমর্টেম হয়ে কত রাতে মৃত দেহ বাড়ি নিয়ে আসা হলো।তখন ছোট্ট রূপসা ঘুমিয়ে কাদা।পরের দিন ঘাট কাজ শেষ হয়ে গেল।
কদিন পর তনুজা র দাদা রা বাড়ি ফিরে এলো। ছোট্ট রূপসা এদিকে ওদিকে চায় আর কি যেন খোঁজে।আর শুধু ই কাঁদে।সমর ও আস্তে আস্তে ব্যবসা র কাজে ব্যস্ত হয়ে পরে।
এই ভাবেই দিন চলে। জেঠু জেঠিমাদের আদরে বড়ো ,হতে থাকে রূপসা।রোজ মা র ছবির সামনে গিয়ে কাঁদে।এক দৃষ্টিতে ছবির দিকে তাকিয়েদেখে।এই বার রূপসার স্কুলে ভর্তি র দিন এগিয়ে আসছে। জেঠিমারা রূপসার জন্য একজন দিদিমণি খুঁজছে।খবর এর কাগজে বিজ্ঞাপন দেয়। তাই দেখে অনেক মহিলাই আসে ।রোজ ই রূপসার দাদু ইন্টারভিউ নেন। হঠাৎ করে একদিন সেখানে উপস্থিত হয় অমৃতা বলে একজন মহিলা। অমৃতার মা ছোট বেলায় মারা গেছে অমৃতা দিদিমার কাছে মানুষ। খুব কষ্ট করে বড়ো হয়েছে।সব শুনে রূপসার ঠাকুর দা অমৃতা কে রূপসার পড়াশুনোর করানো র দায়িত্ব দেন।
অমৃতা পরেরদিন সকাল থেকে রূপসা দের বাড়ি আসা শুরু করে। প্রথম দিন অমৃতা দেখে রূপসা পর্দা আড়াল থেকেঅমৃতাকে দেখছে। কিছু তেই অমৃতা র কাছে আসছে না। অমৃতা একটু চিন্তা তেই পরে যায়,কি করে ওকে কাছে আনবে?এমন সময় সমর রূপসা র বাবা ঘরে আসে।এ সেই রূপসা কে বললো কি ব্যাপার আন্টির কাছে আসছো না কেন? চলে এসো আন্টির তোমার জন্য বসে আছেন।এসো এসো চলে এসো। অমৃতা বললো রূপসা ঠিক আসবে। রূপসা তো ভালো মেয়ে। লক্ষী মেয়ে। তাই না রূপসা?অমনি মাথা নেড়ে রূপসা বলে রুপসা তো খুব গার্ল। অমৃতা আর সমর হো হো করে হেঁসে ওঠে। তারপর রোজ ই একটুএকটু করে অমৃতা রূপসা র খুব প্রিয় পাত্রী হয়ে ওঠে।আন্টির হাতে দুধ খাওয়া।আন্টির সাথে পার্কে যাওয়া।সব কিছু তেই আন্টির কে দরকার।বাড়ীর সকলে অমৃতা কে পেয়ে খুব খুশি। অমৃতা খুব ভালো গান গায়।এখন রূপসা কে গান শেখানোর দায়িত্ব ও অমৃতা র।
সামনের জানুয়ারি মাসে রূপসার ইন্টারভিউ। রূপসা এখন অনেক কিছু শিখেছে।কত ছড়া কত ই্ংরেজী রাইমস সব বলতে পারে। কিন্তু একটা ই মুস্কিল কিছু বলতে গেলেই আন্টি কে লাগে।একা কিছুই বলে না।বাড়ীর সবাই লক্ষ করে রূপসা আন্টি র অপর খুব নির্ভর শীল হয়ে পরেছে। দেখতে দেখতে সে ই ইন্টারভির দিন এসে গেল। রূপসা র বাবা যাবে রূপসা র সাথে ইন্টারভিউ দিতে। কিন্তু রূপসা আন্টি ছাড়া তো যাবেনা। কিন্তু কি মুস্কিল আন্টি তো বাড়ীতে।এখন কে যাব আন্টি কে আনতে? রূপসা কেঁদে ই চলেছে আন্টি যাবে আমার সাথে। এদিকে ইন্টারভিউ র সময় এগিয়ে আসছে,অগত্যা জেঠু গিয়ে আন্টি কে নিয়ে এলো।আন্টিআর বাবার সাথে রূপসা ইন্টারভিউ দিতেগেল।। স্কুলে র কাছে এসে রূপসার একটু ভয় ভয়করছে।আন্টি ওরা কি আমাকে বকবে?ওরা ভালো? অমৃতা শুধু রূপসা কে সাহস দিচ্ছে কেউ বকবে না। তুমি তো ভালো মেয়ে তুমি তো সব পারবে। সবাই তোমাকে খুব ভালবাসে।
সবাইএকে একে ইন্টারভিউ দিয়ে বেরিয়ে আসছে। এবার রূপসা র পালা। অমনি এক জন এসে ডাকলো রূপসা বসু। রূপসা উঠে দাঁড়িয়ে বললো এই তো আমি।চলো আন্টি আমাদের ডাকছে। ঘরে ঢুকেই রূপসা গুডমর্নিং, আমি রূপসা বসু। টেবিলে বসে থাকা সকলে বলে উঠলো ওমা তাই নাকি তুমি রূপসা বসু বা্ঃ খুব সুন্দর নাম তো। তুমি কার সাথে এসেছো? রূপসা বললো বাবা আর আন্টির সাথে।সঙ্গে সঙ্গে ম্যডাম বললেন তুমি মাকে আন্টি বলো? রূপসা অবাক হয়ে বাবার দিকে তাকিয়ে থাকে।সমর একটু ইতস্তত হয়ে বল রূপসার মা নেই।একটু দূর্ঘটনায় মারা গেছে।

সঙ্গে সঙ্গে হেডম্যডাম বললেন দুঃখিত ফর্মে লেখা আছে।।সব প্রশ্নের ঠিক ঠাক উত্তর দিয়ে রূপসা রা বাড়ি ফিরে আসে। কদিন বাদে লিষ্ট বের হয় রূপসা স্কুলে চান্স পেয়ে যায়। বাড়িতে সবাই খুব খুশি।স্কুল যাওয়া শুরু হলো।রোজ ই জেঠিমারা রূপসা কে স্কুল যাওয়া র জন্য তৈরী করে দেয়। হঠাৎ একদিন স্কুল থেকে ফিরে রূপসা খুব কাঁদছে । সবাই জানতে চায় কি হয়েছে?ম্যডাম বকেছে? কিছু বলছে নাখাওয়া দাওয়া কিছুই করছে না।

‌‌
শুধু কেঁদে ই চলেছে। সন্ধ্যায় অমৃতা পড়াতে এসে দেখে জেঠিমা জল পট্টি দিচ্ছে । অমৃতা বলে কি হয়েছে ওর। রূপসা র জেঠিমা জানান স্কুল থেকে ফিরে এসে থেকে ই কাঁদছিল কিছু খায়নি এখন দেখছি খুব জ্বর এসেছে। অমৃতা রূপসা র মাথায় হাত

দিতেই হাতটা চেপে ধরলো। অমৃতা কী হয়েছে সোনা? ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে রূপসা, আন্টি সবার মা স্কুলে আনতে যায়। আমার মা কে ন যায়না। আমি আর স্কুলে যাবো না । আমি মা’র কাছে যাবো। বলে কেঁদে ই চলেছে। অমৃতা বলে থার্মোমিটার আছ?জ্যেঠিমা বলে কিছু ক্ষন আগে দেখলাম ১০২’অমৃতা থার্মোমিটার দিয়ে দেখে১০৪’জ্বর বেড়ে ই চলেছে। বাড়িতে ডাক্তার এলো অনেক ওষুধ ইনজেকশন দিয়ে ও জ্বর কমছে না। অমৃতা কে কিছু তেই ছাড়ছে না। হাতচেপে ধরে আছে। অমৃতার মন ও খুব খারাপ। অনেক রাত হয়ে গেল অমৃতার আর সেই রাতে বাড়ি ফেরা হলো না। সারা রাত রূপসা র মাথায় জলপট্টি দিচ্ছে ওষুধ খাওয়া চ্ছে বাড়ির সকলে ঘুমিয়ে পড়েছে। সকাল হতেই রূপসার দাদু রূপসার ঘরে এসে দেখে রূপসা ঘুমিয়ে আছে।আর অমৃতা মাথার কাছে বসে আছে। অমৃতা তুমি ঘুমাও নি মা? অমৃতা চুপ করে থাকে। তুমি একটু ঘুমিয়ে নাও মা আমি বসছি। অমৃতা বলে না না কাকু ঠিক আছে আমার কোন অসুবিধা হচ্ছে না। আপনি ঘরে গিয়ে বিশ্রাম নিন। আস্তে আস্তে বাড়ীর সকলের ঘুম ভাঙ্গলো সবাই একবার করে চুপি দিয়ে যাচ্ছে। রূপসা র ঠাকুমা এক কাপ চা হাতে ঘরে এলেন। অমৃতা নাও মা একটু চা খাও। না না কাকিমা ঠিক আছে।কাল রাতে ও তো কিছু খেলে না। আমি তোমার দিদিমা কে কাল রাতে খবর দিয়ে দিয়েছি। তুমি টিফিন খেয়ে একটু বাড়ী থেকে ঘুরে এসো। উনি হয়ত চিন্তা করছেন। সমর ঘরে ঢুকে মেয়ের মাথায় হাত দিয়ে দেখল। জ্বর টা তো এখনও ভালো ই আছে দেখছি।ডাক্তারকে আর একবার খবর দি। সমর গেছে ডাক্তার কে ফোন করতে।এমন সময় রূপসা মা মা করে চিৎকার করে উঠে ই অজ্ঞান হয়ে যায়।

সমর এর মা বৌদি সবাই ভয় পেয়ে যায়অমৃতা ছুটে গিয়ে এক বালতি জল নিয়ে আসে। রূপসা কে কোলে নিয়ে এক ধার থেকে মাথায় জল ঢালতে থাকে।সবাই অবাক হয়ে অমৃতা র দিক তাকিয়ে থাকে। অমৃতার দু চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পরছে।সমর ডাক্তার বাবু কে জানায় শিঘ্রই আসুন। রূপসা অজ্ঞান হয়ে গেছে।জল ঢালতে ঢালতে অমৃতা খেয়াল করে রূপসা আবার ওর হাত টা চেপে ধরে আছে।অমৃতার রূপসা কে দেখে নিজের কথা মনে পড়ল।মা মরা রূপসা কে খুব অসহায় লাগছিলো অম‌তার।ডাক্তর বাবু ঘরে ঢুকে রূপসা কে দেখলেন। ডাক্তর বাবু বললেন চিন্তা র কিছু নেই।সময় মত মাথায় জল না পারলে মেয়ে কে বাঁচানো যেত না। সঠিক সময় জল টা ঢালা হয়েছে। এবার আশা করছি ভালো হয়ে যাবে। তবে সমর মেয়ের কথা একটু ভেবে দেখ।ওর এত অল্প বয়সে মা মারা গেছে ওর
জীবনট খুব কষ্টের হ য়ে গেছে। সবাই তো সমান হয় না।সমর বলে আমি তো ওর কথা ভেবে ই আর বিয়ে করিনি। আমার মা বাবা বহু বার বলে ছেন। শোন সমর এতোদিন হয়তো প্রয়োজন হয় নি। এখন স্কুলে সবার মা কে দেখে হয়ত শিশু মনে আঘাত লেগেছে। সমর বলে সৎ মা সে তো আরো সাংঘাতিক। সমর এর বাবা বলেন সকলে সমান হয়না সমর। রূপসার জ্ঞান ফিরে এলো আন্টি র গলাটা জড়িয়ে ধরে আছে।কিছু ক্ষন পর রূপসা কে গরম দুধ খাইয়ে ঘুম পারালো অমৃতা। এবার সমর এর মা কে বলল কাকিমা আমি আসি দিদিমা চিন্তা করবেন। আমি বিকালে একবার আসবো।সমর এর মা বললেন টিফিন করে যাও মা।না কাকিমা বাড়িতে গিয়ে স্বান সেরে টিফিন করব। বলে অমৃতা বাড়ি চলে গেল।
কদিন পরে রূপসা ভালো হয়ে গেল। আবার স্কুল যাওয়া শুরু হল।স্কুল থেকে ফিরে মা এর ছবির কাছে দাঁড়িয়ে কাঁদে। নতুন কোন খেলনা পেলে ছুটে গিয়ে মা’র ছবিতে দেখায়।এক দিন স্কুল থেকে ফিরে খাতা নিয়ে মা’র ছবিতে দেখা চ্ছে দেখো মা আমি আজ কে গুড পেয়ে ছি তুমি আমাকে আদর করবে না। ঠাকুর দা
রমাকান্ত বাবুআড়াল থেকে সব দেখে ন।
সন্ধ্যায় সমর বাড়ি ফিরলে সমর এর বাবা সমর কে বলে তুমি বিয়ে র কথা কি ভাবছো?সমর বললো বাবা তুমি বুঝতে পারছ না সৎ মা এলে রূপসা র আরো কষ্ট হবে।তখন কি করবে তুমি?রমাকান্ত বাবু বললেন তোমার অমৃতা কে কেমন লাগে?কী বলছো বাবা?শোন আমি অমৃতার মধ্যে সেই মাতৃত্ব দেখে ছি। তুমি বোধহয় জানো না অমৃতা রোজ দুপুরে বেলায় স্কুলে র দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থেকে রূপসাকে বাড়ি নিয়ে আসে। রিক্সা ওয়ালা চরন বলছিল।এর পরেও তূমি মেয়ে টা কে চিনতে পারলে না।সমর বললোআরে ওরা দ্বিতীয় পক্ষে মেয়েরবিয়ে দেবেন কেন? রমাকান্ত বাবু বলেনসেটা তুমি আমার হাতে ছেড়ে দাও, আমি কথা বলবো।
পরেরদিন রবিবার বার রূপসার স্কুল ছুটি। সকাল সকাল দাদু নাতনি মিলে চললেন অমৃতা দের বাড়ি। রূপসা রাস্তায় গিয়ে দাদু কে জিজ্ঞেস করল দাদু আমরা কোথায় যাচ্ছি?দাদু বলেন বলবো না একটু পরে ই দেখতে পাবে। অনেক খুঁজে খুঁজে এসে পৌঁছায় অমৃতা র বাড়ি।বেলবাজার সাথে সাথেই দরজা খুলে গেল। অমৃতা কে দেখতে পেয়ে রূপসা ভীষণ খুশি।আন্টি বলে লাফ দিয়ে কোলে উঠে গেল। অমৃতা ও যেন কি করবে বুঝতে পারছে না।ভেতর থেকে অমৃতা র দিদা বলেন কে এসেছে আমু? দিদিমা রূপসা এসে ছে। ওমনি দিদিমা এসে রূপসা কে কোলে নিয়ে আদর করছেন।কী খাবে তুমি দিদি ভাই বিস্কুট খাবে। তুমি কেমন আছো রূপসা? তোমার আন্টি তো খুব চিন্তা করছিলো।
দাদু আর নাতনি অনেকক্ষন সময় কাটান অমৃতা র বাড়ি তে অমৃতার মা মারা যায অমৃতার তখন ৫বছর বয়স।এক
মাস যেতে না যেতেই অমৃতার বাবা বিয়ে করে নেন।সৎ মা অমৃতা কে খুব কষ্ট দিত।না খাইয়ে রেখে দিত, ঐটুকু মেয়ে কে দিয়ে বাড়ি র সব কাজ করার এতটাই নিষ্ঠুর ছিল।

এমনকি মা’র ধর ও পর্যন্তকরত।
এখজন পরিচিতির মুখে খবর পেয়ে অমৃতার দিদিমা অমৃতা কে নিয়ে চলে আসে। দিদিমা র পেনসন এর টাকা তে ওদের স্ংসার চলে।
সব কিছু শুনে রমাকান্ত বাবু র ধারনা হয় এই মেয়ে ই একমাত্র যোগ্য রূপসা মা হওয়ার জন্য। রমাকান্ত বাবু রূপসা কে অমৃতার কোলে দিয়ে বললেন পারবে মা তুমি আমার নাতনির সত্যি কারের মা হতে?জন্মদিলেই হয়না মাতা যদি না বুঝো সন্তানের ব্যথা। হাত জোড় করে অমৃতার দিদিমা কে বলললেন আমার নাতনি টাকে বাঁচান। আপনি আমার একমাত্র সমব্যাথি। অমৃতা রূপসা কে জড়িয়ে ধরে আদর করছে। অমৃতার দিদিমা জানান ঠিক আছে আমি একটু সময় চেয়ে নিই আপনার কাছে। আমি নাতনির সাথে একটু কথা বলি। রমাকান্ত বাবু নাতনি কে নিয়ে বাড়ি ফিরে এলেন।
দুই দিন বাদে অমৃতার দিদিমা অমৃতা কে সঙ্গে নিয়ে রূপসা দের বাড়ি এলেন। রমাকান্ত বাবু ভীষণ খুশি। অমৃতার দিদিমা জানানঅমৃতা কিছু তেই আসতে রাজি হয়নি, আমি তো একা আসতে পারিনা ,বাড়িও চিনিনা তাই অমৃতা কে নিয়ে এলাম। রমাকান্ত বাবু জানান নানা ঠিক আছে।ওর তো পড়াতে আসার কথা ছিল।দুদিন থেকে আসছেনা রূপসার তো খুবই মন খারাপ।যাও মা তুমি রূপসার কাছে যাও।
বাড়িতে সবাইছিল। সবাই এসে অমৃতার দিদিমা সাথে পরিচয় করে। তারপর চা জলখাবার খাওয়ার পর আসল কথা শুরু হল। দিদিমা জানান আমি আপনার প্রস্তাব মেনে নিলাম কিন্তু আমার সামর্থ্য খুব অল্প ,আমি তো আপনাদের সম তুল্য হতে পারবোনা। রমাকান্ত বাবু জানান নানা আপনাকে কিছু করতে হবে না শুধু মতামত জানতে চাই।সমর জানায় আমার কিন্তু অমৃতা র সাথে কিছু কথা আছে। রমাকান্ত বাবু বলেন তুমি অমৃতার সাথে কথা বলে নাও।
সমর গেল রূপসা র ঘরে সেখানে গিয়ে দেখে রূপসা কে বুকে জড়িয়ে খুব আদর করছে অমৃতা।আর রূপসা ও আন্টি কে কত চুমু দিচ্ছে সমর কখন এসেছে ওরা জানতে ই পারে নি। সমর ডাকল রূপসা। ওমনি রূপসা বলে উঠল আন্টি এখন যাবেনা।আন্টি আমার কাছে থাকবে।
অমৃতা উঠে দাঁড়িয়ে বললো কি ছু বলবেন?সমর বললো রূপসা আমার খুব আদরের। সঙ্গে সঙ্গে অমৃতা বলো সেটা খুব স্বাভাবিক।মা মরা একটি মাত্র মেয়ে আদরের তো হবেই। সমর বললোতুমি পারবে ওর দায়িত্ব নিতে? অমৃতা বললো চেষ্টা করব।তবে আপনাকে কোন অভিযোগ করতে দেব না।সমর বললো আমি তো বিয়ে করতে সাহস পাচ্ছিলাম না।সৎ মা এসে রূপসার জীবন টা কে তছনছ করে দেবে তাই ভয় পাচ্ছি। অমৃতা জানায় আমি ও মা মরা মেয়ে সৎ মায়ের অনেক অত্যাচার সহ্য করেছি ৫বছর বয়েসে। আমি রূপসা কে সেই কষ্ট পেতে দেব না।সমর বলে আমি কোন অনুষ্ঠান করে বিয়ে করবনা। তোমার কোন আপত্তি নেই তো। অমৃতা বললো আমার দিদিমা র অনুষ্ঠান করার ক্ষমতা নেই।
সমর বাবা কে গিয়ে জানায় তুমি দিন ঠিক করো ঠাকুর মন্দিরে বিয়ে হবে। অমৃতা রা বাড়ি তে ফিরে এলো। রমাকান্ত বাবু বিয়ের দিন ঠিক করলেন। সাতদিনের মধ্যে ই অমৃতা আর সমর এর বিয়ে হয়ে গেল। ফুলসজ্জার রাত সবাই সমর এর সাথে ঠাট্টা ইয়ার্কি করছে।সমর ও সকলের সাথে মজা করছে। রূপসার জেঠিমারা অমৃতা কে গিয়ে বলে চলো এবার ফুল সজ্জার ঘরে যেতে হবে। অমৃতা রূপসা কে কোলে নিয়ে ফুলশয্যার ঘরে র দিকে যাচ্ছে দেখে সবাই হেসে উঠলো,সমর অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে।সমর বললো রূপসা কে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে? অমৃতা বললো ও আজ থেকে আমাদের কাছে শোবে। সবাই তো অবাক।সমর এর দিদি বললো আজকে থাক কাল থেকে ওকে নিয়ে ঘুমাবি। অমৃতা বললো না আমার মেয়ে আমার কাছে ই ঘুমাবে।সবাই মুখ বুজে ঘরে চলে গেল।সমর ও অমৃতা রূপসা কে নিয়ে ঘরে ঢুকলো।আজ রাতে রূপসা খুব খুশি আন্টি আর বাবা র মাঝে শুয়ে আছে ।
পরেরদিন সকালে উঠে ই সান সেরেঅমৃতা শ শুরু বাড়ির সকলের জন্য চা করছে,টিফিন করছে।তার মাঝে মেয়ে কে দাঁত মাজানো খাওয়া নো সব কিছু নিয়ে ভীষণ ব্যস্ত। হঠাৎ করে রূপসা আন্টি আন্টি করে ছুটে এলোরান্নাঘরে। সঙ্গে সঙ্গে ঠাকুমা ধমক দিয়ে বললো মা বলবে আর আন্টি বলবে না রূপসা। এটা তো মা’র মা।রূপসা না এটা আন্টি,এটা মা না।মা তো আকাশে চলে গেছে। ঠাকুর মা রূপসা কে জোরে ধমক দিয়ে বললো তোমাকে আমি যেটা বলত বলছি তুমি সেটাই বলবে। রূপসা কাঁদতে কাঁদতে বললো মা বলবনা।মা একদম ভালো না আমাকে একা রেখে চলে গেছে। সঙ্গে সঙ্গে অমৃতা রূপসা কে কোলে নিয়ে বলল মা তো চলে যায়নি সোনা ডাক্তার এর কাছে গিয়ে ছিলাম অপারেশন করতে। অবাক হয়ে মা’র দিকে তাকিয়ে থাকে ছোট্ট রূপসা। অমৃতা মেয়ে কে আদর করতে করতে বলে তুমি আমাকে মাম্মা বলো কেমন?
দেখতে দেখতে আরো কয়েক মাস চলে যায়। রূপসার স্কুলে ফাইনাল পরীক্ষা।মা সারা দিন রূপসা কে পড়ায় । রূপসা খুব ভালো পরীক্ষা দেয়। একদিন অমৃতা সমর কে জিজ্ঞেস করে রূপসা র মামা বাড়ি কোথায়?সমর বলে কলকাতা।আচ্ছা পরীক্ষা র পর কলকাতা যাওয়া যায়না।সমর বলে না আমরা ওদের বাড়িতে আর যাইনা।কেন যাওনা একটু বলবে? তনুজা মারা যাওয়ার পর ওরা কোন যোগাযোগ রাখেনি। তুমি গেছিলে কোনদিন রূপসা কে নিয়ে?না জন্মের পর ও কোনো দিন মামার বাড়ি যায়নি।তবে জন্মদিনের পরেওদের মামার বাড়ি যাওয়ার কথা ছিল,সেই বুঝে টিকিট ও করা হয়েছিল তার পর তনুজা র মৃত্যু সব উল্টো পাল্টা হয়ে গেলো। আগে ওরা খুব ফোন করতে যাওয়ার জন্য বলতো কিন্ত্ত যাওয়া আর হয়ে ওঠেনি।কেন মেয়ে টা কে মামা র বাড়ি র আদর থেকে বঞ্চিত রেখেছো? আমরা যাব তুমি সব ব্যবস্থা করো।সমর বললো তুমি বাবা র সাথে কথা বলো। বাবা রাজি থাকলে আমরা যাব। অমৃতা শশু্র কে বললে উনি রাজি হয়ে যান। রমাকান্ত বাবু ফোন করে জানান সমর মেয়ে নিয়ে আপনাদের ওখানে যাচ্ছে। সঙ্গে যাচ্ছে রূপসা র নতুন মা।
সবাই তো শুনে হতবম্ব মেয়ে টার এবার খুব কষ্ট হবে।সৎ মা এলো সংসারে। রূপসা ব্যগ গুছাতে দেখে জানতে চায়
মাম্মা জামাগুলো ব্যগে কেন? অমৃতা বলে আমরা তো মামার বাড়ি যাবো। মামার বাড়ি কি মাম্মা? অমৃতা মেয়ে কে বলে । মামার বাড়ি তে মামা আছে মামী আছে দাদা আছে দিদুন আছে মাসিমনি আছে গেলে দেখবে খুব মজা হবে। তুমি যাবে? মামার বাড়ি মানে কি? অমৃতা বললো মামার বাড়ি মানে মাম্মার বাড়ি। রূপসা বললো তাহলে তোমার বড়ি? আমি যাব মাম্মা।নিঃশ্চ ই যাবে সোনা। অমৃতা বড়ো জায়ের কাছে রূপসার জন্মদিনের ছবি গুলো দেখতে চায়। বড়ো জা প্রীতি সব ছবি গুলো দেখায়। অমৃতা বলে আমাকে একটু সবাইকে চিনিয়ে দেবে বড়দিভাই? প্রীতি সবাই কে ভালো করে চিনেয়ে দেয়। প্রীতি জানতে চায় সবাই কে চিনে কী করবি তুই? আমার মেয়ে কে চেনাতে হবেনা? প্রীতি বলে তাহলে তুই তনুজা র সব এলব্যাম তোর কাছে রেখে দে।ওতে রূপসার অনেক ছবি আছে।সব এলব্যাম গুল ঘরে এনে রূপসা কে সব ছবি দেখাচ্ছে। রূপসা খুব খুশি। আমি ক ই মাম্মা?এই ছোট্ট বোনুটা।😃😃
খুব হাসি পাচ্ছে রূপসার। রূপসা বললো তুমি কোনটা মাম্মা? রূপসা কে কোলে নিয়ে তনুজা একটা ছবি দেখিয়ে বললো এই তো আমি আর তূমি। রূপসা অনেকক্ষণ মনদিয়ে ছবিটা দেখে বললো না না এটা তো ফটোর মা। তূমি কোনটা? ততক্ষণে ঘরে সমর আর ওর মা চলে এসেছে। অমৃতা বললো এটাই আমি অপারেশন করে ডাক্তার বাবু চেহারা বদলে দিয়েছে।সমর এর মা বললো কোনদিন যদি রূপসা সত্যি জানতে পারে তখন কি হবে? অমৃতা বললো সবাই তাই জানবে তনুজাএকসিডেন্টে্্য প্র প্লাস্টিক সার্জারি করা হয়েছে।কোন দিন রূপসা সত্যি জানতে পারবে না।
পরেরদিন সকালে ট্রেন বিকালে বেরিয়ে সবার জন্য জামাকাপড় সব কিনে নিয়ে এলো অমৃতা। তারপর কলকাতা র উদ্দেশ্যে রওনা হলো। পরের দিন পৌঁছল হাওড়া স্টেশনে।সমর এর খুব ইতস্ততঃ লাগছে তনুজা র মৃত্যু র পর তনুজার অবর্তমানে তনুজার বাপের বাড়ি যেতে। হঠাৎ করে সমর দেখে তনুজা দাদা আর জামাইবাবু স্টেশনে তাদের নিতে এসেছেন। রূপসা কে দেখে তারা ভীষন খুশী।আর রুপসা অপরিচিত মুখ দেখে মা’র আড়ালে লুকিয়ে পড়েছে। রূপসা এসে পড়লো মামা বাড়ি।দিদুন মাসিমনিরা,মামী ,দাদা, দিদিরাসবাই রূপসা কে আদর করছে।আর রূপসা মার কোলে উঠে মা’র গলা জড়িয়ে কাঁধে মাথা দিয়ে শুয়ে আছে। অমৃতা বললো নতুন তো তাই লজ্জা পাচ্ছে। তারপর রূপসা কে সান করিয়ে খাইয়ে ঘুম পারালো অমৃতা। তারপর নিজে সান সেরে তনুজা র বাবার ছবিতে প্রনাম করলো,মা কে প্রনাম করলো মা’র হাতে তুলে দিল সকলের জন্য কিনে আনা জামা কাপড়। তনুজার মা মাথায় হাত দিয়ে বললেন সুখী হ ও মা।অমৃতা তনুজা র মাকে জড়িয়ে ধরে বললো আজ থেকে তুমি আমার মা আর আমি তোমার হারিয়ে যাওয়া মেয়ে তনুজা। আমি তোমাকে মা বলেই ডাকবো। আমার মেয়ে যেন কোন দিন জানতে না পারে আমি ওর সৎ মা।দাদা দিদিভাইরা বৌদি তোমাদের সকলের সহযোগিতা চাই। আমি যেন আমার মেয়ে কে ভালো করে মানুষ করতে পারি।এক সপ্তাহ খুব আনন্দ করে দিন কাটলো রূপসা মামার সাথে কত জায়গা ঘুরল। আলিপুর চিড়িয়াখানায়,নিকোপাক সাইন্সসিটি। খুব আনন্দে কাটল।কত খেলনা কতজামা সব উপহার পেল রূপসা। অমৃতা যাওয়ার সময় মাকে কথাদিল প্রত্যেক বছর পরীক্ষা র পর তোমার নাতনিকে নিয়ে আমরা আসবো। তারপর অমৃতা জলপাইগুড়ি ফিরে এলো। আবার রূপসার পড়া শুনা আরম্ভ হল। অমৃতা প্রত্যেক সপ্তাহে তনুজা র মাকে ফোন করে। তনুজা র বাড়ি র লোক অমৃতা কে পেয়ে ভীষন খুশী ‌রূপসা খুব ভালো আছে ভাবলেই তাদের ভালো লাগে।
প্রত্যেক বছর একবার করে মামাবাড়ি ঘুরে যায় রূপসা।
দেখতে দেখতে অনেক দিন কেটে যায়। বাড়িতে সবার ইচ্ছে অমৃতা র নিজের একটা বাচ্চা হোক। সমর বলেরূপসার একটা ভাই হলে কেমন হয়? অমৃতা বলে আমরা একটা মেয়ে ই ভালো আর দরকার নাই।প্রসব করলেই মা হ ওয়া যায়না।
দেখতে দেখতে রূপসা বোর্ডের পরীক্ষা য় খুব ভালো রেজাল্ট করল।তারপর মেডিকেল পরীক্ষা য় পাশ করে বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজের এক জন নামকরা সার্জেন।
রূপসার বিয়ের ব্যবস্থা হচ্ছে । সারাদিন অমৃতা শুধু কাঁদে কী করে থাকবে মেয়ে র বিয়ে হয়ে গেলে।
আজ ও রূপসা জানেনা অমৃতা তার নিজের মা নয়,সৎ মা।এই হলো সেই সত্যি কারের মা।

গানের রিয়ালিটি শো’তে এক অসামান্য গায়িকা হলেন আলো মুখার্জী।আজ গ্রাণ্ড ফাইনাল শো।আর এই ফাইনাল শো দেখার জন্য যাচ্ছেন মৈত্রেয়ী গঙ্গোপাধ্যায়।আলো মুখার্জীর গানের অন্ধ ভক্ত উনি।কতই বা বয়স হবে মেয়েটির ঊনিশ কি কুড়ি।দুটো চোখেই দেখতে পায়না অথচ এই বয়সে যে এত সুন্দর গান করে,সেটা ভেবেই অবাক হয়ে যান।সুদূর গ্রাম থেকে উঠে আসা একজন মেয়ে।অনেক প্রতিকূলতা জয় করে সে এই জায়গায় পৌঁছতে পেরেছে একথা তাকে বার বারই বলতে শুনেছে এই শো’তে।খুব ইচ্ছা মেয়েটিকে সামনে থেকে দেখার এবং মেয়েটির মায়ের সাথেও আলাপ করার ইচ্ছে আছে।কারণ মেয়েটির মা-ই নাকি তার জীবনের সব।আর গ্রাণ্ড ফাইনাল শো’তে মেয়েটির মা আজ আসবেন।গ্রামের একটা মেয়েকে কীভাবে এই জায়গায় পৌঁছে দিলেন ওই মা, আজ সেটাই জানার‌।মৈত্রেয়ী দেবী নিজেও একজন রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী।নিজের গানের স্কুলও আছে।মোটামুটি একটা নাম ডাক আছে মৈত্রেয়ী দেবীর।কারণ নিজের বাড়িতেই গান বাজনার চর্চা বহুকাল আগে থেকেই।

গানের ফাইনাল শো শুরু হয়েছে।অনেক নামী দামী মানুষ আজ এসেছেন। বলতে গেলে লোকজন ঠাসা।মঞ্চে একটার পর একটা গান গেয়ে যাচ্ছে আলো।অপূর্ব গানের গলা।বিচারকদের মন জয়ে করে নিয়ে প্রথম স্থান অধিকার করে নিয়েছে আলো মুখার্জী।আজ আলো মুখার্জীর জীবনে আলোয় আলো।চারিদিকে এত আলো সে আজ মনের চোখ দিয়ে দেখে নিচ্ছে।অনুষ্ঠান শেষ হলেই মৈত্রেয়ী দেবী পরিচয় করবেন আলোর সাথে।একটা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করা।

আলোর হাতে পুরষ্কার তুলে দেওয়া হবে কিছুক্ষণের মধ্যে।মঞ্চের মধ্যে আলো আলোকিত করে দাঁড়িয়েছে।করতালির বন্যা বয়ে যাচ্ছে চারিদিক।আজ আলোকে কিছু কথা বলার জন্য মাইকাফোনটা হাতে তুলে দেওয়া হয়।আলোর এই গানের জগতে আসা,তার পরিবারের সহযোগিতা ইত্যাদি বিষয় জানতে চাওয়া হয় আলোকে।তারপর আলো বলতে শুরু করে..

আমি আলো মুখার্জী।আজ আমি কী বলব নিজেই ভেবে পাচ্ছি না।বীরভূমের একটা প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে উঠে আসা একটি মেয়ে আমি।ছোটো থেকেই আমার গান ভাল লাগতো।নিজের মনে মনেই গান গাইতাম।মাকে বলতাম..

“-মা আমি গান শিখব।”

মা বলত..

“-আর একটু বড়ো হ।তারপর।”

ছোটো বেলায় একটা গান আমার খুব প্রিয় ছিল।স্কুলে গেলে বন্ধুরা বলত…

“-আলো একটা গান শোনা না?”

আমি শোনাতাম সেই প্রিয় গান..”চোখের আলোয় দেখেছিলেম চোখের বাহিরে”..আমার মায়ের থেকে শেখা এ গান‌।

জন্ম থেকেই চোখে দেখিনা আমি।অথচ আমার নাম আলো‌।বন্ধুরা হাসত,দৃষ্টি শক্তিই নেই, অথচ নাম আলো।এই নামটা আমার মায়ের দেওয়া।যে কোনো দিন জানলই না আলো কী।এটা নিয়ে কোনো দিনও কোনো আক্ষেপ করিনি আমি।ঈশ্বর আলো না দিক, কিন্তু আলোর মতো শক্তি আমাকে দিয়েছে।আজ আমার চারপাশে আলোয় ঝলমল করছে।আমি সব দেখতে পাই নিজের অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে।আজ আমি সেই সব মানুষদের দেখাতে পেরেছি,যারা বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছিল একদিন। মা’কে দিনের পর দিন চরম অপমান সহ্য করতে হয়েছে।অনেক অনেক খারাপ কথা বলেছে…

“তোমার মতো অপয়া মেয়ে একটাও দেখিনি।বিয়ের পর থেকে একটা না একটা অঘটন ঘটিয়েই চলেছো।তারপর এমন একটা মেয়ের জন্মদিলে সে আবার অন্ধ।পৃথিবীর আলোটাও দেখতে পেল না‌।এসব পাপের ফল বুঝলে তো,তোমার পাপের ফল।”

আমি নাকি আমার মায়ের পাপের ফল।এমন অভিযোগ করত আমার ঠাকুমা‌।মা ভীষণ কষ্ট পেত। শুধু মা নয়,আমার প্রতিও ছিল ঠাকুমার বিরূপ দৃষ্টি।যেহেতু জন্মের আগেই আমার বাবা মারা গেছেন।শুনেছি বাবা মারা যাওয়ার কারণ হচ্ছে লিভারে ক্যানসার।অত্যধিক পরিমাণে ড্রিঙ্ক করত।সেটা বিয়ের আগে থেকেই। বাবার এই অতিরিক্ত মদ্য পানে আসক্তি নিয়ে মায়ের সঙ্গে ভীষণ ঝামেলা হত।ঠাকুমা বলত..

“-আমার ছেলেটা জীবনে শান্তি পেল না।পুরুষ মানুষ ওরকম একটু আধটু নেশা করে।তা’বলে কি বাড়ি মাথায় করতে হবে?তোমার ইচ্ছে হয় থেকো,না হলে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেও।”

এই ধরনের কম কথাও মাকে শুনতে হয়নি।ঠাকুমার প্রশ্রয় যদি না থাকত,তাহলে বাবাও অকালে মারা যেত না‌।কিন্তু আর কত দিন এভাবে সহ্য করা যায়?ঠাকুমা আর পিসি খুঁটিনাটি নিয়ে অশান্তি করত এবং শেষমেষ আমাদের ঘর ছাড়া করল একদিন।তখন আমার বয়স তিন বছর।তবে আমার জীবনে যে মানুষটা এতোটা আলো ঢেলেছে সে মানুষটা আর কেউ নয়, তিনি আমার মা।আমি চাই আজ এই মঞ্চে একবার মাকে নিয়ে আসতে।যদি অনুমতি দেন….

মঞ্চে আসেন আলো মুখার্জীর মা।আলো বলতে থাকে….

“-এই হলো আমার মা‌।”….মায়ের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়ে আলো বলে… “আমি চাই মা কিছু বলুক” বলে মাইকা ফোনটা মায়ের হাতে দেয় আলো…..

আমার পরিচয় আপনারা পেয়েছেন।হ্যাঁ আজ আমার একটাই পরিচয়,আমি আলোর মা।আলোর কথা থেকে অনেকটাই হয়তো বুঝে গেছেন আপনারা।আজ থেকে তেইশ বছর আগে আমার বিয়ে হয়েছিল কলকাতার এক বনেদী বাড়িতে।শিক্ষা রুচি রীতি নীতি সব দিক দিয়ে বেশ উন্নত মানের মনে হয়েছিল তখন।কিন্তু এই মনে হওয়াটাই ভুল ছিল।পরে অবশ্য বুঝেছিলাম মানুষ গুলোই ভুল।কিছু মানুষ সংসারে থাকে যারা ঝগড়া করার জন্য কারণ খোঁজে।আর না পেলে পায়ে পা তুলে ঝগড়া করবেই।এরকম দুজন মানুষ হলো একজন আমার শাশুড়ি মা,আর অন্যজন হলো আমার ননোদ।শ্বশুর বাড়ি থেকে যখন তাড়িয়ে দেওয়া হলো তারপর থেকে শুরু হলো এক অন্য জীবন।এক অন্ধকারময় জীবনে মুখ থুবড়ে গিয়ে পরলাম একবারে।বাবার বাড়িতে গিয়ে ছিলাম কিছুদিন।কিন্তু কতদিন?আত্মসম্মান বলে তো একটা জিনিস আছে।বাপের বাড়িতে থাকাটা ভালো দেখায় না।তাই নিজের বাঁচার জন্য নিজেকেই চেষ্টা করতে হবে।খবরের কাগজের বিজ্ঞাপন দেখে একটা প্রাইমারী স্কুলে চাকরি পেলাম বীরভূমের একটি প্রত্যন্ত গ্রামে।কলকাতা ছেড়ে কাউকে না জানিয়েই চলে এলাম বীরভূম।আমার বাবা অবশ্য আটকে ছিল আমাকে,কিন্তু কোথায় যাচ্ছি আমি সেটা বলে গেলাম না আর।

তারপর থেকে জেদ চাপল মেয়েকে মানুষ করতেই হবে।ভগবানের ওপর বিশ্বাস রাখলাম।ভগবান দৃষ্টি শক্তি না দিলেও এমন কিছু তো একটা শক্তি দিয়েছেন যার জন্য সে অনেক বড়ো হতে পারে।এটুকু বিশ্বাস ছিল নিজের মধ্যে।পড়াশোনার পাশাপাশি গান শেখাতে লাগলাম।কণ্ঠে সুর দিয়েছেন ভগবান।আর সেই সুরের ছোঁয়া আজ আলোকে পৌঁছে দিয়েছে এক নতুন জগতে।আজ এই মঞ্চ আলোকে যেমন অনেক বড়ো সম্মান দিল,তেমনি আমাকে পরিচিত করালো আলোর মা হিসেবে।মেয়ের সম্মানে আমিও আজ সম্মানিত,আমি গর্বিত” কথা গুলো বলে মাইকাফোনটা হাতে দিয়ে মঞ্চের ওপর দাঁড়িয়ে কেঁদে ফেলেন।

মঞ্চে বহু গুণী মানুষজন উপস্থিত।আলোর হাতে তুলে দেওয়া হয় পুরষ্কার ও সম্মাননা পত্র।তারপর আলো বলে..

“এই পুরষ্কার আমার নয়,এ সব কিছু পাওনা আমার মায়ের।তাই আজ আমি আমার মায়ের হাতে তুলে দিলাম।কারণ এ পৃথিবীতে মা ছাড়া যে আমার কেউ নেই।কারণ পিতৃদেবের পরিচিতি খোলস “গঙ্গোপাধ্যায়” পদবী ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে আমি আজ মায়ের পদবী গ্রহণ করেছি।কারণ আমি মায়ের চোখ দিয়ে যে সমগ্র জগৎ দেখেছি।আজ আমার মাকে কেউ বলতে পারবে না অপয়া।এমন দিনটার আশাতেই ছিল আমার মা,আজ সে স্বপ্ন সার্থক।

কথা গুলো শোনার পর থেকে মৈত্রেয়ী দেবী নিজেকে আর স্থির রাখতে পারেনি।একটা অস্থিরতা কাজ করতে থাকে।একটা অপরাধ বোধের যন্ত্রণা দলা পাকিয়ে ওঠে মনের মধ্যে।তেইশ বছর আগে ঘটে যাওয়া সমস্ত ঘটনা মনের মধ্যে ভেসে ওঠে আর একবার।মঞ্চের চারিদিকে আলো আর আলো।এত আলোর মধ্যেও কোথাও যেন একটু অন্ধকার খোঁজে মৈত্রেয়ী দেবী।চোখটা কেমন ঝাপসা হয়ে ওঠে।মনের মধ্যেই একটা অচেনা অন্ধকারে হারিয়ে ফেলে নিজেকে।
(সমাপ্ত)

কিছু দিন আগেকারই ঘটনা…হটাৎ রাজ বললো চল ভাই আজ একটু পার্ক দিয়ে ঘুরে আসি।
পার্ক??? নারে রাজ ওখানে গেলে আমার তৃষার কথা মনে পরে যায়। কতোই না স্মৃতি জরানো আছে ওই পার্কে। ওকে প্রথম দেখা ওর সাথে কতো মুহূর্ত কাটিয়েছি ওই পার্কে।

রাজ…… চলনা সৌমিক ওখানে একটু আড্ডাও দেওয়া যাবে আর হালকা একটু মদ খেলেও ওখানে অসুবিধে হবেনা।

সৌমিকের ব্রেকাপ হয় এই তিন মাসের মতো। তারপর থেকে মদ,সিগারেট আর যা যা নেশা করার মতো জিনিস আছে সেগুলো নিয়েই বেঁচে আছে। আর ওই পার্কের ভেতর একটা লেক আছে মাঝেমধ্যে ওখানে গিয়েই আড্ডা দেয় দুই বন্ধু। স্বাভাবিকভাবে সেদিনও রাজ বন্ধুর মন ভালো করার জন্য আড্ডা মারতে নিয়ে গেছিলো সৌমিককে।

পার্কে ঢুকতেই চারজনকে চোখে পরলো…দুজন পুরুষ, একজন মহিলা সাথে একটি বাচ্চা। এরা সৌমি,রাজদের পাড়াতেই থাকে। যেহেতু ওরা মদ্যপান করা সেহেতু ওদেরকে একটু এড়িয়েই পার্কের মধ্যে প্রবেশ করলো রাজ আর সৌমিক।

একটা সিগারেট ধরিয়ে টান দিতে দিতে সৌমিক রাজকে বলতে লাগলো…জানিস ভাই এই যুগে ভালোবাসা টালোবাসা বলতে কিছুই নেই রে। এই যে দেখছিস এখানে এতো এতো প্রেমিক প্রেমিকা কেউ কারো জন্য নয় রে। সেই লাস্টে কেউ পরিবারের চাপে অন্য কাউকে বিয়ে করবে,কারো চাকরী হীনতার তার প্রেমিকাকে হারাবে।
সৌমিকের কথাগুলো শুনতে শুনতে হটাৎ চোখ পরলো এক অদ্ভুত দৃশ্যের দিকে।
আমাদের পাড়ায় আসা নতুন ভাড়াটিয়া…যে পরিবারটা বাচ্চা সমেত পার্কে ঢুকেছিলো তার বাচ্চা আর স্বামীকে দেখতে পেলাম না বরং মহিলাটা ভাড়া বাড়ির মালিকের সাথে বসে…

ঘটনাটা দেখতে দেখতেই রাজ বলে উঠলো… এই সৌমিক ওদিকে দেখ একটু আমাদের পাড়ার ভাড়াটিয়াটা না??? সৌমিক— হ্যাঁ স্বামী সাথে এসেছে কিন্তু স্বামীর সাথে এসব রোমান্টিকতা না করে ভাড়ার বাড়ির মালিকের সাথে। দেখেছিস তো ভাই এই যুগে এসব ভালোবাসা-টাসা কিছু নেই। কিন্তু এই ভদ্র মহিলার স্বামী কি কিছুই বোঝে না।
সৌমিকে থামিয়ে দিয়ে রাজ— এই সৌমিক থাম থাম এদের আবার ভদ্রতা। এসব ভদ্রতার মুখোশ পরা মানুষ। সিগারেট শেষ করেই পার্ক থেকে বেড়িয়ে পরে রাজ ও সৌমিক। গেটের সামনে যেতেই ওরা দেখতে পায়… ওই মহিলার স্বামী বাচ্চাটাকে নিয়ে দাড়িয়ে আছে।

সৌমিক— ওই দেখ রাজ বৌ ভেতরে লীলা করছে আর এদিকে স্বামী বায়রে পাহাড়া দিচ্ছে। যে যতো বড়ো বাজে স্বামীই হোক না কেন এমন স্বামী কেউ হতে পারে??? নিজের স্ত্রীকে কেউ পরপুরুষের কাছেও পাঠাতে পারে জানা নেই।
হটাৎ সৌমিক লোকটার কাছে গিয়ে জিগাসা করেই বসে আপনার লজ্জা করে না??? নিজের স্ত্রীকে পরপুরুষের কাছে পাঠাতে… আপনি কি মানুষ??? এমন আরো অনেক প্রশ্নই করেছিলো ওরা লোকটাকে।

লোকটি তখনও শান্ত মাথায় কথা গুলো শুনছে আর অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে আমাদের দিকে। অবশেষে ধীর শান্ত গলায় আমাদের প্রশ্নের উওর দেয়…আমরো লজ্জা করে ভাই। আমারো পুরুষত্বে বাঁধে আমারি স্ত্রী কে দিয়ে এমন জঘন্য কাজ করাতে। কতটা দুর্ভাগা স্বামী হলে নিজে দাড়িয়ে থেকে নিজেরি স্ত্রীকে পরকীয়া করতে দিই।

#স্বার্থপর স্বামী#

পার্ট-২

পিউ

কতোটা দুর্ভাগা স্বামী হলে নিজে দাড়িয়ে থেকে নিজেরি স্ত্রীকে পরকীয়া করতে দিই।

সৌমিক— মানে আপনি সব জেনে শুনেই নিজের স্ত্রীকে অন্য একটা পুরুষের সাথে এগুলো করতে দিচ্ছেন। লোকটি বলে উঠলো… হ্যাঁ সবটাই জানি আমি। কেন জানেন এমনটা করছি??? শুনুন তবে এই যে দেখছেন আমার বৌয়ের গা চকচকে শরীর,মেকি সাজ এই সবটার পেছনে রয়েছে একটা সরল,নিষ্টাবান গৃহবধূ। অনন্যা আমার স্ত্রী ওর সাথে আমার বিয়ে হয় ছয় বছর আগে।
এক দরিদ্র পরিবারের মেয়ে অনন্যা ওকে যখন আমি বিয়ে করি তখনও ওকে এই সমাজের আধুনিকতা ছুঁতে পারেনি কিংবা ও এই আধুনিকতার রং এ নিজেকে মানাতে চায়নি।

চার বছর আমাদের সংসার বেশ ভালোই চলছিলো। আমি একটা ছোটো বেসরকারি ফার্মে চাকরি করছিলাম। আমার বৌ এর বিদ্যাগত শিক্ষা খুব একটা না। আমি সংসারের বাইরে সামলাতাম আর অনন্যা সংসারের ভেতর সামলে নিতো। সত্যি বলতে আমরা সুখী পরিবারই ছিলাম।

আমাদের বিয়ের দুবছর পরে আমাদের মেয়ে রিমঝিম হয়। সেদিন বাবা হওয়ার সাধ পেয়েছিলাম। রিমঝিম হওয়ার পর অফিস থেকে কাজ শেষ হওয়ার পর সোজা বাড়িই ঢুকে যেতাম… বায়রে আড্ডাটুকো দেওয়ারও ইচ্ছে হতোনা শুধু ভাবতাম কতক্ষনে বাড়ি পৌঁছে আমি আমার ছোট্ট রিমঝিমকে কোলে নেবো।

রিমঝিমের যখন ছয়মাস বয়স হটাৎ রিমঝিম কান্না করতোনা,খেতোনা আমরা ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাই তখন ডাক্তার আমাদের জানায় রিমঝিম জন্মগত হৃদরোগে আক্রান্ত। জোর উর্দ্ধে পাঁচ বছর আয়ু।

ঠিক তার দুমাস পরে আমার ভীষন শরীর খারাপ। বেশ কিছুদিন অফিসে না যাওয়ার কারনে আমার চাকরিটাও চলে যায়। যতদিন যাচ্ছিলো আমার শরীর খারাপ হচ্ছিলো অবশেষে আমার মরনব্যাধি রোগ ক্যানসার ধরা পরে। ব্লাড ক্যানসার তবে প্রথম স্টেজ। হটাৎই যেন আমাদের সুখের সংসারে নেমে আসে দঃখের ছায়া। ধার-দেনা, অনন্যার কিছু গয়না সবটুকু বিক্রি করেও ও আমাকে সুস্থ রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলো। এভাবে আরো আটটি মাস কেটে যায়। ভাড়াটিয়ার ভাড়া না দিতে পারার কারনে আমাদের বাড়ি থেকেও বার করে দেওয়া হয়। অন্যত্র যেই ভাড়া বাড়িতেই থাকতে গেছি প্রত্যেকেই অগ্রিম টাকা চায় অন্যথায় ভাড়া দেওয়া হবেনা। অবশেষে আপনাদের পাড়ায় আমরা ভাড়াটিয়া হয়ে আসি।

আমাদের কোনো বেলা খেয়ে কোনো বেলা না খেয়ে দিন কাটছিলো। আমার স্ত্রী খুব একটা পড়াশোনা জানেনা আর এই বাজারে হাজার শিক্ষিত মানুষ যেখানে বেকার সেখানে আমার অল্প শিক্ষা স্ত্রীকে কেই বা চাকরি দেবে। এদিকে আমার সুস্থতার জন্য অনেক টাকার প্রয়োজন।

ডাক্তার আগেই আমার স্ত্রীকে বলে দিয়েছিলো… যেহেতু আপনার বাচ্চার আয়ু নির্ধারিত সেহেতু পারলে আপনার স্বামীকে বাঁচান। প্রত্যেক মাসে কেমো, রক্ত পরিবর্তন করুন অনেক বছর বেঁচে যাবে আপনার স্বামী। কিন্তু এতো টাকা আমার স্ত্রী পাবেই বা কোথায়। এর মধ্যে দেখতে দেখতে আমাদের নতুন ভাড়া বাড়ির কয়েকমাস অতিক্রম হয়। যথারীতি বাড়ির মালিক মাসের টাকা দেওয়ার কথা বলে যায় নতুবা আমাদের বাড়ি ছাড়াতে হবে একথা বলে। অনন্যা মালিকের কাছ থেকে কিছুটা সময় চেয়ে বলেছিলো… সব টাকা শোধ করে দেবো দাদা। যথারীতি ভদ্রলোক সেদিন চলে যায়।

তার কিছুদিন পর আমি একদিন বায়রে বাজার করতে যাই। বাজার করে বাড়ি ফিরে দেখি আমার স্ত্রী নিথর পাথরের মতো শুয়ে রয়েছে আর দুচোখ বেয়ে জল বেয়ে পরছে। পাশে শুয়ে রয়েছে রিমঝিম। কি হয়েছে জিগ্যেস করতেই অনন্যা কন্নায় ভেঙে পরে আর আমায় জানায়… জানো ভাড়ার বাবু আমায় জোর করে আমার সাথে শারীরিক সম্পর্ক করে। বিশ্বাস করো আমি হাজার চেষ্টা করেও আমি নিজেকে রক্ষা করতে পারিনি। জানো আমার সাথে শারীরিক সম্পর্কের শেষে আমায় কিছু টাকা ছুরে দিয়ে গেছেন বাবু। আমি অনন্যাকে জোরিয়ে ধরে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে বলেছিলাম আমরা এই বাড়ি ছেড়ে দেবো আর ওই পিশাচটাকে উচিত শাস্তি দেবো।

অনন্যা আমায় বলে— আমরা বাড়ি ছাড়লে আমরা এখন যাবো কোথায়??? জানো বাড়ির বাবু আমায় হুমকি দিয়ে গেছে আমরা যদি ওনার স্ত্রীকে বা পুলিশকে জানানোর চেষ্টা করি তাহলে খুব খারাপ হয়ে যাবে। আর যদি আমি সইচ্ছায় শারীরিক মিলনে লিপ্ত হই উনি তোমার চিকিৎসার সবটুকু দ্বায়িত্ব নেবেন।

ভদ্র মুখোশ পরে সমাজে থাকা ভদ্র মানুষ ওনারা। তাই ওনার পরিবার, স্ত্রী চোখে আড়াল করে দিনের পর দিন আমার স্ত্রীর সাথে শারীরিক মিলনে লিপ্ত। তবে তার পরিবর্তে আমার চিকিৎসার ভার ওনার। আমার বৌ সমাজের কাছে দুঃচরিত্রা হলেও আমার কাছে আজও পবিত্র সেই নারী রুপেই পূজিত হয়। সমাজের চোখে আমি স্বার্থপর স্বামী হলেও আমার স্ত্রীর কাছে আজও আমি তার একমাত্র ভালেবাসার মানুষই আছি।

কথাগুলো শুনে কখন যে আমাদের নেশা কেটে যায় বুঝে উঠতে পারিনি। কে বলে এই যুগে ভালোবাসা নেই। শহর খুঁজলে দেখা যায় আজও এমন ভালোবাসা বেঁচে আছে। যেখানে স্বামীর কাছে স্ত্রীর ভালোবাসাটাই প্রাধান্য পায় শরীরটা নয়। এমনও স্ত্রী আছে স্বামীর জন্য নারীর সর্বমূল্যবান সম্মান শরীর বিক্রী করতেও দ্বিধাবোধ করেনা। ভালে থাকুক ভালোবাসা।

 

error: