রূপকথার রাজ্যের সেই রাজা-রানী, ব্যাঙ্গমা-ব্যাঙ্গমির গল্পকথা,পক্ষিরাজের ঘোড়া, দুয়োরানী- সুয়োরাণীর সেই যে কালজয়ী গল্প,তাসের দেশ, ক্ষীরের পুতুলসহ আরো কতো কিছু রয়েছে আমাদের ছেলেবেলাটা ঘিরে।আমাদের প্রত্যেকের ছেলেবেলাটা ঘিরেই হয়তো এইসব গল্পের অস্তিত্ব ছিলো। আর এইসব চরিত্রগুলোর পরিচয় কিন্তু বেশিরভাগই ছিলো আমাদের দিদিমা-ঠাকুমার হাত ধরে।তাদের কাছেই শোনা,তাদের থেকেই জানা।তাদের জন্যই তো এইসব চরিত্রগুলোর সাথে আমাদের সখ্যতা খুব সুন্দর ভাবে তৈরী হয়েছিলো।

আর ত্রিশিতার ক্ষেত্রেও তাই।ছোটবেলা থেকেই ঠাম্মিকে ঘিরে ওর জগতের অনেকটা অংশই কেটেছে।ঠাম্মির আদরে মানুষ। যাকে বলে একেবারে ঠাম্মি অন্ত প্রান।
আসলে ত্রিশিতার বাবা আর মা দুজনকেই চাকরির সুবাদে দিনের অনেকটা সময়ই বাড়ির বাইরেই থাকতে হতো।তাইতো ছোট্ট ত্রিশিতা ঠাম্মিকেই বেশি করে পেয়েছে ওর সারা দিনের আবদার গুলোর সাথী হিসেবে।দাদুকে ও বেশি একটা পায়নি।ও যখন অনেক ছোট তখন ওর দাদু মারা যায়।
ত্রিশিতা ওর বাবা মায়ের একমাত্র মেয়ে।মানে চারজনের ছোট পরিবার।তাই বাবা মা হোক বা ঠাম্মির আদর পুরোটাই ছিলো ওর দখলে।ছোটবেলার আদরে ভাগ বসানোর মতো কেউ ছিলো না কিনা।©দেবিকা..
সেই সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে ঠাম্মির হাত ধরে স্কুল যাওয়া, দুষ্টুমি করে মার কাছে বকা খেলে ঠাম্মির আঁচলের তলায় এসে লুকিয়ে যাওয়া, রাতে শুয়ে শুয়ে রূপকথার গল্প শোনা,স্কুল ছুটির দিনগুলোতে যখন একা একা বাড়ি থাকতো তখন ঠাম্মির সাথে লুকোচুরি খেলা,সেই ঠাম্মির চোখ এড়িয়ে আচার চুরি করে খাওয়া আর ধরা পরে গেলে ঠাম্মিকে সুন্দর করে ম্যানেজ করা।যদিওবা এই রাগ ম্যানেজ করাতে খুব একটা কাঠ খড় পোড়াতে হয় না নাতি-নাতনীদের। কেননা ঠাম্মা দিদারা এমনিতেই তাদের নাতি-নাতনীদের উপর খুব একটা রাগ করতে পারেন না।এই একটা জায়গাতেই তাদের সব দোষ মাফ হয়ে যায়।ত্রিশিতার ক্ষেত্রেও তাই-ই হতো।ত্রিশিতার আজও মনে পরে একটা ঘটনা। ওর তখন ক্লাস নাইন।ইউনিট টেস্টের রেসাল্ট খুব একটা ভালো হয়নি।রীতিমতো গার্জিয়ান কল হয়েছিলো। সে তো ভয়ে এই কথাটা কিছুতেই বাবা মায়ের কাছে বলতে পারছিলো না।বললে যে ওর আর রক্ষে নেই।তখন ঠাম্মি কি সুন্দর ম্যাজিসিয়ানের মতো ওর প্রবলেম সল্ভ করেছিলো। ঠাম্মিই ওর স্কুলে গিয়েছিলো। আর পরে ওর মাকে বুঝিয়েও বলেছিলো যাতে ওনার আদরের নাতনীকে না বকেন।অবশ্য এরজন্য ত্রিশিতাকেও প্রমিস করতে হয়েছিলো যাতে সে পরের এক্সামের জন্য ভালোভাবে পড়াশুনো করে।ত্রিশিতাও ওর ঠাম্মিকে বলেছিলো-
” একদম ঠাম্মি।পাক্কা প্রমিস।আমি পরের পরীক্ষা ভালো করে দেবোই।অনেক নাম্বার পাবো দেখো।তুমি যেভাবে ম্যাজিক করে আমার প্রবলেমটা সল্ভ করে দিলে।আর মামনির কাছে বকা খাওয়া থেকেও বাঁচিয়ে দিলে।অনেক অনেক থ্যাংকস তোমাকে।”©দেবিকা..

– ” আরে ধুর পাগলি। ঠাম্মিকে এতো থ্যাংকস বলতে নেই।বুঝলি তো।”( ত্রিশিতার ঠাম্মি অনুরাধা দেবী)

এভাবেই ঠাম্মির আদর,ভালোবাসার মধ্যেই ছোট থেকে বড়ো হলো ত্রিশিতা।তারপর একটা সময় পর ওকে বাড়ি থেকে বেড়োতে হলো।অনেকটা দূর যে যেতে হবে।এবার যে জগৎ চেনার পালা,চেনা-জানার বাইরে গিয়ে অচেনাকে নতুন করে জানার পালা।ক্লাস ১২ পাস করে চেনা-জানা স্কুলের গন্ডি আর চেনা শহরটা ছেড়ে নতুন পৃথিবীর সন্ধানে এগিয়ে যাওয়া।জীবনে একা চলার পথে প্রথম পদক্ষেপ।
পড়াশুনোর জন্য যে বাড়ির বাইরে যেতেই হবে।বেড়িয়ে আসতে হলো ঠাম্মির আদরমাখা ভালোবাসা, আর মায়ের স্নেহ ছেড়ে।
তারপর দিনগুলোও কাটলো নিজের নিয়মে।তবে ত্রিশিতার বাড়িতে না থাকায় সবথেকে যে একা হলো তিনি হলেন অনুরাধা দেবী। ত্রিশিতাকে ঘিরেই তো ওনার সমস্ত জগৎটা ছিলো। রান্না করতে খুব ভালোবাসতেন তিনি।তবে এখন আর ওসব খুব একটা ইচ্ছা করে না।আসলে উনি রান্না তো করতেনই সব ত্রিশিতার জন্য।এখন সেও নেই।খানিকটা হলেও উনি আজ একা।বাড়ির অন্দরমহলেই তো সারাজীবন থাকা।কেবলমাত্র ওই মেয়েটার জন্যই কয়েকটা বছর অন্যরকম কেটেছিলো।আর আজ সেও দূরে থাকায় খুব একা উনি।বাড়িতে তো এখন সম্পূর্ণ একা ।কেবলমাত্র ত্রিশিতা যখন ছুটিতে বাড়ি আসে তখন কয়েকদিন অনুরাধা দেবী হাসিখুশিতে থাকেন, উৎসাহে থাকেন।
তারপর আবার বিশাল বড় বাড়ির চার দেওয়ালের মধ্যে উনি একা।
ইতিমধ্যে দেখতে দেখতে ত্রিশিতার পড়াশুনো শেষ হয়।আজ ও হোটেল ম্যানেজমেন্ট কোর্স শেষ করে বাড়ি ফিরছে।হ্যাঁ হোটেল ম্যানেজমেন্ট। আসলে রান্নার প্রতি উৎসাহ ওর সেই ছোটবেলা থেকেই। ঠাম্মির কাছেই রান্নার হাতেখড়ি। ও তো ছোটবেলা থেকেই রান্নার সময় ঠাম্মিকে ফলো করতো।সেই কতো রান্না।এক ইলিশ মাছ দিয়েই কতো রেসিপি।ইলিশ ভাঁপা,সরষে ইলিশ,দই ইলিশ, ইলিশ পাতুরি আরো কতো কি।তারপর আবার কাতলা মাছের কালিয়া,দই কাতলা,পাকা পোনার ঝোল।বাবা রে কতো রকম ভ্যারাইটি। এসব নিয়ে ভাবনা চিন্তাই ওকে রান্নার প্রতি উৎসাহিত করেছলো।তাই রান্না নিয়েই পড়ার স্বপ্নটা দেখেছিলো।
আর আজ সেই এতোদিনের স্বপ্নটা পূরনের দিন।
ত্রিশিতা আজ খুব এক্সাইটেড। তবে এই এক্সাইটমেন্টের আরো একটা কারন আছে।ও মনে মনে একটা সিদ্ধান্ত নিয়েই এসেছে।শুধু এবার সেটাকে বাস্তবায়িত করার অপেক্ষায়।বাড়িতে গিয়ে শুধু কথাটাকে একবার সবার সামনে পেশ করতে হবে।©দেবিকা..
এদিকে ত্রিশিতার বাড়ি ফেরা নিয়ে মুখার্জি বাড়িতে তো এলাহি আয়োজন। মানে ত্রিশিতা যা যা খেতে পছন্দ করে সবকিছু ওর মা আর ঠাম্মি রান্না করেছে নিজেদের হাতে।আর অনুরাধা দেবীকে দেখে তো মনে হচ্ছে যে উনি একেবারে আকাশের চাঁদ হাতে পেতে চলেছেন।শুধু একটু সময়ের অপেক্ষা।

ত্রিশিতা বাড়ি ফেরার পর বেশ মজা আর আনন্দেই কাটলো সারাটা দিন।রাত্রিবেলা সবাই মিলে ডাইনিং রুমে বসে গল্পগুজব করছিলো। তখন ত্রিশিতা বলেই ফেললো তার সেই প্ল্যানের কথাটা।
– ” বাবা তোমাদের সাথে আমার একটা কথা আছে।আসলে বলতে পারো একটা বিষয়ে পারমিশন নেবার আছে।”
– ” হ্যাঁ রে মা।বল না কি বলবি।”
– ” আসলে বাবা আমি ঠিক করেছি যে এবার একটা নিজেদের রেস্টুরেন্ট খুলবো।যেটার প্রধান আকর্ষণই থাকবে ঘরোয়া বাঙালি রান্না।”
– ” হ্যাঁ সে তো খুব ভালো কথা।আমি আর তোর মা-ও তো এই রেস্টুরেন্টের বিষয়েই ভাবছিলাম। আর বাঙালি ঘরোয়া রান্নার প্ল্যানটাও কিন্তু দারুন।”

– ” বাবা আমার আরো একটা বিষয়ে বলার আছে।আমি চাই যে আমার রেস্টুরেন্টে ঠাম্মি আমাকে রান্নার কাজে হেল্প করুক।আসলে আমি যতোই রান্না শিখি না কেনো ঠাম্মির হাতের রান্না, ঠাম্মির রেসিপি গুলো অনেক অনেক ইউনিক।আর আমার রান্নার হাতেখড়িও তো ঠাম্মির হাত ধরেই।তাই ঠাম্মিও আমার সাথে আমার রেস্টুরেন্টে থাকবে।আমাদের আরো অনেক নতুন নতুন বাঙালি রান্না শেখাবে।
কি ঠাম্মি রাজি তো।” ( অনুরাধা দেবীর দিকে তাকিয়ে বললো ত্রিশিতা) ©দেবিকা..

– ” দিদিভাই আমি?? আমি পারবো নাকি ওতো লোকের রান্নার দেখভাল করতে? আমি তো শুধু বাড়ির জন্য রান্না করে এসেছি এতোদিন ধরে।সবার পছন্দ অপছন্দ আমি কি বুঝতে পারবো??”

– ” আরে তোমাকে সবার জন্য রান্না করতে হবে না। তুমি শুধু আমাদের ইনস্ট্রাকশন দেবে।আর আমরা সেই অনুযায়ী কাজ করবো।কি পারবে তো তোমার দিদিভাইয়ের সাথে হাতে হাত রেখে রেস্টুরেন্টের দায়িত্ব নিতে।”

– “হ্যাঁ রে দিদিভাই পারবো।”

– ” কিন্তু ত্রিশিতা মায়ের তো অনেক বয়স হয়েছে।মা কি পারবে? আর মা তো কখনো এভাবে বাইরের জগতের সাথে এটাচ ছিলো না।অন্দরমহলেই তো মায়ের সংসার।আর তাছাড়া মায়ের শরীরটাও আগের মতো ভালো নেই।অনেক চুপচাপও হয়ে গেছে আগের থেকে।মায়ের বরং ঘরে বসে রেস্ট নেওয়াটাই বেটার।”

– ” না বাবা।ঠাম্মি পারবে।আর এভাবে দিনের পর দিন কোন কাজ কোন উৎসাহ ছাড়া বাড়িতে বসে থাকলে ঠাম্মি আরো অসুস্থ হয়ে পরবে।আর চুপচাপ হয়ে যাওয়া।সে তো ঠাম্মি আমার জন্যই হয়েছে।আমি খুব ভালো করেই বুঝতে পারি।আমায় নিয়েই তো ঠাম্মির পুরো জগৎটা ছিলো। সেই আমিই যখন চলে গেলাম ঠাম্মিকে ফেলে তখন সে একা হয়ে যাবে এটাই তো স্বাভাবিক। আর একটা কাজের মধ্যে থাকলে একটা উৎসাহের মধ্যে থাকলে জীবনের প্রতিটা মুহূর্ত অনেক আনন্দের হয়।সেখানে আর একাকিত্বটা থাকে না।©দেবিকা..
আর রইলো অন্দরমহলের কথা।আরে যে মানুষটা সারা জীবন ধরে নিজের অন্দরমহলটাকে সাজিয়ে এসেছে সে বাইরের পৃথিবীর সাথে মানিয়ে নেবার সব ক্ষমতাই রাখে।অন্দরমহল আর বাহিরমহলকে এক সূতোয় সে বাঁধতে জানে।

” অন্দরমহলের সুরগুলো নিজের মতো থাক।
বাহিরমহলের সাথে অন্দরমহলের পরিচয়টা এবার তবে মিলে যাক।।”

সবার চোখে জল।বিশেষ করে অনুরাধা দেবীর। সত্যি তাদের ছোট্ট মেয়েটা কতো বড়ো হয়ে গেলো।
শুরু হলো ত্রিশিতার ওর ঠাম্মিকে নিয়ে নিজের স্বপ্নের পথে একধাপ এগিয়ে যাওয়া।

[ গল্পের শেষে আমার এটাই বলার যে আমাদেরও উঁচিত নিজেদের কথা ভাবার সাথে সাথে আমাদের ঠাম্মা দিদিমাদের কথাটাও ভাবা।সত্যি রোজের দিনে আমরা আমাদের নিজেদেরকে নিয়ে এতোটাই ব্যস্ত যে আমরা এই মানুষগুলোকেই সময় দিতে পারিনা।অথচ এনারাই আমাদের ছোটবেলার অন্যতম অবলম্বন ছিলেন।আর আমাদের এই অতিরিক্ত ব্যস্ততার জন্যই একাকিত্বে ভোগেন মানুষগুলো। আসুন না আমরাও ত্রিশিতার মতো একটু অন্যরকম ভাবে জীবনকে নিয়ে ভাবি।সব ভালোবাসার মানুষেরা একসাথে মিলে ভালো থাকি

আজ আবার শুরু হলো। এই সমাজসেবীদের জন্য মাথা খারাপ লাগে সুবিমলের। নির্বিবাদী সুবিমল কোনদিনই কোন কিছুর জন্য খুব একটা প্রতিবাদ করে না। তবে এবার মনে হয় এর একটা বিহিত হওয়া দরকার। মনে মনেই গজরাতে থাকে সে। রোজ রোজ সমাজ সেবার নামে তাদের ফল, মিষ্টি বিতরণ, মেডিসিন ক্যাম্প, এগুলোকে জাষ্ট নেওয়া যাচ্ছে না! এখন আবার পূজার আগে ঠাকুর দেখাতে নিয়ে যাওয়ার ধুম! আরে বাবা, বৃদ্ধাশ্রমে থাকা মানেই সে করুণার পাত্র নয়! রাগ কমাতে একটু ঘাড়ে,মাথায় জল দিয়ে, বারান্দার ইজিচেয়ারে বসে সুবিমল। সূর্য্য তখন অস্তে যাওয়ার মুখে।আরাম করে চোখ বন্ধ করতেই সুবিমলের চোখের সামনে পুরনোদিনগুলো ভেসে ওঠে। চার ভাই আর এক বোনের সবার বড় সুবিমল। বাবা মারা যাওয়ার পর ভাইদের মানুষ করা, বোনকে বিয়ে দেওয়া, সবকিছু দায় দায়িত্বের সিংহভাগই এসে পরে সুবিমলের উপর। এই সব করতে গিয়ে কেটে যায় জীবনের অনেকগুলো বসন্তই। তাও যখন বিয়ে করবে ঠিক করে সেই সময়ই ওর বোন ছন্দা বিধবা হয়ে ওদের বাড়ীতে এসে ওঠে। আদরের ছোট বোন একাকী জীবন কাটাবে, আর সে বউ নিয়ে সংসার করবে, এই ভাবনাটা তখন তাকে বেজায় পীড়া দিচ্ছিলো। ফলে, বিয়ে করে সংসারী হওয়ার ইচ্ছেটাই তখন চলে গিয়েছিলো সুবিমলের। তবে ছোটভাইদের বিয়ে দিয়ে সংসারী করেছেন। আর তিনি হয়ে উঠেছেন সংসারের সবার গার্জিয়ান। এতো সব কিছুর মধ্যেও তার প্রধান শখ ছিলো ট্রেকিং করা। নিজে খুব ভালো রোজগার করতেন। তাই শখপূরণে খুব একটা অসুবিধে হতোনা। ট্রেকিং করতে গিয়েই বন্ধুত্ত হয় অমলেন্দুর সাথে। হাসি খুশি, আলাপি অমলেন্দুর সাথে বন্ধুত্ত গাঢ় হতে খুব বেশীদিন লাগেনি সুবিমলের। অমলেন্দুরা নিঃসন্তান। অমলেন্দুর বউ শিবানীকেও ছোট বোনের চোখেই দেখতেন সুবিমল। হটাৎ করেই শিবানী সেলিব্রাল অ্যাটাকে মারা যায়। অমলেন্দু একা হয়ে পরে। সে সময় সুবিমল খুব করেছিলো অমলেন্দুর জন্য। তারপর অমলেন্দুই আর একা থাকতে না পেরে চলে আসে এই ‘অস্তরাগ’ বৃদ্ধাবাসে। সুবিমল তখন থেকেই এখানে আসতো। এর বছর তিনেক পর সুবিমলের বোন ছন্দাও মারা যায়। ছন্দার ছেলের সংসারে কিছুদিন,অন্য ভাইদের সংসারে কিছুদিন, থাকলেও কোথাও যেনো আর সেভাবে মন বসছিলো না সুবিমলের। তখন অমলেন্দুই জোর করে এখানে নিয়ে আসে। এখন এখানে নিজের সমবয়সী লোকেদের মধ্যে থেকে দিনগুলো বেশ কেটে যায় ওর। তবে আজও পরিবারের সবাই সুবিমলকে যথেষ্ট সন্মান করে।পালা, পার্বণে সুবিমল ভাইদের বাড়ীতেই কাটায়। সে বৃদ্ধাশ্রমে আছে বলে নিজেকে কখনো অবহেলিত বলে মনে হয়নি। কিন্তু এই উড়তি সমাজসেবীর দল তাদেরকে অবহেলিত না বানিয়েই ছাড়বেনা। এইসব ভাবনার মাঝেই সুবিমলের মনে পড়ে যায়, যে ওর বই আনতে লাইব্রেরীতে যেতে হবে। বৃদ্ধাশ্রমেই একটা লাইব্রেরী আছে। সুবিমল সেখান থেকে নিয়মিত বই এনে পড়ে।
লাইব্রেরীতে ঢুকেই সুবিমলের সাথে দেখা হয়ে গেলো রত্না বোসের সাথে। এই রত্না বোস এক কালে একটি নামকরা কলেজের প্রিন্সিপাল ছিলেন। নানা বিষয়ে ওনার অগাধ জ্ঞান। এখনও প্রায় সময়ই দেশে, বিদেশে অসংখ্য সেমিনারে অংশ গ্রহণ করেন। তবে স্বামী মারা যাওয়ার পর নিজের বাড়ীতে একা থাকাটা নিরাপদ মনে করেন নি বলেই এখানে চলে এসেছেন। ওনার ছেলেমেয়েরা বিদেশে থাকে। বছরে এক বার করে তিনি তাদের কাছে যান। অন্যান্য দিন দেখা হলে নানা ব্যাপারে কথা বলেন উনি সুবিমলের সাথে। কিন্তু আজ ওনার থমথমে মুখটা দেখে বেশ খারাপ লাগলো সুবিমলের। কি হয়েছে জিজ্ঞাসা করবে কি না যখন ভাবছে, তখনই বৃদ্ধাশ্রমের আর এক আবাসিক সমর গুহর সাথে দেখা। সমর গুহরও মুখে বিরক্তির ছাপ। তাও তিনি রত্না বোসকে বললেন,” খুব খারাপ ঘটনা দিদি। ” কৌতূহল চাপতে না পেরে কি হয়েছে সেটা জিজ্ঞাসা করেই ফেললো সুবিমল।প্রত্যুত্তরে রত্না বোস যা বললেন তার সারমর্ম হলো, গতকাল উনি একটা কনফারেন্স সেরে দিন সাতেক পর বৃদ্ধাশ্রমে ফেরেন। উনি ঢোকার সাথে সাথেই কয়েকটি ছেলেমেয়ে ওনাকে বৃদ্ধাশ্রমের ভেতরে যে মেডিকেল ক্যাম্প ওরা করেছিলো সেখানে নিয়ে যায়।রত্নাদেবী কদিন না থাকায় এই ক্যাম্পের বিন্দুবিষর্গও জানতেন না। উনি কিছু বোঝার আগেই ছেলেমেয়েগুলো তার হাতে কতগুলো ফলমিষ্টি তুলে দিয়ে ছবি তোলে, তারপর সেই ছবি সোশাল মিডিয়ায় পোষ্ট করে,লিখেছে, “ছেলেমেয়েরা বিদেশে থাকে। মায়ের কোনো খোঁজ নেয় না। মা অসুস্থ্য, বৃদ্ধাশ্রমে রয়েছে। আমরা স্বেচ্ছাসেবীরা ‘অস্তরাগে’ মেডিকেল ক্যাম্প করাতে ওনার চিকিৎসা হলো। অসুস্থ্য মানুষকে খাওয়ার ফলও আমরা দিলাম।” এই লেখার সাথে ওনার ছবি। রত্নাদেবী ছবিগুলো দেখিয়ে প্রায় কেঁদেই ফেললেন। তারপর বললেন, “জানেন এর জন্য আমার কতো সন্মান নষ্ট হলো! আমার ছেলেমেয়েরাও খুব কষ্ট পেয়েছে। ছেলে তো বারবার আমাকে ওর কাছে নিয়ে যেতে চেয়েছিলো। আমিই যাই না। তাছাড়া আমার মেয়েও ওর বাবা মারা যাওয়ার পর কলকাতায় ফিরে আসতে চেয়েছিলো। আমিই বারণ করেছি। মেয়ে আমার বিদেশে গবেষণা করছে। আমার জন্য ওর গবেষণার ক্ষতি হোক, তা আমি চাইনি। সত্যি বলতে কি আমি চেয়েছিলাম ওরা আমাকে নিয়ে যেনো অযথা চিন্তা না করে। আমি বাড়ীতে একা থাকলে ওরা দুঃশ্চিন্তা করতোই। তাই আমি এখানে চলে আসি। আর এখানে তো আমি ভালোই আছি। বাড়ীর জন্য মাঝে মাঝে খারাপ লাগে ঠিকই,তবে আপনাদের সবার মাঝে থেকে মন খারাপ করার সুযোগ কোথায় বলুন? আপনারা তো আপনজনের মতো আগলে রেখেছেন। আর আজ এই ঘটনায় আমার মান সন্মান আর রইলো না। আমার মেয়ে এবার সব ছেড়ে চলে আসবে। জানেন, ওর এই গবেষণাটা নিয়ে আমার কতো স্বপ্ন ছিলো! আমি পারিনি। আমার মেয়ে করছিলো। কিন্তু এই ঘটনার পর সবাই আমার ছেলেমেয়ের দিকে আঙ্গুল তুলছে। আমাকে ওরা বার বার বলছে, কেনো আমি আমার অসুস্থ্যতার কথা, তাদের জানাই নি? উফ্, কি যে অশান্তি!” একটানা কথাগুলো বলে হাঁফাতে থাকে রত্না বোস। সুবিমল একটা ছোট্ট দীর্ঘশ্বাস ফেলে লাইব্রেরীর বাইরে আসে। এই সময়ই সুবিমলের ভাগ্নে সৌরভ, তাকে ফোন করে। সুবিমল ফোনটা ধরলে সৌরভ বলে,”মামা, তুমি আমাদের কাছে চলে এসো প্লিজ।” সুবিমল হকচকিয়ে বলে,”কেনো? কি হলো?” সৌরভ বলে, “কিছু মনে করোনা মামা, তুমিই তো আমাকে বাবার অভাব কোনওদিন বুঝতে দাওনি। সেই আমিই তোমাকে মা মারা যাওয়ার পর বৃদ্ধাশ্রমে পাঠিয়ে দিলাম।আমাদের ক্ষমা করো মামা। সুবিমল এবার বলে, “আমি নিজেই এখানে এসেছি। তোমরা তো পাঠাওনি?? কি হয়েছে বলবে? ” ফোনের ওপার থেকে সৌরভ বলে,” মামা, তোমাদের ওখানে কে একজন ভদ্রমহিলা অসুস্থ্য,তার ছেলেমেয়েরা বিদেশে থাকে,দেখেনা।এইসব খবর পেলাম। তাই খুব চিন্তা হচ্ছে।” এবার সুবিমল বুঝলো, দুঃশ্চিন্তার উৎসটা। রাগে মাথা দপ্ দপ্ করতে লাগলো সুবিমলের।

প্রতিদিনই রাতের খাবার সময় আবাসিকরা ডাইনিংরুমে আড্ডা জমায়। সারাদিন কে, কি করলো সেই সব গল্পই হয়। আজ সেই আড্ডাটায় অন্যদিনের মতো খুশির ছোঁয়া নেই, বরং সবার রাগই প্রকাশ পেলো। বেশীর ভাগই স্বাধীন ভাবে জীবনের প্রান্তবেলাটা কাটাবে বলে এখানে এসেছে। মাস গেলে অনেকগুলো টাকা বৃদ্ধাশ্রমকে দেয়। এই বৃদ্ধাশ্রমে বেশীরভাগ অর্থবান মানুষরাই থাকে। তাই ফ্রি মেডিকেল চেকআপ, ফল বিতরন, এগুলো তাদের প্রয়োজন নেই। অথচ কিছু মানুষের অদ্ভূত মানসিকতার জন্য অকারণেই দয়ার পাত্র তারা হচ্ছেন। যেটা তাদের আত্মসন্মানে যথেষ্ট আঘাত করছে। বৃদ্ধাশ্রমের কর্তৃপক্ষের সাথেও এ বিষয়ে কথা হয়েছে। তারা জানিয়েছে, সেদিন যারা মেডিকেল ক্যম্প, ফল বিতরণ করেছিলো, তারা এলাকার প্রভাবশালী রাজনৈতিক দল। সামনে ভোট, তাই এদের সমাজসেবার ধুম পড়েছে। এদের কথা অমান্য করার সাহস কর্তৃপক্ষের হয়নি। না করতে দিলে হয় তো রাত বিরেতে এসে ঝামেলা করতো। তখন এই বৃদ্ধ মানুষগুলোকে নিয়ে তারা কি করতো? তবে ওই ঘটনার জন্য রত্নাদেবীর কাছে তারা ক্ষমা চেয়ে নিয়ে ঘটনাটার ধামাচাপা দিলো।
আজ পূজার সপ্তমী। বৃদ্ধাশ্রমে আজ সাজ সাজ রব। কারণ বৃদ্ধাশ্রমের সকল আবাসিকরা আজ ঠাকুর দেখতে যাবে। অমলেন্দু তার এক পরিচিত ট্রাভেল এযেন্টের কাছ থেকে দুটো বড়ো ভলভো বাস ভাড়া করেছে। একটিতে তারা উঠেছে। অপরটি ফাঁকা। রত্নাদেবীর এক ছাত্রী একটি নাম করা নিউজ চ্যানেলের সিনিয়র জার্নালিষ্ট।রত্নাদেবী তাকে আজ ডেকেছেন ওদের আজকের কর্মকান্ড কভার করার জন্য। একে একে বৃদ্ধাশ্রমের প্রায় সব আবাসিকরা একটি বাসে উঠলো। বাস চলতে শুরু করলো। তার পিছনের ফাঁকা বাসটিও আগের বাসকে অনুসরণ করলো। বাস এসে দাঁড়ালো ওদের বৃদ্ধাবাসে ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প করা, স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার নেতার পূজা প্রাঙ্গনে। সেখানে তখন হরেক রকম পোষাক পরে সেচ্ছাসেবী সংস্থার সদস্যরা আড্ডা দিচ্ছিলো। অমলেন্দুরা ওখানে গিয়ে ওদের বললো বাসে এসে বসতে। ওরা প্রথমে না করেও পরে অমলেন্দুদের অনুরোধে বাসে গিয়ে বসলো। তখন রত্না দেবী উঠে সবার হাতে একটা করে খাবারের প্যাকেট দিয়ে মাইক হাতে বলতে থাকেন,”আমাদের সমাজে বেকার সমস্যা একটা বড় সমস্যা। কিন্তু বেকারদেরও ইচ্ছে করে আরামদায়ক গাড়ীতে চড়ে ঠাকুর দেখতে, ভালো খাবার খেতে। তাই তো আমরা সবাই মিলে চাঁদা তুলে আজ আমাদের পাড়ার বেকার যুবক যুবতি যারা সমাজের চোখে অবহেলিত, তাদের নিয়ে ঠাকুর দেখতে চলেছি। খাবারও খাওয়াচ্ছি।” বাসের মধ্যের সব কিছুই ওই সাংবাদিক মহিলাটি ছবি তুলছিলেন। রত্নাদেবীর কথা শুনে বাসের ছেলেমেয়েরা খুব রেগে যায়। একজন তো চিৎকার করে বললো, “কে বললো আমরা বেকার? আর যদি বেকার হয়েও থাকি তাতে আপনার কি অসুবিধে? আপনারা আমাদের একটা করে খাবারের প্যাকেট দিয়ে এই ভাবে অপমান করতে পারেন না! জানেন আমরা কতো রকম সেবার কাজ করি! ” এবার অমলেন্দু মুখ খুললো, “জানি তোমরা সমাজ সেবা করো। তাই তোমাদের কাছে একটা প্রশ্ন ছিলো, সমাজসেবার আগে কোনোদিন কি জিজ্ঞাসা করেছো যাকে সেবা দিচ্ছ, তার সত্যি সত্যি সেবা লাগবে কি না?? সে সত্যি অবহেলিত কিনা? এই যে তোমরা সেদিন আমাদের বৃদ্ধাবাসে মেডিকেল ক্যাম্প করে, আমাদেরকে অবহেলিত করে দিলে তাতে আমাদের কেমন লেগেছে তার খোঁজ নিয়েছো? বৃদ্ধ মানেই সে অবহেলার পাত্র, এ কথা তোমাদের কে বললো?? ” ছেলেমেয়েরা মুখ নীচু করে বসে রইলো। তখন সুবিমলই বললো, “তোমারা আমাদের মতো বুড়োদের জন্য ভেবেছো, তার জন্য মেডিকেল ক্যাম্প,ফল মিষ্টি দিয়েছো, তাও ঠিক আছে, মেনে নিলাম। কিন্তু তোমরা যে সমাজ সেবা করলে, সেটাকে এতো ছবি তুলে লোক জানানোর দরকার কি ছিলো বলো? একটি মেয়ে মৃদু স্বরে বলে,” ছবি না তুললে তো আমরা যে সমাজসেবা করি সেটা লোকে জানতেই পারবে না।” বৃদ্ধা ডলি দেবী বললেন,” লোকে না জানুক মা।ভগবান তো জানতো। ভালো কাজ করে প্রচার করলে তার কোন মাহাত্ম্য থাকে না।” তারপর বৃদ্ধ বৃদ্ধারা সেদিনের ঘটনার ফলে তাদের কতোটা অসন্মানের মুখে পড়তে হয়েছে সেটা বলেন। এও বলেন বৃদ্ধাশ্রম নিয়ে প্রচলিত ধারণা ভাঙ্গার সময় এসেছে। এখনো মানুষ অতটা খারাপ হয়নি যে, তারা তাদের গুরুজনদের বৃদ্ধাশ্রমে ফেলে দিয়ে দায়িত্ব সারবে। তাই অকারণে বৃদ্ধাশ্রমটাকে সমাজসেবার জায়গা না বানানোই ভালো। তারপর বলেন, ভালো কাজ করলে মানুষ জানবেই। অকারণে তার প্রচার করতে গিয়ে অন্যকে বিপদে না ফেলাই ভালো। সব শুনে বাসের ছেলেমেয়ের দল নিজেদের ভুলটা বুঝতে পারে। তখন তারা বলে আজকের ঘটনা যদি নিউজে দেখায় তো তাদেরও সন্মানহানি হবে। রত্নাদেবী সবাইকে অভয় দিয়ে বলেন, এই সব ছবি সবই ডিটিট করে দেওয়া হবে। তোমরা যে বুঝতে পেরেছো এতেই আমরা খুশি। সেই শুনে বাসের ছেলেমেয়েরা বাস থেকে নামতে যায়। তখন অমলেন্দু বাধা দিয়ে বলে, ” আরে যা হয়েছে ভুলে যাও। আজ উৎসবের দিন। তোমাদের জন্যই বাস ভাড়া করলাম। আর তোমরাই চলে যাবে?? তোমরাও আমাদের সাথে চলো। আমরা নেমে অন্য বাসটায় আছি। আজ আর প্রবীন আর নবীনে কোন বিরোধ নেই। এক সাথে আমরা ঠাকুর দেখবো।” তখন একটি মেয়ে এসে রত্নাদেবীর হাত ধরে বলে, ” আমাকে ক্ষমা করে দিন। ওই দিন, ছবিটা আমিই তুলে সোশ্যাল সাইটে দিয়েছিলাম। কিছু না বুঝেই আপনার অপমান করেছি।” রত্নাদেবী সন্মতি সূচক ঘাড় নাড়িয়ে বললেন, “দিলাম ক্ষমা করে।” তারপর সবার সাথে বাস থেকে নেমে অপর বাসটায় বসলেন। দুটো বাস পর পর প্রবীন ও নবীনদের নিয়ে শরৎ এর কাশফুল ভরা মাঠের পাশ দিয়ে, শিউলির গন্ধ মেখে উৎসবে সামিল হওয়ার জন্য রওনা হলো।

বছর দশেক আগে সোমার বিয়ে হয়েছিল সুশান্তর সাথে।বড়লোক বাবার একমাত্র মেয়ে সোমা,কলেজের মেধাবী ছাত্র সুদর্শন সুশান্তকে প্রথম দেখাতেই ভালোবেসে ফেলেছিল।তারপর প্রেম আর পড়া শেষের পর দু’জনে সাবলম্বী হলে শুভ পরিণয় সম্পন্ন হয়েছিল।সোমার বাবা পরিমল বাবু স্নেহ করতেন সুশান্তকে তাই তিনি মেনে নিয়েছিলেন।

সুশান্ত এক অজ পাড়াগাঁয়ের ছেলে। লেখাপড়ার জন্য শহরে এসেছিল সে। ছেলেবেলাতেই মাকে হারিয়েছিল সুশান্ত। বাবা সুবিনয় ‌বাবু কোলে পিঠে করে মানুষ করেন তাকে।মায়ের অভাব বুঝতে না দেওয়ায় চেষ্টা করে গেছেন সবসময়।প্রতিবেশীরা বহুবার বলেছে আবার বিয়ে করো সুবিনয় কিন্তু তিনি রাজি হননি। বলেছেন ছেলেকে আমি ঠিক লেখাপড়া শিখিয়ে একাই মানুষ করতে পারবো। সারাদিন নিজের জমিতে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে সুবিনয় বাবু ছেলেকে লেখাপড়া শিখিয়েছেন।শহরে পাঠিয়েছেন লেখাপড়া শেখানোর জন্য।ছেলে জীবনে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে তাই তিনি একজন গর্বিত বাবা।মাঝে মাঝে বলেন-“নিজে লেখাপড়া শিখিনি তো কি হয়েছে?আমার ছেলেটাকে তো লেখাপড়া শিখিয়ে মানুষ করতে পেরেছি।”
তারপর ছেলে যখন জানালো সে সোমাকে বিয়ে করতে চায় সুবিনয় বাবু বাধা দেননি।

সুশান্ত বিয়ে করে গ্ৰামেই সোমাকে এনেছিল কয়েকদিনের জন্য।কিন্তু সোমার আচার ব্যবহারে বোঝা গিয়েছিল সে এখানে থাকতে চায় না।সুবিনয় বাবু অনেক চেষ্টা করেছেন বৌমাকে একটু আরামে ভালো রাখার,কিন্তু মানিয়ে নিতে পারেনি সোমা।তাই সুবিনয় বাবু নিজেই ছেলেকে বলেছেন-“বৌমা তো এরকম পরিবেশে অভ্যস্ত নয়,তুই তোর ফ্ল্যাটে বৌমাকে নিয়ে চলে যা।”
সুশান্ত প্রতিবাদ করে বলেছে-“কেনো বাবা আমি এখানে জন্মেছি,তুমি আছো,এটা ওর শ্বশুরবাড়ি একটু তো মানিয়ে নিতে হবে ওকে।”
সুবিনয় বাবু ছেলেকে বলেছেন-“আস্তে আস্তে অভ্যস্ত হয়ে যাবে ঠিক।মেয়েটার মুখ দেখে বোঝা যায় ও খুশি নেই।আমি তো বাবা তাই বুঝি তুই আর দেরি করিস না।”

বাবার কথাতে সুশান্ত সোমাকে নিয়ে চলে আসে নিজের ফ্ল্যাটে‌।তারপর শুরু হয় সাংসারিক জীবন।দু বছর পর ছেলে রাজ আসে কোল জুড়ে। সুশান্ত মাঝে মাঝে গ্ৰামের বাড়িতে আসে।সোমা আসতে চায় না শহরের আধুনিক জীবনযাপন ছেড়ে। সুশান্ত বাবাকে বলে-“চলো বাবা এবার শহরে,আমরা একসাথে থাকবো।”
সুবিনয় বাবু বলেন-“ভিটেমাটি ছেড়ে কোথাও যেতে ইচ্ছে করে না বাবা।তুই বরং বৌমা আর দাদুভাইকে নিয়ে মাঝে মাঝে ঘুরে যাস।”
রাজ বড় হয়েছে সে প্রায়ই বায়না করে গ্ৰামে দাদুর কাছে যাওয়ার।সুশান্ত ছেলেকে নিয়ে বাবার কাছে যায়।নাতিকে পেয়ে সুবিনয় বাবু আনন্দে আত্মহারা হয়ে যান।বলেন-“দাদুভাই পুরো যেনো আমার ছোটবেলার সুশান্ত।”
অনেক আদর করেন ঘুরে ঘুরে গ্ৰাম দেখান।কখনো দিগন্তচুম্বী আকাশ,শাপলা দিঘির কালো জল কখনো মাঠ ভরা ধানের ক্ষেত। ষনাতির প্রশ্নের জবাব দিতে দিতে মাঝে মাঝে হিমশিম খান বৃদ্ধ সুবিনয় বাবু।

সোমা শহরে বেশ আছে বন্ধুবান্ধব,পার্টি, ক্লাব নিয়ে।সে গ্ৰামে যেতে চায় না। সুশান্ত বহুবার বলেছে কিন্তু সে বলেছে-“তুমি যাচ্ছ যাও আমাকে জোর করোনা।”
রাজের বয়স এখন আট।সে সেদিন ছুটির দিন বাবার সাথে গ্ৰামে দাদুর কাছে যাওয়ার জন্য তৈরি হল।সকাল সকাল বেরোলে গ্ৰামের মনোরম দৃশ্য দেখা যায় তাই বেরিয়ে পড়লো সে বাবার সাথে।কিন্তু গ্ৰামে গিয়ে দেখলো তার দাদু খুব অসুস্থ। সুশান্ত বললো-“বাবা তুমি এতো অসুস্থ একবার খবর পর্যন্ত দাওনি?”
সুবিনয় বাবু বললেন-“তোরা ব্যস্ত থাকিস তাই আর জানায়নি।এতোটা বাড়াবাড়ি হবে ভাবিনি বাবা।”
সুশান্ত বললো-“এ তোমার ভারি অন্যায় কাজ বাবা।গাড়িতে ওঠো ডাক্তার দেখিয়ে সোজা শহরে যাবে আমাদের সাথে ওখানেই থাকবে।তোমার একমাত্র ছেলে আমি।তোমার দেখাশোনার দায়িত্ব তো আমার।সেবা করার সুযোগ দেবে না আমায়?”
রাজ হাততালি দিয়ে বলে উঠেছে-“কি মজা দাদু এবার আমাদের সাথে থাকবে।” সুবিনয় বাবু আর ছেলে নাতির সাথে পেরে ওঠেননি।গ্ৰামের বাড়িতে তালা লাগিয়ে বেরিয়ে পড়েছেন নাতির হাত ধরে।

ডাক্তার দেখিয়ে বাড়িতে নিয়ে গেল সুশান্ত। ডাক্তার বলেছেন কদিন পুরোপুরি বিশ্রাম নিতে।সোমা বাড়ি ফিরে তো অবাক।।তাও বললো-“ভালো করেছেন এসেছেন দুদিন থেকেই যান শহরে।”
সুশান্ত বললো-“দুদিন নয় সোমা।বাবা এখন থেকে আমাদের সাথেই থাকবেন।”
সোমা তো আকাশ থেকে পড়লো।সেই দিন থেকেই শুরু হল অশান্তি।প্রায় দিন ঝামেলা লাগে স্বামী স্ত্রীর।সোমা বলে-“এই গেঁয়ো লোকের সাথে এক বাড়িতে থাকা আমার সম্ভব নয়।তুমি ওনাকে বৃদ্ধাশ্রমে রাখার ব্যবস্থা করো।”
সুশান্ত অবাক হয়ে বলে-“উনি আমার বাবা,তোমার স্বামীর বাবা।ছেলেবেলা থেকে কতো কষ্ট করে আমাকে মানুষ করেছেন,কখনো কোনো দুঃখ কষ্ট পেতে দেননি আর আজ তুমি তাকে বৃদ্ধাশ্রমে রাখতে বলছো?নিজের বাবা হলে এরকম বলতে পারতে?”
ঝাঁঝিয়ে ওঠে সোমা।-“কার সাথে কার তুলনা করছো?তুমি আমার উচ্চশিক্ষিত বাবার সাথে তোমার অশিক্ষিত গেঁয়ো বাবার তুলনা করছো?আমি রাজকে নিয়ে বাবার কাছে চলে যাবো।”
সব শুনতে পেলেন সুবিনয় বাবু মনে বড় ব্যাথা পেলেন।ছেলেকে বললেন-“বৌমা তো ঠিকই বলেছে আমাকে কোনো বৃদ্ধাশ্রমেই রেখে আয় বাবা।”
সুশান্ত বললো-“তা হয় না বাবা আমার বাড়িতে সবার আগে তোমার জায়গা।তুমি এখানেই থাকবে কেউ থাকতে না চাইলে আমি বাধা দেবো না।”

রাগে অপমানে ফেটে পড়লো সোমা। বললো-“ওই লোকটার জন্য তুমি তোমার ছেলে স্ত্রীকে ছাড়তে চাইছো।আমাদের প্রতি তোমার কোনো দায়িত্ব নেই?”
সুশান্ত বললো-“হ্যাঁ অবশ্যই আছে দায়িত্ব।আমার বাবার প্রতিও আমার দায়িত্ব আছে তাই জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত আমি বাবাকে আমার কাছে রাখতে চাই।অনেক কষ্ট করেছে সারা জীবন মানুষটা।আমি চাই একসাথে থাকতে, কিন্তু তুমি চাও না।তুমি যেতে চাইলে যাও।যদি কোনোদিন তুমি নিজের ভুল বুঝতে পেরে ফিরে আসো তোমার জন্য এ সংসারের দরজা চিরকাল খোলা থাকবে।রাজ এদিকে কাঁদতে শুরু করেছে।-“মাম্মাম দাদুর কাছে আমি থাকবো না?একসাথে থাকবো না?” সেদিনই ছেলে রাজের হাত ধরে বাড়ি ছাড়লো সোমা।

বারোটা বছর কেটে গেছে রাজ বড় হয়েছে কলেজ পড়ুয়া সে।সোমার বাবা মাও মারা গেছেন কয়েক বছর আগে।সুবিনয় বাবু খুব অসুস্থ বিছানায় শুয়ে দিন কাটে তার‌।এই বারোটা বছরে প্রতিটা দিন তিনি নাতি আর বৌমার জন্য কষ্ট পেয়েছেন।ছেলেকে বলেছেন ফিরিয়ে নিয়ে আয় ওদের,আমার জন্য তোর সংসার নষ্ট হলো।সুশান্ত বাবার সেবা করে‌ যায়‌।বাড়িতে আয়া,কাজের লোক সব রেখেছে সে বাবার দেখাশোনা করার জন্য।সুবিনয় বাবু না চাইতে সব পান শুধু শান্তিটা ছাড়া।এখন অবশ্য মন ভালো হয়ে যায় মাঝেমাঝে কলেজ থেকে রাজ চলে আসে বাড়িতে এসে দাদু বাবার সাথে সময় কাটায়।কখনো কখনো বাবার সাথে রান্না করতে লেগে যায় একসাথে খেয়ে বাড়ি ফেরে।সুশান্ত ভেবে শান্তি পান যে ছেলে তার মানুষ হয়েছে।বৃদ্ধ দাদুর কষ্ট দেখে বড় দুঃখ হয় রাজের।মনে মনে ঠিক করে যে করেই হোক মাকে আবার এ বাড়িতে ফিরিয়ে আনতে হবে।তাহলেই সবাই খুশি থাকবে।

একদিন রাতে রাজ বাবার হাতে খেয়ে বাড়ি ফিরে দেখলো,মা খাবার নিয়ে তার জন্য বসে আছে‌।জিজ্ঞেস করলো-“বাবু খাবার দিই?”রাজ বললো-_না মা তুমি খেয়ে নাও আমি খেয়ে এসেছি নন্দিতার বাড়ি থেকে।নন্দিতা রাজের প্রিয় ‌বান্ধবী।রাজ নন্দিতার কাছে সব বলে সাহায্য চেয়েছিল,নন্দিতা রাজি হয়ে গেছিল। নন্দিতার বাবা শহরের নামী ধনী ব্যক্তিদের মধ্যে একজন,এটা সোমা জানতো।দিনের পর দিন নন্দিতার এ বাড়িতে আসা বাড়তে লাগলো আর রাজের ও বাড়িতে যাওয়া। বাবা মায়ের মৃত্যুর পর সোমা একা হয়ে পড়েছিল।আজকাল বৃদ্ধাশ্রমের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় গাড়ির কাচ টা নামিয়ে রাখে সে।দেখে কতো বাবা,মা সন্তানের আসার পথ চেয়ে বড়ো গেট টার দিকে চেয়ে আছে‌।বারো বছর আগের কথা মনে পড়ে যায়।নিজের ভুল সে বুঝতে পারে আজ। কিন্তু সুশান্তর তো একবারের জন্য ও মনে পড়েনি তাকে,দিব্যি আছে বাবাকে নিয়ে।অভিমানে দুচোখ জলে ভরে আসে তার।

কিছুদিন পর রাজ জানিয়ে দেয় সে নন্দিতাকে ভালোবাসে।একমাত্র ছেলের কথা মেনে নেয় সে।একদিন নন্দিতা আসে বাড়িতে।বলে-“আন্টি জানেন বাবা বলেছেন বিয়ের পর রাজ আমাদের সাথেই থাকবে।আমাকে ছেড়ে বাবা মা থাকতেই পারবেন না।”
রাজ বললো-“তাহলে কি মা একা এ বাড়িতে থাকবে?”
নন্দিতা বললো-“তা কেনো?এতো বৃদ্ধাশ্রম গুলো আছে কিসের জন্য?”
অবাক হয়ে সোমা দেখলো তার একমাত্র আশা,ভরসা,সম্বল রাজ সম্মতি দিয়ে বললো-“ঠিক বলেছো তুমি।মায়ের আপত্তি থাকবে না জানি।বারো বছর আগে মা এমনটাই শিখিয়েছিল আমায়,যে বৃদ্ধ বাবা মায়ের আশ্রয় বৃদ্ধাশ্রম।আর তোমাদের স্টেটাস এর কাছে মা বড় বেমানান।তাই না?”

একটা অদৃশ্য চড় যেনো সপাটে লাগলো সোমার গালে।সেদিন সারাটা রাত কেঁদেছে সোমা।রাজ সব জেনেও মাকে আটকায়নি।নিজের ভুল বুঝতে পেরে অসহায় হয়ে পড়েছে‌ সোমা।রাজ দেখলো সকালে মা স্যুটকেস হাতে তৈরি বললো-” তোকে আমি মানুষ করতে পারিনি বাবা।তোর বাবা হলেন প্রকৃত মানুষ।আমি নিজের ভুলটা আজ নিজের জীবন দিয়ে শিখলাম।বারো বছরের সব রাগ অভিমান ভুলে বোঝাবুঝি কাটিয়ে আমি চললাম সেই মানুষটার কাছে,আশ্রয় চাইতে।তোর ব্যবহার টা আমার পাওনা ছিল বাবা,কারণ ওটা আমারই শেখানো।”

বারো বছর পর নিজের বাড়িতে ফিরে সোমা সোজা ঝাঁপিয়ে পড়লো স্বামীর বুকে।পায়ে হাত দিয়ে ক্ষমা চাইলো সুবিনয় বাবুর কাছে।সুবিনয় বাবু সোমার মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন-“এই দিনটা দেখার জন্য আমি আজও বেঁচে আছি মা।তোর সংসার তোর হাতে তুলে দিয়ে আমি শান্তিতে মরতে পারবো।”
সুশান্তর হাত ধরে সোমা বলছে-“একবারও কি মনে পড়েনি আমার কথা?”
সুশান্ত হেসে বলেছে‌-“প্রতিটা দিন প্রতিটা মূহুর্তে মনে করেছি তোমায়।প্রার্থনা করেছি তুমি ফিরে এসো।”
সোমা কাঁদতে কাঁদতে বললো-“আমার রাজ আর আমাকে চায় না।আমি নিজের ভুলে ছেলেকে হারালাম।সুশান্ত বললঝ কিচ্ছু হারাওনি তুমি যা তোমার সব তোমারই আছে।”

হঠাৎ সেখানে রাজ হাজির।হাসতে হাসতে বললো-“রোম্যান্টিক সিনটা শেষ হলে একটু আমি ভিতরে যেতাম।”
সোমা বললো-“কেনো তুই তো নন্দিনীর বাড়ি থাকবি এখানে কেনো?”
“আমি আমার ঘরে যাবো মা।কিছু জিনিষ কিনেছি তো ঘর সাজাবো।
“মানে?”-সোমা অবাক‌।
“মানে আর কিছুই না মা।এ বাড়িতে আমি প্রায়ই আসি‌‌।আমার ঘরও আছে এখানে। নন্দিতা আমার প্রেমিকা নয় আমার ভালো বান্ধবী।তবে ও আমাকে খুব সাহায্য করেছে।সেই জন্যই আজ আমরা আবার একসাথে থাকবো।ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে সোমা ছেলের মুখের দিকে।রাজ হেসে বললো-“সন্তানদেরও দায়িত্ব বাবা মা ভুল করলে সেটা শুধরে দেওয়ার। আমি সেটাই করেছি।ভয় পেয়েছিলে খুব তাই না মা?কাল সারা রাত যে আমিও ঘুমাইনি মা‌।”
ছেলেকে বুকে জড়িয়ে নিল সোমা।
রাজ বললো-“আজ তোমাদের তেইশ তম বিবাহবার্ষিকীতে আমার সব বন্ধুরা আসছে নন্দিতাও আসছে।আমাকে সব আয়োজন করতে হবে আমি ঘরে যাই আর তোমরা তোমাদের মান অভিমান মেটাও।”

সমাপ্ত

কি-লো ছেলে হয়েছে নাকি মেয়ে হয়েছে?
ঘোষ বাড়িতে আজ বৃহন্নলা এসেছে যাকে আমরা খাস বাংলায় বলি হিজড়া! ঘোষ বাবুর মেয়ে হয়েছে তাই এমনিতেই তার মন খারাপ, তার ওপর এরা এসে গাদা খানেক টাকার দাবী করছে ।
_আমরা কিছু জানতে চাইনা ১০,০০০ টাকা দিতেই হবে। তোর তো কিছু কম নেই!
বৃহন্নলার দল থেকে বললো একজন।
_মেয়ে হয়েছে আবার এতো টাকা কিসের? যা যা , যত্তসব হিজড়ার দল! আমি কি সরকারি ব্যাংক খুলে বসেছি যে তোদের শুধু দিয়ে যাবো ! আর তোদের এতো লোভ কেনো রে , বড়ো বাড়ি দেখেছিস কি মোটা টাকা আবদার করে বসলি!
ঘোষ বাবু খেঁকিয়ে উঠে তাদের উপর।
_এই বাবু, আমরা হিজড়া হতে পারি কিন্তু আমরাও মানুষ! আমাদের ও মান সম্মান বোধ আছে রে!
_এতোই যখন মান সম্মান বোধ তখন লোকের বাড়ি বাড়ি গিয়ে হাত পাতিস কেনো শুনি! কাজ করে খেতে পারিস না!
_কাজ হাহাহা
ঘোষ বাবুর কথা শুনে বৃহন্নালা দলের সবাই একসাথে হেসে উঠলো।
_কে আমাদের কাজ দেবে শুনি! দিবি তুই আমাদের কাজ?বল দিবি!
তাদের কথা শুনে ঘোষ বাবু চুপ করে থাকে তারপর কিছুক্ষন পর বলে,
_দেখ তোদের সাথে আমার তর্ক করার সময় নেই ! আর ছেলে হলে যা চাইতিস তাই পেতিস কিন্তু হয়েছে তো মেয়ে …….
ঘোষ বাবুর পুরো কথা শেষ হওয়ার আগেই বৃহন্নলা দলের হেড রুমি বলে,
_বাবু রে, মেয়ে ঘরের লক্ষ্মী তোরা এটা কবে বুঝবি! মেয়েরাই তো সৃষ্টি কর্তা । মায়ের রূপ , দেবীর প্রতীক! আর আমরা হলাম দুটোর সংমিশ্রণ ! আমাদের এতোটাও অপমান করিস না রে বুকে যে বড্ডো যন্তনা হয় ! আমরাও তো মানুষ বল?
_ছার তো , চল চলে যাই! যে নিজের মেয়ের মূল্যই বোঝে না সে বুঝবে আমাদের! সমাজ আমাদের সারা জীবন হিজড়াই ভেবে আসবে!
তাদের দলের মধ্যে থেকেই আরেকজন বলে উঠে কথাটা!
ঘোষ বাবু চুপ করে থাকে।ঘরের মধ্যে থেকে ঘোষ বাড়ির গিন্নি মেয়েকে কোলে নিয়ে চোখের জল ফেলছে। অবশ্য মেয়েটা জন্মানোর পর থেকেই নানান অপমানে জর্জরিত হয়েছে সে, আর নিশব্ধে আজকের মতোই চোখের জল ফেলে চলেছে।

বৃহন্নলারা ঘোষ বাড়ির গিন্নির চোখের দিকে তাকিয়ে বলে,
_কাঁদিস না রে মা! তোর মেয়ে কে আমরা এমনি আশির্বাদ করলাম কোনো টাকা পয়সা লাগবে না! শুধু মেয়েটাকে মানুষের মতো মানুষ করিস!

কথাটা বলেই একজন তার গলার রূপার চেনটা বাচ্চা মেয়েটার গলায় পরিয়ে দিয়ে প্রাণ ভরে আশির্বাদ করে, ঘোষ বাড়ি ছেড়ে চলে যায় । ঘোষ বাবু আর একটা কথাও বলতে পারলো না । যাদের সে লোভী মনে করতো আজ তারাই তার চোখের আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিলো কাউকে কিছু দিতে টাকা নয়, একটা বড়ো মন লাগে !

___সমাপ্ত__

“ও মা , মা । ও মা । দেখো কী সুন্দর একটা গাছ হয়েছে ? দেখো কী সুন্দর ফুল‌ও ফুটছে ! মা , এটা কি গাছ গো ? বলোনা মা । ” — বছর ছয়েকের টোটোর কথায় মা অমৃতা দেখতে পেল একটা ছোট্ট গাছ ফ্ল্যাট বাড়ির সামনে এক চিলতে মাটিতে উঠে দাঁড়াতে চেষ্টা করছে ।

–“এমা । এখানে আবার গাছ উঠছে ! ওগুলো ফুল নয় টোটো । ওগুলো নতুন পাতা বেরচ্ছে । কিন্তু গেটের পাশে এভাবে গাছ হলে তা তো ঝামেলার একশেষ হবে ! তাছাড়া অন্য কেউ এটা মেনেও নেবে না ! “

—“তাহলে কি হবে মা ? কি করবে গাছটাকে ? কেটে ফেলবে মা ? কেটে ফেলবে ? না মা । না । দেখো কী ভীষণ ছোট্ট ছোট্ট ডাল পালা ! আমার মতোন‌ই না মা ! ও মা ওকে বাঁচাও মা । ওমা , তুমি একটা কিছু করো যাতে ওরা কেউ না কাটে ওকে । প্লিজ মা । প্লিজ । ” — আধো আধো স্বরে টোটো বললো ।

—“ওমা , এটা কি গাছ হয়েছে গো ? “

অমৃতা ভালো করে দেখে বুঝতে পারলো এটা একটা আম গাছ । এখনো বিশেষ একটা বড়ো হয়নি বলে আর সবার নজর পড়ে নি । তবে এভাবে আর কতো দিন লুকিয়ে রাখা যাবে সকলের নজর থেকে ! কিছু একটা করতেই হবে । ন‌ইলে যে টোটো দারুণ কষ্ট পাবে ! গাছটার সাথে ছেলেটা স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে রোজ‌ই কথা বলে । তাহলে কি একবার ম‍্যানেজমেন্টের সাথে কথা বলবে !

“দেখুন অমৃতা দেবী , এটা কি একটা গাছ হ‌ওয়ার জায়গা বলে মনে হচ্ছে আপনার ? এখানে একটা গাছ হলে কতো রকম সমস‍্যা তৈরি হবে কোনো আইডিয়া আছে আপনার ? তাছাড়া কিছু দিন বাদে বাদেই ডাল পালা কাটতে হবে — সেসব দায়িত্ব কে নেবে ?এই ফ্ল্যাটে আপনার বাচ্চা ছাড়া আর একটিও বাচ্চা নেই । আপনার বাচ্চার মুখের দিকে তাকিয়ে আমি এখনও কোনো স্টেপ নিইনি । কিন্তু এবারে তো … ” —মিস্টার গাঙ্গুলী বললেন ।

—-“আমি নেবো সেসব দায়িত্ব । আপনাদের ওসব নিয়ে একদম ভাবতে হবে না । ওখানে যেটুকু জায়গা আছে তাতে করে গাছটা কোনো রকমে দাঁড়িয়ে থাকতে পারবে । কিন্তু প্লিজ গাছটা কাটবেন না । আসলে আমার ছোট ছেলেটার অ্যাক্সিডেন্টে মারা যাওয়ার পর থেকে টোটো মরে যাওয়াকে খুউব ভয় পায় । ও আমগাছটাকেই ওর ভাই ভেবে কথা বলে সকাল বিকেল । প্লিজ কাটবেন না । তাহলে ছেলেটা আবার ট্রমায় চলে যাবে । বিশ্বাস করুন , এই গাছটার জন্য ও ওর ভাইটাকে ভুলতে পারছে একটু একটু করে । ওকে ভুলতে দিন । ওকে ভুলতে দিন প্লিজ । আমার এক ছেলেকে হারিয়েছি । কিন্তু টোটোকে থাকতে দিন আমার বুকে ! “

নাহ্ সে যাত্রায় কাটা পড়েনি আম গাছটা । তারপর সময়ের সাথে সাথে টোটোর সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকলো সে । কয়েক বছর পর থেকে মিষ্টি মিষ্টি আমে ভরে যেতে থাকলো গাছটা । সব ফ্ল্যাটের বাসিন্দারা এক হয়ে আম পাড়ে ছুটির দিনে । আম গাছটা যেন সবাইকে আবার এক সুতোয় বেঁধে রাখছিল ।

টোটোর সামনেই জয়েন্ট এন্ট্রান্স এক্সাম । খুব পড়ার চাপ । তারমধ্যে খবরে দেখাচ্ছে বীভৎস ঝড় আসছে কলকাতায় । দুশো কিলোমিটারের কাছাকাছি থাকবে এই ঝড়ের দাপট । ঝড়ের নাম আমফান । অমৃতা আর মৈনাক অর্থাৎ টোটোর বাবা দুজনেই আজ অফিস ছুটি করেছে । ইনফ‍্যাক্ট গোটা রাজ‍্যেই ঝড়ের ভয়াবহতা আঁচ করে ছুটি দেওয়া হয়েছে ।

সত্যিই মারাত্মক ঝড় । এই এতো ঝড় টোটো তার জ্ঞান হ‌ওয়া থেকে দেখেনি । পাশের একটা ফ্ল্যাট ভেঙে পড়লো হুড়মুড় করে । অনেক বাড়ির অনেক ক্ষতি হলো । কারেন্টের পোস্ট পড়ে গোটা কলকাতা অন্ধকারে ডুবে গেল । এতো অন্ধকার কলকাতার লোক সম্ভবত বহু বছর বাদে দেখলো । আর ঝড়ের যে এমন আওয়াজ হয় কলকাতাবাসী সাক্ষী থাকলো সেই ভয়ংকর শব্দের । ভীষণ ঝড়েই রাত কাটলো । সকালের সূর্য ওঠার আগেই ঝড় থেমে গেছে ।
সবাই ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এলো পরিস্থিতি দেখতে । টোটো বেরিয়ে আসতেই দেখলো আমগাছটা পড়ে আছে রাস্তায় । সারারাত ঝড়ের সাথে লড়াই করেছে সে । অন্য বেশিরভাগ ফ্ল্যাটের-ই প্রচুর ক্ষতি হয়েছে । কিন্তু টোটোদের ফ্ল্যাটে আমগাছটা থাকার কারণে এক ফোঁটাও ক্ষতি হতে পারেনি ।

সেদিনের সেই ছোট্ট ভাই আমগাছটা কবে যেন মা হয়ে গেছিল টোটোর । তাই টোটোদের বাড়িটাকে মায়ের মতো বুক দিয়ে আগলে রেখেছিল সে । টোটো আমগাছের পাশে দাঁড়িয়ে পাতায়, ডালে হাত বুলাতে বুলাতে বলতে লাগলো , — ” ভালো থাকিস ভাই । ভালো থাকিস । –বলেই আমগাছের একটা ডাল কেটে তার গোড়ায় মাটি লাগিয়ে চারাগাছ বানালো । লাগিয়ে দিলো তাকে আগের জায়গাতেই ।

আমগাছের জায়গায় এখনও টোটোর নিজের হাতে লাগানো গাছটা রয়েছে । টোটো এখন বিদেশে । কিন্তু বাড়িটাকে এখনো নতুন আমগাছটা মায়ের স্নেহে রক্ষা করে যাচ্ছে ।

error: