(১)

অফিস থেকে বাড়ি ফিরেই সোফায় গা এলিয়ে দিল মিঠি।সারা দিনের কাজের প্রেশারে বড্ড ক্লান্ত সে।৮-৫ টার ডিউটি, সারাদিনের কাজের চাপ তো আছেই।তার উপর আবার কর্পোরেট সেক্টরের চাকরি।এনার্জির আর বাকি কিছুই অবশিষ্ট থাকে না।অবশ্য চাকরি টা যেমন-তেমন নয়।বেশ নামকরা একটা কোম্পানি শহরের।একবছর হতে চলল মিঠি চাকরিটা পেয়েছে।মিঠির বাবা-মা তো ভীষণ খুশী।মিঠির বাবা অবিনাশ বাবু তো এখন পরিচিত মহলে বেশ খানিকটা সেলিব্রিটি। পরিচিত অভিভাবক মহলে তো সে এখন প্রায়ই উপদেশ দিতে থাকেন।অবশ্য এক্ষেত্রে তার বিশেষ কোন কিছু করার ই থাকে না।কারন বাকি সবাই এমনিই তার কাছে শুনতে চলে আসে যে মিঠি এতো কম বয়সে কি করে এতো ভালো একটা চাকরি পেয়ে গেলো।যেখানে এখন একটা ভালো চাকরি একেবারে আকাশ ছোঁয়া। আর তাই তিনিও গুছিয়ে, বেশ ভেবে চিন্তে উত্তর দিয়ে থাকেন।এভাবে তাকে কেন্দ্র করে ‘ ভালো চাকরি পাওয়া আর সহজে নিজেকে প্রোফেশনাল দিক থেকে সেটেল করার উপায় ‘ এর মহড়াটা চলতেই থাকে।এতে অবিনাশ বাবুও ভীষণ খুশী। আর অন্যদিকে মিঠির মা সোমা দেবী, উনি তো মেয়ের গর্বে একেবারে গরবিনী। উনি তো আবার মেয়ের নামে এক ঘটি জল বেশি খান।পাড়ায় মিঠির যত কাকিমা-জ্যাঠিমা আছে এমনকি নিজের যত বন্ধু, চেনা -পরিচিত আছে সবার কাছে উনি মিঠির প্রশংসায় পঞ্চমুখ।
কিন্তু একবছর হতে চলল মিঠি নিজেকে কিছুতেই ঠিকভাবে মানিয়ে নিতে পারে না এই চাকরিটার সাথে। হ্যাঁ এটা ঠিক ওর ভবিষ্যৎ এখন অনেক সুরক্ষিত। কিন্তু ও তো এমন ভবিষ্যৎ চায়নি কখনো। ডাইরির পাতা গুলো আর মনের ভাবনা গুলো ওকে ভীষণ টানে যে।মনে হয় ওদের সাথে চিটিং করা হচ্ছে যেন।এই চাকরিটা যেন ও মন থেকে করতে পারে না,ভালোবাসতে পারে না কিছুতেই নিজের মত করে।একদিন তো এইসব কথা বাবা-মা র সামনে তুলেছিল, কিন্তু লাভের লাভ কিছুই হয়নি।তাদের স্পষ্ট উত্তর –
” দেখ মা।তুই কি পাগল হলি।এরকম একটা চাকরি পাওয়ার জন্য কত ছেলে-মেয়ে অপেক্ষা করে বসে থাকে।আর সেখানে তুই এভাবে হাতের লক্ষীকে পায়ে ঠেলছিস?”
মিঠির আর কিছুই বলার থাকে না।ছোটবেলা থেকেই ও খুব শান্ত আর বাধ্য স্বভাবের।বাবা-মায়ের মুখের উপর কথা সে কোনদিন -ই বলেনি।যদি বলতেই পারতো তাহলে তো আজ বাংলা নিয়ে পড়ে এখন কোন স্কুলে পড়াতো।নিজের ডাইরির পাতাগুলোতে,পাতায় সাজানো অক্ষর গুলোতে আরো প্রান প্রতিষ্ঠা করতে পারতো।কিন্তু সেটা স্বপ্নই থেকে গেল, বাস্তবের রূপ পেলনা আর।অবশ্য স্বপ্নকে তো সেও ছুঁতে পেরেছে।এতো বড় কর্পোরেট সেক্টরের চাকরি পেয়েছে।অনেকের কাছে তো এটাই অন্যতম স্বপ্ন। কিন্তু ওর কাছে নয়।মিঠির মনে হয় দিনগুলো কেমন যেন গতানুগতিক, যন্ত্রের মত।যেখানে মনের কথার কোন দাম-ই নেই।মাথার কথা গুলোই সব।কিন্তু মিঠি তো মনের কথাতেই বেশি বিশ্বাসী।তার উপর আবার রয়েছে রোজকার জীবনের বাসে-ট্রামের ভিড় আর ঝগড়াঝাটি।এতোকিছুতে বড্ড হাঁফিয়ে উঠেছে ও।আর মনের কথাগুলো শোনার মতো কেউ নেই ওর কাছে।সবাই সবার নিজের মতো কথা,নিজের চিন্তা নিয়েই ব্যস্ত।তাই ওই ডাইরিটাই একমাত্র ভরসা।আর এতো কিছুর ভিড়েও মিঠি বড্ড একা।সত্যিই বড্ড একা।এমনকি অভির কাছেও যদি ওর চাকরি নিয়ে অস্বস্তির কথা কিছু বলে অভি যেন শুনেও শোনেনা।ওর কথাবার্তা তেই মনে হয় কেমন যেন এভোয়েড করছে।
এই যেমন সেদিন অভির জন্মদিনে মিঠি খুব সুন্দর করে একটা কেক বানিয়ে নিয়ে গিয়েছিল অভির জন্য।আর খুব যত্ন করে,নিজের সব মনের ভাবনা গুলোকে একত্রিত করে,খুব গুছিয়ে একটা কবিতা লিখেছিল অভির জন্য।।অভিকে গিফ্ট করবে বলে।কিন্তু মিঠির সব আনন্দ গুলো মুছে গিয়েছিল অভির একটা কথা তে।অভি সেদিন হঠাৎ করে মিঠির সব ভাবনাগুলোকে এলোমেলো করে বলে উঠলো –
” মিঠি আমি কিন্তু তোমার কাছে আরো কিছু এক্সেপ্ট করেছিলাম।বলতে পারো সামথিং স্পেশাল। হ্যাঁ মানছি যে কবিতাটা তুমি ভালোই লেখো।কিন্তু তাই বলে এসব করে নিজের টাইম ওয়েস্ট করো না।এতো ভাইটাল,ইম্পর্ট্যান্ট একটা পোস্ট এ তুমি রয়েছো।এসব ছেলেমানুষি কি তোমায় মানায় মিঠি??মিঠি বি ইওরসেল্ফ।।।আর রইলো গিফ্ট এর কথা।।দেখো এখানে কতো প্রেস,মিডিয়া রয়েছে।সবাই তো জানতে চাইবে যে অভি সেনগুপ্তের উড বি তাকে কি গিফ্ট করলো।মিঠি মিত্র।যে কিনা এতো স্পেশাল একজন মানুষ। এইসব কবিতা টবিতা, এতো বাচ্চা বাচ্চা গিফ্ট কি মানায়? তুমি বুঝতে পারছো তো মিঠি পাবলিক এটাকে কিভাবে নেবে। প্লিজ মিঠি।আই থিঙ্ক তুমি বুঝতে পারছো যে আমি কি বলতে চাইছি।যাই হোক এনজয় দ্যা ডে।আমি একটু আসছি।”
না সেদিন আর মিঠি বেশি কিছু বলতে পারেনি সেদিন।শুধু চোখ থেকে কয়েক ফোঁটা জল গড়িয়ে পরেছিল সবার অলক্ষে।যার খেয়াল কেউ করেনি।
(২)

অভি হল মিঠির বাবা অবিনাশ বাবুর বন্ধুর ছেলে।খুব বড় একজন ইন্ডাস্ট্রিয়ালিস্ট সে।বলতে গেলে মিঠির বাবা-মা ই অনেক খুঁজে তাদের মেয়ের জন্য যোগ্য জীবনসঙ্গী খুঁজে বের করেছেন।যদিও এটা তাদের নিজস্ব পছন্দ। তাই একপ্রকার মিঠিও মানিয়ে নিয়েছিল অভির সাথে নিজেকে।৬ মাস বাদেই ওদের বিয়ে।কিন্তু আজকাল মিঠির মনে হয় সে কি সত্যি সত্যিই পারবে অভির সাথে ওর সারাটা জীবন একই সূতোয় বাঁধতে।যে মানুষ টা মিঠির নিজস্ব চাওয়া পাওয়া কে কোন মূল্যই দেয় না।মিঠির জন্য যার কাছে কোন টাইম ই নেই, যার সব সময় শুধু লাভ-ক্ষতির হিসেব নিকেশে বাঁধা।তার সাথে কি সত্যিই থাকা সম্ভব। ব্যাস এটুকুই। আর এগিয়ে ভাবতে পারেনা মিঠি।ওর বাবা-মা এই বিয়ে টা কে নিয়ে কত উৎসাহিত। এসব দেখেই ভাবনা গুলো সব শেষ হয়ে যায়।

(৩)

এসবের মধ্যেই চলে এলো মিঠির জন্মদিন। তার বাবা-মা, অভি সবাই মিলে একটা বড় পার্টি রেখেছে জন্মদিন টা কে নিয়ে।সকাল থেকেই সোমাদেবী ভীষণ ব্যস্ত ঘর -বাড়ি গোছাতে।অবিনাশ বাবুও শেষে মুহূর্তের প্রস্তুতি নিচ্ছে পার্টি টা যাতে ভালোভাবে হয়।আর অভি তো আছেই তদারকি করার জন্য।ঠিক কি ভাবে সাজালে এটা মিডিয়ার কাছেও পপুলার হয়।সকাল থেকে অনেক উইশ এসে জমা হয়েছে মিঠির সোশ্যাল মিডিয়ার বাক্সে উড়ো চিঠি হয়ে।এইসব ই দেখছিল মিঠি বিছানার এক কোনে বোসে।হঠাৎ করেই ওর ঘরে একটা দমকা হাওয়ার মতো ছোট্ট তুলির আগমন ঘটলো।
৪ বছরের ছোট্ট তুলি। মিঠির মাসতুতো দিদির মেয়ে।মিঠির খুব বড় ভক্ত সে।ওর জন্মদিন উপলক্ষেই তুলিরা এসেছে ওদের বাড়িতে। আর তুলি সে তো এসেই মিঠির কাছে চলে এসেছে। মিঠি ওকে দেখে তো ভীষণ খুশী। তুলি এসে বলল ও নাকি মিঠির জন্য একটা স্পেশাল গিফ্ট এনেছে।বাবা-মার গিফ্ট টা নাকি ওর পছন্দ নয়।তাই ও নিজে থেকেই মিঠি মাসিমনিকে উপহার দেবে।
” তা তুলি সোনা তুমি আমায় কি গিফ্ট দেবে? আমি তো খুব এক্সাইটেড এই ছোট্ট বন্ধুটার হাত থেকে উপহার পাওয়ার জন্য।”(মিঠি)
” এখানে নয় মাসিমনি।বাইরে যে ওই পুকুর টা আছে ওটার কাছে চলো।আসলে আমি তোমাকে গিফ্টটা ঠিক দেবো না।দেখাবো।” (তুলি)
-দেখাবে? কি দেখাবে? ঠিক আছে চলো। যাওয়া যাক।
– হ্যাঁ হ্যাঁ চলো।
তুলি মিঠিকে নিয়ে গিয়ে পুকুরের সামনে দাঁড় করিয়ে দিলো।আর জলের দিকে তাকিয়ে বলল
“ওই দেখো মাসিমনি।জলছবি।জানো তো আমি ড্রয়িং ক্লাস এ ভর্তি হয়েছি কিছুদিন আগে।তখন আন্টি আমাকে প্রথমেই জলছবি দেখিয়েছিলো।আর বলেছিল যে যেকোন ছবি শেখার আগে জলছবি টা শিখতে হয়।কি মজার না জলছবি টা।বলোনা মাসিমনি।ও মাসিমনি।তোমার পছন্দ হয়েছে তো গিফ্টটা?” (তুলি)
তুলি একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে জলের দিকে।চোখ টা যেন থমকে যায়।সত্যি এভাবে কতদিন নিজেকে দেখা হয়নি।আজকে অনেকদিন পর তুলির দেওয়া উপহারের উৎসাহেই নিজেকে দেখলো।আর তুলির কথাগুলো কানে বাজতে লাগলো।সত্যিই তো জীবনে যেকোন ছবি আঁকার আগেই এই জলছবিকে চিনতে শিখতে হয়।সত্যিই তো তাই।নিজেকে বোঝার, নিজেকে চেনার দায়িত্ব তো নিজের ই হয়।নিজেকে যদি নিজেই না চিনলাম, আমার কথাগুলো যদি আমিই না বুঝলাম তাহলে কিসের আমি?কেন আমি?না অনেক হয়েছে।এবার আমার হয়ে আমাকেই কথা বলতে হবে।নিজের স্বপ্নগুলোকে কোনঠাসা হতে দিলে চলবে না।আমাকে নিজের হয়ে কথা বলতেই হবে।।
– না তুলি তোমার এই গিফ্টটা আমার খুব পছন্দ হয়েছে। বলতে পারো জীবনের অন্যতম সেরা উপহার।থ্যাংক ইউ মাই বেবি।এবার চলো ভিতরে।সবাই আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে সোনা।(মিঠি)
– হ্যাঁ মাসিমনি চলো।(তুলি)

(৪)
তুলি আর মিঠি পার্টিতে এসে পরে।এতোক্ষণে অনুষ্ঠান শুরু হয়ে গেছে।আজ আবার মিঠি আর অভির এনগেজমেন্ট এর ডেট ঘোষণা করা হবে।মিঠিকে দেখেই সোমাদেবী বলে ওঠেন-
” কি রে কোথায় ছিলি? তোর জন্যই তো অপেক্ষায় ছিলাম।আয় গিয়ে কেকটা কাট আর তারপর অভির পাশে গিয়ে দাঁড়া।”
এই বলে সোমাদেবী চলে যাচ্ছিলেন।হঠাৎ করে থমকে দাঁড়ালেন মিঠির উত্তর শুনে।আর তার সাথে গোটা আবহাওয়া টাই বদলে গেল ওর কথা শুনে।।
” মা তোমাদের একটা কথা বলার আছে।আজ আমার জন্মদিন। তাই কেকটা আমি কাটবো।কিন্তু তার পরের কাজ টা হবে না।তোমরা আমাকে একটু সময় দাও মা।এক্ষুনি আমার পক্ষে এই বিয়েটা নিয়ে ভাবা সম্ভব হচ্ছে না।” (মিঠি)
– ” মিঠি!!!! এসব তুই কি বলছিস?”
– ” ঠিক ই বলছি মা।আর আমি তো খুব বেশি কিছু চাইনি মা।শুধু একটু সময় ছাড়া।আমি একটু ভাবতে চাই মা।নিজেকে নিয়ে। আমার স্বপ্নগুলোকে নিয়ে। আমার ডাইরির পাতা গুলোকে নিয়ে, আমার জমে থাকা লেখা গুলোকে নিয়ে।ওদেরকে এভাবে দিনের পর দিন ধূলো জমে নষ্ট হতে দেবোনা মা।তাহলে আমার নিজের প্রতি অন্যায় করা হবে।আর বাবা,তুমিই তো ছোটবেলায় শিখিয়েছিলে কোন রকম অন্যায়ের সাথে জীবনে আপোষ না করতে।তাহলে নিজের সাথে আপোষ করি কি করে বলো।খুব বড় ভুল করা হবে এটা করলে।আর অভি যদি তুমি আমার কথায় কষ্ট পেয়ে থাকো তাহলে রিয়েলি সরি।প্লিজ কিছু মনে করো না।দেখো এতো হিসেব করে জীবন চলে না।জীবনে ছোট ছোট চাওয়া পাওয়া গুলো না থাকলে জীবনের কোন মানেই হয়না।এই ছোট ছোট হাসি গুলো নিয়েই তো জীবন। তাই আমার মনে হয় যে আমাদের দুজনেরই একটু স্পেস দরকার।ভাবা দরকার আমাদের সম্পর্ক টাকে নিয়ে।আর তুমিই আমাকে একদিন বলেছিলে ‘ বি ইওরসেল্ফ ‘। সত্যিই এবার আমি নিজেকে নিয়ে ভাবতে চাই। আর আমার মনে হয় যে তোমারো একটু ভেবে দেখা দরকার। “
(৫)

এই ঘটনার পরে কেটে গেছে ২ টো মাস।হ্যাঁ মিঠি আজ সত্যি নিজেকে নিয়ে বাঁচতে শিখেছে।কর্পোরেট সেক্টরের চাকরিটার সাথে সাথে নিজের কবিতা, আর লেখাগুলোকেও আঁকড়ে ধরেছে।আজ সে সত্যি সত্যিই প্রতিষ্ঠিত একটি মেয়ে। পারিপার্শ্বিক দিক থেকেও আর নিজের মনের দিক থেকেও। কিছুদিন হল ওর লেখা একটা বই প্রকাশিত হয়েছে।আর মিঠির লেখার খ্যাতিও ছড়িয়ে গেছে।আর সেই বইটির নাম “জলছবি “….. স্পেশাল ক্রেডিট দেওয়া হয়েছে তুলিকে।
আজ সন্ধ্যাবেলা মিঠির বাড়িতে আবার উৎসব। যার প্রধান কারন ই হল মিঠির লেখা প্রথম বই প্রকাশনের জন্য সেলিব্রেশন।হঠাৎ তুলির মা নন্দা মিঠিকে বলল-
” হ্যাঁ রে মিঠি।সবই তো বুঝলাম। কিন্তু তুই হঠাৎ আমার তুলিকে কেন বইটা ডেডিকেট করলি এটা তো বুঝলাম না”
” তুলিই তো আমাকে জলছবির মানেটা বুঝিয়েছিল।কি রে তুলি তাই না??” ( মিঠি)
বলতে বলতেই মিঠির চোখটা আটকে গেল দরজার দিকে।দেখলো অভি ঢুকছে একটা ফুলের বোকে নিয়ে।ওর দিকেই এগিয়ে আসছে ছেলেটা।এ অভিকে যেন মিঠি আগে কখনো দেখেনি।কত শান্ত পরশ রয়েছে মুখটা তে।
– “অভিনন্দন মিঠি।কেমন আছো বলবো না কারন আমি জানি আমার মিঠি ওর নিজের সাথে ভালোই আছে। শুধু একটা কথাই বলব।গিফ্ট হিসেবে স্পেশাল কিছু চেয়েছিলাম। আজ কিন্তু চেয়েই নেবো আমার উপহার টা।আর সেটা হল তোমার থেকে কিছুটা সময় আমার জন্য।আর তোমার মনের ভাবনা গুলো। দেবে তো মিঠি??”
– মিঠি শুধু চুপচাপ অভির দিকে চেয়ে থাকে।আর অভির হাতটা শক্ত করে ধরে নেয়।অনেক সময় যে নিরবতাই অনেক কিছু, অনেক না বলা কথা বুঝিয়ে দেয়।
(এইতো আমাদের জীবন। আমাদের সকলেরই দরকার মিঠির মতো নিজেকে নিজের করে বোঝার।তাহলেই তো স্বার্থকতা জীবনের। স্বার্থকতা নিজের গহন মনের আড়ালে থাকা স্বপ্নগুলোর।।)
@দেবিকা..©

©®Copyright Protected..
[9:42 AM, 8/20/2020] Moumita Dutta(Client): ( দ্বিতীয় পর্ব)


(৫)

সৃষ্টি আর দীপ্ত দুজন ছিল প্রতিবেশী। ঠিক প্রতিবেশী বললে ভুল হবে।ওদের দুই পরিবারের মধ্যে ছিল খুব বন্ধুত্বের সম্পর্ক। তবে বন্ধুত্বের থেকে আত্মীয়তা-টাই বেশি ছিল।দীপ্ত সৃষ্টির থেকে বছর চারেক বড়।ছোটবেলা থেকেই ওদের মধ্যে বন্ধুত্বের সম্পর্কটা বেশ ছিল। একসাথে খেলা,একসাথে দুষ্টমি করে মায়েদের কাছে কানমলা খাওয়া, একসাথে সাইকেল চালাতে শেখা,ঘুরতে যাওয়া, মেলায় ঘোরা।এরকম আরো অনেক মিষ্টি মধুর স্মৃতি রয়েছে ওদের দুজনের ছেলেবেলাকে ঘিরে।যার কথা ভাবলে আজও দুজনের মুখে অজান্তেই এক চিলতে হাসির রেখা ফুটে ওঠে। সেই হাসি যেন ভোরের প্রথম সূর্যের আলোর মতো নির্মল।@দেবিকা..©
ছোটবেলা আর আগেরকার কথা ভাবতে ভাবতে দীপ্ত আর সৃষ্টি দুজনেরই চোখে ঘুমের রেশ নেমে এলো।

(৬)
(পরের দিন সকালে)
সৃষ্টি এমনিতেই খুব তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে ওঠে। কিন্তু গতকাল এমনিতেই সন্ধ্যে থেকে খুব ধকল গেছে আর তারপর আবার হঠাৎ করে আচমকাই দীপ্তর সাথে দেখা আর সেই নিয়েই অনেক গোলমেলে চিন্তা ভাবনা এসে জড়ো হয়েছিল মনে।তাই নিয়েই একটু হিসেব-নিকেশ করতে গিয়েই রাতে ঘুমটা অনেক দেরিতেই চোখে এসে নেমেছিল।তাই স্বাভাবিক ভাবেই ঘুম থেকে উঠতে আজ একটু দেরিই হয়েছিল।যদিওবা এই দেরিটা সৃষ্টির কাছে একটু হলেও ওর মায়ের কাছে এটা মোটেও একটু নয়।তাই তো আজ ঘুম ভাঙলো মায়ের ধমক খেয়ে।
ধুর কাচা ঘুমটা ভেঙে গেলো।চোখ আওড়াতে আওড়াতে ডাইনিং রুমের দিকে যেতে গিয়েই চোখ আটকে গেলো সৃষ্টির। এ আমি কাকে দেখছি।এই মূর্তিমান সাতসকালে এখানে? মানে আমাদের ডাইনিং রুমে।রুমে তো নয় একেবারে ডাইনিং টেবিলে বসে মায়ের হাতের স্পেশাল লুচি-তরকারি খেয়ে যাচ্ছে।আর মাকেই দেখো না।কি যত্ন করে তাকে বসিয়ে বসিয়ে খাওয়াচ্ছে।এতো একেবারে এলাহি যত্ন।মনে হচ্ছে যেন জামাই আদর করছে।সৃষ্টি এবার রুমে ঢুকেই প্রশ্ন করে উঠল-@দেবিকা..©
” এ কী তুমি এখানে? মানে এতো সকালে তো তাই বলছিলাম আর কি”
– কেন আসতে নেই বুঝি? (খেতে খেতেই জবাব দিলো দীপ্ত)
– এ বাবা না না সেটা কখন বললাম।আসলে এভাবে বলা নেই কওয়া নেই এভাবে আসলে তাই আর কি
– আরে কাকিমার কাছে আসতে আবার পারমিশন নেওয়ার কি আছে রে?? আমি ঠিক বললাম তো কাকিমা? ( সৃষ্টির মা রীনা দেবীকে সাক্ষী টেনে বলল দীপ্ত)
– হ্যাঁ রে দীপ্ত। এতে ঠিক ভুলের কি আছে রে তুই যখন খুশি আমার কাছে আসবি।আর সৃষ্টি তোকেও বলি দেখছিস ছেলেটা এতদিন বাদে এসেছে।কোথায় একটু ওর সাথে ভালো করে গল্প করবি কথা বলবি তা না উল্টো পালটা বকে যাচ্ছিস আর ওকে খেতেও দিচ্ছিস না ঠিক করে।একে তো এতো বেলায় উঠলি ঘুম থেকে তার উপর এসব।তুই কিন্তু এবার খুব বকা খাবি আমার কাছে। এই আমি বলে রাখলাম।(রীনা দেবী)
সৃষ্টি তো পুরো অবাক।কিভাবে বেমালুম বকা খেয়ে গেলো।আর দীপ্তকে দেখো। ওকে বকা খেতে দেখে মিচকি মিচকি হেসে যাচ্ছে।কি অদ্ভুত ছেলে।@দেবিকা..©
ছোটবেলাতেও ঠিক এমন করতো।আর তখন মনি সৃষ্টির হয়ে কথা বলতো।( মনি মানে দীপ্তর মা)। কিন্তু এখন তো মনি এখানে নেই।তাই পুরো বকাটাই সৃষ্টির একা খেতে হল।এইসবই ভাবছিলো সৃষ্টি। হঠাৎ করেই সৃষ্টি বললো-
” মা আমাকে খেতে দিয়ে দাও।আমাকে লাইব্রেরিতে যেতে হবে।বইগুলো ফেরত দিতে।”
– এই সৃষ্টি তাহলে একটু ওয়েট করে যা।আমিও যাবো তোর সাথে।এমনিতেও আমার ওইদিকে কাজ আছে।ভালোই হবে।কাজটাও হবে,তোর সাথে গল্পটাও হবে আবার ঘোরাটাও হবে।একবারে অনেক কাজ হয়ে যাবে।এটা কিছুতেই মিস করা যাবে না।(দীপ্ত)
– হ্যাঁ হ্যাঁ দীপ্ত তুই যা ওর সাথে।
ব্যাস।দীপ্ত পারমিশনটা পেয়েই গেলো।সৃষ্টি আর কিছুই বলতে পারলো না।যার থেকে পালানোর জন্য লাইব্রেরি যাওয়ার প্ল্যান টা কষলো সেই এখন যাবে ওর সাথে।এখন আর কি করার।এবাবে পালানোর চেষ্টা তো করেই যাচ্ছি বিগত ছয় বছর ধরে।কাউকে বুঝতেও দিইনি। ঠিক দিইনি না তাকে তো বুঝতে দিতে চাইনি।যাই হোক  তখন সময়টা তো অন্য ছিল।তাই পালিয়ে বেড়াতাম।আর এখন সময় অনেক আলাদা।আর পালিয়ে বেড়াবার কিই বা দরকার।সে বুঝলে তো এইসব কথা!! আগে তো সবই বুঝতো।কিছু বলার আগেই বুঝে যেতো।আমার কাছে তো দীপ্ত দা-ই ছিল একজন মাইন্ড রিডার।যে আমার মনের সব কথাই পড়ে নিতো আমি কিছু না বলার আগেই।কিন্তু ওই যে বললাম তখন তো ছিল সময়টা অন্য।আর এখন আরো অন্যরকম।@দেবিকা..©
– কী রে। এখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কি ভাবছিস?  যাবি না? চল।এরপর দেড়ি হলে বলিস না কিন্তু যে আমার জন্য দেড়ি হয়েছে।তুই যা ঝগরুটে মেয়ে।।(সৃষ্টির ভাবনার ছেদ ঘটিয়ে বলে উঠলো দীপ্ত)
-কি বললে????
– এ মা ভুল কিছু বললাম নাকি? ছোটবেলায় কি রকম আমার পায়ে পা লাগিয়ে ঝগড়া করতিস। আমার বাবা সব মনে আছে।আমি আবার সবার মতো ওতো ভুলে যাই না।
আচ্ছা শেষের কথাটা কি আমাকে শুনিয়ে বললো নাকি? কথাটা একবার মনে আসলেও বেড়োনোর তাড়াতে হারিয়ে গেলো কথাটা।@দেবিকা..©

(৭)
আজ আবার কতগুলো বছর পর দীপ্ত আর সৃষ্টি একসাথে শহর কোলকাতার ভিড়ের রাস্তায়।সৃষ্টির মনে পরে গেলো ছোটবেলায় একসাথে যখন মেলায় যেতো বা স্কুলে যাবার সময় দীপ্ত ওর হাতটা শক্ত করে ধরে রাখতো।আর সৃষ্টির কাছেও সেটা ছিলো খুব খুব ভরসার একটা জায়গা।সেখানে হয়তো কোলকাতার রাস্তার মতো এতো ভিড় ছিল না।কিন্তু আগলে রাখার মতো একটা মানুষ ছিলো। এসব এলোমেলো চিন্তা ভাবনাই মনে জড়ো হয়ে আসছিলো সৃষ্টির। হঠাৎ করেই ওকে অবাক করে দিয়ে দীপ্ত শক্ত করে ওর হাতটা ধরলো।আর বললো-
– ভয় পাসনা ভিড়ে।আমি আছি।আমি জানি তুই ভিড়ে খুব ভয় পাস।কথা দিচ্ছি তোকে একা একা আর ভিড়ে হাটতে হবে না।প্রমিস।
সৃষ্টি যেন কেমন অবাক হয়ে গেলো কথাগুলো শুনে।দীপ্ত এটা কি বললো।এতোদিন আমি যে হিসাবের অঙ্কগুলো মনে মনে কষেছিলাম তাতে তো দীপ্তর এরকম কিছু বলার নয়।ভিড়ে একা একা চলা তো এখন আমার অভ্যাস হয়ে গেছে।হ্যাঁ যদিও এককালে ভয় পেতাম।কিন্তু এখন তো আর সেই ভয়টাকে এগোতে দিই নি।তবে কেনো??@দেবিকা..©

– কি রে আমার থেকে পালাতে চাইছিস???
– না মানে না।তুমি জানলে কি করে? আর আমি পালাতেই বা যাবো কেনো তোমার থেকে।না না আমি মোটেই পালাচ্ছি না।তুমি ভুল জানো।
– এই সৃষ্টি তুই মিথ্যেটা গুছিয়ে বলতে আজও শিখিসনি।এখনো ঠিক আগের মতোই রয়েছিস।তাই মিথ্যে বলার চেষ্টাটা করিস না।কারন আমি বুঝতে পারি।আর হ্যাঁ। কি বলছিলি যেনো যে আমি বুঝলাম কি করে? আরে বাবা তোর মনে আছে আমি না মাইন্ড রিডার। মানে এটা তুই ই বলতিস।আমি তোর মনের সব কথা পড়তে পারি।
-হ্যাঁ।যদি পড়তেই পারতে ঠিক সময় তাহলে আর আমাকে এতোগুলা বছর আর পালিয়ে পালিয়ে বেড়াতে হতো না( মনে মনে ভাবতে লাগলো সৃষ্টি)

-কি রে আবার ভাবতে শুরু করে দিলি?? আজকাল দেখছি খুব ভাবুক হয়ে গেছিস। কই আগে তো এমন ছিলি না।আগে তো সারাদিন বকেই যেতিস সে কারনে হোক বা অকারণেই।আর এখন কথাও বলিস খুব হিসেব করে। ভেবে চিন্তে।@দেবিকা..©
-কোথায়।সেরকম কিছু না।আসলে হঠাৎ করে একটা কথা মনে পরে গেলো। তাই একটু ভাবছিলাম। সেরকম কিছু না।চলো এগোনো যাক।
– হ্যাঁ বেশ চল।এখন তো আবার মনের কথাগুলো মনেই রেখে দিস।
শেষের কথাটা সৃষ্টি শুনেও যেন শুনলো না।আসলে কি বলবে ও এই কথার উত্তরে। সত্যিই কি কিছু বলার আছে।না।কিছুই বলার নেই।আর এটা তো সত্যি যে আজকাল খুব ভালো করে মনের কথাগুলো মনের মাঝে গোছানো শিখে গেছি।নিজের মনের সাথে একরকম বোঝাপড়ার হিসেব করেই চলি আজকাল।

@দেবিকা..©


………(চলবে)……
[9:43 AM, 8/20/2020] Moumita Dutta(Client): (তৃতীয় পর্ব)


(৮)

এতো মনখারাপি চিন্তা ভাবনা মনে আনলেও, দিনটা বেশ ভালোই কাটলো আজকে।আসলে লাইব্রেরির পরিবেশটা বরাবরই প্রিয় সৃষ্টির কাছে।কেমন শান্ত একটা পরিবেশ। খুব খুব নিজের বলে মনে হয়।আর সেই পরিবেশে নিজের প্রিয় মানুষটার সাথে কিছুটা সময় কাটানো,আবার একসাথে বইপাড়ার সৌন্দর্য উপভোগ করা। এযেন আজকের দিনটাকে একটা অন্য মাত্রায় নিয়ে গেলো।একটা অদ্ভুত আনন্দ।যে ছোট ছোট আনন্দ গুলোই আমাদের এগিয়ে নিয়ে যায় নতুন আনন্দের খোঁজে। আর তার সাথে দীপ্তর বলা কিছু কথা।এই যেমন- ” আমাদের এতোদিনের প্ল্যান বইপাড়ায় ঘুড়তে আসা আজ তবে সাক্সেস পেলো।থ্যাংক ইউ সৃষ্টি। আমাকে এতো সুন্দর একটা উপহার দেওয়ার জন্য।” আর তার মাঝেই দীপ্তর কিছু কথা সৃষ্টিকে অবাক করে দিলো। হঠাৎ করেই ওর সাথে মজা করতে করতে খুব গম্ভীর ভাবে বলে উঠলো -“জানিস সৃষ্টি একটাই আপসোস রয়ে গেলো।ভেবেছিলাম তুই আমায় বুঝিস।কিন্তু কি অদ্ভুত দে…
[9:43 AM, 8/20/2020] Moumita Dutta(Client): (চতুর্থ পর্ব)

(১০)

আজ রবিবার। মানে একটা অলিখিত ছুটির দিন।তাই আজকের দিনটার রুটিনটা স্বাভাবিক ভাবেই সপ্তাহের আর বাকি দিনগুলোর থেকে একটু হলেও আলাদা।সৃষ্টি তো রবিবার টাকে সাজিয়েছে নিজের মতোন করে।এই যেমন অফিস ছুটি তাই সকালে একটু দেরি করে ঘুম থেকে ওঠা,তারপর সকালের জলখাবার থেকে শুরু করে দুপুরের লাঞ্চ সবটাই নিজের হাতে বানানো।সেদিন মায়ের সম্পূর্ণ ছুটি। নিজের কিছু পছন্দমতো এক্সপেরিমেন্টাল রান্নাও চলে এই ছুটির দিনগুলোতে। আর সবথেকে যেটা অন্যরকম সেটা হল বিকেল বেলা ঘুড়তে যাওয়া। আর সেটা অবশ্যই বাবা মায়ের সাথে।তা সে পাড়ার মোড়ে দাঁড়িয়ে ফুচকা খাওয়াই হোক বা গঙ্গার ধারে হাওয়া খেতে যাওয়া। যাই হোক না কেন।ঘুড়তে যাওয়াটা কিন্তু মাস্ট।তাই সবমিলিয়ে এই একটা স্পেশাল দিনের জন্য সারা সপ্তাহ ওয়েট করা যেতেই পারে।@দেবিকা..©
আজ আবার দীপ্তর স্পেশাল ইনভিটেশন সৃষ্টিদের বাড়িতে ওর মায়ের তরফ থেকে। তাই দুপুরবেলার লাঞ্চ-এ আরো কিছু স্পেশাল আইটেম যুক্ত হয়েছে। যা নাকি দীপ্তর ফেবারিট ডিশ।এই যেমন- শর্ষে ইলিশ আর চিংড়ি মাছের মালাইকারি।দুটোই একসাথে।দীপ্তর নাকি এই দুটো ডিশই খুব পছন্দের। তাই ওর ফেবারে এই দুটোই বানাতে হবে।অকাট্য যুক্তি দিয়ে বললেন রীনাদেবী।আর রান্নাটা নাকি তিনি নিজের হাতেই করবেন।তাই কি আর করার।মায়ের সাথে হাতে হাতে রান্নায় সাহায্য করছিলো সৃষ্টি। এমন সময় দীপ্তর আগমন।বলতে গেলে সকাল সকালই এসে পরেছে ছেলেটা।সৃষ্টি তো ওকে দেখে অবাক।
“দেখো। কোন মানে হয় এসবের। একে তো আমি তার থেকে পালিয়ে বেড়াতে চাই।কিন্তু সেই উপায় তো আর নেই।যাই হোক এসব ভেবেও লাভ নেই।কিন্তু এই মূর্তিমানকে দেখো সকাল সকালই এসে হাজির। এসে আবার মায়ের সাথে খোশগল্প করতে শুরু করে দিয়েছে।আরে বাবা একটু পরে আসলে কি হতো? আর মাকেও দেখো।এমনভাবে পাশে বসিয়ে গল্প শোনাচ্ছে যে মনে হুচ্ছে সব রান্না তাকে আজই শিখিয়ে দেবে।ধুর ভালো লাগে না।” (মনে মনে ভাবতে লাগলো সৃষ্টি) @দেবিকা..©
– ” এই সৃষ্টি তুই আবার হাতের কাজ ফেলে কিসব আকাশ পাতাল ভাবতে শুরু করলি হ্যা? আর এই মেয়েটাও হয়েছে।সারাদিন যে কিসব ভাবে।এতো না ভেবে হাতের কাজটা কর।বুঝলি?” ( রীনাদেবী)

– ” এটাই ভাবছিস তো যে আমি এতো সকাল সকাল কেনো আসলাম।” (হঠাৎ করেই সৃষ্টির পাশে গিয়ে আস্তে করে বলে উঠলো দীপ্ত)
সৃষ্টি তো পুরোই অবাক।এবাবা জানলো কি করে যে ওর নামেই এসব ভাবছিলাম।
– “কি রে।এটাই ভাবছিস তো যে আমি জানলাম কি করে? আরে বাবা আমি সব বুঝতে পারি যে তোর মনে কি চলছে বা তুই কি ভাবছিস। তার জন্য আমাকে এসব আলাদা করে বলে দিতে হয়না।আমি এমনিই বুঝতে পারি।”
– হ্যাঁ বুঝলাম। (কথা না বাড়িয়ে বেশ রেগেমেগেই বললো সৃষ্টি)
এইভাবে এই ঝগড়া খুনসুটির মধ্যেও একসাথে বসে সবাই মিলে গল্প করতে করতে কখন যে রাগ, অভিমান এসব পেরিয়ে সেই ছোটবেলার দিনগুলোতে ফিরে গেছে তা নিজেরাই জানেনা।আর সেটা কয়েক মূহুর্তের জন্য হলেও।এইসব মান অভিমানের পালা ভুলে বেশ জমজমাট ভাবেই কাটলো দুপুরটা।আর তার সাথে দুপুরের খাওয়া-দাওয়া টাও দারুন হল।এবারের প্ল্যান হল বিকেলের ঘুরতে যাওয়া।আর প্ল্যানটা হলো গঙ্গার ধারে হাওয়া খেতে যাওয়া। এই নিয়ে তো দীপ্ত আর সৃষ্টি দুজনেই ভীষণ ভীষণ ইন্টারেস্টেড।তবে বিশেষ করে দীপ্ত।কিন্তু একটা মুশকিল হলো হঠাৎ করেই।সৃষ্টির বাবার এক বন্ধু বিনা নোটিশেই হঠাৎ এসে হাজির হল ওদের বাড়িতে। তাই অগত্যা তাদের আর যাওয়া হলো না।রীনাদেবীর কথায়- ” আরে তোরা গিয়ে ঘুড়ে আয়।আমরা পরে একদিন সবাই মিলে প্ল্যান করবো।আর দীপ্ত তো কোলকাতায় নতুন।তো সৃষ্টি তোরই তো দায়িত্ব ওকে শহরটা ঘুড়িয়ে দেখানো।তাই আর দেরি করিসনা।বেড়িয়ে পর তাড়াতাড়ি। “@দেবিকা..©
ব্যাস।দীপ্তর যেন আকাশের চাঁদ হাতে পাওয়ার মতো অবস্থা। সৃষ্টির সাথে ঘুড়তে যাওয়ার সুযোগ। একি কম পাওনা নাকি হ্যাঁ। আর সৃষ্টিই বা কি করে।এখন যতই অভিমান করুক এককালে তো কতোই এভাবে দুজনে ঘুড়তে গেছে।আরও কতো যাওয়ার ছিল।যদিওবা এখন সময়টা অন্য।এসব ভাবনা সাজে না।কিন্তু কি করার।এসব ভাবতে গিয়ে তো ঘুড়তে যাওয়াটাকে মিস করলে চলবে না।আফটারঅল সানডে সপ্তাহে একটাই আসে।তাই কোনভাবে মিস করা যাবে না দিনটাকে।তাই দেড়ি না করে বেড়িয়ে পরাই বুদ্ধিমানের কাজ।@দেবিকা..©
(১১)

রাতের শহর। মানেই একটা অদ্ভুত সুন্দর অনুভূতি। একদিকে জনবহুল শহরের কোলাহল আর অন্যদিকে ব্যস্ত রাত্রির মধ্যেও নিস্তব্ধতা। আর তার সাথে অনেকটা শীতলতা আর আবহনের সৌন্দর্য। গঙ্গার ধারের হাওয়া।আর সেই বিস্তীর্ণ জলরাশি।সব মিলিয়ে এক অতুলনীয় পরিবেশ। মন শান্ত করার পক্ষে অন্তত যথেষ্ট। আর এরকম এতো সুন্দর, শান্ত প্রকৃতির মাঝে বসে হিসেবের বাইরে দু-একটা কথা বলা যেতেই পারে।আর মজার বিষয়টা হলো দুজনেরই এই একই কথাটাই মনে হলো।হঠাৎ করে সৃষ্টি অনেক হিসে…
[9:43 AM, 8/20/2020] Moumita Dutta(Client): (চতুর্থ পর্বের পর)……[অন্তিম পর্ব…]


“ও আচ্ছা এই ব্যাপার। সৌমীর ভূতটা এখনো মাথা থেকে যায়নি তাহলে।এখনো তাহলে ম্যাডাম এসবই ভাবছেন” ( মনে মনে বললো দীপ্ত)
– ” ওরে বাবা রে একবারে কতো প্রশ্ন। একএক করে উওর দেই তাহলে।ভালোই আছে।আর ভালোই খবর হয়তো”
– ” বাহ্।খুব ভালো।”
– “হ্যাঁ। তাতো খুবই ভালো।আচ্ছা এবার বল তোর খবর কি? বিয়েটা কবে করছিস বল? কাকু কাকিমার সাথে কথা বলে তো বেশ বুঝলাম যে তারা তোর বিয়েটা নিয়ে খুবই চিন্তিত। আচ্ছা কাউকে পছন্দ করিস কি? থাকলে বল কাকিমার সাথে কথা বলি বিষয়টা নিয়ে।আর নয়তো সেরম কেউ না থাকলে আমরাই বরং খোঁজটা শুরু করে দিই।কি বলিস।আর সেই কতোদিনের ইচ্ছা যে তোর বিয়েতে একটু পেট পুড়ে খাবো।তবে আমি বলে রাখছি মেনুগুলো কিন্তু আমি ঠিক করবো।একদম বিয়ে থেকে বৌভাত।যাই হোক।এবার তো তুই কিছু বল।”(দীপ্ত)@দেবিকা..©
– ” আমি আর কি বলবো বলো। সবই তো তুমিই বলে দিলে।তোমার কতো প্ল্যান আমার বিয়েটাকে নিয়ে যে একেবারে খাবারের মেনুতে পর্যন্ত চলে গেলে।কোথায় রয়েছে কি আর উনি এখন আকাশ পাতাল প্ল্যান করছে।যত্তসব। এতোই যখন মেনু নিয়ে প্ল্যান নিজের বিয়েটা আগে করো না। “(সৃষ্টি)
– ” হ্যাঁ। সে তো করবোই।অবশ্যই।বিলক্ষন।”
– ” হ্যাঁ সেটাই করো।দেখবে প্ল্যান করার সুযোগে আরো অনেক অনেক বেশি পাবে।শুধু বিয়ে আর বৌভাত নয় আশীর্বাদের দিন থেকে সব মেনু তুমি একাই ঠিক করবে দেখো।আর আমিও বেশ তোমার বিয়েতে একটু সুন্দর করে সেজেগুজে ঘুড়তে যাবো।ভীষণ মজা করবো।কি বলোতো আমারো না সেই অনেকদিনের প্ল্যান।”
– ” আচ্ছা????? তুইও এতো কিছু প্ল্যান করে রেখেছিস??”
– -” হ্যাঁ গো।”( অন্যদিকে মুখ ঘুড়িয়ে বললো সৃষ্টি)
– ” তাহলে তো ভালোই।তবে মুখটা ওরকম বাংলার পাঁচের মতো করে রেখেছিস কেনো??কোন প্রবলেম??  “@দেবিকা..©
– ” না গো।কোন প্রবলেম নেই”
– ” আচ্ছা।জানিস তো লেখাটা খুব সুন্দর ছিলো। লেখাটা দেখেই তোর প্রেমে পরে গেছিলাম। আর যার জন্য লিখেছিলি সে কতোই না লাকি।ভাবলেই হিংসে হচ্ছিল আমার সেই ব্যক্তিটির উপর।হচ্ছিলো কি বলছি।ইভেন এখনো হিংসে হয়।খুব খুব হিংসে হয়”(সৃষ্টিকে শুনিয়ে শুনিয়ে কথাগুলো বলছিলো দীপ্ত)

(১২)
সৃষ্টি আর ভাবতে পারছে না।হঠাৎ করেই কিছু বলার আগেই কথাগুলো যেন থমকে গেছে।কোন লেখার কথা বলছে ও।কোন কবিতা। তবে কি সেই ডাইরিটা। যেটা ছিলো অনেক মনের কথার গোপন সাক্ষী। অজান্তেই যেটা হারিয়ে গিয়েছিল নিজের থেকে।তারপর কত খুঁজেছি।কিন্তু যেটাকে আর খুঁজে পাইনি।একসময় তো সময় এর সাথে সাথে সময়- এর স্মৃতিবাহক ওই ডাইরিটাও হারিয়ে গিয়েছিল। না আর ভাবতে পারছেনা সৃষ্টি। সবকিছু যেম কেমন গুলিয়ে যাচ্ছে।
– ” মানে?? কো কো কোন লেখার কথা বলছো তুমি?কোন কবিতা??? “
– ” এবাবা ভুলে গেলি নাকি এরমধ্যেই। এখন তো দেখছি আমাকেই মনে করাতে হবে।@দেবিকা..©
 
বলছি কথা কানে কানে,
গল্পগুলো আজ ভীষণ টানে।
শব্দ ঘেরা আবেগ নিয়ে
আর রূপকথা ঘেরা গল্প নিয়ে,
হোক তবে কথা কানে কানে,
আর চেয়ে থাকা তোমার পানে।।

এই যে এই লেখাটা।মনে পরছে এবার?? কত গুছিয়ে লিখেছিলি রে লেখাটা।তার উপর আবার সেই ছোটবেলায়।এখন তো নিশ্চই আরো সুন্দর লিখিস।একদিন শোনাবি আমায় তোর কিছু লেখা।তুই নিজে আমাকে বলবি।আমাকে তখন যেন লুকিয়ে লুকিয়ে তোর লেখাগুলো পড়তে না হয়।কি রে বল না শোনাবি তো আমায়??
সৃষ্টি কি বলবে কিছুই বুঝতে পারছে না।তার মানে ওই হারিয়ে যাওয়া ডাইরিটা দীপ্তর কাছে।আর শুধু তাই না ওই ডাইরিতে থাকা লেখাগুলোও ও জানে।সৃষ্টির ভাবনাকে আর এগোতে না দিয়ে হঠাৎ করেই দীপ্ত বলে ওঠে –
        ” আচ্ছা সৃষ্টি লেখাগুলো আমায় নিয়ে লিখেছিলি তাইনা রে।কবে এতো বড় হয়ে গেছিলি রে।আমি তো বুঝতেই পারিনি।”
– ” তোমাকে নিয়ে?? কোথায়?  না না” (সৃষ্টি আমতা আমতা করতে থাকে)
– ” কথা ঘোড়ানোর চেষ্টা করিস না।করলেও তুই সেটা পারবি না বুঝলি।অনেক তো হলো এই লুকোচুরি খেলা।পালাতে পারলি কি? তার থেকে ভালো এবার নাহয় সত্যিটাই বল।মিথ্যে যে তোকে একদম মানায় না রে।।”@দেবিকা..©
– ” হ্যাঁ আমি লিখেছিলাম। তোমাকে উদ্দেশ্য করেই লিখেছিলাম। কিন্তু ওটা এখন পাস্ট।ওসব না ভাবাই ভালো।আমাদের বর্তমানে কনসেন্ট্রেট করার দরকার।অন্তত আমার তাই মনে হয়।”
– ” আচ্ছা বেশ অতীতের কথা ছাড়।এখনকার কথা বল।আমাকে নিয়ে আর কি কি লিখেছিস বল।অবশ্য তোর যা রাগ আমার উপর তাতে ভালো কিছু লিখবি বলে মনে তো হয় না।তুই তো আমাকে এখন আর পছন্দসই করিস না।তাইতো ওই ঘটনার পর থেকে যতবার আমাদের বাড়িতে গেছিস আমার সাথে দেখা না করেই চলে এসেছিস।আচ্ছা মানছি তোকে আমি সেদিন অনেক কথা শুনিয়েছিলাম। কি করতাম বল।সেদিন এমনিতেই মুড অফ ছিলো।তারপর পড়তে গিয়ে শুনলাম সৌমি রটিয়ে দিয়েছে যে আমি আর তুই নাকি প্রেম করে বেড়াচ্ছি।আর এই কথাটা নাকি তুই নিজে ওকে বলেছিস।আর তাই নিয়ে নাকি ওকে অনেক কথাও শুনিয়েছিস।আসলে জানিস তো তখন আমরা দুজনেই কতো ছোট ছিলাম।আর তখন এসব নিয়ে বেশি ভাবনা,লোক জানাজানি নেহাত পাকামি ছাড়া আর কিছু না।তাই তো ভেবেছিলাম এসবের মধ্যে গেলে তোর পড়াশুনোর ক্ষতি হবে।তাই একটু বেশিই বকে ফেলেছিলাম। আর সত্যি বলতে কি সৃষ্টি আমি সেদিন তোকে ভুল বুঝেছিলাম। নিজের অজান্তেই তোকে অনেক কষ্ট দিয়ে ফেলেছিলাম।তাই হয়তো তুই আর আমার সাথে যোগাযোগ রাখার চেষ্টা করিসনি।আর যেদিন তোর ডাইরিটা পড়ে পুরো ব্যাপারটা জানতে পারলাম তখন সত্যিই নিজেকে খুব অসহায় মনে হচ্ছিলো। আর তুইও তখন ছিলি না।যখন যেতিস তখনই তো আমার থেকে পালাতে চাইতিস।আমি তাই আর পেরে উঠছিলাম না তোকে গিয়ে একবার সব কথা বলতে।তোর কাছে গিয়ে ক্ষমা চাইতে।আর তোকে নিজের মনের কথাগুলো বলতে।কিন্তু কি বল।তুইতো যোগাযোগ-ই করলি না।এই এতোগুলা বছরে।তাই আমাকেই আসতে হলো।নয়তো তোর এই মনখারাপ, রাগ,অভিমান জীবনে যাবে না।যদি আমি তোর আসার ভরসা করে বসে থাকি।তাই আর কি। আমিই চলে এলাম।” @দেবিকা..©

সৃষ্টি আর বুঝতে পারছে না কোন কথার কি উত্তর দেবে।সত্যিই তো অনেক অনেক বড় ভুল হয়ে গেলো।এতোগুলা বছর ধরে।দীপ্ত সেদিন ওকে কষ্ট দিয়েছিলো এটা ঠিকই।কিন্তু আমি।আমিও তো এতোগুলো বছর ধরে তাকে কষ্ট দিয়ে আসছি।অজান্তেই এতোগুলো বছর ধরে শুধুমাত্র নিজের রাগটাকেই বজায় রেখেছি।
– ” সৃষ্টি আমি জানিনা তুই আজও আমায় ভালোবাসিস কিনা।কিন্তু আমি ভালোবাসি আমার সেই ছোট্টবেলার বন্ধুটাকে।আর সবসময় ভালোবাসবো।”
সৃষ্টি আজ চুপচাপ।কতো কথা তো বলার আছে।কিন্তু কিচ্ছুইতো বলতে পারছে না।আসলে ভালোবাসার মানুষটার কাছ থেকে এই কথা শোনা।এতো সত্যিই খুব বড় পাওয়া জীবনের।
-” আচ্ছা তোর আজকেও কিছু বলার নেই তাইনা।আচ্ছা বাদ দে।চল অনেক রাত হলো বাড়ি ফিরতে হবে।”(দীপ্ত) @দেবিকা..©
– ” সব কথা কি মুখে বলতে হয়?  মনেরও তো কিছু ভাষা আছে সেগুলো কি বোঝা যায় না? এই যে বলো সবসময় তুমি মাইন্ড রিডার। তুমি আমার মনের সব কথা পড়তে পারো।তবে এখন কি হলো।” (দীপ্তকে থামিয়ে দিয়ে সৃষ্টি বলে ওঠে)
-” আসলে জানিস তো যতই মন পড়তে পারি কিছু কিছু কথা প্রিয় মানুষটার মুখ থেকে শুনতেই খুব ইচ্ছে করে।খুব ভালো লাগে। ” (দীপ্তর মুখে যেন জয়ের হাসি)
– দুজনেই যেন আজ খুব নিশ্চিন্ত। খুব আনন্দিত। একটা বন্ধুত্বের নতুন করে জন্ম।একটা ভালোবাসার সূচনা।সৃষ্টি হঠাৎ করে দীপ্তর হাতটা শক্ত করে ধরে নিয়ে বলে-
“আমার তোমার আবছায়াতে মুহূর্ত আজ বন্দী
অবুঝ মনের খামখেয়ালিতেই তোমার আমার সন্ধি।
তোমার সাথেই ভালো থাকা,হাঁটতে চাই অনেকটা পথ
একই তালে,একই ছন্দে সাজাবো আমাদের স্বপ্নরথ।।”

– শুরু হলো ওদের জীবনের একটা নতুন অধ্যায়। আর তার সাক্ষী রইলো রাতের আকাশের চাঁদ আর তারাগুলো।আর প্রকৃতির নিস্তব্ধতার সৌন্দর্যও যেন দুজনের এই সুন্দর মুহূর্তের সাক্ষী আবাহন করে নিয়ে যাচ্ছে।

আজ সকালে উঠেই গরমে ঘামতে থাকে কৃষ্ণকলি। এবারে শীতের শেষে ঝড় বৃষ্টির জন্য গরমটা ঠিক পড়তে পারেনি। এই দুই দিন ধরেই গরম লাগতে শুরু করেছে। কাল স্কুলে যাওয়ার সময় পুরো সেদ্ধ হয়ে গিয়েছিলো। না! আজ আর ওই মোটা পলেস্টারের কাপড় পরা যাবে না। একটা সুতির কিছু বের করতে হবে। মনে মনে এই সব ভাবতে ভাবতে আলমারিটা খুলে হালকা ঘিয়ে রঙের লিলেন শাড়ীটা বের করে কলি। স্কুলে ওই দামী শাড়ীটা পরবে কিনা ভাবছিলো সে। ঝোঁকের বসে গত পূজার আগে শাড়ীটা কিনে তিন মাস ধরে তার দাম শোধ করতে বেশ বেগ পেতে হয়েছিলো তাকে। ওই তো প্যারাটিচারের সামান্য কিছু টাকা মায়না। ইশশ্ আজ যদি পার্মানেন্ট টিচার হতো,তো আজ কতো টাকা মায়না পেতো! ধুর! স্কুল সার্ভিসটাই প্রায় উঠে গেলো। আনমনে আলমারি বন্ধ করে কলি। এমন সময় কলির মা সুমেধা কলিকে ডাকতে কলির ঘরে এসে ঘিয়ে রঙের শাড়ীটা দেখে বলে, এটা কেন পরবি। তোর হলুদ রঙের পিওর সিল্কটা কোথায় গেলো? কলি অবাক হয়ে বলে,”অতো জমকালো শাড়ী পরে আমি আবার কবে স্কুলে যাই?” কলির মা শান্ত গলায় বলে “যা! তোকে তো বলতে ভুলেই গেছি, আরে নীচের ডাক্তারবাবু তোর জন্য আজ একটা সমন্ধ এনেছে রে। ছবি দেখে তাদের পছন্দ হয়েছে তোকে। এবার সামনে দেখে যদি পছন্দ হয় তো একেবারে পাকা কথা বলে যাবে রে। ছেলেও আজ আসবে। তাই তো বললাম।হলুদ পিওরসিল্কটা পর। আরে হলুদ রঙ পরলে কালোদেরও ফর্সা লাগে। এই সব ম্যাড়া রঙের শাড়ীতে আরো কালো লাগবে। আর শোন আজ স্কুল থেকে তাড়াতাড়ি আসবি। ওরা পাঁচটার মধ্যেই চলে আসবে। ” এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো কলির মা সুমেধা। কলি শান্ত গলায় মাকে দেখে নিয়ে বলে, ” মা আমি কালো। তাই যে রঙের শাড়ীই পরি না কেন কালোই লাগবে! বুঝেছো? আর ছবি নিশ্চয়ই ভাই মেলে পাঠিয়েছে? তাই ও যা এডিট করেছে তাতে আমার গায়ের রঙ বোঝার ক্ষমতা স্বয়ং ভগবানেরও নেই। তাই তুমি নিশ্চিন্তে থাকো। আমার গায়ের রঙ দেখলে ওদের পাকা কথা বলার ইচ্ছেটাই চলে যাবে। ” কলির মা মেয়ের মাথায় হাত দিয়ে বলে,” এতো সুন্দর চুল, মুখের গড়ন,তোর! কেবল গায়ের রঙটাই বড় হয়ে গেলো?” কলি মাকে ঝাঁঝিয়ে উঠে বলে” হ্যাঁ। মা। গায়ের রঙটাই আসল। আমার মতো কালো মোটা মেয়েকে কেউ পছন্দ করবে না। কৃষ্ণকলিদের মুখে শ্রাবস্তীর কারুকার্য কবিরা ছাড়া আর কেউ দেখে না! বুঝেছো? ” তারপর মাকে বলে,” সারা বছরই তো পাত্রপক্ষের সামনে বসে বোকা হচ্ছি, আজ এপ্রিল ফুলের দিনটা না হয়, বোকা নাই বা হলাম। একটা দিনও কি ছাড় দেওয়া যায় না আমাকে? ” সুমেধা মেয়ের কথা উত্তর দেবার আগেই দরজার ওপার থেকে ডক্টর সিদ্ধার্থ বোসের গলার আওয়াজ পাওয়া যায়। “মাসিমা, ওরা কিন্তু আজ দুপুরের ট্রেনেই কলকাতা থেকে আসছে। দুপুরের খাবার ওরা ট্রেনেই খেয়ে আসবে। খালি আপনার এখানে একটু বিশ্রামের ব্যাবস্থা করতে হবে।” এই ডাক্টার বোস কিছুদিন হলো ওদের মফস্বল হাসপাতালে জয়েন করেছেন। কলিদের বাড়ীটা প্রায় হাসপাতালের উল্টো দিকে। হাসপাতালের জড়াজীর্ন কোয়ার্টারের থাকতে না পেরে কলিদের বাড়ীর নীচের ঘরে ভাড়া এসেছেন। তবে অন্তর্মুখী কলির সাথে আসা যাওয়ার পথে সৌজন্যমূলক হাসি বিনিময় ছাড়া আর আলাপ বেশী দূর এগায় নি। তবে ইদানিং নাকি মায়ের চিকিৎসা ভালোই করছেন উনি। মায়ের সাথে ভালো খাতিরও হয়েছে। মায়ের মুখে ডাক্তারের প্রশংষা শুনে একটু শ্রদ্ধাই হয়েছিলো কলির। কিন্তু উনিও শেষে কলির দুর্বল জায়গায় আঘাত দিলেন?চকিতে মাথাটা গরম হয়ে যায় কলির। মূর্হুতের মধ্যে ঘর থেকে বাইরে এসে ডাক্তারকে সামনে পেয়ে উতপ্ত গলায় বলে ,” জানি আপনি অনেক বড় ডাক্তার। রূপ, গুন, অর্থ কোনকিছুরই আপনার অভাব নেই।তাই বলে আপনার কোনো অধিকার নেই, আমাকে ছোট করার। আমার মতো মেয়েকে কেউ এক দেখায় পছন্দ করে পাকা কথা দেয় না, বুঝলেন। আমাদের এই ভাবে এপ্রিল ফুল না বানালেও চলতো আপনার। আপনারা কি করে বুঝবেন আমাদের মতো কুৎসিত মেয়েদের কষ্ট?” কথা গুলো এক নিঃশ্বাসে বলে দুমদাম করে পা ফেলে নীচে চলে যায় কলি। কলির মা তার বরাবরের শান্ত মেয়ের এহেন আচরণে হতবাক হয়ে যায়।তারপর ডাক্তারকে বলে, ” আপনি ওর কথায় কিছু মনে করবেন না ডাক্তার বাবু। আমার মেয়েটা এইরকম নয়। খুব শান্ত। কিন্তু বার বার ওই পাত্রপক্ষের সামনে বসে কালো বলে বাতিল হতে হতে, এখন এই রকম হয়ে গেছে। সিদ্ধার্থ মুখে হাসি টেনে বলে,” আমি কিছু মনে করি নি মাসিমা। গুনের থেকে রূপের কদর বেশী হলে সেটা মনে লাগে, সেটা আমি বুঝি। তবে আমি আপনাকে মাসিমা ডাকি,আর আপনি আমাকে আপনি, ডাক্তারবাবু, এগুলো ডাকলে, একটু কষ্ট হয় বই কি। আমার ভালো নাম সিদ্ধার্থ, আর ডাক নাম সিধু। আপনি যে কোন একটা নামে ডাকলেই খুশী হবো।” তারপর সুমেধার দিকে তাকিয়ে বলে, ” এখন আমি আসি, মাসিমা। আপনার তো এখন অনেক কাজ। ওগুলো সামলান। এইসব কথা পরে ভাবলেও চলবে।” কথাগুলো বলে ধীর পায়ে নীচে চলে যায় সিদ্ধার্থ।
স্কুলে এসে সকালের কথা ভেবে একটু খারাপই লাগে কলির।মনে মনে ভাবে ‘ছিঃ ছিঃ, ডাক্তারবাবু কি ভাবলো? মা-ই হয়তো ডাক্তারবাবুকে সমন্ধের কথা বলেছে। তাই হয়তো উনি কলির সমন্ধের চেষ্টা করেছেন। আর উনি ব্যাচেলার মানুষ। বিয়ে নিয়ে অতো কুটকাচালি হয়তো জানেন-ই না। তাই পাকাকথা বলার কথা বলেছেন। যা! খুব বাজে কাজটা হয়ে গেলো। এই ভাবে কেউ মাথা গরম করে? নাহ্!এবার দেখা হলে ওনার কাছে ক্ষমা চেয়ে নেবে।’তারপর ভাবে ‘মায়েরই বা দোষ কোথায়? আঠাশ বছর বয়স হয়ে গেলো কলির। এখনও বিয়ে না হলে আর কবে হবে? তারপর ভাইও গতবছর ভালো চাকরি পেয়ে গেছে। প্রেমও করছে। কলির বিয়ে হলেই ভাইয়ের বিয়ে হবে। এই সব না না ভাবনার মধ্যে স্কুল শেষ হলে একটু তাড়াতাড়িই বাড়ী ফিরলো কলি।
কলি বাড়ীতে ঢুকেই দেখে ওদের বাগানে বাবা মায়ের সাথে অপরিচিত কয়েকজন মানুষ বসে চা খাচ্ছেন। কলি গেট খুলে ঢুকতেই ওর বাবা কলিকে ডাকলো”কলি, এদিকে আয় তো মা” কলি ধীর পদক্ষেপে ওদের দিকে এগিয়ে যায়। কলির বাবা মেয়েকে দেখিয়ে বলেন , ” এই আমার মেয়ে কৃষ্ণকলি। ও অংকে মাষ্টার্স করে বি,এড পড়েছে। গানও খুব ভালো জানে। শাস্ত্রীয় সঙ্গীত আর রবীন্দ্র সঙ্গীত গেয়ে অনেক জায়গা থেকে মেডেল এনেছে।” কলির মা বলে ওঠে, আমার মেয়েকে আমি ঘরের কাজও শিখিয়েছি। বিয়ের পর তো ঘরের কাজই করতে হবে তাই না? ” তারপর কলির দিকে তাকিয়ে নমষ্কার করতে ইশারা করে। কলি নমষ্কার করতে করতে ভাবে,’ ইশ্ সারাদিন স্কুলের খাটুনির পর একটু ফ্রেশও হতে পারলাম না। যা খোলতাই চেহারা হয়েছে এখন, পাত্র দেখলে ‘কেলেভুত’ ভেবে মুর্ছা না যায়! কিন্তু পাত্র কোথায়? মা যে বললো ছেলে আসবে দেখতে!’ সবার সাথে কলির আলাপ পর্ব শেষ হতে ছেলের মা কলিকে পাশে বসিয়ে চিবুক ছুঁয়ে বলে, কি লক্ষ্মীঠাকুরের মতো মুখ আমাদের বৌমার। আমার ছেলের পছন্দের তারিফ করছি বলো। পাত্রের বাবা বলে ওঠে ঠিক বলেছো, ” মা আমাদের রূপে লক্ষ্মী, আর গুনে সরস্বতী! তারপর কলির বাবাকে বলেন, আমরা কিন্তু আমাদের মাকে খুব তাড়াতাড়ি আমাদের বাড়ী নিয়ে যাবো। আপনি বিয়ের ডেট ঠিক করুন। শুভ কাজ বেশীদিন ফেলে রাখতে নেই। কলির বাবাও মাথা নেড়ে সায় দেয়। ঘটনার আকস্মিকতায় কলির মাথা ভোঁ,ভোঁ করতে থাকে। কে পাত্র? কোথাকার পাত্র? এগুলো না জেনেই তার বিয়ে?কিন্তু মুখে কিছু বলতে পারছিলো না। এমন সময় গেট খুলে সিদ্ধার্থ বাড়ীতে ঢোকে। দূর থেকে চেঁচিয়ে বলে,” মা, বাবা,! তোমরা কতক্ষন এলে?” তারপর ওদের কাছে এসে বলে,” স্যরি গো। আজ হাসপাতালে খুব চাপ ছিলো। তাই দেরী হয়ে গেলো। তা তোমাদের সাথে কলির আলাপ হয়েছে?” সিদ্ধার্থ বাবা বলে ” হ্যাঁ রে। এতো মিষ্টি মেয়ে! আমদের তো খুব পছন্দ হয়েছে। আমরা তো এখন বিয়ের ডেট ঠিক করছি। সিদ্ধার্থ মুচকি হেসে বলে, দাঁড়াও আগেই ডেট ঠিক করো না। কলি এখনো জানে না যে, আমি কলিকে বিয়ে করতে চাই। তাই আগে ওর মত নেওয়াটা জরুরি। তারপর কলির দিকে তাকিয়ে বলে, “আপনি আমার সঙ্গে আসুন কৃষ্ণকলি। ” কলি উঠে সিদ্ধার্থর সাথে ঘরে যায়।
ঘরে গিয়ে সিদ্ধার্থ কলিকে বলে, আমাকে আপনার পাত্র হিসাবে পছন্দ তো? আপনি সময়ও নিতে পারেন। বাবা, মা এক সপ্তাহ থাকবে। দিদিরা অবশ্য পরশু চলে যাবে।” কলি লজ্জায় মুখ নীচু করে বলে, ” আপনি না সত্যি? কি দরকার ছিলো সকালে ওই সব বলার?” সিদ্ধার্থ হা হা করে হেসে বলে, আরে আপনার মা, বাবা সব জানে। আমিই তাদের বলতে বারণ করেছি। আপনাকে যে আমি বিয়ে করতে চাই, সেটা আপনার বাবা, মা, ভাই সবাই জানে।” কলি হতবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করে, কিন্তু কেন? সিদ্ধার্থ, মাথা চুলকে বলে, ” আপনাকে এপ্রিল ফুল করবো বলে! মানে একটু রিয়েল এপ্রিল ফুল। যেটার কথা তুমি সারাজীবন মনে রাখবে! ” তারপর কলির দিকে তাকিয়ে চোখ নাচিয়ে বলে, “কি রাখবে তো মনে?” কলি, সিদ্ধার্থর চোখে চোখ রেখে বলে,” হ্যাঁ মনে রাখবো।” তারপর সিদ্ধার্থর হাতে সজোরে একটা চাপ দিয়ে বলে, “বদমাশ!” সিদ্ধার্থ পরম আবেগে কলিকে নিজের বাহুবন্ধনে আবদ্ধ করে বলে ” হ্যাঁ, তোমার কাছে আমি সারাজীবনই বদমাশ হয়েই থাকতে চাই।

সকাল বেলা উঠেই মাথাটা গরম হয়ে গেলো এনার। ওফ্ আর পারা,যায় না। ঘুম থেকে উঠেই শুরু করে দেয়। না! মোরগ আর অতীশের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। সারাদিন হারমোনিয়াম বাজিয়ে খালি কি যে প্যাঁ, পোঁ। আর গান! সেই এক প্যানপ্যানানি রবীন্দ্রসঙ্গীত বা নজরুল গীতি। এগুলো এখন চলে নাকি! ধুর! রীতিমতো মাথাগরম নিয়েই মোবাইলটা হাতে নেয় এনা। ফোনটা নিয়েই মনটা ভালো হয়ে যায় ওর। সানির মেসেজ। কি দারুণ একটা ভিডিও পাঠিয়েছে সানি। কি ফানি! প্রচলিত রবীন্দ্রসঙ্গীতের মধ্যে একটা নিজস্ব কাঁচা শব্দ ঢুকিয়ে দিয়ে, গায়ক বার বার নিজের সুরে গেয়ে যাচ্ছে, আর কলেজের ছেলেমেয়েরা নেচে চলেছে। এই ভিডিওটাই দেবে নাকি বক্সের সঙ্গে ফিট করে ওদের বাড়ীর দিকে ঘুরিয়ে। যেমন ভাবা, তেমন কাজ, মোবাইলটা বক্সে নিয়ে চালু করে দিতেই তারস্বরে বাজতে লাগলো..”শালা চাঁদ উঠেছিলে গগনে”।

কিছুক্ষন পরে অতীশ ওর বোকা বোকা মুখটা নিয়ে হাজির। তবে আজ ওর মুখটা রাগে গনগন করছে। এনাকে দৃঢ় গলায় বলে,’ রবীন্দ্র সঙ্গীত আমাদের কাছে অনেকটা পূজার মন্ত্রের মতো।তাকে সম্মান না দেও, অসম্মান করোনা।’ বলে এনার দিকে একবারও না তাকিয়ে চলে যায় নিজের বাড়ীতে। এবার এনার খুব খারাপ লাগে। অন্য দিন অতীশ এসে এনার সাথে গল্প করতে চায়, গুনগুন করে গানও করে। কিন্তু আজ, অতীশের মুখে খালি ঘৃণাই দেখতে পেলো এনা। ওর মনটা হঠাৎ করেই যেন ধূসর মেঘে ঢেকে গেলো। রাগ করে মোবাইল নিয়ে ওই ভিডিওটাই ডিলিট করে দিলো।

এনা,আর অতীশ পাশাপাশি বাড়ীতে থাকে। অতীশের ঠাকুরদাদা শাস্ত্রীয় সঙ্গীত শিল্পী। তার কাছেই অতীশের গান শেখা শুরু। তারপর বড় হওয়ার পর গানকেই জীবনের ধ্যান জ্ঞান করে নেয় ও। শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের পাশাপাশি নানা ধরনের গানে নিজের পারদর্শিতা দেখাতে থাকে অতীশ। তবে ওর ঠাকুরদার শিক্ষা সে ভোলেনা। তাই খুব ভোরে উঠে হারমনিয়াম নিয়ে রেওয়াজ করাটা নিত্যদিনের অভ্যাসে পরিনত করে ফেলেছে অতীশ। তারপর নিজের পছন্দের কিছু রবীন্দ্র সঙ্গীত, নজরুল বা দ্বিজেন্দ্র গীতির মাধ্যমে মনের শুদ্ধতা ও একাগ্রতা বৃদ্ধি করে ও।

অন্যদিকে ধনী ব্যবসায়িক পরিবারের একমাত্র মেয়ে এনা। বাবার অঢেল, অর্থ আর প্রশয়ের কারণে ছোটবেলা থেকেই সে জেদী,একগুঁয়ে, কিছুটা উশৃঙ্খলও। তবে অতীশকে এনার বাড়ীর সবাই খুব ভালোবাসে। বিশেষ করে এনার ঠাকুদা তো অতীশের গানের একনিষ্ঠ শ্রোতা।

স্কুল পাসের পরে এনা আর অতীশ একই কলেজে ভর্তি হয়। কলেজে গিয়ে এনা আরো উশৃঙ্খল হয়ে ওঠে। কিন্তু অতীশ হয় ধীর, স্থির, নম্র,ভদ্র। আস্তে আস্তে তার গানের সুখ্যাতি সারা কলেজে ছড়িয়ে পড়ে। অনেক মেয়েই তার কাছে আসতে চায়। কিন্তু সে খালি ভালোবাসে এনাকে। এনাই তার জীবনের সবচেয়ে ভালোবাসার ও গুরুত্বপূর্ণ মানুষ। তাই সে এনার কাছে প্রায়ই আসে,তার মনের কথা বলার জন্য। কিন্তু প্রতিবারই এনার থেকে আঘাত পেয়ে তাকে ফিরে যেতে হয়।

এই রকম এক সময় অতীশ জানতে পারে, যে এনা, কলেজের সব থেকে উশৃঙ্খল ছেলে সানির সাথে প্রেমের সম্পর্কে নিজেকে জড়িয়েছে।সানি অনেক মেয়ের জীবনে সর্বনাশ করছে। তাই অতীশ এনাকে সাবধান করতে যায়। কিন্তু ফল হয় উল্টো। এনা অতীশকে রীতিমতো অপমান করে ওর বাড়ীর থেকে তাড়িয়ে দেয়। এর কিছুদিন পর অতীশ কলেজ ছেড়ে ভিন রাজ্যে চলে যায়। এনা আর অতীশের খবরও রাখেনা।

অতীশ চলে যাওয়ার পর এনা, সানির সাথে আরো ঘনিষ্ঠ হয়ে পড়ে।এনার দিনগুলো সানির সাথে বেশ রঙ্গীন ভাবেই কেটে যাচ্ছিলো। প্রায়ই এনা, সানির সাথে একান্তে সময় কাটাতো। তবে মাঝে মাঝেই এনার মনে এক ফালি উড়ো মেঘের মতো অতীশের স্মৃতি এসে ছায়া ফেলতো। তখন অকারণ বিষণ্ণতা এসে এনাকে গ্রাস করে।

একদিন সকালে অতীশের মা এসে খবর দেয়, অতীশ, গানের একটা প্রতিযোগিতায় সারাদেশের মধ্যে প্রথম হয়েছে। ফলস্বরূপ মোটা অংকের টাকা পুরস্কার পাবে ও। এছাড়াও অনেক অনুষ্ঠানে ও সিনেমায় গান গাওয়ার সুযোগ পাবে। খবরটা ওদের পাড়ায়,ঝড়ের বেগে ছড়িয়ে পড়ে। পরদিন খবরের কাগজ, টি.ভিতে অতীশকে দেখায়।তার কন্ঠের জাদুতে মুগ্ধ হয় সবাই। এবার এনা, অতীশের গান ভালো করে শোনে। অতীশের কন্ঠমাধুর্যে মুগ্ধ হয় সে। খুব আফশোষ হয় ওর। কেন অতীশের গান আগে ভালো করে শোনেনি ও?

কদিন ধরেই এনার মন খারাপ। এনা তার শরীরে নতুন আগন্তুকের পদধ্বনি শুনতে পাচ্ছে। সে যে মা হতে চলেছে এটা সে বুঝতে পারছে। কিন্তু সানির পাত্তা নেই। ফোন করলেও সানি আর আজকাল ফোন ধরেনা। মেসেজেরও উত্তর দেয়না।এনা বেশ মনমরা হয়ে পড়ে। সানির বন্ধুদের কাছে জিজ্ঞেস করেও ওর খোঁজ পায়না এনা।

বেশ কদিন পরে কলেজে এসে এনা জানতে পারে সানি কলেজে এসেছে। সে তখন সানি খোঁজে, কলেজ ক্যন্টিনে গিয়ে দেখে সানি তার নতুন বান্ধবী নিয়ে ব্যস্ত। সেই দেখে এনা রাগে ফেটে পড়ে। সানিকে জানায় তার শরীরে সানির সন্তান এসেছে। কিন্তু সানি তা অস্বীকার করে। সবার সামনে এনাকে অপমান করে বলে,বলে অন্যের পাপ সানির উপরে এনা চাপাতে এসেছে। এনার চেনা বন্ধু,বান্ধবীরাও সানির কথাই মেনে নেয়। একমাত্র এনার সবথেকে প্রিয় বান্ধবী নিশা, এনার পাশে থাকে। নিশা, এনাকে বললো লোক জানাজানি হওয়ার আগেই বাচ্চাটাকে নষ্ট করে দিতে। নিরুপায় হয়ে এনাও রাজি হয়ে যায়।

আজ অতীশ বাড়ী ফিরে আসছে। এনাদের সারা পাড়ায় আজ খুশির ধুম। ঘরের ছেলের সাফল্যে তারা খুব খুশি। এনার ঠাকুরদা খুশি হয়ে অতীশের জন্য একটা দামী ঘড়ি কিনেছে।অতীশকে রাতের বেলা নিজের বাড়ীতে খাবারের নিমন্ত্রন করে এনার দাদু। অতীশ আসবে বলে এনাদের বাড়ীতে সাজ সাজ রব পড়ে যায়। একমাত্র এনাই এইসব কিছু থেকে দূরে রাখে নিজেকে। নিজের ঘরে, নিজেকে বন্দী করে রাখে সে। কাল বাচ্চাটাকে নষ্ট করে দেবে এনা। নিশা তার পরিচিত ডাক্তারের সাথে কথা বলেছে। কালই নিশা ওকে নিয়ে যাবে। তারপর সব শেষ। এনা, নিজের পেটের উপরে হাত বুলিয়ে বাচ্চাটাকে আদর করে। এবার খুব কান্না পায় ওর। ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদতে থাকে ও। ওর মনে পড়ে অতীশের সাবধান বানী। কেন যে তখন অতীশের কথা শুনলোনা!

এনার ঠাকুরদার আমন্ত্রনে অনেকদিন পরে এনাদের বাড়ী অতীশ আসে। এনাদের বাড়ীতে তখন অতীশকে ঘিরে উৎসব শুরু হয়ে যায়। কিন্তু অতীশের চোখদুটো খালি এনাকে খুঁজতে থাকে।

রাতের খাবারের সময় সবাই উপস্থিত থাকলেও এনাকে দেখতে পায়না অতীশ। একটু অন্যমনস্ক হয়েই খাবার খায় সে। এনার জন্য বেশ মন খারাপ লাগে ওর। এমন আনন্দের দিনেও এনা একবার তার সামনে এলোনা। তারপর ভাবে, আসবেই বা কেন। ও তো সানিকে ভালোবাসে। একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়েই খাওয়া শেষ করে অতীশ।

নিজের বাড়ী যাওয়ার আগে যাবোনা ভেবেও, এনার ঘরের সামনে এসে অতীশ দাঁড়ায়। এমন সময় ভেতর থেকে এনার কান্নার শব্দ শুনতে পায় সে । এবার আর অতীশ নিজেকে আর স্থির রাখতে পারেনা। দরজা ঠেলে এনার ঘরে ঢোকে। এনা তখন মাথা টেবিলে রেখে কাঁদছে। অতীশ ধীরে ধীরে এগিয়ে যায়, টেবিলের সামনে গিয়ে এনার মাথায় হাত বুলায়। এনা এবার মাথা তোলে। অতীশ দেখে এনার চোখ লাল। শান্ত গলায় বলে, ” কি হয়েছে?” হঠাৎ করে অতীশকে দেখে ঘাবরে যায় এনা। একটু চুপ থেকে, জোরে কেঁদে ওঠে সে। অতীশ এগিয়ে যায় এনার দিকে। এনার হাতটা ধরে বলে,” কি হয়েছে বলো?” তখন এনা অতীশকে বলে,’ যেকোন মায়ের জীবনেই তার সন্তান সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ, অথচ দেখো আমি আমার সন্তানকেই নষ্ট করে দিতে বাধ্য হচ্ছি।’ বলে কাঁদতে সব কথা বলে অতীশকে।

সব শুনে অতীশ, স্তদ্ধ হয়ে যায়। তারপর আস্তে আস্তে বলে,” সানির মতো একটা কাপুরুষের জন্য, তুমি তোমার সন্তানকে নষ্ট করবে এনা? ” এনা কাঁদতে কাঁদতেই বলে, “আর কি করবো বলো। বাড়ীতে তো আর এই খবরটা বলা যাবেনা। আর বলেই বা লাভ কি?” তখন অতীশ, এনাকে বলে,” জানি তুমি আমাকে পছন্দ করোনা। তবুও বলবো, আমি তোমাকে ভালোবাসি এনা। তুমি আমার জীবনের খুব গুরুত্বপূর্ণ একজন মানুষ। তাই তোমার জীবনের সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ যে মানুষ আসছে… তোমার সন্তান, তাকেও আমি ভালোবাসতে চাই। ওকে এই পৃথিবীতে আসতে দেও, এনা। এর জন্যই না হয় তুমি আমার হাতটা ধরলে।” কথাটা শেষ করার আগেই অতীশের চোখ জলে ভরে ওঠে। এনা আস্তে আস্তে বলে,” আমি ভুল করেছিলাম। সত্যিকারের মানুষ না চিনে, অমানুষের পিছনে দৌঁড়িয়েছি। আমাকে ক্ষমা করো।” একটু থেমে আবার বলে,” আমি এবার থেকে নিজেকে শুধরিয়ে নেব, দেখো। আমি বুঝতে পেরেছি।একটা সুযোগ আমাকে দেও। আজ তুমি আর আমার অনাগত সন্তানই আমার জীবনে সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ দুটো মানুষ। তোমাদের কোনদিন আমি অবহেলা করবোনা, দেখো।” অতীশের মুখে এবার হাসি খেলে যায়। এনাকে নিজের বুকের মধ্যে টেনে নিয়ে বলে,” পাগলী! একটা!”

রাজস্মিতা নিউ জেনারেশন এর মেয়ে।বেশ সম্ভ্রান্ত পরিবারে ছোটো থেকে মানুষ হয়েছে।বাচ্ছা বয়স
থেকেই সকলের খুব আদরে,স্নেহে তার বেড়ে ওঠা।
সাধারন মধ্যবিত্ত বাড়ির মেয়েরা যেমন বয়স বাড়ার
সাথে সাথে মায়ের থেকে একটু আধটু রান্নাবান্না করা বা বাড়ির যাবতীয় কাজ কিছুটা হলেও শিখে রাখে, সে সব তাকে কোনোদিন শিখতে হয়নি,কারন তাদের বাড়িতে সদা কাজের লোক থাকতো।শহুরে আদব
কায়দাটাই তার বেশ ভালোভাবে রপ্ত করা।

বাবার বন্ধুর ছেলে শৌনকের সঙ্গে তার বিয়ে হবে
এমনটা আগে ভাগেই স্থির হয়েছিলো। রাজস্মিতা
তাই প্রেম বস্তুটা থেকে দূরেই থেকেছে এতদিন।
সুন্দরী,স্মার্ট মেয়ে-প্রপোজও পেয়েছে বিভিন্ন ক্লাসে
বিভিন্ন সময়ে।তবু,একবারের জন্য কারোর প্রেমে
সে আসক্ত হয়নি।বরং,সে জীবনের এই বাঁধা ধরা
নিয়মের বাইরে নিয়ে গিয়ে প্রানখুলে বেঁচেছে এত
দিন। ঘুরেছে ফিরেছে,লঙ ড্রাইভে গেছে,মস্তি করেছে।

শৌনকও উচ্চবিত্ত ফ্যামিলির ছেলে।সে চ্যাটার্ড একাউন্ট্যান্ট।তাই রাজস্মিতাদের বাড়ি থেকে এ বিয়ে
তে কোনো দ্বিধাবোধও ছিলো না।রাজস্মিতা,বিয়ের
আগে শৌনকের সঙ্গে দেখা করেছে,বেরিয়েছে,এসব
করে বুঝেছে শৌনক ভালো ছেলে।হয়ত একটু শান্ত
তবে তাতে কী?সমস্যাটা হলো,রাজস্মিতার শ্বশুর
বাড়ি হতে চলেছে শহর থেকে অনেক দূরে,মফস্বল
এর দিকে।তার ভয়,সেখানে গিয়ে সে হাঁপিয়ে যাবে
না তো।

বিয়ে হলো।বিয়েতে আত্মীয়রাও সবাই বেশ খুশি
বলেই মনে হলো।ফুলসজ্জার দিন রাতে রাজস্মিতা
ঘরে ঢুকেই আগে পরণের বেনারসি,গলা,হাতের সব
গয়না ছেড়ে রেখে নিজের এটার্জি থেকে হালকা
গোল গলা মেয়েদের টিশার্ট,আর হট প্যান্ট পড়তে
যেন তার স্বস্তি ফিরে এলো।বিয়ের দুদিন যেন তার
কাছে যুদ্ধ মনে হচ্ছিলো।অবশেষে রানীর মুকুট ছেড়ে নিজের মতন।উফফ শান্তি।কিছুক্ষন পর
শৌনক ঘরের মধ্যে প্রবেশ করে,দরজা বন্ধ করে
ফিরে দেখে রজনীগন্ধা সৌরভে সজ্জিত নরম বিছানার ওপর তার সদ্য বিবাহিত স্ত্রী কোথায়
লজ্জায় শাড়ির ঘোমটা না টেনে রেখে,হট প্যান্ট
আর শার্ট পড়ে বাচ্ছা মেয়ের মত বসে আছে।সেই
দৃশ্য দেখে শৌনক আর হাসি চেপে রাখতে পারলোনা।
তার হাসি দেখে রাজস্মিতা বলল-‘অমন করে হাসার
কী আছে?আমি বাড়িতে এগুলো পড়ে থাকি,তাই
পড়েছি।’শৌনক তার হাসি আরও চওড়া করে বলল
-‘কাল কী ঘুম থেকে উঠে এমন হট প্যান্ট পড়ে নীচে
নামবে নাকি!’রাজস্মিতা বলল-‘আমি শাড়ি টাড়ি
পড়তে পারিনা।আমি তাই আমার পড়ার মত কটা কুর্তি আর সালোয়ারও এনেছি।আমি ওই পড়বো।’এভাবেই একে ওপরের
সাথে খুনসুটি করতে করতে দুজনের চোখে রাত্রি নামলো।

পরদিন তখন ঘড়ির কাঁটায় আটটা।দরজায় ওদিকে
শৌনকের মায়ের গলা-‘খোকা,এই খোকা,ওঠ এবার।
আত্মীয়রা সব বাড়ি বেরোচ্ছে,বৌমার সঙ্গে দেখা
করবেনা?’ শৌনক ঘুম ঘুম চোখে তার মাকে
-‘পাঁচ মিনিটের মধ্যে আসছি মা।’ কথাটা বলে,
বিছানার ওপর একেবারে লম্বা হয়ে হাত পা ছড়িয়ে
শুয়ে থাকা,ঘুমন্ত বউয়ের মুখের ওপর থেকে চুলগুলো সরিয়ে
বলল-‘ওই,শুনছো,ওঠো।’রাজস্মিতা চোখ বন্ধ করে
নাকের সুরে-‘কটা বাজে..একটু পরে।’শৌনক ফের
বলল-‘রিলেটিভরা বাড়ি যাচ্ছেন।একবার দেখা করে
এসে আবার ঘুমোবে।’ তাকে জোর করে ঘুম থেকে
তুলে দিতে সে বলল-‘চলো।আমি কিন্তু আবার এসে
ঘুমোবো।’শৌনক বলল-‘চলো মানে কী?এমন হট
প্যান্ট পরেই যাবে নাকি?’রাজস্মিতা বলল-‘আমি
শাড়ি পড়তে জানিনা।তুমি তবে পড়িয়ে দাও।’
শৌনক ঠোঁট চেপে বলে ফেলল-‘এতো মহা জ্বালা।’
রাজস্মিতার চোখ আবার ঢুলে এলো।সে নিভু নিভু
চোখে বেঘোরে বলল-‘তুমি শাড়ি পড়োনি কোনো
দিন?’শৌনক বুঝলো,তার বউ ঘুমের ঘোরে ভুলভাল
বকছে।শৌনক রাজস্মিতার একটা নতুন শাড়ি ভেঙে
তার চোখের ঘুম ছাড়িয়ে অনেক চেষ্টা করলো তাকে
শাড়ি পড়ানোর।কিন্তু কুঁচির ভাঁজ করতে গিয়ে হিমশিম। বাধ্য হয়ে সে নীচে গিয়ে মা কে গিয়ে বলল
-‘তোমার বৌমা কে শড়ি পড়াতে হবে।ও পারেনা।’
মা হেসে ফেলে,মুখ চাপা দিয়ে বলল-‘চল,যাচ্ছি।’

শৌনকের মা ওপরে গিয়ে নতুন বৌমা কে নিজের
হাতে শাড়ি পড়িয়ে নীচে আনলো।আত্মীয়রা বৌমা
কে যে যার মত আশীর্বাদ করে বিদায় নিলো।কেউ
কেউ তো আবার এও বলে গেলো-‘সামনের বছর
ভালো খবরটা যেন পেয়ে যাই।’সবাই চলে গেলে পর
শ্বাশুড়িমা তার বৌমা কে নিয়ে রান্নাঘর,ঠাকুর ঘর
সব দেখিয়ে আনলো।রাজস্মিতা বলল-‘মা,আমিতো
রান্না বান্না পারিনা।আর শাড়িও পরতে জানিনা।’
শ্বাশুড়িমা তার বৌমাকে বলল-‘তোমার যেটা পড়তে
ইচ্ছে হবে পড়ো।তবে শাড়ি পড়াটা কিন্তু আমি তোমায় শিখিয়ে দেবো।শাড়ি পড়ে তোমায় একদম
লক্ষী প্রতিমার মত লাগে।আর তোমার যেদিন মনে
হবে রান্না শিখতে,আমায় বলবে,আমি এটাও শিখিয়ে দেবো।’ভালো শ্বাশুড়ি পেয়েছে রাজস্মিতা,
কিন্তু তার যে এসব শিখতে ইচ্ছে করেনা।শ্বাশুড়িমা
জিজ্ঞেস করলো-‘কী খাবে এখন?’রাজস্মিতার মুখ
ফসকে এতদিনের অভ্যস্ত-‘ম্যাগি’র নাম নিলো।
শ্বাশুড়িমা বলল-‘আচ্ছা,তুমি শাড়ি ছেড়ে এসো,
আমি ম্যাগি বানাচ্ছি।’

সেদিন রাতে রাজস্মিতার খুব ইচ্ছে হলো আইসক্রিম
খাওয়ার।বাড়িতে নেই।শৌনক বলল -‘কাল নিয়ে আসবো।’রাজস্মিতা বলল-‘আজই।’শহরে, রাত্রে
রাস্তায় আইসক্রিম পাওয়া যায়,তবে শৌনকদের
ওখানে তা যায় না।কোথাও পাওয়া গেলো না।সব
দোকান বন্ধ।বাড়ি ফিরে আসতেই রাজস্মিতা খুব
উৎসাহের সাথে বলল-‘কই আইসক্রিম,দাও দাও।’
শৌনক বলল-‘পাইনি।’রাজস্মিতার মন খারাপ হয়ে
গেলো।সে রাগে কোনো কথা না বলে ঘুমিয়ে পড়লো।
পরদিন সকালাই শৌনক শ্বশুরবাড়িতে ফোন করে
জানলো রাজস্মিতা সকালা কী খেতে পছন্দ করে।
পরদিন রাজস্মিতার ঘুম ভাঙতেই,শৌনক সেই সব
কিছু রাজস্মিতার চোখের সামনে এনে হাজির করলো।আগের রাতে সে আইসক্রিম না পেলেও
যেন আইসক্রিমের বরফে তার মনটা গলে গেলো।
তার হঠাৎ করে ইচ্ছে হলো শাড়ি পড়া শিখবে সে।
শাড়ি হাতে করে রান্ন ঘরে গিয়ে দেখে শ্বাশুড়িমা
গরম গরম বেগুনি ভাজছে।তার বেগুনি ভাজা শিখতে ইচ্ছে হলো।সে শ্বাশুড়ি মা কে মিষ্টি করে বলল-‘মা,খুন্তিটা দিন না আমি একটু করি।’শ্বাশুড়ি
মা বলল-‘এদিকে এসো।’রাজস্মিতা প্রথম নিজের
হাতে রান্না করবার জন্য খুন্তি ধরে গরম তেলে নাড়তেই তেল ছিটকে এসে হাতে পড়তেই-উ মা গো’
বলে চেঁচিয়ে হাত থেকে খুন্তিটা ছেড়ে দিতে যাবে-
শ্বাশুড়ি মা শক্ত করে তার আলগা হাতের খুন্তিটা চেপে
ধরে কড়ায় ছাড়া বেগুনিটা উল্টে দিতে দিতে বলল-
‘তেলের ছিটে সহ্য না করলে,রান্নার হাত আর চোখ
কোনোটাই শক্ত হবেনা।’রাজস্মিতা তখন একটু সাহস করে
একটা কাটা বেগুনের টুকরো বেসনে
মাখিয়ে কড়ায় ছেড়ে দিয়ে, তেল ছেটানোর ভয় না করে চোখ গুলো খুলে রেখে নিজের জীবনে প্রথম একটা বেগুনি ভেজে ফেললো।

‘একটু সরে বসবেন প্লিজ’-বছর পঁচিশেকের ছেলেটার আবেদনে বই থেকে চোখ ফিরিয়ে তরুনী জানলার দিকের সীটটায় সরে গেলো।ছেলেটা শান্ত ভাবে তরু-নীর ছেড়ে দেওয়া সিটটায় বসে কাঁদের ব্যাগটা কোলের কাছে নিয়ে ব্যাগের সামনের চেনটা খুলে ভেতর থেকে টিফিন বক্সটা বের করলো।কেমন একটা মিষ্টি গন্ধ ছাড়ছে না?ছেলেটা,গন্ধটা যে কীসের তা আন্দাজ করতে পারলোনা।অগত্যা,
টিফিন বক্স এর কৌটোটা খুলে রুটি আর আলুভাজা গুলো খেতে আরাম্ভ করলো।দেড় দু ঘন্টা লেগে যাবে বর্ধমান পৌছোতে।এতটা রাস্তা সে কীভাবে যাবে?পাশে একজন চেনা কেউ থাকলে,চেনা না হলেও যদি অপরিচিতও একজন এমন কেউ থাকতো যার সঙ্গে গল্প করতে করতে যাওয়া যেত।কিন্তু,তার পাশে যে মেয়েটি বসে আছে সে তো বই এর থেকে চোখই তুলছে না।কথা কী বলবে?বলবে না মনে হয়।

বাস বেশ গতিতে ছুটছে।বাইরের হাওয়ায় মেয়েটার
ডানদিকের চুলগুলো তার চোখে মুখে জড়িয়ে গিয়ে
তার পড়ার একটু বিরক্ত করছে।সে বইয়ের পাতা সামলাবে না চুলের ঝাপটা!ছেলেটা মিনিট পাঁচেক
ধরে মেয়েটার দিকেই বারবার আড়চোখে তাকাচ্ছে,
আজকালকার দিনে এত বই পাগল মেয়ে হয় নাকি! ছেলেটা অন্তত দেখেনি।কিন্তু সে যে মেয়েটা কে লক্ষ্য করছে সেটা মেয়েটা বইয়ের দিকে যতই চোখ রাখুক না কেনো মেয়েটা কিন্তু নজর রেখে চলেছে।মিনিট পনেরো পর মেয়েটা বইয়ের পাতা থেকে চোখ না সরিয়েই নরম ভাবেই বলল-‘আপনি মেয়ে দেখেন নি কখনো?’ছেলেটার মধ্যে তখন হঠাৎ একটু ইতস্তত ভাব জন্মেছে মেয়েটাকে কী উত্তর দেবে।সে একটু মিথ্যে বলার চেষ্টা করল-‘না,মানে কৈ..আপনাকে দেখছি কোথায়।আমি তো জানালার বাইরের দিকে তাকিয়ে..’
মেয়েটা ছেলেটার উত্তর শুনে আচমকা
জিজ্ঞেস করলো-‘দেখুন তো আমার খোঁপাতে লাল
ক্লিপটা আছে না পড়ে গেছে।’ ছেলেটাও অত শত না ভেবে চট করে উত্তর দিলো-‘লাল ক্লিপ তো খোঁপায় ছিলো না আপনার।’মেয়েটা তখন প্রথম তার দিকে তাকিয়ে বলল-‘আপনি যে বললেন দেখেন নি আমায়?’-মেয়েটা তাকে ধরে ফেলেছে দেখে ছেলেটা লজ্জা পেলো।কিছু উত্তর দিলোনা।মেয়েটা বলল-
‘থাক আর লজ্জা পেতে হবেনা।’ ছেলেটা আলতো
স্বরে কাঁচুমাচু হয়ে বলল-‘সরি।’মেয়েটা বলল-
‘এতটা রাস্তা চুপ করে একা একা বসে থেকে যাবেন
কীকরে?আমি তো গল্প টল্প করতে পারবোনা।’
ছেলেটা মুখের ভাবভঙ্গিমায় মেয়েটাকে বোঝাতে
চাইলো যে সে বিরক্ত হবে,তবে যা হোক করে চলে
যাবে।মেয়েটা তার মুখের ভাষা বুঝতে পেড়ে বলল-
‘আসুন বই পড়বেন।একসঙ্গে পড়া যাবে।বেশ ভালো ভালো কবিতা আছে।’ছেলেটা কবিতা অতটা ভালো বাসেনা তবু মেয়েটার বলায় আর না করতে না পেরে অগত্যা দুজন মিলে একটা বই দুদিকটা ঠিক ভাগ করে ধরে পড়তে আরাম্ভ করল।

ছেলেটা তার কথা রাখতে বই ভাগাভাগি করে পড়ছে দেখে মেয়েটার মনে হলো আর পাঁচটা ছেলের থেকে
সেই ছেলেটা একটু হলেও আলাদা।সে আড়চোখে
তাকে দেখছিলো এটা যদি তার দোষ হয় তবে তার
একবার বলায় সে কবিতা পড়তে লেগেগেলো এটা
তার বড় একটা গুন।মনের মধ্যে ছেলেটার প্রতি
অন্যরকম একটা ইম্প্রেশন জন্মালো মেয়েটার।
একটা করে কবিতা দুজনে পড়ে,একে অপরকে আড়চোখে দেখে,দুজনেই বুঝতে পারে,তবু কেউ কাউকে বারণ করে না।একটা কবিতা পড়ে পাতা উল্টে মেয়েটা খেয়াল করলো ‘আবার দেখা হবে’ কবিতাটির পাতায় তার ফোন নাম্বার লেখা আছে।
প্রথমে ছেলেটার দিকে আড়চোখে তাকাতে গিয়ে
খেয়াল পড়েনি,তাই খেয়াল পড়তেই সে টপ করে
পাতাটা আবার উল্টে দিলো।ছেলেটার ততক্ষনে
কবিতাটা পড়া হয়ে গেছে।ক্রমে বই শেষ হলোনা
বাস এসে বর্ধমান পৌছালো।আস্তে আস্তে দুজনেই
বাস থেকে নামল।মেয়েটা পুনরায় চলে যাবে দুর্গাপুর ছেলেটা ফিরে আসবে আরামবাগ।আর হয়তো তাদের কোনোদিন দেখা হবে না।কিন্তু,এই কয়েক ঘন্টার সাক্ষাৎ এ তাদের মধ্যে তেমন বেশি কথা না হলেও তারা একে অপরকে ভুলে যাবে কি।
চোখের ইশারায় দুজনে তখন বিদায় নিয়েই নিয়েছিলো।মেয়েটা দুর্গাপুরগামী বাসে উঠতে যাবে
কী আবার পিছু ফিরে ছেলেটাকে সারা দিলো।ছেলেটাও যেন এই সারাটার অপেক্ষা করছিলো।
সে মেয়েটার সারা পেয়ে দৌড়ে এলো।মেয়েটা ছেলেটার চোখের দিকে না তাকিয়ে করবোনা করবোনা ভাবতে ভাবতে জিজ্ঞেস করেই ফেলল
-‘আবার কবে দেখা হবে?’ছেলেটার বুকের ভেতরে
তখন যেন রামধনু খেলে গেলো।ছেলেটা হাসি মুখে
বাসে বসে পড়া সদ্য একটা কবিতার শেষ লাইনকটা দিয়ে উত্তর দিলো-‘..বেঁচে থাকলে তোমার সঙ্গে আবার দেখা হবে।’বাস এর ড্রাইভার হর্ণ দিলো।মেয়েটা বাসে উঠতে উঠতে জিজ্ঞেস করলো -‘আমায় খুঁজে পাবেন কীভাবে?’ছেলেটা চেঁচিয়ে-‘৯৭৩২০১…’ মেয়েটা অবাক হয়ে গেলো।এ যে তার নম্বর।ছেলেটা পেলো কোথায়?তারপর তার মনে পড়লো কবিতার বইয়ে।মেয়েটা বাসের ভেতর থেকে তার হাতটা বের করে ইশারায় বুঝিয়ে দিলো-‘একদম ঠিক আছে।’

-‘ইসস্..যা জ্যামের মধ্যে পড়লাম না।আমরাই সবার লেট হয়ে যাবো মনে হচ্ছে।’

সম্রাট কথাটা সেঁজুতিকে বলতে বলতেই হর্ন দিতে লাগলো ঘনঘন।সেঁজুতি ঠোঁটে একটা বিরক্তিসূচক শব্দ করে বললো-

-‘কোথায় সাতটার মধ্যে চলে যাবার কথা।আর এখন এখানেই তো সাতটা বেজে গেলো।রিসেপশনের পার্টি এতক্ষনে স্টার্ট হয়ে গেলো বোধহয়।’

সম্রাট ও সেঁজুতি দুজনেরই বন্ধু সায়কের বিবাহের রিসেপশন আজ।লজে বিরাট আয়োজন।যাকে বলে খানা পিনা,নাচা গানা সবের আয়োজন করেছে বন্ধু।দেরী হ’য়া মানে নিশ্চই বুঝতে পারছেন।সবই কপাল।

লজের পার্কিং প্লেসে গিয়ে যখন ওদের গাড়ি থামলো তখন রিস্টওয়াচে পৌনে আটটা।সেঁজুতি বঁকে হাতে নিয়ে তড়িঘড়ি নামতে গিয়ে গাড়ির গেটে,এককোনে
জুতোর লেসটা আটকে গিয়ে টান পড়তেই গেলো ছিঁড়ে।নিজের দিকের দরজা টেনে দিয়ে সম্রাট যখন সেঁজুতির দিকটা লক করতে এলো,এসে দেখে-ও মা এ কী কান্ড ঘটিয়েছে সেঁজুতি।সম্রাটকে দেখা মাত্রই
সেঁজুতি মুখ ভার করে বললো-

-‘কী করবো এখন আমি?ছেঁড়াটাকে পরে ওপরে যাব কীকরে?’

সম্রাট তখন সেঁজুতিকে বললো-

-‘তুই ওগুলো গাড়িতে খুলে রেখে দিয়ে খালি পায়েই ওপরে চল।একেই দেরী হয়ে গেছে।এখন ফের নতুন কিনতে গেলে আরও দেরী হবে।সায়ক আরও রেগে
যাবে আমাদের ওপর।’

লেহেঙ্গা পরে,দু হাতে মেহেন্দি করে শেষ মেষ পায়েতে হিল ছাড়া রিসেপশনে যেতে সেঁজুতি কেমন কেমন যেন একটা করতে লাগলো মনে মনে।সম্রাট তখনই সেঁজুতির মনের আওয়াজ শুনতে পেলো।সে করলো
কী,নিজের পায়ের জুতো মোজা সব খুলে সেঁজুতিকে বললো-

-‘চল,এবার আলগা পায়ে যেতে নিশ্চই ব্যাড ফিলিং হবেনা?’

সম্রাটের এই এটিচিউডটাই সেঁজুতিকে অবাক করে বারবার।ভালোবাসার মানুষকে কোনটাতে প্রসন্ন করা যায়,সেটা সম্রাটের মত কেউ হয়তো এতটা জানেনা।

সেঁজুতির মনে এতটুকু দ্বিধাসংকোচবোধ রইলোনা।রিসেপশন রুমে পৌছানো মাত্রই সায়ক ওদের দেখামাত্র দেরীর জন্য রাগ দেখানোর বদলে বলে বসলো-

-‘খ্যাপা নাকি?তোরা দুজনে জুতো খুলে কেন ভেতরে এসেছিস?বাইরে কোথাও লেখা আছে-জুতা খুলিয়া প্রবেশ করিবেন।’

উত্তরটা সেঁজুতি দিলো।জবাব শুনে সায়ক সম্রাটের দিকে ফিরে হাসি মুখে বললো-

-‘বউকে খুশি করা কেউ তোর কাছ থেকে শেখে..।’

সম্রাট বললো-

-‘আপনিও কাল থেকে শিখে যাবেন অঙ্কের মাস্টার মশাই।’

একটু হাসাহাসি হওয়ার পর,সায়কের সহধর্মিণী ওদের মাঝখানে এসে সায়ককে বললো-

-‘আরে চলো,ওখানে ছবি তোলবার জন্য সবাই যে দাঁড়িয়ে আছে।’

তারপর সম্রাট আর সেঁজুতিকে বললো-

-‘আপনারা দেরী করে এসেছেন।এর শাস্তিটা তোলারইলো।এখন চলুন, আপনাদের আজ আসর জমাতে হবে।শুনেছি দুজনেই দারুন নাচেন।’

কিছুক্ষনের মধ্যেই আসর জমে গেলো।আজকাল বিয়েতে এই এক নতুন ট্রেন্ড শুরু হয়েছে।ব্রাইডের সাথে সকলের নাচা চাই চাই।ড্রিঙ্কসের সাথে গানের তালে পা মেলালো প্রায় সকলেই।এমন সময় জুসের
গ্লাস হাতে অরিক্তা মানে ইমনের স্ত্রী এবং সেঁজুতির বান্ধবী,সে সেঁজুতির পাশে এসে বললো-

-‘সম্রাট কিন্তু ভালোমত ড্রিঙ্কস নিচ্ছে।তুই কিছু বলিস না ওকে?’

সেঁজুতি বিয়ারের গ্লাসে চুমুক দিয়ে হালকা মেজাজে বললো-

-‘কেন,ইমন নিচ্ছেনা?’

অরিক্তা বললো-

-‘ওকে ড্রিঙ্কস করতেই দিইনা।আমার দিব্যি দেওয়া আছে,ড্রিঙ্কস করলে সোজা ডিভোর্স দিয়ে দেবো।’

সেঁজুতি ফের হালকা সুরেই বললো-

-‘তাহলে আর কী,জুসই খাক।’

অরিক্তা বললো-

-‘তোর না সম্রাটের ওপর কোনো জোর নেই।আরে আজকালকার ছেলে,হাতে না টিপে রাখলে কখন বেহাত হয়ে যায় তার ঠিক আছে।’

এবার অরিক্তার কথাটা সেঁজুতির গায়ে লাগলো বেশ তাই সে নরম সুর ছেড়ে একটু শক্ত করে উত্তর দিলো

-‘এক আধদিন বন্ধুদের সাথে পাল্লা দিচ্ছে।আমিও তো বিয়ার খাচ্ছি।মাতলামো তো করছেনা।আমার ওর ওপর সে বিশ্বাস আছে ও ড্রিঙ্কস করে বাওয়াল মাচাবে না।ওর লিমিটেশন ও বোঝে।তাছাড়া,তোর
মত বরকে হাতে রাখাতে আমি বিশ্বাস করিনা ভাই।যে যার নিজের স্পেস থাকাটা জরুরি।’

সেঁজুতির কথাগুলো অরিক্তা ঠিক ঘিঁটতে পারলোনা তাই সে সেঁজুতিকে এভোয়েড করে দূরে চলে গেলো।অতঃপর সেঁজুতি এবং সম্রাটের জুটির নাচ উপস্থিত
সকলের নজর কাড়লো।অবশেষে খাওয়া দাওয়া সব মিটলে ‘পর বাই বাই করতে এসে সায়ক,সম্রাটকে জিজ্ঞেস করলো-

-‘গাড়ি চালিয়ে যেতে পারবি তো?’

উত্তরটা পাশ থেকে সেঁজুতি দিলো-

-‘আমি ড্রাইভ করবো।’

সায়ক বললো-

-‘তুই?’

সেঁজুতি বললো-

-‘আরে আমি জাস্ট একটা বিয়ার নিয়ে ছিলুম।’

সেঁজুতি ড্রাইভিং সীটে বসে গাড়ি ছাড়লো।সম্রাটের চোখ ঢুলে আসছিলো।কিছুটা রাস্তা যাওয়ার পরে সেঁজুতি সম্রাটকে জিজ্ঞেস করলো-

-‘ওকে তো?’

সম্রাট বললো-

-‘আরে নেশা নেই এখন।তখন একটু নিয়েছিলো ঠিক কিন্তু,ও সব নাচানাচিতেই কেটে গেছে।ফাটিয়ে নেচেছি বল আমরা?’

সেঁজুতি বললো-

-‘নাচতে না জানলে তোকে বিয়ে করতুম নাকি তুই ভাবছিস?’

সম্রাট বললো-

-‘আচ্ছা,তাই বুঝি?আমি তো জানতাম আমরা ভালোবেসে বিয়ে করেছি।’

সেঁজুতি হাসলো।সম্রাটও হাসলো।তারপর সেঁজুতি বললো-

-‘জানিস,আজকে অরিক্তা তোর আমার মধ্যে ঝগড়া লাগাতে চেষ্টা করছিলো।কলেজ থেকেই ওকে চিনি,শুধু এর ওর সাথে ঝগড়া লাগিয়ে দেওয়ার ধান্দা।ওর জন্য বৈভব আর রিমিতার সম্পর্কটা ভাঙলো।’

সম্রাট অরিক্তার ব্যাপারটা এড়িয়ে যেয়ে বললো-

-‘বৈভব।আপনি যার কবিতার প্রেমে একেবারে হাবু ডুবু খেয়ে সাঁতার কাটছিলেন,উনি তো?’

সেঁজুতি ড্রাইভ করতে করতে এবার একবার তার দিকে বড় বড় চোখে করে তাকিয়ে বললো-

-‘মেরে ফেলবো তোকে কিন্তু ওই ট্রপিকটা তুললে।’

সম্রাট বললো-

-‘সে তো ফেলবেই।এদিকে চেয়ে চালালে এমনিতেই এক্সিডেন্ট হবে।আর এক্সিডেন্ট হলে তো কে মরবে সেটা জানা।তোর মাগুর মাছের জান,তুই কী আর মরবি।’

সেঁজুতি তার বাঁ হাতটা স্টিয়ারিং থেকে তুলে সোজা সম্রাটের ঠোঁটের ওপর দিয়ে বললো-

-‘কী সব আজে বাজে কথা।তোর না মুখে কোনোটাই আটকায় না।’

সম্রাট তার হাতটা নিজের হাতে কোমলতার আবেশে ঠোঁটে জড়িয়ে চুমু খেলো।তারপর বললো-

-‘জানিস,তোকে যখন প্রপোজ করবো ভেবে জানতে পারলাম তুই বৈভবকে মনে মনে চাইছিস।তোর জন্য আমিও কবি হয়েছিলাম।যদিও তোর অন্তরে জায়গা
পেতে কবিতার প্রয়োজন হয়নি।তবে সেদিন থেকেই আমি কবি হয়ে রয়ে গেছি।’

সেঁজুতি সম্রাটে এই কথাটা শুনে ভারী অবাক হলো।সে বিষ্মিত মুখে বললো-

-‘তুই কবিতা লিখতিস?মানে এখনও লিখিস?কই কখনো তো বলিসনি আমায়?’

সম্রাট বললো-

-‘আমি কী আর বৈভব সেনগুপ্ত যে আমার কবিতায় কেউ হাততালি দেবে।’

সেঁজুতি বললো-

-‘শোনা তাড়াতাড়ি।নয়তো গলা টিপে দেবো তোর।’

সম্রাট শোনাবেনা,সেঁজুতি ছাড়বে না।যদিও শেষমেষ সম্রাটের জেদই জিতলো, অভিমান হলো সেঁজুতির।বাড়ি ফেরা মাত্র সম্রাটের দুচোখে ঘুমের রেখা সমানভাবে জুড়ে গেলো চোখের ওপর।সেঁজুতি সে রাতেই আলমারি,ড্রয়ার ইত্যাদি ঘেঁটে দেখলো যদি সম্রাটের কবিতার খাতাটা খুঁজে পায়।

দিন দুয়েক পর সন্ধ্যায় ওদের বাড়ির সকলের একটা জন্মদিনের নিমন্ত্রন ছিলো।সেঁজুতি তখন সবে মাত্র শাড়িটা পরে,সখ হয়েছে পায়ে নুপুর পড়ার,একটা পায়ের নুপুরের মুখটা আঁটছিলো,এমন সময় সম্রাট কানে ফোন দিয়ে কার সাথে যেন কথা বলতে বলতে ঘরের মধ্যে এলো।তারপর ফোনে(এমন করবে যে ও
জানাই ছিলো।যাই হোক এখন রাখছি।বেরোতে হবে বুঝলি।..হ্যাঁ, হ্যাঁ,সেঁজুতিকে বলছি)

ফোনটা রাখতেই সেঁজুতিই আগে জিজ্ঞেস করলো সম্রাটকে-

-‘কার কী হয়েছে?’

সম্রাট বললো-

-‘তোর বান্ধবী অরিক্তা,বরের সাথে ঝগড়া করছে খুব নাকি।শুনছি ডিভোর্স চাইছে।’

সেঁজুতি ওই এক পায়ের নুপুরটা কোনো মতে এঁটেই সম্রাটের কাছে উঠে গিয়ে জিজ্ঞেস করলো-

-‘কেন?কী হয়েছে নাকি ওদের মধ্যে?’

সম্রাট বললো-

-‘ইমন কোথায় ড্রিঙ্কস করে এসেছিলো।অরিক্তা ওকে ধরে ফেলেছে।আর সেই জন্যই কেলেঙ্কারি বাধাচ্ছে।’

সেঁজুতি বললো-

-‘ও মেয়েটাই ওরকম।স্বামীকে ওকেসনে পর্যন্ত একটু ড্রিঙ্কস করতে দেবেনা।তো লুকিয়ে খাবেনা তো কী করবে।আরে ও এটা বোঝেনা যে সবারই ব্যক্তিগত কিছু ইচ্ছে থাকে।যদি লিমিট পেরিয়ে যায় তখন নয় বলা যায়।এন্ড ইমনকে আমি যতদূর চিনি,হি ইজ এ ফাইন গাই।খারাপ গুন খুব কম ওর।’

সম্রাট বললো-

-‘তোকে বলা হয়নি,সেই যে বার আমি বসের পার্টিতে গিয়েছিলাম।ওখানে ইমনও ইনভাইট ছিলো।আমার সাথে দুটো পেক হুইসকি নিয়েছিলো।স্রেফ দুটোই।
তারপর,সে মুখে ফ্রেসনার দিয়ে টিয়ে আগে গন্ধটা কাটালো,তারপর বাড়ি ফিরলো।এখন বুঝছি,ব’য়ের প্রেসার ছিলো ওর ওপর।’

এমন সময় পাশের ঘর থেকে সম্রাটের মায়ের হাঁক পড়লো-

-‘বাবু,হলো তোদের?দেরী হয়ে যাচ্ছে।কেক কাটা কী শেষ হয়ে গেলে যাবি।তোর সুশান্ত কাকু কিন্তু বড় রাগ করবেন নাতির কেক কাটার আগে না পৌছলে।’

মায়ের ডাকের আওয়াজ পেয়ে সম্রাট চট করে শার্ট প্যান্ট পরতে শুরু করলো।সেঁজুতি বললো-

-‘আমি মায়ের ঘরে যাচ্ছি কানেরটা পরতে।তুই শিগ্রি রেডি হয়ে,ঘরটা এঁটে দিয়ে চলে আয়।’

রেডি হয়ে ঘরের আলো বন্ধ করবার সময় সম্রাটের দৃষ্টি পড়লো বিছানার ওপরে সেঁজুতির এক পায়ের নুপুর পড়ে আছে।সে সেঁজুতিকে সারপ্রাইজ করবে বলে মনে মনে হাসতে হাসতে নুপুরটা পকেটে নিয়ে
রাখলো।তারপর ঘর বন্ধ করে গাড়ির ঘরে গেলো।

রাস্তায় যাওয়ার সময় সম্রাট গোপনে সেঁজুতির হাত স্পর্শ করলো।এমনটা সম্রাট তখনই করে যখন সে সেঁজুতির মিষ্টি মুখের দিকে আড়চোখে তাকালে সে আর চোখ ফেরাতে পারেনা।কলেজে পড়ার সময়ও
বহুবার করেছে।সেঁজুতি,সম্রাটের স্পর্শ পাওয়া মাত্র তার হাতটা সরিয়ে দিতে সম্রাট আড়চোখের ইশারায় জানতে চাইলো-

-‘কী হলো?’

সেঁজুতি চোখের ইশারাতেই বুঝিয়ে দিলো।সেদিনের সে অভিমান এখনও অনড়।সম্রাট তার লুকিং গ্লাসে পেছনের সীটের দিকে তাকিয়ে সুযোগ বুঝে আবার তার হাতটা টেনে ধরতে চাইলো তার বাঁ হাতটা দিয়ে।সেঁজুতি উল্টে সম্রাটের হাতে চিমটি কেটে বললো-

-‘সামনের দিকে চেয়ে ড্রাইভ কর।’

সম্রাট আলতুভাবে (উহু)শব্দ করে মনে মনে বললো-

-‘চলনা,গাড়ি থেকে নেমেই তোর অভিমান যদিনা ভাঙিয়েছি তো কী বলেছি।’

নিমন্ত্রন বাড়িতে পৌছে,গাড়ি থেকে সম্রাটের মা বাবা আত্মীয়ের বাড়ির দরজার দিকে এগোলো।সেঁজুতি তাদের সাথেই এগোতে যাচ্ছিলো,অমনি পিছ থেকে সম্রাট সেঁজুতির শাড়ির আঁজলটা আঙুলে জড়াতে সেঁজুতি পিছন ফিরে চাপা গলায় বললো-

-কী হয়েছে?ছাড়,কেউ দেখবে।’

সম্রাট বললো-

-‘দাঁড়িয়ে যা।নয়তো লজ্জায় পড়বি।’

সেঁজুতি শুনলোনা সম্রাটের বারণ।ভেতরে গিয়ে সে যখন একজন চেনা আত্মীয়ের বাচ্চাটাকে কোলেতে নিয়ে আদর করছিলো,তখনই প্রথম একটা মেয়ের
চোখে পড়লো সেঁজুতির একটা পায়ে নুপুর নেই।সে তার মা কে বললো-

-‘দেখো,ওই আন্টির একপায়ে নুপুর নেই।’

মেয়েটার মা তার পাশের একজনকে, এইভাবে আস্তে আস্তে অনেকেই জেনে গেলো।সেঁজুতির ব্যাপারটা যখন বোধগম্য হলো,সে দারুন লজ্জায় পড়ে গেলো।
একজন মাঝ বয়স্কা তো সেঁজুতিকে জিজ্ঞেস করেই বসলো-

-‘তুমি কী জেনেশুনে একপায়ে নুপুর পড়েছো।আজকাল কী সব ফ্যাশান না কী বেড়িয়েছে যে মেয়েরা নাকি একপায়ে নুপুর পড়ছে।’

সেঁজুতি কী উত্তর দেয় মহিলাকে।এমন সময় সম্রাট পাশ থেকে সেঁজুতির দিকে এগিয়ে এসে তার পকেট থেকে অন্য নুপুরটা বের করে একঘর লোকজনের
সামনে হাসি মুখে সেঁজুতির পায়ের সামনে হাঁটু ভাঁজ করে নুপুরটা পরিয়ে দিলো।সেঁজুতির কিছু বলবার আগেই সম্রাট ঘটনাটা ঘটালো।কোলে বাচ্ছা ছিলো তাই বাধা দেওয়াও হলোনা।আশেপাশের লোক জনে এ দৃশ্য দেখে অবাক হয়ে গেলো।এমন ছেলেও হয় যে তার বউয়ের এত খেয়াল রাখে।তারা নানা কথা বলাবলি আরম্ভ করলো সম্রাটকে নিয়ে।সেঁজুতির
ভেতরে তখন এমন ইচ্ছে করছে যে সম্রাটকে বুকে টেনে নেয়।সে সম্রাটের দিকে গভীরে আবেগের সাথে তাকালো।সম্রাটও ওর দিকে একপলকে চেয়ে হাসি
হাসি মুখে গলার স্বর নামিয়ে বললো-

“আমি প্রেমিক,আমি ভালোবাসতে জানি
তখনই তোর মান ভাঙাই,যখন তুই অভিমানি..”

কার কবিতা লেখা?সম্রাট লিখেছে? -সেঁজুতির মনে এই প্রশ্নটাই জোয়ারের নদীর মত ফুলে ফেঁপে উঠতে আরম্ভ করলো।চার পঙক্তির কবিতাটা শেষ হতে না হতেই সেঁজুতি উৎফুল্ল কন্ঠে না বলে পারলোনা-

-‘তোর লেখা তো?এত ভালো লিখিস তাও আমাকে কোনোদিন শোনাসনি কেন?’

সম্রাট বললো-

-‘অভিমান ভাঙানোর কবিতা,অভিমান ভাঙানোতেই কাজে লাগে।বৈভবের মত না হলেও ওর কাছাকাছি হয়েছে তো লেখাটা?’

সেঁজুতি তার কোলের বাচ্ছাটার মাথায় আদর দিয়ে সম্রাটকে বোঝালো-

-‘তোকে এমনই একটা উপহার দিতে পারবো যেদিন সেদিনই এই লেখাটার জন্য মর্যাদা দেওয়া যাবে।’

দুজনে একসঙ্গে একবার দুজনের দিকে তাকিয়ে চোখের দৃষ্টি বন্ধ করে সেই সুখের মুহুর্ততে একসাথে সফর করে আসলো।

বিশ্বাসে যে বস্তু মিলায়,তারই নাম ভালোবাসা।

দেখতে দেখতে মেয়েটা বড় হয়ে গেল! তিরিশ হয়ে গেল! জন্মদিনের পায়েস রান্না করতে করতে ভাবছিলেন অসীমা।
মুনিয়ার তখন সাড়ে তিন, সুস্থ অশোক বাড়ি থেকে বেরোলেন, ‘বডি’ হয়ে ফিরলেন। কতগুলো বছর কেটে গেল তারপর! একার হাতে মেয়েকে বড় করা, আর বড় করার থেকেও বেশি, ‘মানুষ’ করার স্বপ্ন দেখতে দেখতেই কেটে গেল এতগুলো বছর। তা আজকাল যখন সবাই মুনিয়ার মিষ্টি ব্যবহার, রাস্তার কুকুর-বেড়ালদের নিজে হাতে খাওয়ানোর প্রশংসা করেন, মনে হয় মেয়ে অনেকটাই মানুষ হয়েছে, ঠিক যেমনি চেয়েছিলেন উনি।
“গুড মর্নিং মা” বলে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে মুনিয়া।
“আজ রবিবার, তাও এতো তাড়াতাড়ি উঠে পড়লি যে?” মেয়েকে আলতো আদর করে জিজ্ঞেস করেন উনি।
সেকথার উত্তর না দিয়ে হাসতে হাসতে মেয়ে বলে “মা,পায়েস দাও…উফ, এই জন্মদিনের পায়েসের মতো গিফট কিচ্ছু হয়না…”

“পাগলি মেয়ে” ভাবতে ভাবতে মিষ্টি হাসেন অসীমা। প্রতিবছর উনি পায়েস করবেন ই, আর মেয়েও খেয়ে কিছু না কিছু রিটার্ন গিফট দেবেই। আগে, ছোটবেলায় ঠাকুরের জন্য রাখা ফুল থেকে ক’টা গাঁদা, দোপাটি নিয়ে এসে দিত…একটু বড় হয়ে ভাইফোঁটা বা রাখিতে দাদাদের দেওয়া টাকা থেকে কানের দুল, টিপের পাতা দিত…তারপর চাকরি পেয়ে শাড়ি। গতবছর তো গোয়ার টিকিট দিয়েছিল – চারটে দিন খুব ভালো কেটেছিল মা -মেয়ের। এবার কী দেয় কে জানে!

ডাইনিং টেবিলে বসা মুনিয়াকে ধান-দুর্বা দিয়ে আশীর্বাদ করে পায়েসের বাটি এনে রাখেন অসীমা। মেয়ে প্রনাম করে, তারপর হাতে তুলে দেয় খবরের কাগজ।

সরিয়ে রাখতে যাবেন, হঠাৎ মেয়ের মুখের মিটিমিটি হাসি দেখে কী একটা সন্দেহ হয়। দুষ্টু দুষ্টু হাসি মেয়ের। একদম ছোটবেলায় আচার চুরি করে ধরা পড়লে যে হাসিটা হাসত!

“এই, কী দুর্বুদ্ধি মাথায় ঘুরছে রে তোর?” জিজ্ঞেস করেন উনি।
“দুর্বুদ্ধি না মা, সুবুদ্ধি… এই যে দেখো…” বলে মায়ের হাতে কাগজের একটি বিশেষ পাতা খুলে দিয়ে পায়েসের বাটিটা নিয়ে ঘরে চলে যায় মেয়ে।

‘এতে আবার কী আছে!’ ভাবতে ভাবতে চশমাটা পরে দেখেন পাত্র চাই এর পাতায় একটি বিজ্ঞাপন “দক্ষিন শহরতলি নিবাসী, সুন্দরী, সুগৃহিনী, শিক্ষিতা, নিজস্ব বুদ্ধিতে ও শ্রমে গড়ে তোলা ব্যবসার কর্ণধার, বাহান্ন বছরের মহিলার একজন প্রকৃত ভালোমানুষ ও তাঁর একমাত্র শাখামৃগ সম্প্রদায়ের কন্যাকে ভালোবাসবেন এমন পাত্র চাই। ফোন করুন… ” বলে মুনিয়ার নাম্বার দেওয়া।

প্রচন্ড জোরে চেঁচাতে যাবেন,মুনিয়া জড়িয়ে ধরে বলল “মা, কী করি বলো, আমার ও তো বিয়ে হয়ে যাবে আজ বাদে কাল…তোমার তো ঝগড়া করার সাথী চাই একজন? তাই…”

মেয়েকে মারতে গিয়েও কেন কে জানে চোখ টা সজল হয়ে গেল অসীমার…

কালের নিয়মেই মেয়ে বড্ড ব্যস্ত হয়ে গেছে এখন। মাঝে মাঝেই মনে হয় কেউ যদি পাশে থাকত…। ঠিক স্বামী নয়, বন্ধুর মতো…।

সত্যি, মেয়ে যে কখন মা হয়ে যায়…।।

 

আমাদের জীবনে কিছু সম্পর্ক ভালোবাসতে শেখায়,আবার কিছু সম্পর্ক শেখায় যে কেন ভালোবাসতে নেই।।

আমরা যতই স্বাবলম্বী হই না কেন,দিনের শেষে একটা কাঁধ খুঁজি,যেখানে নিশ্চিন্তে মাথা রাখা যায়।যাকে “জানিস কি হয়েছে”- বলে সারাদিনের সমস্ত টা উগরে দেওয়া যায়।দুঃখ পেলে চিৎকার করে কাঁদা যায় আবার প্রচন্ড অস্বস্তিতে তাকে জড়িয়ে ধরে একটু শান্ত হওয়া যায়।।

অভ্যাস বসত আমরা এমন মানুষ খুঁজে বেড়াই,খুঁজতে খুঁজতে কখনো এমন মানুষ পেয়ে যাই, আবার কখনো পাই না।
যখন পাই না তখন গান শুনি,ছবি আঁকি, গল্পের বই পড়ি,নিজেই নিজেকে সামলে রাখি।।
কিন্তু যখন পেয়ে যাই,তখন ই যত ঝক্কি,
বছরখানেক ধরে অভ্যাসের একটা সংসার করার পর,
দুজনের একজন হঠাৎ করেই সরে যেতে শুরু করে,
“তোমার দুর্বলতা আমার দায় নয়”এমন ই কিছু একটা হাব ভাব করে তোমায় কি স্বাভাবিক ভাবে প্রস্থানের ইঙ্গিত দেয়।।

এতটা ভালোবাসার পর ও যদি এমনটাই হয় তবে তাকে দরজা অবদি এগিয়ে দিয়ে দরজা বন্ধ করে দাও।।
একটা গরম নিঃশ্বাস ছেড়ে,সমস্ত চ্যাট শেষবারের মত পড়ে, ডিলিট করে দাও,সমস্ত কল রেকর্ড শেষবারের মত শুনে মুছে দাও।।
সমস্ত চিঠি শেষবারের মত পড়ে, পুড়িয়ে ফেল।।
কিন্তু তার ফিরে আসার অপেক্ষা করো না।।
বা সে ফিরে আসলে তাকে ফিরিয়ে নেওয়ার মত ভুল করো না।।

যে মানুষ একবার ছেড়ে যায় সে বার বার ছেড়ে যায়।।
যে মানুষের ভালোবাসার ক্ষমতা থাকলেও,তাকে পরিনতি দেওয়ার ক্ষমতা নেই,সে নেহাত ই কাপুরুষ।।
যে মানুষের তোমার সাথে না থাকতে চাওয়ার জন্য দুহাজার অজুহাত আছে তাকে তুমি তোমার দু হাত দিয়ে আটকাবে ভাবছো?
ভুল ভাবছো!!

কিছু সম্পর্ক পচে যাওয়া ঘায়ের মত,শারীরিক অঙ্গের মায়া করে রেখে দিলে,বাকি দেহটাকে ও ধীরে ধীরে পচিয়ে দেবে,আর তার জঘন্য দুর্গন্ধ তোমায় বাকি জীবন টা জুড়ে বয়ে বেড়াতে হবে।।
পঙ্গু হয়ে বাকি জীবন টা হুইল চেয়ারে কাটানোর চেয়ে তাকে সঠিক সময় কেটে বাদ দেওয়াই ভালো।।

কিছু মানুষ ছেড়ে যাওয়ার জন্যই আসে,তাই তাদের ছেড়ে দিতে হয়।।

তোমার ভালোবাসা অপূর্ণ থেকে গেল,
ভাবছো তুমি হেরে গেলে,
না,কিছু সিদ্ধান্তে হেরে গিয়েও জিতে যাওয়া যায়।।

কারণ তুমি জান,
ঠিক তোমার মত আর কেউ নেই

ছোটবেলা থেকেই শুনে এসেছে, ‘মা হওয়া মুখের কথা নয়’, কিন্তু এই যমজ ছেলে হবার পর হাড়ে হাড়ে বুঝতে পারছে শর্মিলা। আইডেন্টিকাল টুইনস ওরা। তাই খাটনিও অনেক বেশি। তবে বেবিদের দিকে তাকালেই যেন মুডটা ভাল হয়ে যায় ওর। সোনা ছেলেরা ওর! একদিন কত বড় হবে! মানুষের মতো মানুষ হবে!
ভাবতে ভাবতেই একটু উদাস হয়ে গেল শর্মিলার। অনীশ একটুও হেল্প করে না ওকে। যেন আয়া রেখে দিলেই কাজ শেষ হয়ে যায়! ওর পাশে এসে বসেও না একটুও। প্রেগনেন্সির খবর পাবার পর প্রথমে একদম খুশি হয়নি অনীশ। ওকে একবার ঠারেঠোরে অ্যাবর্ট করতেও বলেছিল। কেরিয়ারের দোহাই দিয়ে। পরে ইউ এস জি রিপোর্ট আসার পর আরো…অ্যালুফ হয়ে গেছিল অনীশ।
কলিংবেল বাজল।
ইষৎ টলোমলো পায়ে ঘরে ঢুকল অনীশ। এই নিয়ে এই সপ্তাহেই তিনবার।
আজ আর ধৈর্য্য রইল না শর্মিলার। বলে উঠল ‘অনি, হোয়াট দ্যা হেল! আজ আবার ড্রাঙ্ক তুমি! আমি বাড়িতে এভাবে আছি, একটুও হেল্প করোনা বেবিদের নিয়ে আর এদিকে তুমি পার্টি করছ?’
‘তোমার বেবি,,তুমি সামলাও!’
‘ও, আমার একার ওরা? তোমাকে বিয়ে করার সময় ওই বাড়ি থেকে নিয়ে এসেছিলাম?’
‘চেঁচিও না! ওরা হবার আগে তুমি তোমার বাড়িতে ছিলেনা? টানা পনেরো কুড়ি দিন? তারপর হঠাৎ করে খবর দিলে তুমি কনসিভ করেছ?’
‘ছিঃ অনি, তুমি এতো নোংরা? এটা কি বললে তুমি আমাকে…?’ ভেঙে পড়া গলায় বলে শর্মিলা।
একটু চুপ করে থাকে অনীশ। তারপর বলে, ‘আচ্ছা, লেটস ডু ওয়ান থিং, ডিএনএ টেস্ট! তারপর আমি বিশ্বাস করব।
একটু চুপ করে থাকে শর্মিলা।
তারপর বলে, ‘আমি ঠিক, তুমিও জানো, কিন্তু অগ্নিপরীক্ষা দিতে দিতে আমরা মেয়েরা ক্লান্ত…এক কাজ করো…তুমি এই বাড়ি ছেড়ে চলে যাও…হোম লোন জয়েন্টলি নেওয়া, তাই এটা যতটা তোমার বাড়ি, ততটা আমারও। আর হ্যাঁ, বাকিটা,পরে হিসেব নিকেশ হবে…’

সীতা থেকে শুরু প্রতিনিয়ত পরীক্ষার…তবে..শর্মিলা আজ পেরেছে…।।

#২
জমে উঠেছে পার্টি। রঙিন পানীয় আর সুখাদ্যে মাতোয়ারা গোটা পার্টি হল। ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে নিজের হাতের রেড ওয়াইনে চুমুক দিতে দিতে দূরের বাড়ি গুলোর দিকে তাকাচ্ছিল বিদিশা। একটা হাল্কা হাওয়া দিচ্ছে…দূরের বাড়িগুলো যেন ছোট ছোট জোনাকির মতো লাগছে।
মাথাটাও টিপটিপ করছে। আজ ইউজুয়ালের থেকে কয়েকটা বেশি ড্রিংক নেওয়া হয়ে গেছে ওর। অল্প অল্প দুলছে মাথাটা ওর।
হঠাৎ মনে হলো, পেছনে কে যেন এসেছে। ঘুরে দেখার আগেই বুঝতে পারল পেছন থেকে জড়িয়ে ধরেছে ওকে। প্রবাল। আবার এসেছে ওর কাছে!
‘তুমি এখানে কেন বিদিশা? এই শাড়িটাতে তোমাকে পুরো আগুন লাগছে…’
একটু শক্ত হয়ে যায় বিদিশা। আগে শুধু মেসেজ করত এখন ফিজিক্যালি অ্যাবিউজ করছে…।
কয়েক সেকেন্ড পরেই ঘুরে দাঁড়িয়ে ঝাড় লাগাতে যাবে, দেখে সামনে অর্পণ।
‘বাহ্, হ্যাভিং ফান, ইউ টু?’ চোখে আগুন নিয়ে বলল অর্পণ।
‘প্লিজ, তুমি যেটা ভাবছ, সেটা না, আই ওয়াজ স্টান্ডিং অ্যালোন…এন্ড দেন হিন কেম…’ বলল বিদিশা।
প্রবাল চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে।
‘শাট আপ, আমি যেটা দেখেছি, সেটা তো ভুল না…। ইউ…ইউ…’ রাগে কিড়মিড় করে বলল অর্পণ।
একটু চুপ করে থাকল বিদিশা। প্রবাল অন্যদিকে তাকিয়ে আছে, যেন কিছু জানেই না।
‘আমাকে অ্যাবিউজ করবে না প্লিজ। তোমার বন্ধু আমাকে অনেকদিন ধরেই ডিস্টার্ব করছে আর তুমি নিজেও সেটা জানো। যদি কিছু বলতে হয় ওনাকে বলো, আর ওটাও বলে দিও মলেস্টেশান কত বড় একটা ক্রাইম।’
বিষ দৃষ্টি হেনে সামনে থেকে সরে যায় বিদিশা।
অহল্যা মেনে নিয়েছিলেন, বিদিশা আর চুপ থাকবে না।

#৩
চুপচাপ বসে আছে পামেলা, ঘরে এলো আদিত্য।
‘এই যে তুমি এখনো রেডি হওনি? লোকজনের সামনে ন্যাকামি করবে না’ বিষের মতো গলায় চলে গেল ও।
আজ আরো একটা পার্টি। কিন্তু আজ ও পারছে না একদম। এই শিফন শাড়ি পরে হেসে হেসে পার্টি অ্যাটেন্ড করা, আদিত্যর বসেদের সাথে ফ্লার্ট করা..আর পারছে না ও।
অথচ, না পারলেও হবে না। আদিত্যর হুকুম। না মানলেই গালিগালাজ। ওর রূপের জন্যই নাকি বিয়ে করেছিল ওকে।
বাথরুমে যাবে ভাবছে, ঘরে এলেন শাশুড়ি মা।
‘বাবু বলল তাড়াতাড়ি রেডি হতে,দেরি না হয়ে যায়… ওঠো তুমি’ কর্কশ স্বরে বললেন উনি।
মাথাটা ঘুরে উঠল আরো একবার। তারমধ্যেই একটু সামলে নিয়ে পামেলা বলে উঠল ‘আমি আজ কোথাও যাব না…আর শুধু আজ না, কোনোদিনই যাব না। আমার ঘেন্না করে এইসব জায়গায় যেতে। আপনার ছেলেকে বলে দিন।’
দ্রৌপদীর যুগ আর নেই।
ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স করে দমিয়ে রাখা যাবে না আর পামেলাকে।

#৪
দেওয়ালের দিকে মুখ করে শুয়ে আছে সুমিতা, পেছন থেকে বাবার কন্ঠ ভেসে এলো ‘উঠে একটু চোখে মুখে জল দিয়ে বাইরের ঘরে এসো, নন্দীবাবুরা এসে গেছেন’
শুনেই কাঠ হয়ে গেল সুমিতা।
ও নাহয় একটা ভুল করেই ফেলেছে, তাবলে ভৃঙ্গীকে বিয়ে করতে হবে? সুজয় নন্দীকে পাড়ার সবাই ভৃঙ্গী বলেই ডাকে। পাড়ায় নানা গসিপ ওর নামে। আর তাকেই নাকি সুমিতাকে পার করে দেবার জন্য বাছা হয়েছে?
আয়নায় নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকাল সুমিতা। তিনমাসের অন্তঃসত্ত্বা ও। ওর আর সৈকতের ভালবাসার সন্তান। অন্তত ওর কাছে বড্ড ভালবাসার। তা সে সৈকত যতই ভুলে যাক না কেন। কিন্তু ও অ্যাবোর্ট না করে বাচ্চাটাকে রাখতে চায় বলার পর থেকেই বাবা মায়ের রোষের মুখে পড়েছে। আর, সত্যি বলতে কি মধ্যবিত্ত বাড়িতে সেটা খুব স্বাভাবিক ও। কিন্তু তা বলে একজন নিরাপরাধ মানুষকে…এভাবে…নাহ্, সম্ভব নয় ওর পক্ষে।
যেভাবে ছিল, সেভাবেই বেরিয়ে আসে ও।
কুন্তী চুপ করে ছিলেন, সুমিতা নিজের অপছন্দের কথা বলবেই আজ।

#৫
গত কয়েকদিন ধরেই চুপ করেছিল শ্যামলী। কিন্তু আজ আর পারছে না ও। কাউকে একটা বলতেই হবে ওর মনের কথা। নইলে…এভাবে গুমরে গুমরে মরে যাবে ও।
কিন্তু কাকে বলা যায়?
ভাবতে ভাবতেই মনে পড়ে শবনমের কথা। ওর স্কুলের বন্ধু শবনম, যাকে সব বলা যায়, জাজমেন্টেড হবার ভয় না পেয়ে।
‘শব্বু, আমার খুব দরকার তোকে’ ফোন করেই বলল শ্যামলী।
‘আরে, আমিও ভাবছিলাম তোকে ফোন করব’
‘জানিস, অর্ক…অর্ক আসলে আমাকে ডিচ করেনি, ওকে শুভ আমার আর ওর নামে অনেক আজেবাজে কথা বলেছিল। আর, তুই তো জানিস অর্ক কেমন শুভ অন্তপ্রান ছিল? ও সব বিশ্বাস করে সরে গেছিল চুপচাপ। আর শুভ সেই সুযোগ নিয়ে…আমার বাড়িতে কথা বলে…বিয়ের সব ঠিক করে ফেলল…কিন্তু আমি আজ ই অর্কর মাসির মেয়ের থেকে সব জানলাম। আমি কি করি শুব্বু? সত্যি বলতে কি, আমি এতটাই ডিপ্রেশানে চলে গেছিলাম যে শুভর ব্যাপারে ভাবিইনি কিছু। আমার বাড়ির লোক ও ভেবেছিলেন শুভ কত ভাল ছেলে। একে ভরসা করা যায়…। কিন্তু, এখন আমি কি করে পারব শুব্বু? আমি যে এখনো অর্ক কেই…ওকে এতবার বলেছি, সবাইকে এভাবে বিশ্বাস করো না…শোনেই নি…’ একটানা বলা থামিয়ে চুপ করে শ্যামলী।
একটু থেমে থাকে শবনম। তারপর বলে ‘আশিষের একটা অ্যাফেয়ার চলছে, জানিস? কয়েকদিন ধরেই সন্দেহ হচ্ছিল। আজ প্রমান পেলাম। মেয়েটার নাম্বার ও নিয়ে নিয়েছি, আর চ্যাটগুলোর স্ক্রিনশট ও।’
‘শিট! কি করবি তুই এখন শুব্বু?’
‘আমি আশিষকে বোঝাবো রে…একটা ভুল হয়ত করেছে, কিন্তু এক্ষুণি ছেড়ে যেতে চাইনা। আর শোন, জীবনের শুরু মিথ্যে দিয়ে হতে পারে না। তুই যদি অর্ককে ভালবাসিস এখনও, শুভকে তাহলে বলে দে..’
‘আর তুই ও স্ক্রিনশট গুলো হাতছাড়া করিস না। আমিও অর্কর থেকে পাওয়া শুভর পাঠানো মেসেজ গুলো রেখে দেব যত্ন করে। যাতে পরে কোনো সমস্যায় পড়লে…’
‘সোশ্যাল মিডিয়াতে আপলোড করে দেব..’ হাসিতে ফেটে পড়ে বলে শবনাম। এদিক থেকে যোগ দেয় শ্যামলীও।
তারা এবং মন্দোদরীর কথা সেযুগে কেউ শোনেনি…এই সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে না শুনে উপায় আছে!

(পঞ্চসতী বা পঞ্চকন্যা নামে সুখ্যাত যাঁরা, তাঁদের, বা সনাতনী মূল্যবোধকে আঘাত দেবার জন্য নয় এ লেখা। শুধুমাত্র সামাজিক প্রেক্ষাপট আলোচনার প্রসঙ্গেই এসেছে ওঁদের নাম। কারো ভাবাবেগে কোনোরকম আঘাত লাগলে ক্ষমা প্রার্থনীয়)

বারান্দায় বসে ছিল সুদীপ। হঠাৎ পায়ে পায়ে সামনে এলো বাবিন। দেখে ভুরুটা একটু কুঁচকে গেল সুদীপের। বাবিনের তো এইসময় অনলাইন ক্লাস চলে। এই তো একটু আগেও শুনছিল ও, মোবাইলে ক্লাস করছে বাবিন। দেড়টা পর্যন্ত চলার ও কথা। তাহলে কী হলো?

“কি হলো বাবা? ক্লাস শেষ?” জিজ্ঞেস করল সুদীপ। আজকাল নিজের চিন্তাতে এত ব্যস্ত থাকে, ছেলের রুটিনে চেঞ্জ হয়েছে বোধহয়, আর ও খেয়াল ই করেনি!

“বাবা, মিস তোমার সাথে একটু কথা বলবেন…” বলে ফোনটা বাবার হাতে দিয়ে ঘরে চলে যায় বাবিন।

কাঁপা কাঁপা হাতে ফোনটা নেয় সুদীপ।

মিস কথা বলবেন, মানে? এমনিতে বাবিন খুব ভালো বাচ্চা। খুব একটা দুষ্টুমি করেনা। বায়নাও নেই তেমন। আগে মাঝে মাঝে বাইরে খাবে বায়না করত, এখন তো করোনার জন্য সব বন্ধ। তা, সেই ছেলের জন্য নালিশ আসার সম্ভাবনা তো প্রায় নেই বললেই চলে!

তাহলে?

তাহলে একটাই মানে…হয়ত স্কুলে কোনো প্রজেক্ট ওয়ার্ক বা কিছুর জন্য টাকা দিতে হবে।

দুমাস আগে চাকরিটা চলে গেছে সুদীপের। হাত একদম খালি প্রায়। প্রফিডেন্ড ফান্ড থেকে টাকা তোলার জন্য অ্যাপ্লাই করেছে, এই সময়ে আবার টাকা চাইলে…আর দিতে না পারলে তো খুব ই লজ্জার বিষয় হবে।

মধ্যবিত্ত হবার কি কম জ্বালা?

ভাবতে ভাবতে ফোনটা কানে দেয় সুদীপ।

“হ্যালো ম্যাম? বলুন…আমি অর্ণবের বাবা বলছি।”

“নমস্কার মি. সেন…ভালো আছেন?”

“হ্যাঁ ম্যাম…আপনি ভালো তো?”

“হ্যাঁ…আসলে আপনাকে একটা কথা বলার ছিল…”

এই রে!

“হ্যাঁ ম্যাম…বলুন, প্লিজ…”

মিস একটু চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন।

“আসলে, অর্ণবদের একটা হোম ওয়ার্ক দেওয়া হয়েছিল। বাংলা রচনা লেখার। সেই লেখাটা আপনাকে পাঠাতে চাই। আপনার ইমেল আই ডি টা একটু আমার এই নাম্বারে মেসেজ করে দেবেন, প্লিজ?”

যাক! টাকা লাগবে না তাহলে!

“নিশ্চয়ই…আমি এক্ষুণি দিচ্ছি…”

“ভালো থাকবেন। রাখি, কেমন?” বলে ফোন রেখে দেন উনি।

একটু পরে মোবাইলে টিং করে আওয়াজ শুনে সুদীপ খোলে ইমেল টা।

বাবিনের কাঁচা কাঁচা হাতে লেখার ছবি তুলে পাঠানো….বাবিন হয়ত লিখে তারপর ছবি তুলে পাঠিয়েছিল মিস কে।

“আমার জীবনের স্বপ্ন
আমার অনেক স্বপ্ন আছে। আমি চাই আমাদের এই সুন্দর পৃথিবীতে খুব তাড়াতাড়ি সব বাজে রোগ সেরে যাক। এখানে যেন কোনো গরীব মানুষ না থাকে, সবাই যেন পেট ভরে খাবার পায়। আর কোনো পশু যেন আমাদের অত্যাচারের জন্য মারা না যায়।

তবে, আমার জীবনের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন আমার বাবাকে নিয়ে। আমার বাবা অনেকদিন অফিস যাচ্ছেন না। একদিন বাবা ফোনে একজন কাকুকে বলছিলেন “এই বিপদের মধ্যে, জিনিসপত্রের এত দাম, তার মাঝে মালিক চাকরিটা খেয়ে নিল…কিভাবে চলব..”, মাঝে মাঝেই আমি দেখি বাবা আর মা নিজেদের মধ্যে কিছু আলোচনা করছেন। বাবা বা মা ঘরে একা থাকলে এই গরমের মধ্যেও ফ্যান চালান না, লাইট জ্বালান না। কিছু জিজ্ঞেস করলে বলেন “ঠান্ডা ঠান্ডা লাগছে” বা “চোখে আলো লাগছে”, “মাথা ধরেছে”…। মা বলেন “সব ঠিক হয়ে যাবে…”, বাবা শুনে মাথা নাড়েন।

তাই আমি খুব তাড়াতাড়ি বড় হতে চাই। যাতে আমি একটা চাকরি করতে পারি। তাহলে আমি বাবাকে একটা এসি কিনে দেব। মা কে একটা নতুন, দেওয়ালে লাগানো টিভি কিনে দেব। আর বাবাকে অনেক টাকা হাতখরচ দেব, যাতে বাবা কোনো চিন্তা না করেন, একা একা বারান্দায় বসে।”

পড়তে পড়তে চারিদিকটা একদম ঝাপসা লাগছিল সুদীপের। ছেলেটা…এই সেদিন হলো…সাদা তোয়ালে মুড়ে বাড়ি আনা হলো…
হামা দেওয়া…হাঁটি হাঁটি পা পা…

কবে এত বড় হয়ে গেল? এমন ভাবে ভাবতে শিখল?

ভাবতে ভাবতে, নিজের অজান্তেই চোখ থেকে জল পড়ছিল সুদীপের।

হঠাৎ টের পেল বাবিন এসে ছোট্ট ছোট্ট দুটি হাত মেলে জড়িয়ে ধরেছে বাবাকে। সেই দুটি হাতে অভয়বানী। সব ঠিক হয়ে যাবার…ভালোবাসার দিন ফিরে আসার…।

বাবিন না… এ যেন কোনো মহামানব… ভেঙে পড়া লতাকে আশ্রয় দিচ্ছেন, শালপ্রাংশু, মহাভুজ হয়ে…।

আহা রে জীবন

আটদিনের মাথায় বিদিশা আর নির্মাল্যের
ওয়েডিং।এরেঞ্জন্ড ম্যারেজ।সেই ভাবে ওরা
একে অপরের সাথে বিশেষ পরিচিত নয়।শুধু ফোনে কথা বললে,বা হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ থাকলে,কিম্বা একদিন একটা কফিহাউসে বসে কিছুক্ষন সময় কাটালে কী আর বোঝা যায় ওদের কতটা কী মেলে!তাই চাইলো বিবাহের আগে একটা
দিন একসঙ্গে দূরে কোথাও বেরিয়ে আসে।তাতে করে ওদের মধ্যে সম্পর্কটাও অনেক সহজ হয়ে উঠবে।আর তাই দুজনে মিলে লংড্রাইভে যাওয়ার হঠাৎ প্ল্যানটা করলো।

রবিবার।ছুটির দিন।সকাল আটটার দিকে নির্মাল্য, বিদিশাকে ওদের বাড়ি থেকে পিক করলো।গন্তব্য অজানা।যতদূর দুচোখ চায়।সুজুকি ডিজায়ারটা এই মাস খানেক হলো নির্মাল্য নিয়েছে।প্রথমবার লংড্রাইভে যাচ্ছে সেটাকে নিয়ে।শীতের সকাল।বাইরে হাল্কা কুয়াশা তখনও আছে।গাড়ির কাঁচটা ওপর অবধি টেনে দিয়ে যাত্রা শুরু হলো।তখন
সবে মায়াপুরটা পেরিয়েছে,নির্মাল্য বলল-‘কফি খাবে?’বিদিশা কাঁচের বাইরে দেখতে পেলো বড় রাস্তার পাশে দু একজন মাটির ভাঁড়ে চা খাচ্ছে।ও নির্মাল্যকে বলল-‘মাটির ভাঁড়ে কখনো চা খাইনি।খাবে তুমি?’নির্মাল্য বলল-‘কেনো নয়।চলো তাহলে নামা যাক।’কথাটা বলে রাস্তার এক পাশে গাড়ি পার্ক করে দুজনে একজন চা ওলার কাছ থেকে
মাটির ভাঁড়ে চা নিলো।শীতের দিনে ভাঁড়ে গরম চা খাওয়ার অনুভূতিই আলাদা।বিদিশা প্রথম চুমুকটা চা এ দিয়ে -‘ওয়াও’ বলে উঠলো।নির্মাল্য জিজ্ঞেস করলো-‘এই প্রথমবার?’বিদিশা হাসি মুখে বলল- ‘হ্যাঁ.. বিয়ের পর আমায় কিন্তু মাটির ভাঁড়ে চা
খাওয়াতে নিয়ে বেরোতে হবে।’নির্মাল্য বলল
-‘আমার রোজগেরে অভ্যেস।দারুন লাগে। যাক এবার থেকে একজন সঙ্গীকে সাথে পাওয়া যাবে। ‘বিদিশা বলল-‘প্রতিদিন কিন্তু।’নির্মাল্য বলল- ‘একদম।প্রতিদিন।’

চা পান করে আবার গাড়ি ছাড়লো।কিছুটা গিয়ে এক জায়গায় ট্রাফিক জ্যামের মধ্যে তারা পড়লো।গাড়ির উইন্ডক্রিনের সামনে চোখে পড়লো,দুটো বাচ্ছা,গায়েতে ময়লা জামাকাপড়,হাতে কয়েকটা রাস্তায় পড়ে থাকা রঙবেরঙের ছেঁড়া কাগজ,ছোটো ছোটো বাক্স ইত্যাদি নিয়ে রাস্তা পেরোচ্ছে নির্মাল্য, বিদিশাকে বলল-‘দেখেছো,ওই সব বাচ্ছাগুলোর জীবন।’বিদিশা বলল-‘সত্যি।ওদের অবস্থা দেখলে কেমন একটা লাগে। গিল্টি ফিল হয় এটা ভেবে যে,আমরা কত সুখে আছি তাও..।’ নির্মাল্য বলল- ‘চলো, গাড়িটা কোথাও সাইড করে ওদের কিছু
কিনে দিই।একদিন ওদের জন্য অন্তত কিছু কিনে
দিতে পারলেও ভালো লাগবে।’

দুজনে লক্ষ্য রাখলো ছেলেগুলো কোন দিকে গেলো।জ্যাম কাটতে ওরা সেই রাস্তা নিলো।গাড়িটা একটা ফাঁকা জায়গা দেখে সাইড করে রেখে গেলো।কিছুটা হাঁটবার পর ছেলেগুলোর দেখা পেলো।ওরা তখন মোট চারজন।একটা বন্ধ বাড়ির দরজায় বসে কে কী নিয়ে এসেছে সেই সবেরই
হিসেব চলছিলো।বিদিশা তাদের প্রথম ডেকে বলল-‘এই,তোমরা কী করছো?’ ওদের মধ্যে একজনের হাতে নতুন একটা জামা ছিলো,আর একজনের হাতে ক’টা মোমবাতি।ওরা দুজন কাঁদন মাদন হয়ে বলে উঠলো-‘আমরা চুরি করিনি দিদি..’
বিদিশা বলল-‘শান্ত হও।আমি কী বললাম তোমরা চুরি করেছো?’ তখন ওদের মধ্যে একজন বলল-‘ এই জামাটা আমরা সব বাচ্ছারা মিলে পয়সা জমিয়ে জমিয়ে কিনেছি।’ এবার নির্মাল্য বলল- ‘কার জন্য নিয়েছো এটা?’ওদের একজন বলল- ‘আজ আমাদের বোন মুনির জন্মদিন।ওর জন্যে
এটা কিনেছি।’নির্মাল্য বলল-‘জন্মদিন?আমাদের নিয়ে যাবেনা?’ওদের একজন হাসি মুখে চোখ বড় বড় করে বলল-‘তোমরা যাবে?খুব আনন্দ হবে তাহলে।’নির্মাল্য আর বিদিশা মিলে ঠিক করলো মুনির জন্ম দিনটা ওরাও ওই বাচ্ছাগুলোর করে পালন করবে। কেক নিলো,নতুন জামা, জুতো, আরও কত কী খেলনা নিয়ে ওই বাচ্ছাগুলোর সঙ্গে
ওরা ওদের থাকবার জায়গায় গেলো।

ওরা বাচ্ছাগুলোর সঙ্গে গিয়ে ওদের যে থাকবার জায়গা দেখলো তাতে সত্যি চোখে জল এসে যাওয়ার মত কথা।ওই মানুষগুলোর এক জীবন আর..ভাবাই যায় না।মুনিকে নিজের হাতে বিদিশা নতুন জামা পড়ালো।সবাই মিলে কেক কাটলো, খাওয়া দাওয়া করলো,আনন্দ করলো,নাচলো,কত কত ছবি তুললো।ফেরার সময় ওই নির্ভেজাল মনের মানুষগুলো বিদিশা আর নির্মাল্যকে প্রান ভরে আশীর্বাদ করলো-‘তোমরা দুজনে অনেক সুখী হবে।গরীবের এই এইটুকু আশীর্বাদ রইলো।’

ওরা শেষবার ‘বাই’ করে গাড়িতে ফিরে এসে ফের সামনের দিকে রহনা দিলো। দুজনের মনেই তখন যেন বিরাট একটা প্রশান্তির হাওয়া।জীবনটা দারুন সুন্দর মনে হচ্ছে।বিদিশা বলল-‘আমরা যখনই সুযোগ পাবো,এই সব মানুষগুলোর কাছে আসবো হ্যাঁ?’ নির্মাল্য বলল-‘তোমার মনটা সত্যি সুন্দর।’ ‘বিদিশা বলল-‘তোমারও..।’ বিকেল হবো হবো।তখন ওরা কতুলপুরে। বিদিশা দেখতে রাস্তার মোড়ে একজন গ্যাস বেলুন বিক্রি করছে।বিদিশা, নির্মাল্যর কাছে বাচ্ছা মেয়ের মত আবদার করলো
-‘বেলুন কিনে দেবে?’নির্মাল্য হেসে বলল-‘বাচ্ছা মেয়ে নাকি?’বিদিশা বলল-‘বাচ্ছাই তো।দেখছোনা, এখনো ভালো করে চুল জড়াতে পারিনা।হাতে নেলপলিশ লাগাতে পারিনা।’নির্মাল্য হা হা করে হেসে বলল-‘হায়রে!এমন বাচ্ছা মেয়েটাকে নিয়ে আমায় সংসার করতে হবে।’বিদিশা বলল-‘আমি এমনই থাকতে চাই সারাজীবন।’ নির্মাল্য বলল- ‘থাকবে।কে বারণ করবে।।’

গ্যাসবেলুন কিনে সেগুলো গাড়ির সামনে ঝুলিয়ে ফের গাড়ি ছাড়লো।নির্মাল্য বলল-‘এই মানুষটার সাথে থাকা যাবেতো?’বিদিশা বলল-‘আমি রান্না পারিনা।সকালা ঘুম থেকে উঠতে পারিনা।গুছিয়ে কখনো কথা বলতে পারিনা।আর মাঝে মধ্যে রাতে
ভুল বকার অভ্যেস আছে।স্বপ্ন দেখি বলে।এবার বলো তুমি থাকতে পারবে তো?’ নির্মাল্য বলল- ‘ঘুমের ঘোরে লাথি মারার অভ্যেস নেই তো?’বিদিশা বলল-‘বিয়ের খাটটা একটু বড় সাইজের কিনবে।তাহলে এক আধবার যদি পাও চলে যায় তো নীচে
পড়বার ভয় থাকবেনা।’নির্মাল্য ভ্রু চাগিয়ে বলল- ‘বাবা!এতো বিয়ে নয়,আমি যুদ্ধ করতে নামছি।’

জয়পুর জঙ্গলের সীমানা এসে পড়লো ওদের সামনে।ক্রমে জঙ্গলের প্রাকৃতিক শোভা আরও ঘনীভূত হলো।নির্মাল্য বলল -‘এখানে একটু নামি চলোনা।’বিদিশা বলল-‘আমি তোমাকে এটাই বলব ভাবছিলাম।’বিদিশা গাড়ি থেকে নেমে পাখিদের মিষ্টি আওয়াজের তালে তালে শিসের ধ্বনি দিতে লাগলো।হাত প্রসারিত করে ওর ইচ্ছে হলো পুরো জঙ্গলের গাছপালাগুলোকে ও ওর বুকেতে নিয়ে ফিরতে।নির্মাল্য,গাড়ির সামনে থেকে গ্যাসবেলুন গুলো নিয়ে এসে বলল-‘এই নাও,এগুলো উড়িয়ে দাও এখানে।’বিদিশা নির্মাল্যর হাতটা মুঠোয় ধরে বলল-‘একা কেনো।এসো,একসাথে ওড়াই।’বেলুন
গুলো ধীরে ধীরে পাতাদের আড়ালে চলে গেলো।বিদিশা আচমকা নির্মাল্যকে জড়িয়ে বলে উঠলো- ‘আজকের দিনটা স্পেশাল।’নির্মাল্যর দুটো খোলা হাত তখন বিদিশাকে বাঁধনে জড়ালো।নির্মাল্য বলল-‘তুমিও খুব স্পেশাল আমার জন্য।’

বিকেল সরে গোধূলি নেমে এলো।আর সমুখে নয়।যা মেলানোর ছিলো প্রায় সবই দুজনের মিলে গেছে।এবারে তাই ঘরেতে ফেরবার পালা।গাড়িতে বসে নির্মাল্য বলল -‘সোয়টারটা চাপিয়ে নাও।’ বিদিশা গায়ে সোয়টার পড়ে নিয়ে বলল-‘বিয়ের আগে আর একদিন বেরোনো যায়?’ নির্মাল্য বলল- ‘কোথায় যেতে চাও।’ বিদিশা বলল-‘যেখানে খুশি।’ নির্মাল্য বলল-‘তবু বলো কোথায় যেতে চাও।’ বিদিশা বলল-‘যেতে চাওয়াটা আমার লক্ষ্য নয়।তুমি ছেলেটার সাথে আরও টাইম স্পেন্ড করতে ইচ্ছে হচ্ছে।’ নির্মাল্য কথাটা শুনে বেশ আবেগে ভাসলো।বলল-‘বাকিটা জীবন তো আমার সঙ্গেই। অনেক সময় পাবে কাটানোর।’ বিদিশা তখন নির্মাল্যর সীটের দিকে ঘেঁষে এসে ওর কাঁধের কাছে মুখটা বাড়িয়ে বলল-‘এমনই থাকবে তো?বিয়ের পর বদলে যাবে নাতো?’ নির্মাল্য বলল-‘

“জীবন যদি অন্যরকমও হয়
প্রত্যেকদিন,প্রত্যেকটা রাতে
বদলে যাব নতুন ভীড়ের মুখে
তোর সঙ্গে যুগের সাথে সাথে”

বিদিশা স্টিয়ারিংএ নির্মাল্যর হাতটা ছুঁয়ে বলল-
“এই জন্মই শুধু কেনো,পরজন্ম পাই যদি
তোমার ভালোবাসায় হবো খরস্রোতা নদী”

আটদিন পরে ওদের শুভবিবাহের দিন অপেক্ষা
করলেও,ওদের অন্তর মিলনের প্রক্রিয়া ততক্ষনে
সম্মন্ন হয়েছে মঙ্গলময় ভাবেই।

কিছুতেই চোখের পাতা এক করতে পারছে না আবহ। ট্রেনের সেকেন্ড ক্লাস এসি তেও ঘেমে যাচ্ছে আবহ। মিটিং সেশন এ বার বার করে চাইছিল দার্জিলিং প্রজেক্ট টা ওর হাতে না পড়ে। শেষ রক্ষা আর হলো না। ফাইল টা আবহ সেন নামেই সাইন হলো। সেদিন থেকে ঘুম উড়ে গেছে ওর। এক একবার ভেবেছে রিজাইন দিয়ে দেবে। এত ঘেন্না জন্মেছে ওর এই দু বছরে তার উত্তর একজন ই দিতে পারবে হয়তো। অথচ কত ভালোলাগার জায়গা ছিল দার্জিলিং। শুধু ভালোলাগা না ভালোবাসা ছিল অনেক। সেই টানে অগুনতি বার ছুটে গেছে। জুলাই মাস টা বাঁধা ধরা সময় ছিল ওর। দার্জিলিং এর বৃষ্টি ওর প্রথম প্রেম। কপালের বিন্দু বিন্দু ঘাম মুছে উঠে বসলো। কাচের জানালার বাইরে কিছুই দেখা যায় না। ছুটে চলেছে ট্রেন রাতের অন্ধকারের সব নিস্তব্ধতা লঙ্ঘন করে। নিশ্বাস রুদ্ধ হয়ে আসছে যেনো আবহর। কেনো করলো শ্রীপর্ণা এরকম। ওদের গল্পটা তো এরকম না হলেও পারতো। কেন আবহকে দেওয়া কথা রাখলো না? নাহ্ এসব ভাবতে গা গুলিয়ে উঠছে আবহর।
########################

ডব্লিউ বি সি এস এর কোচিং এ প্রথম শ্রীপর্ণা কে দেখে আবহ। সকাল থেকেই সেদিন মেঘ করেছে। কোচিং এর বিল্ডিং এ ঢুকেই হুড়মুড় করে বৃষ্টি নামলো। ক্লাস শুরু তখনও হয়নি। এক্সকিউজ মী বলে পাশে এসে বসেছিল শ্রীপর্ণা। নীল রঙের চুড়িদার পড়া,কপালে ছোট্ট টিপ, চোখে কাজল, কি যে লাস্যময়ী লাগছিল ওকে। দু গাল বেয়ে জল মাথার থেকে গড়িয়ে পড়ছে। ও খানিক অস্বস্তি বোধ করেছিলো ঐভাবে আবহর তাকানোতে। তারপর অনেক বৃষ্টি ঝরে গেছে প্রেম হয়ে আবহ আর শ্রী এর জীবনে। সেবছর চাকরি পাবার পর ই ঠিক করে আবহ আর একবার ভিজবে বৃষ্টি তে তবে আর কলকাতা নয় দার্জিলিং এ, তার স্বপের পাহাড়ে, আর সাথে থাকবে তার স্বপ্নসঙ্গী শ্রী। শ্রী প্রথমে রাজি হয়নি। তারপর আর না করতে পারেনি,বিয়ে তো তারা এই বছর ই করবে না হয় প্রেম টা কে আর একটু উন্নত করে নেওয়া।
#######################
ঠিক দু বছর আগে দার্জিলিং মেইল এ রওনা দিয়েছিল ওরা। সেদিন ও টুপটুপ করে বৃষ্টি পড়ছিল। সারারাত শ্রী আবহকে ঘুমোতে দেইনি। এক চাদরে মুড়ি দিয়ে লোয়ার বার্থ এর পর্দা টেনে জানালার কাঁচের বাইরে রাতের অন্ধকার কে গ্রাস করে যাচ্ছিল দু জোড়া চোখ। কাঁচের জানালা বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছিল। শ্রী কে জড়িয়ে ছিল আবহ। এন জে পি তে নেমেই পার্সোনাল কার ওদের নিয়ে চলল উপরে। আবহর কোলে মাথা রেখে বৃষ্টিভেজা পাহাড় গুলোতে দৃষ্টিনিবদ্ধ রেখেছিল শ্রী আর আবহ সেই প্রথমবার ওই নৈসর্গিক সৌন্দর্য উপভোগ করছিল তার স্বপ্নপরী র সাথে। এই সময় যদি থমকে যেত প্রশ্ন করেছিলো শ্রী কে। কোনো উত্তর না দিয়ে একবার তাকিয়েছিল শ্রী। কত মায়া জড়ানো ছিল সে চোখে আজও ভুলতে পারেনি আবহ।
হোটেল পৌঁছেই বৃষ্টি বাড়তে থাকে হালকা কুয়াশার মত মেঘ জড়িয়ে রেখেছিল সারা দার্জিলিং টাকে। শ্রী ফ্রেশ হয়ে আবহ কে জড়িয়ে ধরেছিল। আর আটকাতে পারেনি নিজেকে আবহ। কাছে টেনে হাজার চুম্বন এঁকে দিয়েছিল শ্রী র কপালে পুরো পাহাড় কে সাক্ষী রেখে। আদর মেখে যখন উঠল বিকেল গড়িয়ে গেছে তখন। সেবার আবহ আর শ্রী র দু বছর পূর্ণ হয়েছিল। কেভিন টারস গিয়ে টেবিল সাজিয়ে আর একবার প্রপোজ করেছিলো আবহ। শ্রী বলেছিল ইয়েস আই উইল ম্যারি ইউ। পাশে বসা গুটি কয়েক লোকের তালিতে সেদিন যেনো কিসের অধিকারবোধ পেয়ে গেছিলো আবহ।
#####################
এন জে পি পৌঁছে গেছে ট্রেন। এবার অফিসের কর্মী একজন রিসিভ করতে এসেছে। ট্রলি টানতে টানতে ওর পিছন হাটতে থাকলো আবহ। এতদিনের চেনা রাস্তা গুলো সব ঘুরপাক খেতে থাকলো আবহর। গাড়িতে বসেই সিগারেট ধরালো। মাথা ধরে আছে পুরো। ড্রাইভার কে স্টার্ট করতে দিয়ে কাচের জানালা ঘেঁষে বসলো। মেঘ করে আছে সেদিনের মত। মনে হচ্ছে শ্রী আজও মাথাটা বুকে রেখে প্রকৃতি দেখছে। বুকটা কেমন কাপছে ওর। আবার ডুবে গেলো পুরোনো দিনে। সেবার রক গার্ডেন এ শ্রী চিৎকার করে বলেছিল আমি শুধু তোমার আবহ। পাহাড় ওর ডাক শত বার প্রতিফলিত করে বলেছিল যেনো বেশ তাই হোক। ম্যাল এর রাস্তায় আবহ শ্রী র হাত দুটো জড়িয়ে ধরে বলেছিল আমাকে ছেড়ে যেও না শ্রী। শ্রী উত্তরে বলেছিল তুমি কি পাগল? হ্যাঁ, পাগল ই তো পাগল বলেই তো এত কিছুর পর তুমি ছেড়ে গেলে শ্রী। আমার এত প্রেম অস্বীকার করে গেলে। সিগারেট টা শেষ, জ্বলন্ত শেষ ভাগ আঙ্গুলের ডগা পুড়িয়ে দিল। ঝম ঝম করে বৃষ্টি নেমেছে, ড্রাইভার গাড়ি দাঁড় করিয়ে দিল এত বৃষ্টি তে ওপরে ওঠা বিপজ্জনক।
######################
হোটেল এ পৌঁছতে বিকেল গড়িয়ে এলো। আবহ লাঞ্চ টা দিয়ে যেতে বলে জানলার পর্দা টা সরিয়ে দিলো। মনে হলো পাহাড় ওর জানালার কাছে এসে বলছে শ্রী এখনও কি তোমার আছে আবহ? পর্দা টা সরিয়ে দিলো আবার। বুক ফেটে কান্না এলো একরাশ। লাঞ্চ সেরে ড্রিঙ্কস অর্ডার করলো ও। বাইরে বেরোনোর প্রশ্নই ওঠে না। রিসেপশন এ একবার ফোন করে বললো মিস্টার কাপাডিয়া এলে যেনো রুম নং ১৪ তে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। নরম বিছানায় নেশাগ্রস্ত শরীর এলিয়ে দিল। মনে পড়ছে সেদিন ভিক্টোরিয়া তে ওদের শেষ দেখা হওয়া দিন টা। শ্রী এর বাবা অনেক মেনেও রাজি হননি আবহ র সাথে বিয়েটা নিয়ে। শ্রী তার মধ্যে সুইসাইড এটেম্পট করার চেষ্টাও করেছে। আবহ গিয়েছিল হসপিটাল এ। সবার সামনে চরম অপমান করে তাড়িয়ে দিয়েছিল শ্রী র বাবা। বুঝতে পারছিল না কি করবে আবহ। বাইরে অঝোরে বৃষ্টি হচ্ছে। হসপিটাল এর বাইরে বসে পড়েছিল আবহ। আকাশের একরাশ বৃষ্টি কে বলেছিল শ্রী র জীবন ভিক্ষে দাও। বৃষ্টি ওর কথা রেখেছিল। সুস্থ হলে যেদিন আসে আবহ ওর হাতে মাথা রেখে ডুকরে কেদে উঠেছিল। শ্রী র চোখে জল বাঁধ ভেঙেছিল। বৃষ্টি নেমেছিল সেদিনও। দুজনে বৃষ্টির কাছে ওদের সব প্রেম জমা রেখেছিল এই জনমের মত। না আর শ্রী র সাথে দেখা করেনি আবহ। ওর বাবা র পছন্দ করা ছেলেকেই বিয়ে করেছে ও। আজ ও সুখী কিনা তার খবর ও রাখেনি।। মনে মনে চেয়েছে প্রতি বৃষ্টির দিন শ্রী যেন ভাল থাকে। একমাত্র বৃষ্টি চেনে আবহ কে শ্রী র মত করে।
###################
সন্ধ্যে কখন হয়েছে জানা নেই। ডোর বেল এর আওয়াজ এ ঘুম ভাঙলো আবহ র। ওয়েটার মিস্টার কাপাডিয়া কে নিয়ে ঢুকলো সাথে দু কাপ কফি। আলিঙ্গন সেরে বিজনেস ডিল করে নিল আবহ। কথা হলো কাল সার্ভে তে যাবে। কাপাডিয়া বিদায় নিল। হোটেল এর বারান্দায় এসে দাড়ালো একটা সিক্ত হাওয়া এসে হালকা বৃষ্টির ছাঁটে ভিজিয়ে দিল ওর শরীর। উল্টোদিকে ফিরেই বিদ্যুতের শিহরণ খেলে গেল শরীরে। একি শ্রী এখানে। ওকে মনে হয় দেখেনি। ওটা তবে শ্রী র ই মেয়ে হবে। মা হয়ে গেছে শ্রী। আগের মতোই আছে। মাথার সিঁদুর আরো লাস্যময়ী করে তুলেছে ওকে। একটা পুরুষালি কণ্ঠে সম্বিত ফিরল। কি হলো শ্রীপর্ণা ঘরে এসো ভিজে যাবে তো। চোখ তুলে দেখে আবহ দাঁড়িয়ে। এ কি দেখছে শ্রী। বাকরুদ্ধ দুজনেই।
######################
– কেমন আছো শ্রী? চিনতে পারছ?
– আবহ তুমি এখানে?
– হ্যাঁ, প্রজেক্টের কাজ তাই।
– ওহ্। চোখ নামিয়ে শ্রী বলে ভালো আছো আবহ?
– যেভাবে তুমি রেখে গেছ শ্রী।
– জানো আবহ তোমার নিশ্বাস টা এই পাহাড় এ খুব প্রবল। তাই অক্সিজেন নিতে এসেছি। এই দু বছরে তিন বার এলাম।
– আমি আসিনি শ্রী। প্রজেক্ট না থাকলে কোনোদিন আসতাম না।
– চলো পরিচয় করিয়ে দিই।
– থাক না শ্রী। আমার কল্পনাতে আর একটা মুখ নাই বা আঁকলে।মেয়ের নাম কি রেখেছ?
– বৃষ্টি।

আবহ র সারা শরীর কেঁপে উঠলো। এই নাম ওরা ঠিক করেছিল দার্জিলিং এসে। ততক্ষনে বৃষ্টির ছাঁট ভিজিয়ে দিয়েছে দুজন কে।

আমি তোমাকে এক বুক ভালোবাসা দিতে পারবো না,
কিন্তু যতটা দেবো সেটুকু আমি কাওকে দেবো না।

আমি সব সময় তোমাকে সময় দিতে পারবো না,
কিন্তু যেটুকু দেবো সেটুকু শুধু তোমার।

সবসময় চোখের জল মোছাতে পারবো না,
কিন্তু এমন ভাবে রাখার চেষ্টা করবো যাতে তোমার চোখে কখনও জল না আসে।

পারবো না আমি গোলাপ দিয়ে ভালোবাসা প্রকাশ করতে,
জিনিস টা আমার বড্ড ফিকে লাগে,
কিন্তু গঙ্গার ধরে আমার কাঁধে মাথা রেখে হারিয়ে যেতে দিতে পারি।

ভালোবাসা প্রকাশের জন্য হাত কাটতে পারবো না,
কিন্তু ভালোবাসি বোঝানোর জন্য হাত ধরে শুধু রাস্তা নয় প্রত্যেক টা বাধা পার করে দিতে পারি।

তোমার সকালের রোদ বা রাতের চাঁদ হতে পারবো না,
কিন্তু কোনো গরম দুপুরের স্নিগ্ধ ঠান্ডা বৃষ্টি হয়ে নামতে পারি।

ভালোবাসার পরিণতির কথা দেবো না,
কিন্তু তোমার নিঃসার্থ আমাকে পাওয়ার অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে তোমাকে পরিণীতা বানাতে পারি।

সব সময় তোমাকে মাথায় তুলে রাখতে পারবো না,
কিন্তু তোমার ঠিক ভুল টা ধরিয়ে দিয়ে তোমার পাশে থাকতে পারি।

হ্যাঁ হয়ত আমি তোমার সব ইচ্ছা সম্পূর্ন করতে পারি না,
কিন্তু ইচ্ছা গুলো সম্পূর্ণ করার আবেগ জাগিয়ে রাখতে পারি।

কিভাবে ভালোবাসতে হয় জানি না,
কিন্তু ভালো সময়ে পাশে না থাকি খুব খারাপ সময়ে পাশে থাকতে পারি।

জীবনের সব দুঃখ কষ্ট ভাগ করতে পারবো কিনা জানিনা,
কিন্তু একটা হেড ফোন ভাগ করে নিতেই পারি।

আসলে সত্যি কি জানো আমার ভালোবাসা দেখেনা তুমি কতটা দিচ্ছ বা আমি কতটা দিচ্ছি,
ভালোবাসা পণ্য নাকি যে হিসাব করতে বসবো কে কতটা দিচ্ছে।

আমি শুধু ভালোবাসা মানে এটুকু জানি শেষ পর্যন্ত পাশে থাকতে,
যেই ভালোবাসায় কতটা খুঁজতে যাবে দেখবে সেই ভালোবাসা টা ভালো থাকায় পরিণত হবে।

আর তুমি যখন ভালো থাকতেই চাও তখন আর একটা মানুষ এর কি দরকার?
একা একা ও তো ভালো থাকা যায়, যায় না কি?

দেখো আমার পরিষ্কার কথা,
” অপেক্ষায় ভালোবাসি উপেক্ষায় ভালোবাসি,
অভিসারে ভালোবাসি অনুসারে ভালোবাসি,
শুরুতে ভালোবাসি সমাপ্তিতে ভালোবাসি,
কারণ আমি ভালোবাসায় বিশ্বাসী।”

দেখো একটা ভেঙ্গে যাওয়া ঘরের থেকে একটা সুন্দর সংসার যেমন ঢের ভালো,
তেমনই ছেড়ে যাওয়ার চেয়ে থেকে যাওয়া ঢের ভালো।

কখনও ভালোবাসা টাকে পণ্য নয় ভালোবাসা হিসেবেই দেখো,
দেখবে ভালোবাসা টা দীর্ঘস্থায়ী হবে,
ভালোবাসার ইচ্ছা থেকে যাওয়ার ইচ্ছা টা বেড়ে যাবে,
হাত ধরে রাখার ইচ্ছা টা বেড়ে যাবে,
সবশেষ পরিণতি পাওয়ার ইচ্ছা টা বেড়ে যাবে।

কোনো অভিযোগ রেখো না বিপরীত জনের উপর,
কারণ তুমি নিজেও জানো তুমিও নির্ভুল নও।

সবশেষে ভালোবাসা টাকে ভালো থাকা হিসেবে নয় ভালোবাসা হিসেবেই নাও,
নির্ভুল চেও না ভুল টাকেই ঠিক করে নাও।

প্রাণচঞ্চল, হাসিখুশি মৌবনীর শাশুড়ি মার চরিত্রটি এক্কেবারে তার বিপরীত |তিনি বেশ রাশভারী এবং মিতভাষী | পেশায় ছিলেন একজন স্কুল শিক্ষিকা, বছর খানেক হোলো অবসর নিয়েছেন,শুভ্রাদেবীর কিন্তু সেই রাগী দিদিমনি ইমেজটা থেকে গেছে রন্ধ্রে রন্ধ্রে !প্রায় পাঁচ মাস হতে চললো মৌবনী এবাড়িতে বৌ হয়ে এসেছে কিন্তু এখনো তাদের মধ্যে বেশ দূরত্ব…. মেপে চলা, মেপে কথা বলা এমনকি মেপে মেপে অনুভূতির প্রকাশ ! যা মৌবনীর চরিত্রের সাথে বড্ড বেমানান | ছেলে যখন বছর আটেকের, স্বামী কে হারান শুভ্রা দেবী, জীবনের এই ধাক্কাটাই বোধহয় তাকে বদলে দিয়েছে একলহমায়, সুখী গৃহকোণ থেকে উপড়ে এনে ফেলেছে বাস্তবের কঠিন মাটিতে |তারপর থেকেই শুরু তার জীবন সংগ্রাম…. ছেলে, সংসার আর নিজের চাকরি সামলাতে সামলাতে কখন যে ব্যক্তি শুভ্রাকে হারিয়ে ফেলেছেন সেটা বোধহয় নিজেরও অজানা !
ছেলে অফিসে চলে যাওয়ার পর এখন বাড়িতে থাকে এই দুটি প্রাণী… শ্বাশুড়ি আর বৌমা, কিন্তু বাড়ি প্রাণহীন… নিস্তব্ধ !কথা কাটাকাটি, বাগবিতণ্ডা তো দুরস্ত, প্রাণের আলাপটাও জমে ওঠেনি এখনো | ছটফটে মেয়ে মৌবনী অনেক বারই চেষ্টা করেছে কাছে ঘেঁষতে, আলাপ জমাতে কিন্তু অপরপক্ষের সঠিক সঙ্গত না পেয়ে তার উৎসাহও স্তিমিত হয়ে পড়ে ক্রমশঃ! সবসময়েই এক গাম্ভীর্যের মোড়কে সযত্নে নিজেকে গুটিয়ে রাখেন শুভ্রা দেবী |মৌবনীর বান্ধবীরা বলে,
“বাব্বা তোর শাশুড়ি কে দেখলেই ভয় লাগে রে, এমন রামগরুড়ের ছানার সাথে থাকিস কি করে সারাটা দিন !এর থেকে বাবা ঝগড়ুটে শাশুড়ি ঢের ভালো !”
সেদিন বিকালে মুষলধারে বৃষ্টি, তাই ছাদে যাওয়া হয়নি মৌবনীর, মা এসময় ঘরে বসে গল্পের বই পড়েন, ও গুটি গুটি পায়ে মায়ের ঘরে আসে, “একী মা আপনি এই অসময়ে শুয়ে আছেন? জানালা দিয়ে তো বৃষ্টির ছাঁট আসছে.. “বৌমার সাড়া পেয়ে ক্লান্ত চোখ দুটি ধীরে ধীরে মেললেন শুভ্রা দেবী… চোখ দুটো ছলছল করছে, মুখটাও বেশ শুকনো !কাছে আসে মৌবনী, “কি হয়েছে মা? “হাতে হাত রাখে মৌ, একী গা তো বেশ গরম !আমায় বলেন নি কেন? এভাবে কষ্ট পাচ্ছেন !”
-“কষ্ট পেতে পেতে আমার অভ্যেস হয়ে গেছে গো, এটুকুতে কিছুই হয় না !”
মুখের তির্যক হাসিটা বেশ বুঝিয়ে দিচ্ছে এ তার অভিমানের কথা কিন্তু কার প্রতি এই অভিমান… বোধহয় এই সাদাকালো, কঠিন জীবনটাই তাকে অভিমানী করে তুলেছে ধীরে ধীরে.শিখিয়েছে কঠিন হতে….
মৌবনী ছুট্টে বাইরে আসে মনটা কেমন ভারী লাগে, এই কঠিন মানুষটার চোখদুটো যেন বড্ড মায়া মাখানো লাগলো আজ, এতটা কাছ থেকে তো দেখার সুযোগ হয়নি কখনো !!হাতে একটা জলের বাটি আর রুমাল নিয়ে ফিরে আসে,
“আপনার ছেলেকে ফোন করেছি, ও ডাক্তারের এপয়েন্টমেন্ট নিয়ে রাখবে এখন চুপটি করে শুয়ে থাকুন…. আমি একটু জলপট্টি দিয়ে দি…
আজ ওরা দুজনে খুব কাছাকাছি, এতো কাছে আগে কখনো আসেনি মৌ, মায়ের পাশে বসে, আলতো হাতে ভেজা রুমালটা কপালে রাখে, মাথায় হাত বুলিয়ে দেয় পরম মমতায়, মৌবনী জানে আপনজনদের কিভাবে কাছে টেনে নিতে হয়, কিন্তু শুভ্রা দেবীই এসুযোগ এতদিন তাকে দেননি, নিজের অনুভূতি গুলি সংগোপনে গুছিয়ে রেখেছেন মনের ভিতরঘরে
-“জানিস মৌ তখন আমার ক্লাস নাইন, হঠাৎ ই মা কে হারালাম, তারপর থেকে নিজের ভালো মন্দ বুঝে নেওয়ার দায়িত্ব পড়েছিল নিজের ওপরই,বিয়ের পর ভেবেছিলাম একটা মিষ্টি মেয়ে হবে, স্নেহের পরশে ওই আমায় আগলে রাখবে, কিন্তু সে তো হোলো না, তবে আজ এতদিন পর তোর স্পর্শে মায়ের কথা খুব মনে পড়ছে রে !হারিয়ে যাওয়া মায়ের গন্ধটা আবার পাচ্ছি… হবি আমার মা? “
চোখের কোণ থেকে গড়িয়ে আসা জলটা মুছে দেয় মৌ, দুহাতের মধ্যে যত্ন করে গুছিয়ে নেয় মায়ের হাতটা, “এই মিষ্টি মা টাকে কেন আড়াল করে রাখতে ওই রাগী মায়ের আড়ালে? আমার যে বড্ড ভয় করতো… বুকের খুব কাছে টেনে নেন মৌকে….
ভালোবাসার উষ্ণ স্পর্শে মুহূর্তের মধ্যেই গলে জল হয়ে গেল তাদের সম্পর্কের জমে থাকা বরফটা |

পাড়ার ভিতর বড় বাড়িটার পাশে ছোট বাড়ি টা বড্ড বেমানান। পেস্তা সবুজ রঙের বড় বাড়ি টার মানুষ গুলো আর টালির চালের মানুষ দুটো তো একে বাড়েই আলাদা।তবুও তাদের মধ্যে এক নিবিড় সম্পর্ক।টালির চালের বাড়ির জয়া নামের বউ টা একটা সুন্দর ফুটফুটে বাচ্ছা জন্ম দিল।বর টা সারাদিন প্রচুর খাটে।আর শাম্তশিষ্ট বউ টা সংসার সামলায়।বাচ্চা টার নাম পরী।পরীর মত ই সুন্দর। টালির ঘরে এমন রূপ নিয়ে কিকরে এল পাড়ার সবাই বলে।ঐ পরীর জন্যই পাশের সেন বাড়ির মানুষ গুলো এই বাড়ির লোকের সাথে ভাব জুরলো।সেনবাবুর বিরাট ব্যবসা।সেন গিন্নি রমিতা শিক্ষিত ভদ্র।দুটো ছেলে মেয়ে ।সুন্দর শিক্ষিত মার্জিত।ফুটফুটে পরী কে সবার খুব ভাল লাগতো।রমিতার ছেলে অর্ঘ্য আর মেয়ে ওলি পরীকে বোনের মত ভালবাসতো।জয়া রমিতা কে বলতো দিদি তুমি যেমন করে নিজের ছেলে মেয়ে কে শাসন কর তেমন করে পরী কে ও মানুষ কর।আমি আর পরীর বাবা তো এত কিছু বুঝি না।পরী খুব লক্ষী মেয়ে ।দিন দিন বড় হতে লাগলো।সেন বাড়ি তে তার অবাধ যাতায়াত।অর্ঘ্য চাকরী নিয়ে মুম্বাই চলে গেল আর ওলি হোস্টেলে।রমিতা এখন পরীকে নিয়ে ই সময় কাটায়।এবছর পরীর নাইন হল।পড়া শোনায় বেশ ভাল পরী তার দাদা দিদি দের মত।ওলি বললো মা পরীর জন্য এবার ভাল টিচার রাখতে হবে।আমি আর দাদা যাদের কাছে পড়েছি তুমি তাদের সাথে কথা বল।পরীর সব কিছুর ভাবনা যে রমিতার ।ছেলে মেয়ের মত নিয়ে সব টিচার ঠিক করলো রমিতা।অংক পরীর প্রিয় বিষয়।খুব ভাল নম্বর করে।শহরের নামী বিদ্যালয়ে পড়ে পরী।অঙ্কের টিচার মলয় বাবু পরী কে খুব ভালবাসেন।পরী তুই ১০০ই পাবি মাধ্যমিকে।পরী খুব উৎসাহ পায়।দেখতে দেখতে পরী ১০ উঠলো।খুব মন দিয়ে পড়া করে।কিন্তু গত ক দিন ধরে পরী মলয় বাবুর কাছে যেতে চায় না অংক করতে।গরীব ঘরের মেয়ের বিচার বিবেচনা অনেক বেশী।মলয় বাবু একে ওকে দিয়ে খবর পাঠায়।পরীর মা পরী কে বকে।পড়ায় অবহেলার জন্য।পরী এবার কি করে।তার ওলি দিদি ও নেই।কাকে বলবে এ কথা ।কে বুঝবে।তার সরল শান্ত মা তো কাঁদতে বসে যাবে ।পরী নিরুপায় হয়ে তার বড় মা রমিতা কে গিয়ে বললো।বম্মা _একটা কথা বলবো ।তুমি কি আমাকে বিশ্বাস করবে।রমিতা বললো কি কথা পরী ।যদি বিশ্বাস করার মত হয় তবে ঠিক করবো।তুই বল আগে।পরী অসহায়ের মত করে বললো বম্মা জানো ১০ এ ওঠার পর থেকেই মলয় বাবুর ব্যবহার পালটে যাচ্ছে।কেমন যেন গায়ে হাত বোলায়।সবার শেষে আমাকে ছাড়ে ৭দিন আগে আমাকে বললো দুপুরে পড়তে যেতে।আমি অংক করার লোভে যেই গেলাম ভিতরের ঘরে নিয়ে গেল।বললো আইসক্রিম খাবি ।তার পর বললে পরী তুই দিনদিন দেখতে কত সুন্দর হয়ে উঠছিস।আমার না তোকে খুব আদর করতে ইচ্ছা করে।আমার গালে আঙুল দিয়ে বোলাতে লাগলো।আমার খুব ভয় করছিল বম্মা।আমি বললাম মলয় দা আমার না খুব পেট ব্যাথা করছে।আজ কে আপনি ছেড়ে দিন ।কাল আসবো ।বলে চলে এসেছি।বম্মা কি হবে বল তুমি ।আমি কি করে পড়তে যাব।আমার নিজেকে নিজে ছোট মনে হচ্ছে।রমিতা নীরবে সব কথা শুনলো ।পরী কে বুকে জরিয়ে ধরলো।বললো তুই এই কথা আর কাকে বলেছিস।পরী বললো কাউকে না ।কে বিশ্বাস করবে ।ওনার এত নাম।আমি গরীবের মেয়ে আমার কথা কেউ মানবে না।কি হবে বম্মা ।আমার পরীক্ষার কি হবে।রমিতা বললো আমাকে একদিন ভাবতে সময় দে।তুইচুপ করে থাক।
পড়ের দিন রমিতা পরীকে ডেকে পাঠালো।পরী তোর দাদা দিদির সাথে আমার কথা হয়েছে।দিদি আজই আসছে।তোর পাশে দাড়াতে।কিন্তু সামনে তোকেই থাকতে হবে।আমরা সবাই তোর পিছনে।অলি এসে হাজির।অর্ঘ্য বারবার ফোন করছে।পরী কে বোঝাচ্ছে কি করতে হবে।১দিন পর পরীমলয় বাবু কে ফোন করে বললো আমি পড়তে যাব ।কখন যাব বলবেন।মলয় বাবু খুব বকলো পরী কে ৭দিন না পড়ার জন্য।তারপর বললো অনেক টা পিছিয়ে গেছিস ।আজ দুপুরে আয় ।সেই মত পরী দুপুরে পড়তে গেল।মলয় বাবুর বাড়িতে পড়তে যে শেষে ঢোকে সেই দড়জা বন্ধ করে ।পরী এখন একা ।মলয় বাবু বললো দরজা বন্ধ করেছিস ।পরী বললো হ্যা মলয় দা।চল খুব গরম ভিতরের ঘরে বসি ।ওঘরে এসি আছে।পরী খাটে বসবি আজ।বলে পরীর পাশে গাঘেসে বসলো।আসিস নি কেন ৭দিন ।বল কি ভেবেছিলি পার পেয়ে যাবি।চুপচাপ থাকবি ।একটু আদর করবো তার বদলে তুই কত ভাল নম্বর করবি ভাব একবার।পরী মেনে নেওয়া ছাড়া তোর কোন উপায় নেই।তোর বাবা গরীব কেউ তোদের কথা বিশ্বাস করবে না।আয় কাছে আয়।একটু হাতের সুখ করি।পরী বললো মলয় দা একটু বাথরুমে যাব ।যা যা ঘরের টায় যা।পরী বাথরুমে ঢুকে লুকানো ফোন টা বেড় করলো।একটা মিস কল দিল ।আর অপেক্ষা করতে লাগলো।তার পর ই শোরগোল।অনেক মহিলার গলা।যাক দিদি আর বম্মা এসে গেছে।বাথরুম থেকে বেড়িয়ে দেখে অনেক বন্ধু আর তার মা দের ভীড় রমিতা মলয় বাবু কে বলছে কত গরীবমেয়ের আপনি সুযোগ নিয়েছেন তা কেউ জানেনা।কিন্তু এবার আপনি বিরাট ভুল করে ফেলেছেন মেয়ে বাঁচতে।পরী অলির বোন ।আপনিভুলে গেলেন কি কে।আপনার দিন শেষ হয়ে গেল।সব মহিলারা মিলে মলয় বাবু কে মারতে লাগলো।পাড়ার লোক জড়ো হয়ে গেল।অলি বললো পরী মোবাইলে সব টা রেকর্ড করেছিস তো।পরী বললো হ্যাঁ দিদি।পুলিশ ডেকে মলয় কে তুলে দেওয়া হল।শহরের সব কটি স্কুলে র মেয়ে রা পরীর পাশে এসে দাড়াল।টেকনোলজি যে খুব উন্নত এখন ।মলয় বাবুর চরিত্রের কথা সারা শহর জেনে গেল।যে সব অসহায় মেয়েরা মলয় বাবুর শিকার ছিল তারাও পরীর পাশে এসে দাড়াল। এত এত মেয়েদের প্রতি দিনের পর দিন দিনভোগ লালসা করার জন্য মলয় বাবুর শাস্তি হল।আর পরী তার অমন বম্মা দাদা দিদি থাকে তার রেজাল্ট কখন খারাপ হয়।গম্ভীর সেন বাবু পরীর মাথায় হাত রেখে বললো লড়াই করে জিতে গেলি তো মা ।মনে রাখিস এভাবেই ফিরে আসতে হয়।

আটদিনের মাথায় বিদিশা আর নির্মাল্যের
ওয়েডিং।এরেঞ্জন্ড ম্যারেজ।সেই ভাবে ওরা
একে অপরের সাথে বিশেষ পরিচিত নয়।শুধু ফোনে কথা বললে,বা হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ থাকলে,কিম্বা একদিন একটা কফিহাউসে বসে কিছুক্ষন সময় কাটালে কী আর বোঝা যায় ওদের কতটা কী মেলে!তাই চাইলো বিবাহের আগে একটা
দিন একসঙ্গে দূরে কোথাও বেরিয়ে আসে।তাতে করে ওদের মধ্যে সম্পর্কটাও অনেক সহজ হয়ে উঠবে।আর তাই দুজনে মিলে লংড্রাইভে যাওয়ার হঠাৎ প্ল্যানটা করলো।

রবিবার।ছুটির দিন।সকাল আটটার দিকে নির্মাল্য, বিদিশাকে ওদের বাড়ি থেকে পিক করলো।গন্তব্য অজানা।যতদূর দুচোখ চায়।সুজুকি ডিজায়ারটা এই মাস খানেক হলো নির্মাল্য নিয়েছে।প্রথমবার লংড্রাইভে যাচ্ছে সেটাকে নিয়ে।শীতের সকাল।বাইরে হাল্কা কুয়াশা তখনও আছে।গাড়ির কাঁচটা ওপর অবধি টেনে দিয়ে যাত্রা শুরু হলো।তখন
সবে মায়াপুরটা পেরিয়েছে,নির্মাল্য বলল-‘কফি খাবে?’বিদিশা কাঁচের বাইরে দেখতে পেলো বড় রাস্তার পাশে দু একজন মাটির ভাঁড়ে চা খাচ্ছে।ও নির্মাল্যকে বলল-‘মাটির ভাঁড়ে কখনো চা খাইনি।খাবে তুমি?’নির্মাল্য বলল-‘কেনো নয়।চলো তাহলে নামা যাক।’কথাটা বলে রাস্তার এক পাশে গাড়ি পার্ক করে দুজনে একজন চা ওলার কাছ থেকে
মাটির ভাঁড়ে চা নিলো।শীতের দিনে ভাঁড়ে গরম চা খাওয়ার অনুভূতিই আলাদা।বিদিশা প্রথম চুমুকটা চা এ দিয়ে -‘ওয়াও’ বলে উঠলো।নির্মাল্য জিজ্ঞেস করলো-‘এই প্রথমবার?’বিদিশা হাসি মুখে বলল- ‘হ্যাঁ.. বিয়ের পর আমায় কিন্তু মাটির ভাঁড়ে চা
খাওয়াতে নিয়ে বেরোতে হবে।’নির্মাল্য বলল
-‘আমার রোজগেরে অভ্যেস।দারুন লাগে। যাক এবার থেকে একজন সঙ্গীকে সাথে পাওয়া যাবে। ‘বিদিশা বলল-‘প্রতিদিন কিন্তু।’নির্মাল্য বলল- ‘একদম।প্রতিদিন।’

চা পান করে আবার গাড়ি ছাড়লো।কিছুটা গিয়ে এক জায়গায় ট্রাফিক জ্যামের মধ্যে তারা পড়লো।গাড়ির উইন্ডক্রিনের সামনে চোখে পড়লো,দুটো বাচ্ছা,গায়েতে ময়লা জামাকাপড়,হাতে কয়েকটা রাস্তায় পড়ে থাকা রঙবেরঙের ছেঁড়া কাগজ,ছোটো ছোটো বাক্স ইত্যাদি নিয়ে রাস্তা পেরোচ্ছে নির্মাল্য, বিদিশাকে বলল-‘দেখেছো,ওই সব বাচ্ছাগুলোর জীবন।’বিদিশা বলল-‘সত্যি।ওদের অবস্থা দেখলে কেমন একটা লাগে। গিল্টি ফিল হয় এটা ভেবে যে,আমরা কত সুখে আছি তাও..।’ নির্মাল্য বলল- ‘চলো, গাড়িটা কোথাও সাইড করে ওদের কিছু
কিনে দিই।একদিন ওদের জন্য অন্তত কিছু কিনে
দিতে পারলেও ভালো লাগবে।’

দুজনে লক্ষ্য রাখলো ছেলেগুলো কোন দিকে গেলো।জ্যাম কাটতে ওরা সেই রাস্তা নিলো।গাড়িটা একটা ফাঁকা জায়গা দেখে সাইড করে রেখে গেলো।কিছুটা হাঁটবার পর ছেলেগুলোর দেখা পেলো।ওরা তখন মোট চারজন।একটা বন্ধ বাড়ির দরজায় বসে কে কী নিয়ে এসেছে সেই সবেরই
হিসেব চলছিলো।বিদিশা তাদের প্রথম ডেকে বলল-‘এই,তোমরা কী করছো?’ ওদের মধ্যে একজনের হাতে নতুন একটা জামা ছিলো,আর একজনের হাতে ক’টা মোমবাতি।ওরা দুজন কাঁদন মাদন হয়ে বলে উঠলো-‘আমরা চুরি করিনি দিদি..’
বিদিশা বলল-‘শান্ত হও।আমি কী বললাম তোমরা চুরি করেছো?’ তখন ওদের মধ্যে একজন বলল-‘ এই জামাটা আমরা সব বাচ্ছারা মিলে পয়সা জমিয়ে জমিয়ে কিনেছি।’ এবার নির্মাল্য বলল- ‘কার জন্য নিয়েছো এটা?’ওদের একজন বলল- ‘আজ আমাদের বোন মুনির জন্মদিন।ওর জন্যে
এটা কিনেছি।’নির্মাল্য বলল-‘জন্মদিন?আমাদের নিয়ে যাবেনা?’ওদের একজন হাসি মুখে চোখ বড় বড় করে বলল-‘তোমরা যাবে?খুব আনন্দ হবে তাহলে।’নির্মাল্য আর বিদিশা মিলে ঠিক করলো মুনির জন্ম দিনটা ওরাও ওই বাচ্ছাগুলোর করে পালন করবে। কেক নিলো,নতুন জামা, জুতো, আরও কত কী খেলনা নিয়ে ওই বাচ্ছাগুলোর সঙ্গে
ওরা ওদের থাকবার জায়গায় গেলো।

ওরা বাচ্ছাগুলোর সঙ্গে গিয়ে ওদের যে থাকবার জায়গা দেখলো তাতে সত্যি চোখে জল এসে যাওয়ার মত কথা।ওই মানুষগুলোর এক জীবন আর..ভাবাই যায় না।মুনিকে নিজের হাতে বিদিশা নতুন জামা পড়ালো।সবাই মিলে কেক কাটলো, খাওয়া দাওয়া করলো,আনন্দ করলো,নাচলো,কত কত ছবি তুললো।ফেরার সময় ওই নির্ভেজাল মনের মানুষগুলো বিদিশা আর নির্মাল্যকে প্রান ভরে আশীর্বাদ করলো-‘তোমরা দুজনে অনেক সুখী হবে।গরীবের এই এইটুকু আশীর্বাদ রইলো।’

ওরা শেষবার ‘বাই’ করে গাড়িতে ফিরে এসে ফের সামনের দিকে রহনা দিলো। দুজনের মনেই তখন যেন বিরাট একটা প্রশান্তির হাওয়া।জীবনটা দারুন সুন্দর মনে হচ্ছে।বিদিশা বলল-‘আমরা যখনই সুযোগ পাবো,এই সব মানুষগুলোর কাছে আসবো হ্যাঁ?’ নির্মাল্য বলল-‘তোমার মনটা সত্যি সুন্দর।’ ‘বিদিশা বলল-‘তোমারও..।’ বিকেল হবো হবো।তখন ওরা কতুলপুরে। বিদিশা দেখতে রাস্তার মোড়ে একজন গ্যাস বেলুন বিক্রি করছে।বিদিশা, নির্মাল্যর কাছে বাচ্ছা মেয়ের মত আবদার করলো
-‘বেলুন কিনে দেবে?’নির্মাল্য হেসে বলল-‘বাচ্ছা মেয়ে নাকি?’বিদিশা বলল-‘বাচ্ছাই তো।দেখছোনা, এখনো ভালো করে চুল জড়াতে পারিনা।হাতে নেলপলিশ লাগাতে পারিনা।’নির্মাল্য হা হা করে হেসে বলল-‘হায়রে!এমন বাচ্ছা মেয়েটাকে নিয়ে আমায় সংসার করতে হবে।’বিদিশা বলল-‘আমি এমনই থাকতে চাই সারাজীবন।’ নির্মাল্য বলল- ‘থাকবে।কে বারণ করবে।।’

গ্যাসবেলুন কিনে সেগুলো গাড়ির সামনে ঝুলিয়ে ফের গাড়ি ছাড়লো।নির্মাল্য বলল-‘এই মানুষটার সাথে থাকা যাবেতো?’বিদিশা বলল-‘আমি রান্না পারিনা।সকালা ঘুম থেকে উঠতে পারিনা।গুছিয়ে কখনো কথা বলতে পারিনা।আর মাঝে মধ্যে রাতে
ভুল বকার অভ্যেস আছে।স্বপ্ন দেখি বলে।এবার বলো তুমি থাকতে পারবে তো?’ নির্মাল্য বলল- ‘ঘুমের ঘোরে লাথি মারার অভ্যেস নেই তো?’বিদিশা বলল-‘বিয়ের খাটটা একটু বড় সাইজের কিনবে।তাহলে এক আধবার যদি পাও চলে যায় তো নীচে
পড়বার ভয় থাকবেনা।’নির্মাল্য ভ্রু চাগিয়ে বলল- ‘বাবা!এতো বিয়ে নয়,আমি যুদ্ধ করতে নামছি।’

জয়পুর জঙ্গলের সীমানা এসে পড়লো ওদের সামনে।ক্রমে জঙ্গলের প্রাকৃতিক শোভা আরও ঘনীভূত হলো।নির্মাল্য বলল -‘এখানে একটু নামি চলোনা।’বিদিশা বলল-‘আমি তোমাকে এটাই বলব ভাবছিলাম।’বিদিশা গাড়ি থেকে নেমে পাখিদের মিষ্টি আওয়াজের তালে তালে শিসের ধ্বনি দিতে লাগলো।হাত প্রসারিত করে ওর ইচ্ছে হলো পুরো জঙ্গলের গাছপালাগুলোকে ও ওর বুকেতে নিয়ে ফিরতে।নির্মাল্য,গাড়ির সামনে থেকে গ্যাসবেলুন গুলো নিয়ে এসে বলল-‘এই নাও,এগুলো উড়িয়ে দাও এখানে।’বিদিশা নির্মাল্যর হাতটা মুঠোয় ধরে বলল-‘একা কেনো।এসো,একসাথে ওড়াই।’বেলুন
গুলো ধীরে ধীরে পাতাদের আড়ালে চলে গেলো।বিদিশা আচমকা নির্মাল্যকে জড়িয়ে বলে উঠলো- ‘আজকের দিনটা স্পেশাল।’নির্মাল্যর দুটো খোলা হাত তখন বিদিশাকে বাঁধনে জড়ালো।নির্মাল্য বলল-‘তুমিও খুব স্পেশাল আমার জন্য।’

বিকেল সরে গোধূলি নেমে এলো।আর সমুখে নয়।যা মেলানোর ছিলো প্রায় সবই দুজনের মিলে গেছে।এবারে তাই ঘরেতে ফেরবার পালা।গাড়িতে বসে নির্মাল্য বলল -‘সোয়টারটা চাপিয়ে নাও।’ বিদিশা গায়ে সোয়টার পড়ে নিয়ে বলল-‘বিয়ের আগে আর একদিন বেরোনো যায়?’ নির্মাল্য বলল- ‘কোথায় যেতে চাও।’ বিদিশা বলল-‘যেখানে খুশি।’ নির্মাল্য বলল-‘তবু বলো কোথায় যেতে চাও।’ বিদিশা বলল-‘যেতে চাওয়াটা আমার লক্ষ্য নয়।তুমি ছেলেটার সাথে আরও টাইম স্পেন্ড করতে ইচ্ছে হচ্ছে।’ নির্মাল্য কথাটা শুনে বেশ আবেগে ভাসলো।বলল-‘বাকিটা জীবন তো আমার সঙ্গেই। অনেক সময় পাবে কাটানোর।’ বিদিশা তখন নির্মাল্যর সীটের দিকে ঘেঁষে এসে ওর কাঁধের কাছে মুখটা বাড়িয়ে বলল-‘এমনই থাকবে তো?বিয়ের পর বদলে যাবে নাতো?’ নির্মাল্য বলল-‘

“জীবন যদি অন্যরকমও হয়
প্রত্যেকদিন,প্রত্যেকটা রাতে
বদলে যাব নতুন ভীড়ের মুখে
তোর সঙ্গে যুগের সাথে সাথে”

বিদিশা স্টিয়ারিংএ নির্মাল্যর হাতটা ছুঁয়ে বলল-
“এই জন্মই শুধু কেনো,পরজন্ম পাই যদি
তোমার ভালোবাসায় হবো খরস্রোতা নদী”

আটদিন পরে ওদের শুভবিবাহের দিন অপেক্ষা
করলেও,ওদের অন্তর মিলনের প্রক্রিয়া ততক্ষনে
সম্মন্ন হয়েছে মঙ্গলময় ভাবেই।

ছোট থেকেই বাবা ছিল আমার বন্ধুর মতো।মা মারা যাওয়ার পর থেকে বাবাই হয়ে উঠেছিল আমার কাছে সর্বেসর্বা।ক্লাস টেনে পড়ার সময় মা মারা গেল।আমাকে নিয়ে তো বাবার চিন্তার শেষ নেই। মেয়েরা বড়ো হলে বাবা মায়ের মনে অনেক চিন্তাই আসে।তাই টুয়েলভ পরীক্ষা দেওয়ার পর বাবা আমার বিয়ে নিয়ে অস্থির হয়ে উঠলেন।তো সেদিন বাবা বললেন..

“-তাহলে অনির্বাণ দের বাড়িতে গিয়ে কথা বার্তা বলে রাখাই ভালো,তাই না?”

“-কীসের কথা বার্তা বাবা?”

“-তোর বিয়ের।তোর মা নেই,এখন তো সবটাই আমাকে ভাবতে হবে তাই না?”

“-তা তুমি অনির্বাণের বাড়িতে কেন যাবে সেটাই তো বুঝতে পারছি না?”

“-আমি জানি তো তুই অনির্বাণকে ভালো বাসিস।”

“-কী যে বলো বাবা। অনির্বাণ আমার খুব ভালো বন্ধু। এর থেকে তো বেশী কিছু নয়।”

আসলে কাছের বন্ধুর সঙ্গে বিশেষ সম্পর্ক হতেই পারে।একটা ছেলে আর একটা মেয়েকে একসঙ্গে কোথাও দেখা গেলে অথবা তাদের মধ্যে খুব ভালো বোঝা-পড়ার সম্পর্ক দেখা মাত্রই ধরে নেওয়া হয় তাদের মধ্যে বন্ধুত্ব বাদেও সম্পর্ক আছে।তবে ছেলে বন্ধু মানেই যে প্রেমিক এমন ধারণাটা সত্যি নাও হতে পারে।ঠিক এই ভুলটাই করেছিল আমার বাবা।

পরিবারের বাইরে যার হাতে হাত রেখে অচেনা স্থানে চলে যাওয়া যায় সেই তো আসল বন্ধু।অনির্বাণ আমার জীবনে সে রকমই এক বন্ধু।স্কুলজীবনের শুরুতে জীবনের প্রভাতি বেলায় পরিচয় হয়েছিল অনির্বাণের সাথে।স্কুলে গিয়ে প্রথম দিন অনির্বাণকেই বন্ধু বলে জেনেছিলাম।এক সাথে স্কুলে যাওয়া, খেলাধূলা,হৈ হুল্লোড় সে এক রঙীন ছোটবেলা।আমাদের এই বন্ধুত্বের সূত্র ধরেই অনির্বাণের বাবার সাথে আমার বাবারও খুব ভালো বন্ধুত্ব হয়ে যায়‌।তারপর আস্তে আস্তে অনির্বাণ হয়ে গেল আমার বেস্ট ফ্রেন্ড। মনের যাবতীয় সুখ দুঃখের ভাগীদার হয়ে গেল অনির্বাণ।দুজনকে এক সঙ্গে মেলামেশা করতে দেখে অনেকেরই ধারণা ছিল অনির্বাণের সাথে আমার নিশ্চয়ই প্রমের সম্পর্ক।

সে যাই হোক, বাবা যখন জানতে পারল যে,অনির্বাণ আমার জীবনে খুব ভালো বন্ধু ছাড়া আর কিছুই নয়,তখন আমার জন্য অন্যত্র বিয়ের সম্বন্ধ দেখা শুরু করলেন। উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করার পরই আমার বিয়েটা হয়ে যায়।অনেকেই অবশ্য অনির্বাণকে জিজ্ঞেস করেছিল..

“-মধুরিমা তোকে ছেড়ে দিল কেন?”

অনির্বাণ হেসেই বলে ছিল…..

“-প্রকৃত বন্ধুত্ব সেটাই যেটা চিরকাল থাকবে।বন্ধুত্বকে তো প্রেমের জায়গায় নিয়ে যাই নি।তাই ছেড়ে যাওয়ার কথা আসে কোথা থেকে?”

আসলে বন্ধুত্ব হলো সেটাই যা চির দিন থাকে। জীবনের পথে হাঁটতে হাঁটতে যে যেখানেই থাক না কেন, চলার পথে বন্ধুত্ব নামের এই পাথেয়টির তুলনা বোধ হয় আর কিছুর সঙ্গেই চলে না।এ এমনই বিষয়, যেন কিছু না থাকলেও বন্ধুত্ব থাকলে চলে। আবার সব থাকলেও বন্ধুত্ব ছাড়া চলে না!

আমার বিয়ের পর আমার হাজব্যাণ্ডের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলাম অনির্বাণের।বন্ধুত্ব থেকেই বোধহয় নতুন বন্ধুত্বের সৃষ্টি হয়।অনির্বাণও আমার হাজব্যাণ্ডের ভালো বন্ধু হয়ে গেল।ছুটির দিনে আমার হাজব্যাণ্ড নিজেই অনির্বাণকে দুপুরে লাঞ্চের ইনভাইট করতো।এমন কত দিন গেছে এক সঙ্গে তিন জন রেস্টুরেন্টে খেয়েছি,ঘুরেছি,কত আনন্দ করেছি।

বিয়ের পর থেকে প্রায় আট বছর কেটে গেছে।ততদিনে অনির্বাণও ভালো চাকরি পেয়েছে একটা।একদিন অনির্বাণকে ফোন করেছে,এটা সেটা নানান কথা হচ্ছে, তা আমিই বললাম…

“-চাকরি তো পেয়েছিস, এবার বিয়েটা কর।”

“-হ্যাঁ রে বাড়ি থেকেও বলছে।”

“-সত্যিই তো অতো বড়ো বাড়িতে কাকিমা একা। একটা কথা বলার মতো বন্ধু তো দরকার।তাই না?”

“-ঠিক বলেছিস, আর দেরি করা যাবে না।”

তারপর থেকে অনির্বাণের পাত্রী খোঁজা শুরু হলো। যেখানেই পাত্রী দেখতে যায় সঙ্গে আমাকেও নিয়ে যায়। অন্যান্য বন্ধু থাকলেও আমাকে যেতেই হবে এমনটাই ওর দাবী। কখনো কখনো আমার হাজব্যাণ্ডও সঙ্গে গেছেন।কিন্তু পাত্রীপক্ষ এমনকি পাত্রী নিজেও অনির্বাণকে ক্যানসেল করে দিত। কারণ দেখতে গেলেই আমাকে দেখিয়ে অনির্বাণকেই জিজ্ঞেস করতেন, ইনি কে? যেই শোনে আমি ওর বান্ধবী, ওমনি না করে দেয়।আর ভাবে কিছু না কিছু একটা সম্পর্ক আছে। আমি অনির্বাণকে বলতাম..

“-এবার থেকে দেখাশোনার জন্য যখন যাবি, তখন আমাকে আর সঙ্গে নিস না।”

“-কেন?একটা মেয়ে কি একটা ছেলের বন্ধু হতে পারে না?এসব ভ্রান্ত ধারণা কেন? তুই যাই বলিস আমি তোকে সঙ্গে নিয়েই যাব, দেখিই না কী হয়। একটা ছেলের সাথে একটা মেয়ের বন্ধুত্ব গড়ে ওঠা তো অস্বাভাবিক নয়। আর বন্ধুত্ব গড়ে উঠে সুখ-দুঃখ সহভাগিতা, সহযোগিতা,বোঝাপড়া কিছু দায়িত্ব পালন আর খুনসুটির মধ্য দিয়ে। সুতরাং দুই ভিন্ন লিঙ্গে মানুষকে একসঙ্গে দেখা গেলেই তাদের মধ্যে প্রেম আছে বা নিশ্চয়ই আলাদা কোনো সম্পর্ক আছে এমনটা ধরে নেওয়ার তো কোনো কারণ নেই।”

অনির্বাণ নিজে যেটা ঠিক মনে করবে সেটাই ও করবে,আমি বললেও আমার কথা শুনবে না‌।তাই পরের বার আমাকে নিয়েই গেল দেখা শোনার জন্য‌।ওখানে যেতেই সেই একই প্রশ্ন।অনির্বাণের জবাব..

“-আমার ছোট থেকেই একে অপরকে চিনি।আমরা এক সঙ্গেই পড়াশোনা করেছি ছোট থেকেই, আমার ভীষণ ভালো একজন বন্ধু বলতে পারেন।”

সব শুনে মেয়েটি বলে…

“-এটা দেখে ভালো লাগছে ছোটো বেলার সেই বন্ধুত্বটা এখনো বজায় আছে। আসলে অনেক ছেলে মেয়েই বিয়ের পর আর বন্ধুত্ব রাখতে চায় না।যেটা আপনাদের আজও অটুট।বন্ধুত্ব হচ্ছে ট্রাডিশন,ধরে রাখতে হয়।”

এমন কথা বলা সেদিনের সেই মেয়েটিই আজ অনির্বাণের ঘরণী।ওর নাম অঙ্কিতা।আর এখন অঙ্কিতাও আমার ভালো বন্ধু।ইংরেজি সাহিত্যের লেখক ভার্জিনিয়া উলফ বলেছিলেন, “কেউ কেউ পুরোহিতের কাছে যায়, কেউ কবিতার কাছে, আমি যাই বন্ধুর কাছে।” তাই তো বিপদে আপদে সুখে দুখে আমরা ছুটে যাই একে অপরের কাছে।আসলে বন্ধুত্ব এক অসীম সম্পর্কের নাম। যার বিশালতা বা গভীরতা অপরিমেয়।অন্ধ বিশ্বাসে যার হাতে হাত রেখে পথচলা যায় সেই তো বন্ধু। বন্ধুত্ব একটি সম্পর্ক,যে সম্পর্কের মাঝে থাকবে দুটি সমমনস্ক মানুষ। সেখানে হতে পারে দুটি ছেলে, দুটি মেয়ে কিংবা ছেলে-মেয়ে উভয়ই।বন্ধুত্বের কোনো জেন্ডার হয় না। কর্ম সূত্রে অনির্বাণ এখন বাইরে থাকে।দেখা সাক্ষাৎ হয় না বললেই চলে।অঙ্কিতার সঙ্গেই বেশি কথা হয়।অনির্বাণ ও টাইম পেলেই ফোন করে। এখনো মাঝে মধ্যে হোয়াটস্যাপে ছবি পাঠিয়ে জিজ্ঞেস করে..

-তিনটে সার্টের মধ্যে একটা চুজ্ করে দে তো।আজকে অফিসের মিটিং আছে,কোন্ টা পড়ব ঠিক করতে পারছি না!

তখন মনে হয় না দূরে আছি।অনির্বাণের এমন দাবীই আমাদের বন্ধুত্বকে সারা জীবন অটুট রাখবে আশা রাখি।তবে বন্ধুত্ব টিকিয়ে রাখতে গেলে আমাদের পাশে থাকা মানুষ গুলোর সহযোগিতা ভীষণ কাম্য। আমার হাজব্যাণ্ড বা অঙ্কিতার মতো মানুষ গুলোরও খুব প্রয়োজন। কে বলেছে একটা ছেলে একজন মেয়ের ভালো বন্ধু হতে পারে না?অবশ্যই হয়ে উঠতে পারে প্রিয়জন,শুধু দরকার উন্নত মানসিকতা।
(সমাপ্ত)

error: