রাতের খাবার খেয়ে, চলন্ত ট্রেনের দুলুনিতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি টের পাইনি। ঘুমের আর দোষ কি! সারাদিন যা ধকল গেছে! অফিস থেকে বেরোতে বেরোতে এমনিতেই দেরি হয়ে গেছিল… সাতদিন কলকাতায় থাকব না… আগামী সাতদিন কার কি কি কাজ… সবাইকে পাখী পড়ার মতো বুঝিয়ে সুঝিয়ে… খানিকটা নিশ্চিন্ত হয়ে… যখন ওলা বুক করলাম… তখন দেখি, পনের মিনিট লাগবে বলছে।

আর এক কাপ কফি খাবার মতো হাতে সময় আছে এখন। আমার পিওন ‘মধু’ ভালো নাম ‘মধুসূদন’ করিতকর্মা ছেলে। কি করে যে বুঝে যায় কখন আমার কি চাই!!
দেখি একটা প্লেটে করে দুটো গরম সিঙ্গারা আর এক কাপ কফি এনে দিয়ে গেল আমার টেবিলে।
আরে বাঃ এতো দেখছি মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি! উফ্ আর এই হয়েছে এক বৃষ্টি… আজ সকাল থেকে একনাগাড়ে ঝির ঝির করে হয়েই চলেছে। থামার কোনো নামগন্ধ নেই। অফিসে এসি চলছে বলে টের পাওয়া যায় নি। মধু’র ভেজা ছাতা দেখে বুঝলাম বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে এখনো।

মোবাইলে তাকিয়ে দেখি! পনের মিনিট থেকে বাড়িয়ে কুড়ি মিনিট ওয়েটিং দেখাচ্ছে ওলা! সর্বনাশ! শেষে কি ট্রেন মিস হয়ে যাবে! আর ও একটু আগে থাকতে ওলা বুক করা উচিৎ ছিল। দেখি একবার ফোন করে… কতদূরে আছে? ধুত্তোর কানেক্ট ও হচ্ছে না ফোনটা…
‘দা নাম্বার ইউ হ্যাভ ডায়াল্ড ইস কারেন্টলি আন অভ্যাইলেবেল’
এতো আচ্ছা জ্বালা! কতবার রিডায়াল করব! হাত ব্যাথা হয়ে গেল যে!
ফোনটা টেবিলে রেখে এবার স্পিকার ফোনে ডায়াল করলাম… হ্যাঁ…অ্যাই তো রিং হচ্ছে এতক্ষণে…
—হ্যালো…
—হ্যালো… ভাইসাব আপ কাঁহা হ্যায়?
—জ্যাদা দূর নেহি। অজন্তা সিনেমা কে পাস। পর ইঁহা রাস্তা পুরা জাম হ্যায়… পানি জম গ্যায়া।
পোলিস কাঁহা চল গয়ে পতা নেহি… পুরা ট্রাফিক জ্যাম হো গিয়া!
—ঠিক হ্যায়, আপ ওহী রোকিয়ে… ম্যায় রিক্স লেকে পৌঁছতা হুঁ

আবার সেই সবজান্তা… অসময়ের ত্রাতা মধুসূদন। আমি কিছু বলার আগেই দেখি একটা রিক্সা কে দাঁড় করিয়ে… আমার ট্রলি ব্যাগ আর ব্রিফকেস হাতে নিয়ে গেটের সামনে দাঁড়িয়ে…
“উঠুন স্যার, আমি সাইকেল নিয়ে অজন্তা সিনেমার ওখানে যাচ্ছি।”
আমার রিক্সা পৌঁছনোর আগেই মধু সেখানে গিয়ে উপস্থিত! ছাতা ধরে আমাকে তুলে দিল ওলা তে।
—সাবধানে যাবেন স্যার।
—হ্যাঁ ঠিক আছে… মধু এই টাকা কটা রাখো… তোমার মেয়ের জন্য কিছু কিনে দিও…

গাড়ি ঘুরিয়ে নিল ওলা ড্রাইভার…
—অব জোরসে চালাইয়ে ভাইসাব… জলদি পৌঁছনা হ্যায় হাওড়া স্টেশন…
—কৌনসা ট্রেন?
—মুম্বাই মেইল
—আট বাজে হ্যায় না? আরামসে পৌঁছ জাইয়েগা…
বৃষ্টির তো বিরাম নেই… আরাম আর পাচ্ছি কই! ঠাকুর ঠাকুর করে এখন ট্রেনটা পেলে হয়!

হাওড়া সে মুম্বাইকে ঔর যানেওয়ালি… এক দো আট এক শূন্য আপ… হাওড়া মুম্বাই এক্সপ্রেস… এক্কিস নম্বর প্ল্যাটফর্ম পর খারী হ্যায়।
হাতে আর মাত্র পাঁচ মিনিট!!… এক হাতে ট্রলি ব্যাগ আর এক হাতে ব্রিফকেস নিয়ে… দৌড়াতে লাগলাম প্রাণপণে। দৌড়াতে দৌড়াতে ট্রেনের পাদানিতে সবে মাত্র পা রেখেছি… আর তখখুনি ট্রেনটা চলতে শুরু করে দিল!
ওহ কপাল জোরে আজ ট্রেনটা ধরতে পেরেছি… আর একটু হলেই….
কোচ নাম্বার B2 বার্থ নাম্বার 22, যাক আপার বার্থ পরেছে… আমার পছন্দের বার্থ।
ট্রলি ব্যাগটা লোয়ার বার্থের তলায় চেন তালা লাগিয়ে, চ্যান কা শ্বাস নিলাম।

“বাবাই সরে এসো আঙ্কেলের গায়ে পা লাগছে তো”
লক্ষ্য করে দেখি, নীচের বার্থে একটা বাঙালি ফ্যামিলি, আর তাদের দুস্টু ছেলে বাবাই।
“আরে না না কিছু লাগে নি… এই তো তালা লাগানো হয়ে গেছে আমার…”
দেরি না করে উঠে পড়লাম আপার বার্থে। চাদরটা টানটান করে পেতে… বুকের তলায় বালিশ দিয়ে… উপুড় হয়ে শুয়ে… গতকালের কেনা গল্পের বইটা পড়তে শুরু করে দিলাম… ‘শারদীয়া আনন্দমেলা’

নীচের বার্থে বাঙালি ফ্যামিলির বাচ্চা ছেলেটি… দুরন্তপনা করেই চলেছে ট্রেনে উঠে থেকে। সিঁড়ি দিয়ে বাঙ্কে উঠছে আর নামছে। আর এদিকে, আমার ঠিক উল্টোদিকের আপার বার্থে এক মারওয়ারী… ফোনে বকবক করেই চলেছে পানপরাগ চিবোতে চিবোতে…
“ভাও কিতনা?… ঔর ডিসকাউন্ট?… কোই গুনজাইস?”
ভাবলাম একবার বলি… আমার গুজারিস… দয়া করে যদি একটু আস্তে কথা বলেন… তাহলে আমি শান্তিতে গল্পের বইটা একটু পড়তে পারি।

“ডিনার কা অর্ডার?… ভেজ, ননভেজ, চিকেন বিরিয়ানি, ফ্রায়েড রাইস, আন্ডা কারি…”
“সাব ডিনার কা অর্ডার?”
মশগুল হয়ে ছিলাম গল্পের বইয়ে। প্যান্ট্রি কারের বয়ের ডাকে হুঁশ ফিরল…
“নেহি চাহিয়ে”
‘শান্তিপুরে অশান্তি’ গল্পটা চার পাতার বেশি পড়তে পারলাম না এদের জ্বালায়!
ধুর… খেয়ে দেয়ে শুয়ে পড়ি বরং। নেমে পড়লাম আপার বার্থ থেকে।
হাত মুখ ধুয়ে এসে… নিচের বার্থে বসে খাবারের প্যাকেটটা খুললাম।
ওয়াও! চিলি চিকেন আর পরোটা দিয়েছে!… মুখে দিয়ে দেখলাম একটু… ওফফ… চিকেনটা ব্যাপক বানিয়েছে গিন্নি।
“কাকু ও কাকু… তোমার আনন্দমেলাটা একটু নেব?”

একি মামার বাড়ির আব্দার!! সবে মাত্র গতকাল কিনেছি। শান্তিপুরে নয়… এতো দেখছি খড়্গপুরে অশান্তি! ট্রেন দাঁড়িয়ে রয়েছে খড়্গপুরে। ভাবছিলাম খেয়ে দেয়ে উঠে… শুয়ে শুয়ে গল্পটা পড়া শেষ করব… দিলো বারোটা বাজিয়ে!
না বারোটা যদিও বাজে নি… সবে রাত দশটা কুড়ি।

—বা-বা-আ-ই… ওরম করে না, কাকু বইটা পড়ছেন তো…
—কাকুতো পড়ছে না… খাচ্ছে তো…
—আহা, ঠিক আছে বৌদি… নিক না বইটা… আমি কাল পড়ব খন…
—থ্যাংকু কাকু…
লাফ দিয়ে আমার বার্থে উঠে গেল বইটা পেরে আনতে।
আমি ও হাত মুখ ধুয়ে উঠে পড়লাম আমার বার্থে। টিটির টিকির দেখা নেই! সারা সন্ধ্যে কোথায় যে থাকে কে জানে! যেই একটু তন্দ্রা লাগবে ঠিক তখখুনি ‘টিকিট’ বলে ঠেলে তুলবে!

সবাই কম্বল পেয়েছে কিনা চেক করছে ট্রেনের অ্যাটেনডেন্ট।
—ভাইসাব এসি থোড়া কম কর সকতে হ্যায় ক্যায়া? আপার বার্থ হ্যায় না, কান মে ঠান্ড লাগ্রাহা হ্যায়
—ঠিক হ্যায় সাব, দেখতা হুঁ…

শুয়ে পড়লাম কম্বল মুড়ি দিয়ে। বিলাসপুর পৌঁছাবে সকাল সাতটা নাগাদ। কোনও বিলাসিতা করতে আমার এই ট্রেন যাত্রা নয়… নিতান্তই দায়ে পড়ে। অফিসের কিছু কাজ আছে বিলাসপুরে। একটা প্রজেক্ট চলছে তার তদারকির জন্য ই যাওয়া। নইলে এই ঝড় জল মাথায় করে… কে আর ঘর ছেড়ে বেরোতে চায়!

ট্রেনের দুলুনিতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি টের পাইনি। হঠাৎ একটা ঝাঁকুনি দিয়ে ট্রেনটা কোথায় যেন থেমে গেল! ধড়মড় করে উঠতে গিয়ে মাথায় ঠোকা খেলাম ট্রেনের ছাদে। মস্তকে আঘাত নাকি যাত্রা শুভ। নিকুচি করেছে শুভর! টনটন করছে মাথাটা… একটু জল ঝাপটা দিতে পারলে ভালো হতো…

নেমে এলাম ওপর থেকে। বেসিন থেকে জল নিয়ে অল্প করে মাথায় ঝাপটা দিলাম। সবাই দেখছি ঘুমিয়ে কাদা। ট্রেন নট নড়নচড়ন। একটু প্রাকৃতিক হাওয়া পেলে ভালো লাগত… খুলে দিলাম লোহার দরজাটা। গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টির সাথে… দমকা ঠাণ্ডা বাতাস এসে আছড়ে পড়ল গায়ে।
উঁকি মেরে দেখি… দুটি স্টেশনের মাঝখানে কোথাও দাঁড়িয়ে রয়েছে মুম্বাই মেল। কোথাও কিচ্ছু দেখা যাচ্ছে না… চারিদিকে ঘন কালো অন্ধকার। কোলা ব্যাঙের একটানা ডাক শোনা যাচ্ছে… ড্রাইভার সাহেব পোঁ পোঁ পোঁ করে তিনবার হর্ন বাজিয়ে… ক্লান্ত হয়ে গেছেন বোধহয়।
সামনে রক্তচক্ষু দেখাচ্ছে লাল সিগন্যাল। একটা লোক দেখি লন্ঠনের মতো কি একটা হাতে নিয়ে… এদিকেই হেঁটে আসছে রেললাইনের পাশ দিয়ে ।

—ক্যায়া হুয়া ভাইসাব?
—আগে অ্যাক্সিডেন্ট হুয়া সাহাব… সুইসাইড কেস…
ঘড়িতে তখন বাজে রাত দুটো…
ভারী বুটের আওয়াজ তুলে… তিনটে বন্দুকধারী পুলিশ… টহল দিতে দিতে… অন্য কামরা থেকে আমাদের কামরায় এসে হাজির।
“দরওয়াজা কিঁউ খুলা হ্যায়? বন্ধ কিজিয়ে”
বাধ্য ছেলের মতো দরজা বন্ধ করে, ফিরে গেলাম নিজের বার্থে। মাঝরাতে ঘুম ভেঙ্গে গেলে এই এক মুশকিল! সহজে আর ঘুম আসতে চায় না।
কে সুইসাইড করল! ছেলে না মেয়ে? কত বয়েস? কেন ই বা সুইসাইড করল! মাথায় ঘুরপাক খেতে লাগলো হাজার চিন্তা! যত্তসব কাপুরুষ… কামহিলা ও হতে পারে। যাকগে মরুক গিয়ে, আমার আর কি! মাঝখান থেকে আমার ঘুমটা নষ্ট করাল!
প্রায় মিনিট পঁয়তাল্লিশ পর… একটা হ্যাঁচকা দিয়ে নড়ে উঠলো ট্রেনটা। আস্তে আস্তে এবার চলতে ও শুরু করলো। আমি ও কম্বলটা টেনে নিলাম গায়ের ওপর। রাত জেগে একটু ঘুমিয়ে পড়েছিলাম ভোরের দিকে।

“চায়য় চা… চায়ে গরম…”
ঘুম ভেঙে গেল চা ওয়ালার হাঁকডাকে। ফুলে উঠেছে মাথার মাঝখানটা… দপদপ করছে এখনও…
—এক চায়ে দিজিয়ে… ইধার… ইধার উপর মে। কাঁহাতক পৌঁছা ভাইসাব?
—বিলাসপুর আনেয়ালি…

ও এসে গেছি তাহলে! প্রায় ঘন্টা খানেক লেট চলছে, ঘড়িতে আটটা পনের। বিলাসপুর আসছে?… নাকি ট্রেন বিলাসপুর পৌঁছাচ্ছে? আট সকালে এই বিতর্কে না জড়ানোই ভালো।
পেস্ট ব্রাশ বের করে… ওয়াশরুমে গিয়ে ভালো করে ফ্রেশ হয়ে… বেরোতেই দেখি… ট্রেন ঢুকে গেছে বিলাসপুর স্টেশনে।
আমার সাইট সুপারভাইজার জয়দেব… ছাতা মাথায় করে জানলা দিয়ে উঁকি দিচ্ছে কামরায়। আমি তাকে দেখতে পাচ্ছি… কিন্তু ও দেখতে পাচ্ছে না আমাকে। হ্যাঁ এই তো… এই তো এইবার দেখতে পেয়েছে, হাত নাড়ছে।
“আসুন স্যার… সাবধানে নামুন। বৃষ্টিতে প্ল্যাটফর্ম পিছল হয়ে আছে… দিন স্যার ব্যাগটা আমাকে দিন। সোজা চলুন, বাইরে গাড়ি রাখা আছে।”

সাদা অ্যাম্বাসাডার। পিছনের সিট সাদা তোয়ালে দিয়ে মোড়া। উঁফ! ড্রাইভার অগুরু ধূপ জ্বালিয়েছিল মনে হচ্ছে! এই গন্ধটা আমি একদম সহ্য করতে পারি না। মনে হয় যেন শ্মশানে এসেছি। অল্প খানিকটা নামিয়ে দিলাম কাঁচের জানলাটা। তিন চার বার চাবি ঘোরানোর পর কোঁ কোঁ কোঁ কোঁ শব্দ করে… একরাশ কালো ধোঁয়া ছেড়ে… চলতে শুরু করল লজঝড়ে অ্যামবাসাডার। সামনের সিটে ড্রাইভার আর জয়দেব। পিছনে আমি একা।

—জয়দেব… কাজের প্রোগ্রেস কতদূর?
—ভালো নয় স্যার। যা বৃষ্টি হচ্ছে কদিন ধরে! লেবাররা ঠিক মত কাজে আসছে না… খুব ক্ষেপে আছে ক্লায়েন্ট। অবশ্য বিমলবাবু সবদিক সাধ্যমত ম্যানেজ করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন… লেবার দের ওভারটাইম করিয়ে সামাল দিয়েছেন কিছুটা…
—হুম প্রগ্রেস যে সন্তোষজনক নয়… সে আমি কলকাতায় বসেই টের পেয়েছি। নইলে জরুরি তলব করে… আমাকে কি আর এমনি এমনি এখানে ডেকে পাঠিয়েছে?

বিমল আমার প্রজেক্ট ম্যানেজার। যেমন উচ্চ শিক্ষিত, তেমনি ম্যানপাওয়ার ইউটিলাইজেশনে সুদক্ষ। বয়সে জয়দেবের থেকে অনেক ছোটো… প্রায় বছর পনেরর ছোটো। বিমল যদিও জয়দেবের বস, তবে এদের মধ্যে বোঝাপড়া ভালো। জয়দেব পুরোনো কর্মী হলেও সিনিয়রিটি কমপ্লেক্স নেই। দিব্যি মানিয়ে নিয়েছে নতুন বস কে।

বৃষ্টিটা আবার ঝেঁপে এলো তার সঙ্গে ঝোড়ো হওয়া। শীত শীত লাগছে একটু। গাড়ির একটা ওয়াইপার আবার কাজ করছে না!
—ভাইসাব কুছ তো ঠিক সে দিখাই নেই দেরহা! থোরি দের কে লিয়ে গাড়ি সাইড কর লিজিয়ে।
—আররে নাহি সাহাব… কুছু হবে না। হাম অপকও সাহি সালামত পৌঁছা দেঙ্গে…

—জয়দেব? আর কদদূর তোমার হোটেল?
—স্যার, আমি তো সাইটেই থাকি। আর আপনার জন্য যে হোটেলটা বুক করেছি… ওটাই সবচেয়ে সাইটের কাছে। আপনার যাতায়াতে সুবিধা হবে। যদিও জায়গাটা একটু নির্জন… তবে সাইটের কাছে বলেই…
আ-আসুন স্যার… হোটেলে পৌঁছে গেছি। এখান থেকে সাইট আর মাত্র চার কিলোমিটার।

হোটেলের সার্ভিস বয় এসে, আমার ট্রলি ব্যাগ আর ব্রিফকেস ভেতরে নিয়ে গেল।
হোটেলটা মন্দ নয়, তবে বহু পুরোনো হোটেল। সম্ভবত বিলাসপুরের প্রথম হোটেল।
‘হোটেল মনোরমা’ চারতলা বিল্ডিং।
সামনে গাড়ি বারান্দা। রিসেপশনে একটা বড় সোফা, একটা টি টেবল, দেওয়ালে এক ভদ্রমহিলার ছবি। তাতে রজনীগন্ধা ফুলের মালা দেওয়া। ফুলের সুগন্ধে ম ম করছে হোটেলের রিসেপশন। সম্ভবত ইনিই হোটেলের মালকিন ‘মনোরমা’। বয়স কালে অপরূপ সুন্দরী ছিলেন ছবি দেখেই সেটা বেশ বোঝা যাচ্ছে।
উনার ছবির নীচে, দেওয়ালে চার চারটে দেওয়াল ঘড়ি। জানান দিচ্ছে আমেরিকা, জাপান, জার্মান আর ইন্ডিয়ার সময়। বাড়তি তিনটে ঘড়ি কিসের জন্য লাগিয়েছে, জিজ্ঞেস করতে হবে…

“আসুন স্যার ঘরটা দেখে নিন, ঠিক আছে কিনা…”
তিন তলায় কর্নার রুম। পুব দক্ষিণ খোলা, দুদিকে দুটো ব্যালকনি। বিশাল পালঙ্ক জমিদার বাড়ির মতো। বড় বড় কাঁচের পাল্লা দেওয়া জানালা। জানলায় ভারী পর্দা পেলমেট থেকে ঝুলছে মাটি পর্যন্ত। একটা শ্বেত পাথরের গোল টেবিল… তার দুদিকে দুটো গদি আঁটা চেয়ার মুখোমুখি রাখা। বাথরুমে বিশাল বাথটাব। সেগুন কাঠের ড্রেসিং টেবিলে বাটালির সূক্ষ সূক্ষ কাজ…
আয়নাটা বহু পুরোনো… মনে হয় বেলজিয়াম থেকে আনানো… পারা উঠে গেছে কয়েক জায়গায়…
—স্যার ঘর পছন্দ হয়েছে?
—উম্ম… হু… হ্যাঁ হ্যাঁ, জয়দেব… তোমার চয়েস আছে বলতে হয়। বেশ ভালো একটা হোটেল বের করেছ খুঁজে খুঁজে…
—হেঁ হেঁ স্যার… অনেক বছর তো হয়ে গেল কোম্পানিতে। আপনার কি পছন্দ সে তো আমার অজানা নয়। তাহলে চলুন স্যার, একবার নীচে যেতে হবে… নাম ঠিকানা এন্ট্রি করতে হবে খাতায়…
—হ্যাঁ চলো…
খাতায় লিখে দিলাম নামধাম। আই ডি প্রুফ দেখে নিয়ে, চাবি ধরিয়ে দিয়ে ম্যানেজার…
“স্যার কিসি চিজ কা জরুরত পরে তো… নউ নাম্বার ডায়াল কিজিয়ে গা… নাস্তা উস্তা জো চাহিয়ে মিল যায়েগা”

—স্যার আপনি তাহলে ফ্রেশ হয়ে নিন। গাড়ি আর ড্রাইভার রইলো… আমি চলি…
—তুমি কিসে যাবে? বোসো, আমি স্নান করে ব্রেকফাস্ট সেরে সাইটে যাব।
—না স্যার, আমি তো বাইক নিয়ে এসেছিলাম। ওই যে লক করে রাখা আছে… বাইকটা একমাসের জন্য ভাড়ায় নিয়েছি। আপনি আসুন আপনার সুবিধা মতো… আমি এগোই…

‘শারদীয়া আনন্দমেলা’ বইটা ট্রেনেই ফেলে এসেছি। আফসোস হচ্ছে খুব। বইটা এখানে থাকলে রাত্রে পড়তে পারতাম। মন টা একটু খচখচ করছে… আনন্দমেলা হারানোর সাথে সাথে… আমার জীবন থেকে আনন্দ হারিয়ে যাবে না তো!!
এতো সুন্দর বাথটাব! কিন্তু গা ডুবিয়ে বসে থাকার সময় নেই। ক্লায়েন্ট পেমেন্ট নিয়ে কোনো গা করছে না। শেষে আমাকে ডুবিয়ে মারার তালে আছে দেনার দায়ে!
“হ্যালো রুম সার্ভিস? দো পিস ব্রেড বাটার, অমলেট, ঔর এক কফি… জলদি প্লিজ…”

ব্রেকফাস্টের অর্ডার দিয়ে শাওয়ারের কল খুলে দিলাম… ঠাণ্ডা গরম জল মিক্স করে স্নান সেরে নিয়ে… দাড়ি কামিয়ে, আফটার সেভ মেখে… স্কাই কালারের শার্ট আর ব্ল্যাক কালারের প্যান্ট পরে তৈরি হচ্ছি… পিঁ পিঁ ডোর বেলের আওয়াজ।
“কাম ইন”
ব্রেকফাস্ট এসে গেছে, সঙ্গে নিউজ পেপার। খবরের কাগজ পড়তে পড়তে খাওয়া শুরু করেছি… এমন সময় দেখি মোবাইল বাজছে আমার।

—হ্যাঁ জয়দেব বলো…
—স্যার আপনি কি বেরিয়ে পড়েছেন?
—না, এই জাস্ট বেরোব, ব্রেকফাস্ট সেরে।
—একটু তাড়াতাড়ি আসুন স্যার, একটা বিরাট সমস্যা হয়েছে…
—কি হয়েছে?
—-যত তাড়াতাড়ি পারেন, চলে আসুন স্যার…. বিমলবাবুর মারাত্মক অ্যাকসিডেন্ট হয়েছে…
—অ্যাঁ সেকি!! কি করে? কখন হলো!?
—এই একটু আগে হয়েছে, আপনি আর দেরি করবেন না স্যার… তাড়াতাড়ি আসুন, আমি রাখছি।

কোনোমতে গলাধঃকরণ করে ব্রিফকেস নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম।
“ড্রাইভার… সাইট চলিয়ে জলদি”
বিমলের হঠাৎ কি করে কি হলো! খুব এফিশিয়েন্ট ছেলে। দেড় বছর হল আমার এখানে কাজ করছে, এর মধ্যে একদিন ও কামাই নেই। সাইট জবের জন্য একেবারে আদর্শ ছেলে। মাস সাতেক আগে বিয়ে করেছে, ওই সময় মাত্র কয়েকদিন ছুটি নিয়েছিল। গিয়ে ছিলাম ওর বিয়েতে। লাভ ম্যারেজ, লাভপুরে শ্বশুরবাড়ি। বিয়ের পর ওর প্রমোশন হলো, স্যালারি বাড়ল, সবই ঠিক ছিল…
ওর হঠাৎ এরকম হলো কি করে!? দেখি জয়দেব কে একবার কল করে…
“হ্যালো” ফোনে শুনতে পাচ্ছি অ্যাম্বুলেন্স এর সাইরেন…
—হ্যালো জয়দেব… হ্যাঁ আমি বেরিয়ে পড়েছি, তুমি সাইটে আছো তো!?
—স্যার আমি অ্যাম্বুলেন্সে… বিমলবাবুকে নিয়ে হসপিটালে যাচ্ছি। আপনি ওখানে চলে আসুন। ড্রাইভার কে বলুন ও চেনে গভর্নমেন্ট হসপিটাল।
—ওকে, ডোন্ট ওরি… আমি আসছি…
—ড্রাইভার, গাড়ি ঘুমা লিজিয়ে… গভর্নমেন্ট হসপিটাল যানা হ্যায়।
—জ্বী সাব

হাসপাতালে পৌঁছে, গাড়ি সোজা নিয়ে গিয়ে দাঁড় করালাম ইমারজেন্সি ওয়ার্ডের সামনে। জয়দেবের ফোন দেখি রিং হয়ে যাচ্ছে! ওর আবার কি হলো! ফোন ধরে না কেন? লম্বা করিডর, স্ট্রেচারে করে পেশেন্ট বয়ে নিয়ে যাচ্ছে ওয়ার্ড বয়। হন্তদন্ত হয়ে নার্স কোথায় যেন যাচ্ছে! সবাই খুব ব্যাস্ত।
একজন ডাক্তার, গলায় স্টেথোস্কোপ ঝুলিয়ে, সাদা অ্যাপ্রন পরে, এই দিকেই আসছে।
—ডক্টর… থোরি দের পহলে এক অ্যাক্সিডেন্ট পেশেন্ট আয়থা… নাম হ্যায় বিমল।
ও কিধর হ্যায় কুছ বাতা সক্তে?
—পেশেন্ট!! ডেডবডি লায়া গ্যায়া থা। সিধা যাকে লেফট সাইড মে যাইয়ে।

কিসব বলছে!?! ডাক্তার কার সাথে কাকে গুলিয়েছে কে জানে! যদি সত্যিই হয়!!
ভগবান করুন যেন সত্যি না হয়। মাথা কাজ করছে না আমার। ও- ওই তো জয়দেব বসে আছে বেঞ্চিতে।
“জয়দেব… কি অবস্থা!! বিমল কোথায়?”
হাউ হাউ করে কেঁদে উঠলো জয়দেব।
—স্যার, বিমলবাবু আর নেই
—কি কি-বলছ কি তুমি! নেই মানে?!
—নিউ কনস্ট্রাকশনের স্ট্রাকচারের পঞ্চাশ ফুট ওপর থেকে পা ফসকে মাটিতে আছড়ে পড়ে গেছেন বিমলবাবু। মাথা ফেটে চৌচির, ঘিলু বেরিয়ে গেছে! হাসপাতালে পৌঁছনোর আগে… রাস্তাতেই সব শেষ…
এরা পুলিশে খবর দিয়েছে। এখনই পুলিশ আসছে জিজ্ঞাসাবাদ করতে… পোস্ট মোর্টেম করা হবে…

আমার দুটো পা থর থর করে কেঁপে উঠল! পায়ে কোনো জোর পাচ্ছি না। চোখে অন্ধকার দেখছি। মাথা চেপে বসে পড়লাম বেঞ্চিটায়।
কি জবাব দেব বিমলের বৌ সঞ্চারী কে? ফুলের মত নিষ্পাপ মুখখানি… মাত্র কয়েকমাস আগে ভালোবাসা করে বিয়ে করেছে।
ওদের কত রঙ্গিন স্বপ্ন… সব যে ভেঙে চুরমার হয়ে গেল!! ভীষণ অসহায় লাগছে আমার।

—আর ইউ মিস্টার অতীশ দত্ত চৌধুরী?
পুলিশ ইন্সপেক্টরের গুরু গম্ভীর কন্ঠস্বর!
—ইয়েস স্যার…
—আমি জয়ন্ত ব্যানার্জি। লোকাল থানার অফিসার ইনচার্জ।
—আসুন মিস্টার চৌধুরী। আমাদের সঙ্গে আপনাকে একবার থানায় যেতে হবে। এই যে মিস্টার জয়দেব… আপনাকে ও আসতে হবে।

বিলাসপুরে বাঙালি পুলিশ ইন্সপেক্টর দেখে একটু ভরসা পেলাম।
—স্যার, থানায় কেন!?
—সেটা থানায় গিয়ে জানতে পারবেন।
—কিন্তু স্যার… এখন কিকরে যাই! বডি পরে আছে এখানে…
—বডি নিয়ে কেউ পালাবে না। পুলিশ পাহারায় থাকবে। চার ঘন্টার আগে ডেথ সার্টিফিকেট দেবে না। তারপর পোস্ট মর্টেম হবে… বডি পেতে সন্ধ্যে হয়ে যাবে। আপনি আসুন থানায়।
—ঠিক আছে স্যার চলুন…
—জয়দেব… তুমি কলকাতা অফিসে এক্ষুনি ফোন করে বলো, কেউ যেন বিমলের বাড়িতে খবর দেয়। ওদের বাড়ির লোক যত তাড়াতাড়ি সম্ভব যেন বিলাসপুর চলে আসে। আর একটা ফোন করো রায় বাবুকে।
না থাক তুমি না… উনাকে আমি কল করছি। উকিল মানুষ তো… তুমি করলে ফোন নাও ধরতে পারে।

“ক্রিং ক্রিং–ক্রিং ক্রিং”

—বলো চৌধুরী, কি খবর? হঠাৎ অধমকে স্মরণ করার কারণ! ডিভোর্স কেস কিন্তু আমি আজকাল আর নিচ্ছি না।
—ধুর… কিসের ডিভোর্স! তোমাদের উকিল দের এই এক দোষ… বড্ড বেশি কথা বলো!
—কি করব ভায়া… কথা বেচেই তো খাই। আর খাই বলেই বেঁচে আছি… হাঃ হাঃ
—ছাড়ো ওসব কথা। আমি এখন বিলাসপুরে আছি। তুমি আজ রাতেই বিলাসপুর রওনা দাও, ভীষণ আর্জেন্ট।
—কি ব্যাপার! এতো আর্জেন্ট? তোমার নামে কি ওয়ারেন্ট বেরিয়েছে নাকি?
—ধরে নাও সেরকমই। তুমি আসছ তো?
—নিশ্চিন্তে হোটেলে গিয়ে ঘুমাও। আমি সকালে গিয়ে ডেকে তুলব… বাই…

“মিস্টার চৌধুরী… আপনি তো গাড়ি এনেছেন। ড্রাইভার কে বলুন আমাদের জিপটাকে ফলো করতে”
পুলিশের গাড়ি অপরাধীর পিছনে তাড়া করে… আর আমরা এখন পুলিশের গাড়ির পিছনে তাড়া করে চলেছি। সেই অর্থে আমরা নিরপরাধ… এটা ভেবে মনকে স্বান্তনা দিচ্ছি ঠিকই… কিন্তু কথায় বলে না? পুলিশে ছুঁলে আঠারো ঘা!! আজ যে কি আছে কপালে!? কে জানে? আর একেই বলে বোধহয় মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা!!


—বসুন মিস্টার চৌধুরী। চা খাবেন তো? রামলাল… তিন চায়ে লাও…
‘হ্যাঁ বলুন, আপনার কোম্পানি তে কতদিন কাজ করছিলেন বিমলবাবু? কি পোস্টে ছিলেন? বিলাসপুরে উনি কতদিন ধরে ছিলেন?
—ব-বলছি স্যার। বিমল আমাদের কোম্পানি তে গত দেড় বছর ধরে কাজ করছিল। ও ছিল আমাদের প্রজেক্ট ম্যানেজার। গত একমাস যাবৎ একটা ভাড়া বাড়িতে থাকত এই বিলাসপুরে।
—উনার মেডিক্লেম… এল আই সি… এসব করা আছে?
—হ্যাঁ স্যার আছে। আমাদের কোম্পানি তার প্রিমিয়াম দেয়। এল আই সি এই ক্ষতিপূরণ অবশ্যই দেবে।

—সে তো এল আই সি যা দেবার দেবে। আপনি কি দেবেন? একজন মালিক হয়ে আপানার দায় তো অনেক! বিমলবাবু তো আপনার কাজ করতে গিয়ে মারা গেছেন। তার দায়িত্ব আপনি এড়াতে পারেন না।
—বলুন স্যার… আমাকে কি করতে হবে? আমি তো রয়েছি… পালিয়ে যাই নি…
—পালিয়ে আর যাবেন কোথায়!? মোল্লার দৌড় ওই মসজিদ পর্যন্ত… আর চৌধুরীর দৌড় বেহালা পর্যন্ত। সব জানা আছে আমার।
আগে পোস্ট মর্টেম রিপোর্ট দেখি… সাইটটা দেখি… যদি দেখা যায় আপনার গাফিলতি ছিল… তখন কিন্তু ওকালতি করেও আপনার রায় বাবু কিচ্ছু টি করতে পারবেন না…

বাপরে!! কি সাংঘাতিক কান!!! ফোনের সব কথা শুনে ফেলেছে!!! এমনকি আমার বাড়ি বেহালায় সেই খবরটা ও পেয়ে গেছে!!!

—মিস্টার জয়দেব… আপনি বোধহয় সেই ব্যক্তি… যিনি বিমলবাবু কে জীবিত অবস্থায় শেষবারের মতো দেখেছিলেন… কি ঠিক বললাম?
—আ-আজ্ঞে হ্যাঁ স্যার। আমি বিমলবাবু কে সঙ্গে নিয়ে অ্যাম্বুলেন্সে আসছিলাম…. রাস্তাতেই…
—চুপ করুন। এটা সরকারি দপ্তর… এখানে কান্না কাটি করবেন না। যখন দুর্ঘটনাটি ঘটে… সেই সময় আপনি ঠিক কোথায় ছিলেন?

ক্রিং ক্রিং

—হ্যালো, ইন্সপেক্টর জয়ন্ত ব্যানার্জি স্পিকিং
—স্যার, ম্যায় উমেশ বোল রহা হুঁ। যাঁহাপর বিমলজী গির গয়ে থে… উস জাগা হামলোগ ঘের রাক্ষা হ্যায়। জমিন পর দাগি দিয়া হ্যায়… আউর খুন কা স্যাম্পেল ল্যাবরেটরি মে ভেজ দিয়া।
—বহৎ খুব। ওয়েল ডান উমেশ। তুম ওহী রুকো, হামলোগ পৌঁছ রহা হুঁ…
ড্রাইভাররর…. জিপ নিকালো। মিস্টার চৌধুরী, জয়দেব, আসুন আমার সাথে। গাড়িটা এখানেই থাক। আপনারা দুজনে জিপের পিছনে উঠুন।

পুলিশের জিপে ওঠা এই প্রথমবার। ভীষণ ভয় হচ্ছে, হাত পা কাঁপছে আমার! শরীর দিয়ে দরদর করে ঘাম গড়াচ্ছে, ঠোঁট শুকিয়ে যাচ্ছে…
“এ-একটু খাবার জল পাওয়া যাবে?”
কিছু উচ্চবাচ্য করলেন না জয়ন্ত বাবু। মোবাইলে কার সঙ্গে কথা বলেই চলেছেন। জিপ এসে থামল
সাইটের সামনে।
ফোনে কথা বলতে বলতে জিপ থেকে নেমে পড়েছেন জয়ন্ত বাবু। হাত দেখিয়ে আমাদের নামতে বললেন ইশারায়। কেউ একজন দৌড়ে এসে জয়ন্ত বাবুকে সেলাম ঠুকল… এই বোধহয় উমেশ।
“আইয়ে সাব… উস্তরফ চলিয়ে… বিমলজী উধার গির গয়ে থে…”

মেঝেতে চাপ চাপ রক্তের দাগ! জায়গাটা লাল ফিতে দিয়ে ঘিরে রেখেছে পুলিশ। মেঝেতে চক দিয়ে আঁকা… ঠিক যে জায়গাটায় এসে আছড়ে পড়েছিল বিমল। ওপরে তাকিয়ে স্ট্রাকচারে দেখলাম… কোনো রেলিং দেওয়া নেই! যে কোনো লোক অসাবধানতাবশত পরে যেতেই পারে!!
—জয়দেব বাবু… আপনি তখন কি করছিলেন? এই যে আপনাকে বলছি…
—অ্যাঁ! হ্যাঁ স্যার বলুন…
—কানে কথা যায় না? আপনি তখন কি করছিলেন??
—আ আজ্ঞে স্যার আমি তখন ওই দেওয়ালের পিছনে টয়লেট করতে গেছিলাম।

—তারপর?
—তারপর স্যার ওপর থেকে ভারী কিছু একটা পড়ার মতো জোরে আওয়াজ শুনে দৌড়ে আসি
—এসে কি দেখলেন?
—এসে দেখলাম… বিমলবাবু উপুড় হয়ে মাটিতে পড়ে আছেন। রক্তে ভেসে যাচ্ছে… কোনো সাড় নেই!! অজ্ঞান হয়ে গেছেন!!
—ঘড়িতে তখন ঠিক কটা বাজে?
—স্যার সে-সেটা তো খেয়াল করিনি… সাড়ে দশটা হবে বোধহয়…
—তারপর?
—তারপর আমি লোকজন ডেকে আনি… অ্যাম্বুলেন্স কে খবর দিয়ে স্যার কে ফোন করি।
—মিস্টার চৌধুরী… আপনার মোবাইল টা একবার দিন তো।

—জয়দেব বাবু… আপনি মিস্টার চৌধুরী কে ফোন করে ছিলেন নটা বেজে ছাপান্ন মিনিটে। কল ডিউরেশন টোয়েন্টি নাইন সেকেন্ড।
—হতে পারে স্যার। তখন তো ঘড়ি দেখিনি…
—আপনি হয়তো ঘড়ি দেখেন নি। কিন্তু বিমল বাবুকে আপনি ছাড়া আর কেউ পরে থাকতে দেখেন নি! আপনি ছাড়া ওপর থেকে ভারী কিছু পড়ার শব্দ কেউ শোনে নি!! আপনি ই লোক ডাকতে গিয়ে ছিলেন!! ব্যাপারটা কি আপনার নিজের কাছে গোলমেলে লাগছে না?
পুলিশের কাছে কিছু গোপন করার চেষ্টা করবেন না… পেটের কথা কি করে মুখে আনতে হয়… সেটা আমার খুব ভালো করে জানা আছে। পরিস্কার করে সব কিছু খুলে বলুন।

—উমেশ… বাকি আদমি লোগো কো বুলাও… জো লোগ বিমলজী কো দেখা থা… অ্যাম্বুলেন্স মে উঠানে সে পহলে…
উমেশ ডেকে নিয়ে এল সেইসব লেবারদের… যারা বিমলকে অ্যাম্বুলেন্সে তোলার সময় উপস্থিত ছিল।
—আইয়ে ইধার আইয়ে… আপলোগ কঁহা থে উস ওয়াক্ত জব বিমলজী গির পরে?
—সাহাব, হামলোগ চায় পিনে ক্যান্টিন গ্যয়াথা।
—লেকিন ক্যান্টিন তো নসদিক মে হ্যায়। আপলোগো কো উনকা গিরনে কি আওয়াজ কিঁউ নেহি শুনাই দিয়া?

“পোঁ ওওও ওওও……”

—অব এ সাইরেন কিঁউ বাজ রহা?
—এক বাজ গিয়া সাব। লাঞ্চ টাইম কা সাইরেন বাজ রহা হ্যায়।
—আচ্ছা… সাইরেন আউর কব কব বাজতি হ্যায়?
—চার দফে বাজতি হ্যায় সাহাব। সুবে আট বাজে জব ফ্যাক্টরী কা গেট খুলতি হ্যায়। ফির দশ বাজে চায় কা টাইম। দোফওর এক বাজে লাঞ্চ কে টাইম। আউর ফির চার বাজে ছুট্টি কা টাইম।
—অব সমঝ গ্যায়া। ইস্কা মতলব জব বিমলজী গির পরে… উস ওয়াক্ত ভি সাইরেন বাজি থি। আউর ইসলিয়ে উনকা উপর সে গিরনে কি আওয়াজ… আপলোগ কা কানো তক নেহি পৌঁছা…
বিমলজী কা দেহান্ত ঠিক দশ বাজে… ইয়া উস্কি থোরি দের বাদ হুয়ি। দশ বাজে কা পহলে নেহি… আপলোগ অব যা সক্তে।

“জয়দেব বাবু… আপনি নটা বেজে ছাপান্ন মিনিটে মিস্টার চৌধুরী কে অ্যাক্সিডেন্ট এর খবরটা জানিয়েছেন। আমার অঙ্ক কিন্তু মিলছে না।
মিস্টার চৌধুরী… চলুন এবার একবার থানায় রাউন্ড দিয়ে, হসপিটাল যাব। জিপে গিয়ে বসুন দুজনে।

থানায় পৌঁছে জয়ন্ত বাবু, নিজের লাঞ্চ বক্স খুলে খেতে বসে গেছেন। আমার ও খুব খিদে পাচ্ছে। সেই সকালে দু পিস পাউরুটি খেয়ে বেলা দুটো পর্যন্ত রয়েছি। এক হাবিলদার এসে বলল…
“আপলোগ খানা খাইয়ে গা তো… যাইয়ে খানা খাকে আ যাইয়ে”।

—জয়দেব… তুমি কিছু খাবে তো যাও… খেয়ে এসো, আমি কিছু খাব না।
—না স্যার, আমি ও কিছু খাব না।
ভেজা হাত রুমালে মুছতে মুছতে বেরিয়ে এলেন জয়ন্ত বাবু…
“ড্রাইভার… গাড়ি নিকালো। আপনারা দুজনে জিপে উঠে পড়ুন… হসপিটাল যাব”।

আবার সেই দম বন্ধ করা সরকারি হাসপাতালে প্রবেশ। সুস্থ মানুষের ও অসুস্থ হয়ে যাবার জোগাড়! খোঁজ নিয়ে জানা গেল পোস্ট মর্টেম চলছে এখন।
বাইরে অনেকক্ষণ অপেক্ষা করছি। এর মধ্যে দেখি অনেক গুলো মিসড কল! ফোনটা সাইলেন্ট করে রেখে ছিলাম। কল ব্যাক করলাম পরিচিত নম্বর গুলো দেখে দেখে। আন নোন নাম্বার গুলো তে কল ব্যাক করতে সাহস পেলাম না।
যদি সঞ্চারী ফোন করে থাকে! কি উত্তর দেব? ওগুলোর মধ্যে একটা আন নোন নাম্বার থেকে দেখি উনিশটা মিসড কল! এটা নিশ্চয়ই সঞ্চারীর ফোন নাম্বার! এত বার ফোন করেছে… কল ব্যাক করা উচিৎ। ডায়াল করলাম রিং হচ্ছে… “হ্যালো” একটি মহিলা কন্ঠ।

“মিস্টার চৌধুরী… এদিকে আসুন কুইক…” দেখি জয়ন্ত বাবু ডাকছেন!
“জয়দেব… ফোনটা ধরো তো… কথা বলো… আমি আসছি এখনই। সাহেব কেন ডাকছেন দেখি।”

—মিস্টার চৌধুরী… আপনার মনে পড়ছে? জয়দেব বাবু তখন বলে ছিলেন… উনি আওয়াজ শুনে দৌড়ে গিয়ে দেখেন… বিমল বাবু উপুড় হয়ে অজ্ঞান অবস্থায় মেঝের ওপর পড়ে রয়েছেন…
—হ্যাঁ, জয়দেব তো তাই বলে ছিল…
—হুম, পোস্ট মর্টেম রিপোর্ট কিন্তু অন্য কথা বলছে।
উনি মেঝেতে আছড়ে পড়ে অজ্ঞান হন নি। অজ্ঞান অবস্থায় মেঝেতে পড়েছেন। মানে মেঝেতে পড়ার আগে ই তিনি জ্ঞান হারিয়েছেন।

এবার তো দেখছি আমার জ্ঞান হারানোর উপক্রম!! আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না, কি ঘটে চলেছে!!
—এ-এসবের মানে কি!?
—বুঝতে পারলেন না মিস্টার চৌধুরী? মানেটা তো জলের মত পরিস্কার। বিমলবাবু কে আগে অজ্ঞান করা হয়েছে। তারপর অপেক্ষা করা হয়েছে সাইরেন বাজার জন্য। যেই সাইরেন বেজেছে… সেই মুহূর্তে উনাকে ওপর থেকে ঠেলে ফেলে দেওয়া হয়েছে নিচে… যাতে ভারী কিছু ওপর থেকে পড়ার শব্দ কেউ শুনতে না পায়।
টি টাইমে আসে পাশে কেউ থাকবে না। সবাই ক্যান্টিনে যাবে। ওপর থেকে ফেলে দেবার সময় কেউ দেখে ফেলার ভয় নেই। এটা কোনো অ্যাক্সিডেন্ট নয়।
এটা একটা অত্যন্ত সুপরিকল্পিত মার্ডার।
‘পাকরো পাকরো পাকরো হাবিলদার… জলদি…’

দেখি জয়দেব দৌড়াচ্ছে উর্ধশ্বাসে!! হাবিলদার তার পিছনে তাড়া করেছে লাঠি হাতে নিয়ে। কোমর থেকে রিভলবার বের করে শূন্যে ফায়ার করলেন জয়ন্ত বাবু…
“পালাবার চেষ্টা করবেন না… গুলি চালাতে বাধ্য হব।
হ্যান্ডস আপ, ইউ আর আন্ডার অ্যরেস্ট মিস্টার জয়দেব।”

হাবিলদার এসে হ্যান্ডকাফ পরিয়ে দিল জয়দেবের হাতে। টানতে টানতে জিপে নিয়ে গিয়ে তুলল।
“মিস্টার চৌধুরী জিপে উঠে পড়ুন”।
জিপ চলতে লাগলো প্রচণ্ড স্পিডে। মাথা নিচু করে বসে আছে জয়দেব। কিছুক্ষণের এর মধ্যে ই পৌঁছে গেলাম থানায়।

—জয়দেব বাবু… এবার বাকিটা আপনি বলবেন? নাকি আমাকেই বলতে হবে?
কেন খুন করলেন বিমলবাবু কে?
—স্যার আমি খুন করিনি।
গালে সপাটে এক চড়! কষের জায়গা কেটে গিয়ে রক্ত পড়ছে! আর একটু হলে চেয়ার থেকে ছিটকে পড়ত জয়দেব!!

—আ-আমাকে ক্ষমা করে দিন স্যার… বউ বাচ্চা নিয়ে মারা পড়ে যাব…
—ছেড়ে দেব!? তোকে?? তুই ক্ষমা চাইবার যোগ্য???
এবার আমি ও কষিয়ে একটা চড় মারলাম।

—বল কেন খুন করলি? কি করে অজ্ঞান করলি? সব খুলে বল… নয়ত আজ তোর ওপর থার্ড ডিগ্রি চালাব। জয়ন্ত বাবু জোরসে রুলের বাড়ি মারলেন জয়দেবের পায়ের গোড়ায়।
—সব ব-বলছি স্যার… মারবেন না…
হাত জোড় করে কাঁদতে শুরু করেছে জয়দেব।
দেখে আমার গা পিত্তি জ্বলে যাচ্ছে…
—বিমলবাবু আমার থেকে বয়সে অনেক ছোট… আমি অনেক পুরোনো স্টাফ… তবুও…
—তবুও কি?? বিমলবাবু কে তোর বস কেন করা হয়েছে? সেটাই তোর জ্বলন!! বিমলবাবু সরে গেলে উনার জায়গায় তোর প্রমোশন হবে! তাই তো??
হুঙ্কার দিয়ে উঠলেন জয়ন্ত বাবু।

—হ্যাঁ হ্যাঁ-স্যার…
—ছি ছি ছি, জয়দেব!!… আমি তো ভাবতেই পারছি না… এই সামান্য কারণে কেউ কাউকে খুন করতে পারে!! বিমলের মত এত ভালো ছেলের কোনো শত্রু থাকতে পারে…..এ-এটা কেউ বিশ্বাস করতে পারবে না। আর তুই সেটাকে সুযোগ হিসেবে কাজে লাগিয়ে… অ্যাক্সিডেন্ট বলে চালিয়ে দেওয়ার ছক কষে ছিলি!!
আমি তো এতদিন তাহলে দুধ কলা দিয়ে কাল সাপ পুষেছি!!!
স্যার একে ফাঁসি তে চড়ানোর ব্যবস্থা করুন। আমি আর এর মুখ দর্শন করতে চাই না।

—বিমলের মত শক্ত সমর্থ পুরুষ কে… ও কি করে অজ্ঞান করে ফেলল? বিমল যদি একটু আঁচ করতে পারত… ওর ওপর হামলা হতে চলেছে… তাহলে হয়ত…
—ওটা আমি বোঝাচ্ছি মিস্টার চৌধুরী। ক্লোরোফর্ম দিয়ে সহজেই অজ্ঞান করা যায়। কিন্তু ওটা জোগাড় করা সহজ নয়। তাই দেশি পদ্ধতি ব্যবহার করেছে। দুটো কেমিক্যাল আছে, যেটা সহজে পাওয়া যায়… নাম দুটো আপনার জানার বিষয় নয়। তার মধ্যে একটা অডরলেস আর একটায় ধূপের মত গন্ধ থাকে। ওই দুটো কেমিক্যাল দু ফোঁটা করে একসাথে মিশিয়ে… রুমালে নিয়ে আপনার নাকে চেপে ধরলে… আপনি এক্ষুণি জ্ঞান হারাবেন।
—আচ্ছা… গন্ধটা কি অগুরু ধূপের মত?
—একসেক্টলি… আপনি কি করে জানলেন?
—ওহ মাই গড!! তুই তার মানে আজ সকালে বিলাসপুর স্টেশনের কাছে… কোনো দোকান থেকে…. ওই মারণাস্ত্র কিনে…. আমি যে অ্যামবাসাডারে এলাম, সেটা তে তুলেছিলি!!! তারপর হোটেলে গিয়ে, গাড়ি থেকে কেমিক্যাল নামিয়ে নিয়ে… বাইকে করে সাইটে গিয়ে এই কান্ড করেছিস!!!
হায় হায়!! হে ভগবান… বিমলের মৃত্যুবাণ আমি… বিলাসপুর স্টেশন থেকে গাড়ি করে বয়ে এনেছি!! আর বিমলকে ঠেলে দিয়েছি মৃত্যুপুরে!! আমি ও তো এই পাপের ভাগিদার!!

—আরে কি হলো?? আর কত ঘুমাবে?? ওঠো… দ্যাখো কে এসেছে?
বউয়ের চিৎকারে ঘুম ভেঙে গেল। তাকিয়ে দেখি আমার মাসতুতো বোন রাখি হাতে দাঁড়িয়ে!

—উঠে পরো দাদামণি। এসো, তোমার হাতে এটা পরিয়ে দিই…
ওহ! তাই তো!! আজ তো রাখিপুর্ণিমা!! তাহলে এতক্ষণ যা দেখছিলাম… সেটা স্বপ্ন!!
আসছি রে বোন। মনে মনে বললাম… এরকম স্বপ্ন যেন, কারও না হয় পূরণ…

সমাপ্ত

 

এ গল্প সোমালিয়ার মেয়ে Waris Dirie ‘র। মানুষ রুপকথায় বিশ্বাস করে কি না আমি জানি না। তবে এটা কোনো সাজানো মোটিভেশনাল গল্পও নয়। এ এমন এক বাস্তবের সম্মুখে আমাদের দাঁড় করাবে যেখানে আমাদের হারহীম হওয়া ছাড়া উপায় নেই।

মরুভূমির’র বিষন্ন শূন্যতার মাঝে মানবতার মরীচিকায় বারোটা শিশুর মধ্যে জন্ম নেওয়া মেয়ে “Waris Dirie” এর গল্প। আর এমনই কি বা ভিন্ন হওয়ার সম্ভাবনা জেগে উঠছিল যে একটা ইন্টারভিউ পুরো বিশ্বের নজর থামিয়ে দিল “Waris Dirie” র উপর!

তখন মাত্র বয়স পাঁচ, এই বয়সে তাদের একটি রিচুয়্যাল পালন করা হয় যেটার নাম “Infibulation”। যন্ত্রণার চরম সীমাকে জানতে হলে আমাদের জানতে হবে এই রিচুয়্যালটি কী?

Infibulation – the ritual removal of the external female genitalia and the suturing of the vulva, a practice found mainly in northeastern Africa, particularly in Djibouti, Eritrea, Ethiopia, Somalia, and Sudan.

সহজ ভাষায় ও বিজ্ঞানকে যদি বাদ দিয়ে কথাটা বলতে চাই তা হলে বলতে পারি নারীর গোপন অংঙ্গের দ্বার বদ্ধ করে দেওয়া এবং একটি মাত্র সুক্ষ্ম পথ রেখে দেওয়া হয় যেখান থেকে প্রয়োজনীয় অবশেষ বেরিয়ে আসতে পারে। শুনতে যতটা স্বাভাবিক ও সরল ভাবছেন বিষয়টা কিন্তু একদম সহজ ও সরল নয়।

একটি বিশেষ দিন দেখে একটি বিশেষ মহিলা এই রিচুয়্যাল পালন করতে সাহায্য করেন। মা নিয়ে যায় মেয়ে কে সেই দাইমার কাছে। সে তার উজ্জ্বল ছুড়ি দিয়ে এই কাটাছেঁড়া খেলা খেলেন, অতঃপর নগ্ন নির্জন পাথরের উপর চিল্লাতে থাকা মেয়েটাকে ফেলে সবাই দূরে লুকিয়ে দাঁড়ায়। চিৎকার করা মেয়ের মাথার উপর চিল ঘুরপাক খায়। মাটিতে নেমে আসে নিয়তি। তারপর দরজায় কড়া নাড়ে আঘাত। ক্ষতবিক্ষত হয়ে রক্ত ধুয়ে ফেলে পাথর। চিল ফিরে যায়। কান্নায় ব্যথায় অর্ধমৃত শরীর ফিরিয়ে নেয় মা তার বুকে। ফিরে যায় ঘরে। সিন্দুকে সমাজ তার বিশ্বাস বন্ধ করে তালা ঝুলিয়ে দেয়। রক্ত মাখা পাথর বৃষ্টি বিহীন মরুভূমিতেও ভিজে ওঠে পাঁচ বছরের শিশুর রক্তে।

এর ফলে অনেক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। মা হতে গিয়েও মারা গেছে অনেকেই।

বয়স তখন তেরো, বিয়ে ঠিক করে দেওয়া হল ষাঠ বছরের একটা বৃদ্ধর সাথে। এ বিয়ের প্রস্তাব কিছুতেই মেনে নিতে পারে নি। Waris এই চোরাবালিতে পা ফেলেনি সবার আড়ালে মা’কে বিদায় জানিয়ে বেরিয়ে পড়েছিল । মাইল মাইল জলহীন বালি মেখে পথ হেঁটে গেছিল নতুন জীবনের উদ্দেশ্যে। পরিবারের এক কাকা তাকে কাজের মেয়ে হিসেবে নিয়ে য়ায় UK। ফ্রিতে সে এম্বেসিতে খেটে গেল‍‍‍‍‍‍ বছরের পর বছর। Civil War ‘র সময় সবাই ফিরে যায়। ফেরেনি শুধু Waris‌। London এর রাস্তায় দিন কাটিয়েছে ও। গার্বেজ থেকে খাবার কুড়িয়ে খেয়েছে। আস্তে আস্তে ইংরেজি ভাষা শিখেছে। McDonald’s ‘এর একটি রেস্তোরাঁয় পরিস্কার করার কাজ করেছে। সেখান থেকে নিজের জীবিকা আয় করে ও এই অচেনা শহরে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে চলেছিল প্রতিনিয়ত।

মানুষ বলে সঠিক সময়ের অপেক্ষা করতে হয়, সময় ফেরে, সময় কে চিনতে হয়। Waris’রও সময় ফিরেছে আঠেরো বছর বয়সে। তার রূপ চোখে পড়েছিল এক ফটোগ্রাফারের।
আস্তে আস্তে মডেল হিসাবে বিখ্যাত হয়ে ওঠে Waris। সিনেমায় ছোট্টো একটা রোল থেকে শুরু হয় সিনেমার জার্নি। তার লেখা আত্মজীবনী বেস্টসেলার হয়ে ওঠে। লেখিকা হিসেবেও খ্যাতি অর্জন করে। আত্মজীবনীর নাম,
“Desert Flower”। Waris’ র অর্থ হলো Desert Flower। জীবনের চাকা কোথায় কে ঘুরিয়ে দেবে আমরা কেউ বলতে পারি না, তা বলে নিয়তির অপেক্ষা করলে হবে না। নিজেকে কাজের কাজী করে তুলতে হবে।

হয়তো Waris ‘র জীবনে মডেল হওয়াটা থেকে শুরু হয় মিরাকেল। তবে তার নিজের বেঁচে থাকার জন্য যে কাজ করে আয় করেছিল সেটা আসলে একটা সাফল্য। বাকিটা হয়ত রুপকথা। নিজেই জিতে গেছিল সেদিন যেদিন নিজের খাদ্যের জন্য আত্মনির্ভরশীল হয়ে উঠেছিল। কোনো কাজ ছোটো বড়ো নয়। কাজ করে যাওয়াটা বড়ো বিষয়। গল্পটা হয়তো আরও বিস্তারে বলা যেত তবে আমার উদ্দেশ্য এটুকুই,এমনিও অনেক কথা বলেছি। এটা বর্ণবিভেদের গল্প নয়৷ এটা ষাঠ বছর বয়সের বৃদ্ধ চাকু হাতে যৌনাঙ্গের দরজায় দস্তক দেওয়ার থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে নিজের রূপকথা লিখে ও বয়ে যাওয়া রক্তের ব্যথা বলতে পারা এক সাধারণ নারীর গল্প । দোহাই নয় দোয়া করুন। আমাদের হাতে হারাবার কিছু না থাকলেই ভালো। সব থেকে সহজ ভাবে এগিয়ে যেতে সুবিধা হয়। অজুহাত পড়ে থাক অতীতে, বর্তমান কর্মের, ভবিষ্যৎ ভাব্বার নয় ফল নিয়ে। গীতার শব্দ গুলো কানে বাজছে হয়তো আপনারও। বেঁচে থাকার গান শোনাচ্ছে সময়। মানব অধিকার উল্লাস করছে। মানুষ এগিয়ে গেছে চাঁদে। আমার মা চাঁদে যেতে পারেনি কিন্তু তিনি তার মতো করে চাঁদকে জয় করেছে,আপনিও করুন । ক্ষুদ্র ভাববেন না আপনাকে ,আপনি যদি শুধু সন্তানও মানুষ করছেন তো মনে রাখবেন আপনি দেশের ভবিষ্যৎ গড়ছেন নিজের হাতে। আপনার শিশু আপনার চাঁদ।

মানুষের জন সমুদ্রে আমি আছি। আপনিও আছেন আমার পাশে। শুধু মনে রাখবেন হয়তো আমাদের কেউ চেনে না। হয়তো শুধু আমরা মাত্র একজনের কাছে হিরো বা হিরোইন। এই বা কম কোথায়!

 

লাল বেনারসি, কপালে চন্দন, আর সুন্দর গয়নায় মালবিকা কে মোহময়ী লাগছে। ছোট বোন কে এই সাজে দেখে হঠাৎ চোখ আটকে গেলো মানবেন্দ্রর। বোন এর হাত দুটো ধরে ভেজা দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে বললো তোকে ভীষণ সুন্দর দেখাচ্ছে রে মালা।বোনের চোখেও জল। আর কিছুক্ষন পরেই সে চলে যাবে এই বাড়ি থেকে। একদলা কষ্ট যেনো দলা পাকিয়ে গলার কাছে উঠে এলো। মানব ঝটপট চোখের জল মুছে বললো না বোনু এখন তোমার অনেক দায়িত্ব এতো কষ্ট পেলে হবে না। চলো নিচে সবাই তোমার জন্য অপেক্ষা করছে।সুন্দর ভাবে বিয়ে সম্পন্ন হলো।মালবিকা পরের দিন সকালে আর্দ্র আর মালবিকা ও তার বাড়ির বাকি সদস্য রা বাড়ির উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলো। সবাই চলে যাওয়ার পর মানব এর মনে হলো এই ফাঁকা বাড়ি টা যেনো এক নিমেষে মৃত্যুপুরী হয়ে গেছে। মালবিকা ও মানবেন্দ্র দুই ভাই বোন। মালবিকার থেকো বছর ৮ এর বড়ো দাদা মানব। অনেক ছোটো বেলায় তাদের বাবা মা মারা গেছেন। তারা এক পিসিমার কাছে মানুষ। তিনিও গত হয়েছেন বহুদিন হলো। মানব ছোটো থেকো বেশ মেধাবী। নিজের মেধার জোরে সে আজ এক নামী কলেজ এর অধ্যাপক। আর বোন মালিবকা কলেজ শেষ করে এখন তার ধ্যান জ্ঞান শুধু তার গান।ভীষণ সুন্দর গানের গলা তার। তার এই গান শুনেই তো আর্দ্র তার প্রেমে পড়ে। বিগত এক বছর প্রেম এর পর আজ তারা সাত পাকে বাঁধা পড়েছে।নিজের ভালোবাসার মানুষকে জীবন সঙ্গী হিসেবে পেতে দুজনের খুশী আর ধরে না। আদ্রর বাবা এই শহরের একজন নামী ব্যবসায়ী। তাই তারা ছেয়েছিলেন আর্দ্রর আরও কোনো বড়ো ঘরে বিয়ে দিতে কিন্তু শেষ পর্যন্ত ছেলের কথায় তারা এই বিয়ে তে রাজি হন।তারপর মালবিকার সাথে আলাপ হলে ওনারও মালবিকার ঈশ্বর প্রদত্ত গলা শুনে বিহ্বল হয়ে যান। এই সুন্দর গুন এর সাথে মালবিকার অসম্ভব শান্ত নম্র ব্যবহার তাদের সুপ্রসন্ন করে। তাই তারা বেশ খুশি মনেই মালবিকা কে এই বাড়ির বউ করে নিয়ে আসেন।

বিয়ের প্রায় সাত দিন কেটে গেছে। আর্দ্র আর মালবিকা যাচ্ছে মধুচন্দ্রিমায়।মালবিকার সব থেকে পছন্দের জায়গা দার্জিলিং। ছেলেবেলা থেকে পাহাড় তাকে ভীষণ ভাবে আকর্ষণ করে তাই সে আর্দ্রর কাছে আবদার করে তাকে দার্জিলিং নিয়ে যাওয়ার জন্যে। আদ্র প্রথমে চেয়েছিলো তারা বিদেশে কোথাও যাবে কিন্তু মালবিকার এই বায়না শুনে সে খানিক অবাক হয়। বিদেশে ট্যুর ছেড়ে কেউ দার্জিলিং ঘুরতে যেতে চায়?? কিন্তু মালবিকার সেই এক বায়না যে সে দার্জিলিংই যাবে। অগত্যা মালবিকা কে খুশি করার জন্যই মূলত তাদের এই দার্জিলিং এ আসা। গাড়িতে বসে মালবিকা জানলা দিয়ে বাইরের প্রকৃতি দেখছে, যে দিকে তাকাও শুধু ঘন নিবিড় সবুজ আর দৈত্য এর ন্যায় পাহাড় দাঁড়িয়ে। তার সাথে ঠান্ডার আমেজ যেনো এক স্বপ্নের শহর মালবিকার কাছে। মালবিকার এই উজ্বল্ল দুটো চোখ আর গাল ভরা হাসি দেখে আর্দ্র তৃপ্ত হয়। সে তো শুধু এটাই ছেয়েছে যেনো মালবিকা ভালো থাকে চিরকাল। তার মুখের এই হাসি দেখার জন্যে আদ্র সব করতে পারে। মালোবি আর আর্দ্র কোনো হোটেল এ ওঠে নি। তারা উঠেছে একটা বাংলো তে। তার দাদা র বন্ধুর বাংলো। সবুজ পাহাড়ের কোলে এই বাংলোর কাছাকাছি আর তেমন কোনো বাড়িঘর নেই। যদিও এই ছোটো বাংলো টা এতো সুন্দর যে কাছাকাছি কোনো আরও জনবসতি থাকলে এই নিবিড় জনমানবহীন পরিবেশ এর এই আমেজ বোধ করি তারা পেতো না। স্নান সেরে রাত এর খাবার খেয়ে ঘরে এসে আদ্র মালবিকা কে কোথাও দেখতে না পেয়ে আসে পাশে খুঁজতে থাকে। হঠাৎ সে শুনতে পায় কেউ একটা গান গাইছে “চলে যেতে যেতে দিন বলে যায়, আঁধারের শেষ এ ভোর হবেই” আর্দ্র গান টাকে অনুসরণ করে নিচে নেমে আসে আর তখনই লোডশেডিং চারিদিক অন্ধকার। দিকবিদিক শূন্য হয়ে সে মালবিকাকে ডাকতে যাবে ঠিক সেই মুহূর্তে তার মাথার পিছনে সজোরে কেউ আঘাত মারে আর সে অজ্ঞান হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে।
আর্দ্রর যখন জ্ঞান ফেরে তখন সে দেখে তার সামনে মালবিকা বসে আছে সারা রাত কান্না কাটি করার দরুন তার চোখ মুখ ফুলে গেছে। সে চোখ খুলতে মালবিকা আবার তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকে। আদ্র তাকে জানায় যে সে এখন ঠিক আছে কিন্তু মালবিকা স্থির হতে পারে না। সে বলে “আমি দাদা কে আর মাকে ফোন করে জানিয়েছি ওরা সন্ধ্যার মধ্যে চলে আসবে তারপর তুমি একটু সুস্থ হয়ে গেলে আমরা বাড়ি ফিরে যাবো। কিন্তু তোমার সাথে এমন টা কি করে হলো আর্দ্র?
আর্দ্র তাকে কাল রাত এর সব ঘটনা খুলে বলে। মালবিকা আরও ভয় পেয়ে যায়। সে বলে ওঠে ” আর্দ্র আমরা তো কারোর কোনো ক্ষতি করি নি তাহলে তোমার উপর এই আক্রমণ কেনো হলো?”
” আমি সত্যি জানি না মালবিকা। কিন্তু তুমি বাবা মা আর দাদা কে কেনো জানিয়েছ এই সব?”
“আমি যা করেছি ঠিক করেছি আর্দ্র। এই অচেনা জায়গায় তোমার উপর এমন আক্রমণ হলো আর এখানে এক মুহুর্ত ও একা থাকা ঠিক নয় বাবু। ওরা এলে কালকেই আমরা চলে যাবো।” ওই বাংলো র একজন চাকর ছিলো শিবু। সে আর্দ্রর জন্য ডাক্তার ডেকে আনে। এখন আর্দ্র খানিক সুস্থ। সন্ধ্যায় ৬:৩০ নাগাদ তাদের বাংলোর গেটের সামনে একটা গাড়ি এসে থামে। আর্দ্রর বাবা মা আর মালবিকার দাদা এসেছেন। গাড়ি থেকে নেমে এক মুহূর্ত অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন আদ্রর বাবা। তারপর তার স্ত্রীর ডাকে তার সম্বিত ফেরে এবং তিনি বাড়ির ভিতরে ঢুকে আসেন। এক মাত্র ছেলের এই অবস্থা দেখে মা খুব ভেঙ্গে পড়েন। আদ্রর বাবা ও মালবিকার দাদা তাদের দুজন এর মুখ থাকে গত রাত এর সব কথা শোনেন। মালবিকা জানায় সেই সময় সে বাথরুম এ ছিলো। আর্দ্রর চিৎকার শুনে সে ছুটে এসে দেখে রক্তে মেঝে ভিজে যাচ্ছে আর আদ্র অজ্ঞান হয়ে পরে আছে। মালবিকার দাদা বলে “আমি কাল সকালেই লোকাল পুলিশ কে খবর দেবো।” কিন্তু আর্দ্রর বাবা তাকে কাউকে কিছু জানতে বারণ করেন এবং যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এই বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ার কথা বলেন। ওনার কথা শুনে সকলেই ভীষণ অবাক হয়ে যান। কিন্তু ওনার মুখের উপর কথা বলার সাহস কারোর নেই। তাই রাত এর ডিনার করে সবাই সবার ঘরে শুতে চলে যায়।
মাঝ রাতে কিসের একটা আওয়াজ শুনে অনিকেত বাবু অর্থাৎ আর্দ্রর বাবার ঘুম ভেঙ্গে যায়। তিনি দেখেন একটা ছায়া তার জানলা দিয়ে সরে গেলো। তিনি বিছানা ছেড়ে দরজা খুলে বাইরে এসে দেখার চেষ্টা করেন কেউ আছে কি না? কিন্তু কাউকেই দেখতে পান না শুধু শুনতে পান একটা গান। হালকা মিষ্টি সুরে বাজছে গানটা।”চলে যেতে যেতে দিন বলে যায় আঁধারের শেষে ভোর হবেই, হয়ত পাখির গানে গানে, তবু কেনো মন উদাস হলো….” গান টা শুনে তার বুকের ভিতর টা ছ্যাঁৎ করে ওঠে। এই গান যে ওনার খুব পরিচিত। ওই গান কে অনুসরণ করে তিনি নিচে নেমে আসেন। বাড়ির পাশের বাগান থেকে আসছে গান টা। তবে কি তার অন্ধ অতীত আবার ফিরে এসেছে। তাকে শেষ করার জন্য। বাগানের শেষ প্রান্তে যেখানে শুধু পাহাড়ী সব ফুল ফুটে আছে সেখানে গিয়ে তিনি দেখেন এক মহিলা তার দিকে পিছন করে দাঁড়িয়ে গান গাইছে। অন্ধকারে তাকে সঠিক দেখতে না পেলেও তিনি আন্দাজ করতে পারেন সে কে! তবুও তিনি চিৎকার করে বলে ওঠেন কে তুমি? সেই নারী মূর্তি ও বলে ওঠে “আমাকে চিনতে পারছো না অনিকেত দা? আমি মৃন্ময়ী। মনে করো সেই আজ থেকে বছর কুড়ি আগে ঠিক এখানে তুমি আর আমি…”
” মৃন্ময়ী তুমি? কিন্তু তুমি কি করে এখানে?”
সেই নারী মূর্তি আবার বলে ওঠে ” কেনো অনিকেত দা আমি আসতে পারি না তোমার কাছে?”
অনিকেত বাবু চিৎকার করে বলে ওঠেন ” না পারো না, তুমি কিছু তেই আসতে পারো না। কি করে আসবে তুমি তোমাকে তো আমি নিজের হাতে এই পাহাড় থেকে ধাক্কা মেরে ফেলে দিয়েছিলাম। তুমি মরে গেছো মৃন্ময়ী তুমি মরে গেছো।”
এক নিশ্বাসে কথা গুলো বলে কান্নায় ভেঙে পড়েন অনিকেত বাবু। হাঁটু মুড়ে মাটিতে বসে পড়েন। আর চারি দিকে আলো জলে ওঠে। চোখ তুলে তিনি সামনে ছেয়ে দেখেন তার স্ত্রী, ছেলে, মালবিকা আর মানব দাঁড়িয়ে। তার সাথে পুলিশ। কাউকে কিছু বলতে না দিয়ে তার স্ত্রী তার কাছে এসে বলেন কেনো করলে তুমি এই সব? “আমাকে ক্ষমা করে দাও অনুপমা কিন্তু মৃন্ময়ী আমাকে….” ওনার কথা শেষ করতে না দিয়েই মানব বলে ওঠে” ভয় পাবেন না। কোনো ভূত নেই এখানে। এতক্ষণ যা হচ্ছিল টা সম্পূর্ণ টা আমাদের পূর্ব পরিকল্পিত।”
এর পর মালবিকা বলতে শুরু করে ” আমার বাবা আর অনিকেত কাকু দুজন বিজনেস পার্টনার ছিলেন। এটাই আমাদের বাড়ি।মা বাবা দাদা র আমি খুব আনন্দে দিন কাটাতাম এখানে। একদিন শুনলাম বাবা গাড়ি দুর্ঘটনায় মারা গেছে। আমি তখন অনেক টা ছোট। কিন্তু দাদা প্রায় বছর ১০ এর।”
তারপর আবার মানব বলতে শুরু করলো ” একদিন রাত এ দেখলাম মা খুব কাদছে আর জোরে জোরে ঝগড়া করে কারোর সাথে কথা বলছে এই বাইরে বাগানে। আমি লুকিয়ে দেখছিলাম সেটা ছিল অনিকেত কাকু। সব শুনে বুঝলাম অনিকেত কাকুই বিজনেস এর জন্য বাবা কে মেরে ফেলেছে।কোনো ভাবে সেটা মা জানতে পেরে যায় আর পুলিশ কে সব জানিয়ে দেবে বলে। অনিকেত কাকু ভয় পেতে যান উনি মা কে অনেক বোঝানোর চেষ্টা করেন কিন্তু যখন উনি মা কে বোঝাতে ব্যার্থ হন। তখন রাগ এর বসে মা কে এইখান থেকো ধাক্কা মারে ফেলে দেন। উনি ভাবেন এই কথা কেউ জানে না। কিন্তু আমি লুকিয়ে সব দেখে ফেলি। কিন্তু ভয়ে কাউকে কিছুই বলতে পারি না। মা বাবার দুঃখে সুইসাইড করেছে এমন টাই রটে যায় চারিদিকে। আমাদের পিসি আমাদের দুজনকে নিয়ে কলকাতায় চলে যান। বহু বছর কেটে যায় একদিন আমি জানতে পারি মালবিকার সাথে অনিকাতে বাবুর ছেলে প্রেম করছে। পুরনো কোনো কথাই আমি ভুলিনি, আমি মালবিকা কে সব জানাই। আর এই প্ল্যান করে আপনাদের এখানে ডেকে নিয়ে আসি। আমার কাছে কোনো প্রমাণ ছিলো না তাই অনিকেত কাকু কে ভয় দেখিয়ে সব সত্যি টা বের করার চেষ্টা করেছিলাম। মালবিকা একদম মা এর চেহারা আর গলা পেয়েছে তাই ওকে ভয় দেখানো টা র সহজ হলো। তাই কাল আদ্র উপর শিবু কে দিয়ে আঘাত করলাম যাতে ছেলের এই কথা শুনে তার বাবা মা এখানে ছুটে আসেন। আর অনিকেত বাবুর অতীত আবার তার সামনে আসে।”

এতো অবধি বলে মানব থামে পুলিশ এসে অনিকেত বাবু কে ধরে নিয়ে যায়। মালবিকা আদ্রর কাছে এসে বলে ” এতো সব কিছুর মধ্যে ও আমার ভালোবাসা টা মিথ্যে নয় আদ্র। আমি জানি তোমার আমার উপর রাগ হচ্ছে অনেক। আর তুমি আমাকে ভালবাসবে না কিন্তু আমার মা এর খুনি কে ধরার জন্য এই নাটক টা আমাকে করতেই হতো আর্দ্র। পারলে আমায় ক্ষমা করো।”
এই বলে মালবিকা পিছনে ঘুরে এগিয়ে যেতে চায় আর্দ্র ছুটে এসে তাকে জড়িয়ে ধরে বলে “আমার বাবা র শাস্তি তুমি আমায় দিও না মালবিকা। আমি তোমাকে ছেড়ে থাকতে পারবো না।”
দূরে কোথাও আবার বেজে উঠেছে ” চলে যেতে যেতে দিন বলে যায়, আঁধারের শেষে ভোর হবেই……..

এটা রেখে দেওয়ার মতো দলিল। কে পড়ল, না পড়ল অথবা কে লিখল তা নিয়ে ভাবার নয়। শুধু লিখে রেখে গেলাম ফেসবুকের দেওয়ালে। বারবার ফিরে পাওয়ার জন্যে।

যে মানুষটা কখনও বুড়ো হলেন না। যে মানুষটা দিন, রাত, রোদ, ছায়া চিরন্তর চোখ ঢাকেন কালো চশমায়। শিশুর মতন অভিমানী আর মনের ভেতর মেঘের মতন আবেগ নিয়ে ঘোরাফেরা করেন কোলকাতা শহরে। সহজে যার চোখের পাতা ভিজে ওঠে দার্জিলিংয়ের বৃষ্টিতে খয়েরি পাতার মতো। তার ছেলে তাকে প্রকাশ্যে “অঞ্জন দা” বলে ডাকে। কথা বলব সেই সরল পিতার সব থেকে আন্ডাররেটেড অ্যালবাম নিয়ে। কোনো লেবেল ছাড়াই প্রকাশিত হয়েছিল জ্ঞান মঞ্চে।

উনষাট। প্রায় ৫০ মিনিটের একটা অ্যালবাম। আটটা গান, যে গানগুলো মনে হয় অঞ্জন দত্ত-র লেখা ওঁর ক্যারিয়ারের এখনও পর্যন্ত শ্রেষ্ঠ গান, যেখানে অসাধারণকে অতীব সাধারণ ভাবে প্রকাশ করেছে। প্রেম, বিষাদ,সামাজিক অথবা রাজনৈতিক ভাবনা চিন্তার মধুর মিশ্রণ এই উনষাট।

যে মানুষটা নিজের গানের কথায় কোনো ভণিতা করেননি, যা ইচ্ছে তাই সোজাসাপ্টা ভাষায় বলে গেছেন গোটা জীবন জুড়ে তার গানে । অনেকেই বলবে হয়ত এটা বয়স বেড়ে যাওয়ার দোষ কিন্তু তিনি তার গানেই ধরিয়ে দিয়েছেন যে এটা বয়েস বেড়ে যাওয়ার সাহস।

তখন উনষাট, বলাই বাহুল্য অঞ্জন দত্ত-র বয়স বাড়ছে ফলত সময় ফুরিয়ে আসছে। খুব সাধারণভাবেই প্রতিটি শিল্পীর মৃত্যুভয় তুখোড়। কারণ তাদের অনেক কিছু বলার থাকে, অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেওয়ার থাকে শিল্পের মাধ্যমে। সে বক্তব্যগুলো বলতে না পারার অনিশ্চয়তা তাঁকে প্রতিনিয়ত জ্বালাতন করে। তাই সময় ও মৃত্যু নিয়ে তারা খুব ওয়াকিবহাল। সেই পরিস্থিতি থেকে যে কথাগুলো উঠে আসে সেগুলো খুব raw।

প্রথম গান- এখনো তাই

“ঝান্ডা হাতে অনেকের চোখে মুসোলিনি ভেসে ওঠে এখনো তাই।
রাস্তা ঘাটে মাতালের চোখে ভ্যানগগ খুঁজে পায় এখনো তাই।
বে-ওয়ারিশ লাশ কাঁটা ছেঁড়া করে স্বযত্নে ঢেকে রাখে এখনো তাই।
বে-পরোয়া ঠোঁট চুমু খেলে লিপস্টিক ধেবড়ে যায় এখনো তাই।
নিগারকে ব্ল্যাক বললেও তার অভিমান কমে যায়না এখনো তাই।
সমকামী কতহাজার ভালোবাসা সহজে পায় না এখনো তাই।

যিজেস(যীশু)মারা যায়নি,শুধু ক্রুশ বিদ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে।
ঘুমের বড়ি আঁকড়ে থেকেও করেনা এখনো অনেকেই সুইসাইড।
এখনো তাই, এখনো তাই,আমি গান গাইছি এখনো তাই।”

এই মানুষটা এখনো কেন গান গাইছে তার শত শত কারণ বলে দিল প্রথম গানে। গানের অন্দরমহলে ঢোকার আগে গীতিকার আমাদের জানান দিচ্ছে দরজার সম্মুখে কেন তিনি ফিরে এসেছেন। প্রথম গানেই তার বয়স বেড়ে যাওয়ার ছাপ। কেন এখনো গুটিয়ে সব কিছু ঘরকুনো হয়ে যাননি অঞ্জন দত্ত সে সব উত্তর দিয়ে শুরু হচ্ছে বাকি গল্পটা।

দ্বিতীয় গান- সকলেই জানে

“সকলেই জানে সকলে চাইলে
পৃথিবীতে ক্ষমতা পাল্টে দেওয়া যায় ।
সকলেই জানে ক্ষমতার কাছে এসে
মাথাটা না নোয়ালে মাথা কাটা যায় ।”

আদৌ সকলেই কি জানে এত কঠিন সত্যি কীভাবে এত সহজভাবে বলা যায়! হয়ত এর জন্যেই বয়স ক্ষয় হয়, মানুষ অভিজ্ঞতার চূড়ান্তে হাঁটাচলা করে। যে মানুষের ঠোঁটে কথাগুলো পেরেকের মতো গেঁথে থাকে তার মুখে সহজে জোছনার মতো ফোটে এখানেই, আরও গভীরে নামলে অতল জলে যারা ডুব সাঁতারু।

তৃতীয় গান- বদল

“নিয়ে আসছে সকলের রাজনৈতিক অনিহা
নিয়ে আসছে নোবেল পিস প্রাইজের ব্যর্থতা
নিয়ে আসছে পারমাণবিক বৃষ্টি নামার ভয়
নিয়ে আসছে গনণতান্ত্রিক মননের অবক্ষয়
নিয়ে আসছে যেখানে সেখানে শপিং মল
নিয়ে আসছে বারুদের গন্ধে মাখা জমি দখল।
বদল,নিয়ে আসছে নিয়ে আসছে আরেকটা দিন।
সে তুমি যতই থাকো যতই নির্বিকার।”

নির্বিকার, দেখতেই পাচ্ছি একটা মানুষের ব্যক্তিগত ও সামাজিকতার মিশ্রণ থেকে বেরিয়ে আসতে আসতে হেঁটে আসছে রাজনৈতিক অথবা ডিসটোপিয়ানের দিকে। একটা পথ যে পথের প্রতিটি বাঁকে তুমি আছো যেখানে সামাজিক , রাজনৈতিক ও ভালোবাসার চলাচল তুমি বুঝতে পারবে।

তারপর

“ইতিহাস ঘুমিয়ে পড়েছে ক্লান্ত,
ভবিষ্যতের দৈত্য বড়ই বিভ্রান্ত,
ট্রিগার টানতে টানতে বড়ই ক্লান্ত,
ঘোলাটে সমুদ্র এখনো অশান্ত,
আবার শুরু হবে প্রথম থেকে প্রলয়। “
(বিদায়)

অথবা

“আমি তোমার জন্য রেখে গেলাম মাইকেল অ্যাঞ্জেলো ,
ঈশ্বর ছুঁতে চায় তোমার আঙুল।
রেখে গেলাম নেরুদার বেপরোয়া প্রেম,
জেমস ডিনের ছাই চাপা আগুন ।
থাকবে তোমার পিছিয়ে পড়ার হাজার অজুহাত,
বিষিয়ে যাবে যাবেই তোমার মন ।
তাই তোমার জন্য রেখে গেলাম জোয়ান অফ আর্ক,
আমি তোমার জন্য রেখে গেলাম জন।”

অথবা

“একটা দিন ছিল একটা দিন
একটা বৃষ্টি ভেজা পাহাড়ের মাথায়
ছিল না ছিল না লজ্জা
ছিল না কোনো কষ্ট
ছিল না কিছু হারিয়ে ফেলার ভয়।”

অথবা

“একটা মেঘের পেছনে লুকিয়ে কাঞ্চনজঙ্ঘা
একটা বধির বাচ্চার আবেগের হাততালি ।
একটা হিজড়ে, যার হঠাৎ পায় লজ্জা
আমি তাদের মতো করে তোমাকে ভালোবেসেছি।”

অথবা

“ছোট ছোট ছেলেদের হাতে পিস্তল দেখে যাবে
আরো বছর দশ হয়ত আট।
প্যালেস্টাইনে আবার ল্যান্ড মাইন ফাটবে,
জ্বলে উঠবে হয়ত গুজরাট।


অনেক প্রেমের গান শুনালাম
তবু ভাঙল প্রেম আমারই আবার।
আজ আমার বয়েস আজ আমার বয়েস
আজ আমার বয়েস উনষাট।”

বিদায় জানাবার আগে অনেক কিছু বলার আছে। আমাদের জন্যে রেখে যাচ্ছেন ইতিহাস, শিল্প, মানুষের ব্যথা, চিৎকার আর ভালোবাসা। যে মানুষটা আজীবন প্রেমের গান গেয়েছেন তার প্রেম হারিয়েছে বহুবার। তাকে হারিয়ে ফেলার ভয় নিয়ে গেছে তাকে গভীর একাকীত্বে। কালো চশমার আড়ালে। তবুও সে বারবার তোমাকে ভালোবেসেছে। এই পৃথিবীর সব প্রাকৃতিক যা কিছু এখানে মেকি নয় তাদের মতো করে তোমাকে ভালোবেসেছে।
তখন তার বয়স উনষাট। সে জানে গান কোনোদিন বদল আনতে পারবে না। তবুও সে যে কটা দিন বেঁচে আছেন দেখে যাবেন নোবেল পিস প্রাইজের ব্যর্থতা। ভেবে যাবেন মাইকেল অ্যাঞ্জেলো। দেখবেন জ্বলন্ত গুজরাটের মতো আরও কিছু দৃশ্য। আর হয়ত আট, দশ বছর। চলে যাওয়ার আগের মুহূর্ত পর্যন্ত ভালোবাসার গান গাইবেন।

এখনো সময় আছে। জীবিত মানুষের প্রাপ্য ভালোবাসা পাঠাও। হারিয়ে গেলে শুধু থেকে যাবে হাহুতাশ। হয়ত এই কথাগুলো এখন কেউ পড়বে না। কেউ কথা বলবে না তবে মনে রেখ চলে গেলে তখন সবাই কথা বলবে তখন এই কথাগুলোই ফিরে ফিরে আসবে।

তিনি তখন আর কোনো কথাই বলবেন না। শুধু সবার প্লে লিস্টে বাজবে-

“তাই সব হারাবার আগে এসো, বলো, বন্ধু বিদায়।
তাই ফুরিয়ে যাবার আগে এসো, বলো,বন্ধু বিদায়।
এই গান,এই গান,এই গান তারপর বিদায়।”

রিমিতাকে আমি ভালোবেসে বিয়ে করেছিলাম আজ থেকে দশ বছর আগে।রিমিতাও আমাকে খুব খুব ভালোবাসতো।আমাদের বিয়েতে আমাদের দুজনের পরিবারের সহমতি ছিলোনা।কিন্তু, আমাদের মনে হয়েছিলো আমরা একে অপরকে ছাড়া বাকি জীবন কাটাতে পারবোনা।তাই পরিবারের অমতেই পালিয়ে গিয়ে বিয়েটা করে ছিলাম। আমার চাকরি ছিলোনা।

একটা দোকানে খাতা সারার কাজ করতাম।কোনোরকমে বাড়ি ভাড়া নিয়ে আমি রিমিতার সাথে সেখানেই ছোট্ট করে সংসার পাতি। আমাদের সব সখ আহ্লাদ মিটতোনা তবে আমরা কেউই তাতে অসুখী ছিলাম না।বেশ সুখেই দিনরাত্রি কাটছিলো আমাদের। বিয়ের বছর তিনেকের মাথায় আমাদের সেই ছোট্ট ভাড়া ঘরেই আমাদের ভালোবাসার ফলস্বরুপ এক কণ্যাসন্তান ঘর আলো করে এসেছিলো।আমাদের ছেলে হয়নি বলে যে আমরা এতটুকু অখুশি হয়ে ছিলাম তা একদমই নয়।বরং,মেয়ে হওয়ায় আমরা আরও বেশিই খুশি হয়েছিলাম।

আমরা স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিলাম আমাদের যেমন সম্বল তেমন ভাবে মেয়েকে বড় করে তুলবো।তার সমস্ত সখ সাধ আর যা যা আছে,সব পূরণ করবো। তিনবছর পর আমাদের দুজনেরই পরিবারের লোক আমাদের কাছের মানুষেরা আমাদের সম্পর্কটা মেনে নিয়েছিলো।আমি,রিমি ও আমাদের ছোট্ট মেয়েকে ফের আমার পুরানো বাড়িতে মানে মা বাপির কাছে ফিরে গিয়েছিলাম।তবে কাজটা ছাড়িনি। আমি কাজের জন্য বাইরেই থাকতাম এবং আমার স্ত্রী মানে রিমি ও মেয়ে থাকতো বাড়িতে।আমার মা বাবা নাতনিকে পেয়ে পুরানো সবকিছু ভুলে গিয়ে নতুন করে বাঁচতে আরম্ভ করেছিলো।মেয়েটার বড় ধুমধাম করেই অন্নপ্রাশন হলো।প্রতি সপ্তাহে যখন আমি বাড়ি ফিরতাম রিমি আর আমাদের মেয়েকে নিয়ে আমরা ঘুরতে যেতাম।বাড়িতেও কত আনন্দ করতাম।রিমির সাথেও আমার ভালোবাসার বন্ধন অটুট ছিলো আগের মতই।

কিন্তু,রিমির সাথে আমার মনের রিলেশন যে কীভাবে কমতে শুরু করেছিলো তা একবারের জন্য আমি বুঝতে পারিনি।হ্যাঁ,কাজের সূত্রে আগের মত শারীরিক সম্পর্কটা হতনা ঠিকই কিন্তু মনের যোগাযোগ তো রোজই থাকতো।তাও.. আজকে আমাদের বিয়ের ছ’বছর পূর্ণ হয়েছে।মানে সিক্সথ এনিভার্সিরি।অথচ,রিমি আমার সঙ্গে নেই। এই মাঝের তিনটে বছরে রিমি যে অন্যএকজনের সাথে কবে যে সম্পর্কে জড়িয়ে গেছিলো তার গন্ধটা আঁচ করতে পারিনি আমি।

এই সাত দিন হলো তার সাথে আমার ডিভোর্স হয়েছে।মেয়েটাকে সে নেয়নি, আমার কাছেই ছেড়ে গেছে। আমি আজও মানতে পারছিনা যে রিমি-যে আমাকে ভালোবেসে একদিন বিবাহ করেছিলো সে কীকরে আমায় ছেড়ে চলে যেতে পারে?কীসের চাহিদা তাকে আমার চেয়ে দূরে করে দিলো?এতদিনধরে তো এত অভাবেও সে আমার সাথে ছিলো।হঠাৎ তার কীসের এত প্রয়োজন হয়ে পড়লো যে আমায় ছাড়তে হলো? না,মানসম্মানের কথা আমি একদম ভাবছিনা।সে নয় আজ লোকে চারকথা আড়ালে বলবে আবার চুপ হয়ে যাবে।কিন্তু,তার নিজের মেয়েটার মুখটাও এক বার মনে পড়লো না এমন একটা বিরাট ডিশিসন নেওয়ার আগে?আমাদের ভালোবাসা,আমাদের সুখ দুঃখের সময়গুলো তার একবার মনে ভেসে উঠলো না?এমন ভাবে না বলে ছেড়ে যাওয়া যায়?যায় কি? প্রথমে ভেবেছিলাম যে ছেলেটার সাথে পালিয়েছে সেই ছেলেটা হয়তো রিমিকে বশীকরণ ইত্যাদি করে হয়তো ভাগিয়ে নিয়ে গেছে।কিন্তু,সাত দিন আগে সে যখন কোর্টে সবার মুখের ওপর বলল যে -আমার সাথে সে থাকতে পারবে না,আমি তার জীবনটা শেষ করে দিচ্ছিলাম মধ্যবিত্ততার মায়াজালে বেঁধে রেখে তখন বিশ্বাসটা করতে বাধ্য হয়েছিলাম যে,আমার সাথে কাটানো ছ’টা বছর হয়তো সে ভালো থাকার অভিনয় করে কাটাচ্ছিলো।

কোর্টের ফায়সালা হয়ে যাওয়ার পর আমি তাকে একটাই প্রশ্ন করেছিলাম -‘আমায় ভালোবেসেছিলি কেন সব জেনে শুনে?’ রিমি আমার মাথা নামিয়ে চলে গিয়েছিলো।আমায় এ প্রশ্নের উত্তর দেয়নি।সে চলে যাওয়ার আগে আর একবারের জন্য বলেনি- আমায় সে নিঃস্বার্থভাবেই ভালোবেসে ছিলো।কিন্তু,আমাদের ভালোবাসার এক মাত্র উপহার আমাদের মেয়েটাকে সে আমার কাছে দিয়ে গেছে।মেয়েটার দাবিও করেনি একবার।স্ত্রী হয়ে নয় আমায় অস্বীকার করতে পেরেছিলো।কিন্তু,একজন মা হয়ে কীভাবে এটা পারলো জানিনা।যাই হোক, এইটুকুর জন্য আমি তার কাছে সারাজীবন কৃতজ্ঞ থাকবো।

হাসির আড়ালে সত্যিই নিজের লোকটাকেও চিনতে
পারিনি আমি।

 

error: