ছোটবেলা থেকেই শুনে আসছি পুরুষ মানুষ দের না কি কষ্ট পেতে নেই,পুরুষ মানুষ দের না কি কাঁদতে নেই।পুরুষ মানুষের না কি চোখে জল মানায় না। আস্তে আস্তে মেনে নিয়েছিলাম আমি সমাজের বেশীরভাগ পুরুষের মতোই।তাই ক্লান্ত ঘামে ভেজা শরীরে কলেজ ফিরতি আমি ট্রেনে কোনো মহিলার সামনে ঘন্টার পর ঘন্টা দাঁড়িয়ে থেকেছি বসতে চাইনি কষ্ট হলেও,আমি পুরুষ মানুষ যে।যে দিদির সাথে মারপিট না করলে দিন কাটতো না সেই দিদি চলে গেলো নিজের সংসারে,চোখ ফেটে জল এলো আশেপাশের লোকজন বললো পুরুষ মানুষ এই ভাবে কাঁদে না কি?যে ঠাম্মা র কাছে গল্প না শুনলে ঘুম আসতো না সেই ঠাম্মা চিরদিনের মতো চলে গেলেন আমাকে ছেড়ে অনেক কেঁদেছিলাম সেদিন।সবাই বলেছিল পুরুষ মানুষ কে শক্ত হতে হয় এতো সহজে ভেঙে পড়লে চলে না।


আমি অনিমেষ,ডাক নাম অনি।ছোট্ট এক মফঃস্বল শহরের এক মধ্যবিত্ত পরিবারের একমাত্র পুত্র সন্তান।একটু বড়ো হওয়ার পর থেকে শুনে এসেছি যে আমাকে নাকি প্রতিষ্ঠিত হতে হবে সংসারের হাল ধরতে হবে।মনে মনে প্রস্তুত ছিলাম স্বপ্ন ছিল ভালো চাকরি করবো বাবা মা কে সুখে রাখবো কিন্তু সেটা ছিল স্বপ্ন,সত্যি নয়‌। পড়াশোনাতে আমি ছিলাম অ্যাভারেজ স্টুডেন্ট।মোটামুটিভাবে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেই কলেজ ভর্তি হলাম।নতুন কলেজ নতুন জীবন।জীবনে প্রেমও এলো স্বপ্ন দেখলাম রিনি কে নিয়ে সংসার করার কিন্তু ওটাও স্বপ্ন ছিল সত্যি নয়।


থার্ড ইয়ারে পড়ি তখন বাবা প্রচন্ড অসুস্থ হয়ে পড়লেন হঠাৎ করে।বাবা ছিলেন একটা প্রাইভেট সংস্থার কর্মচারী।অবসর নেওয়ার পর জমানো টাকায় কোনো ভাবে সংসার চলছিল,আর আমার পড়াশোনা।বাবা মা আশায় ছিলেন আমি চাকরি পেয়ে গেলে সব ঠিক হয়ে যাবে।কিন্তু তা আর হলো না বাবাকে বাঁচাতে আমাদের সব জমানো টাকা শেষ হলো।এদিকে সংসারে চরম দুর্দিন খাবো কি আমরা?তার উপর বাবার ওষুধ কিনবো কি ভাবে?মায়ের হাই প্রেশার,হাই সুগার,প্রায়ই অসুস্থ হয়ে পড়তেন।যাইহোক সংসার টাকে বাঁচাতে ঝাঁপিয়ে পড়লাম আমি।অনেক চেষ্টা করলাম একটা চাকরীর কিন্তু একটা অ্যাভারেজ উচ্চ মাধ্যমিক পাশ ছেলের একটা চাকরি জোগাড় করা যে খুব কঠিন, হাড়ে হাড়ে বুঝে গেলাম।কলেজে পড়া শেষ করাটা আর হলো না।ভাবলাম আগে বাবা মা কে বাঁচাই আবার সব ঠিক হয়ে গেলে পড়াশোনা করবো ‌নতুন করে। তারপর থেকে শুরু করলাম টিউশনি সকাল বিকাল আর বেলায় কখনো দিন মজুরের কাজ কখনো বা রাজমিস্ত্রির সহকারী হিসেবে।এইভাবে সংগ্ৰাম করে বাবা মা কে নিয়ে কোনো রকমে দিন কাটছিল আমার।


কয়েক বছর পর শুনলাম রিনির বিয়ে।বুকটা ফেটে যাচ্ছিল কষ্টে সেদিন ও চোখে জল এসেছিল কিন্তু বুঝতে দিইনি কাউকে তাই আর কেউ বলেনি যে পুরুষ মানুষের কাঁদতে নেই।আমি এক ব্যর্থ পুরুষ মানুষ ছিলাম।রিনি চেয়েছিল আমার সাথে সম্পর্ক টা রাখতে আমিই সরে এসেছি।ও বড়ো বাড়ির মেয়ে আমি সত্যিই ওকে স্বাচ্ছন্দ্য দিতে পারতাম না।কোন বাবা বা তার মেয়েকে এরকম ছেলের হাতে তুলে দেবে!শুনলাম রিনির স্বামী একজন নামজাদা ডাক্তার আর কোথায় আমি এক দিনমজুর।মনে মনে প্রার্থনা করলাম রিনি যেনো সুখী আর খুশি থাকে।হ্যাঁ আমি সেই পুরুষ মানুষ যে তার প্রথম ভালোবাসা কেও হারিয়ে ছিল।


আর লেখাপড়া করা আমার হয়নি। অনেক বছর কেটে গেছে দিনমজুরের কাজ করেই হিমশিম খেয়েছি সংসার চালাতে।বয়স বেড়েছে।অসুস্থ মা বাবা শেষে বারবার বিয়ের কথা বলতে লাগলেন।তারা তাদের বৌমাকে আনতে চান।মেনে নিলাম।বিয়ে হলো আমার সুনন্দার সাথে।মেয়েটা খুব শান্ত স্বভাবের।গরীব ঘরের মেয়ে তো তাই মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা প্রচুর।আমাদের সংসারে এসেই ও হাল ধরলো সংসারের।অসুস্থ বাবা মায়ের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়ে সেবা যত্নের কোনো ত্রুটি রাখলো না।বাবা মা কে আশ্বস্ত হতে দেখে আমার ভালো লাগলো।


বারোটা বছর কেটে গেছে বাবাকে হারিয়েছি চিরকালের জন্য।মা আরও অসুস্থ হয়ে পড়েছেন।এখন আমি দুই সন্তানের বাবা।দুটো ছেলে মেয়ের লেখাপড়া,সংসার,অসুস্থ মা নিয়ে আমার সংসার।শরীর টা মাঝে মাঝে আর টানে না।মাঝে মাঝে যেনো বুকটা অবশ হয়ে আসে যন্ত্রণা হয়।কিন্তু ডাক্তার দেখাবো টাকা কোথায়? সবসময় চাইতাম ছেলে মেয়ে দুটো শিক্ষিত হোক যতো কষ্ট হোক আমার।আর যেনো শরীর সায় দেয়না কষ্ট হয় সারাদিন মাঠে কাজ করতে কিন্তু থামলে তো আর চলবে না আমি পুরুষ মানুষ যে।


পাড়ার এক দাদা একদিন বললো যে,ও যে কোম্পানিতে কাজ করে আমি চাইলেই না কি সেখানে কাজ করতে পারি।অফিসে নিয়ে গেল আমায় যতোদূর বুঝলাম একটা ইনসিওরেন্স কোম্পানি সেটা।অফিসাররা বোঝালেন কোম্পানির কতো ব্যবসা কতো, সম্পত্তি আর কতোগুলো কারখানা চলে এসব নিয়ে।সব শুনে মনে হলো আমি জয়েন করতেই পারি।তারপর থেকে শুরু হলো মানুষ কে বোঝানো।কম দিনে অনেক বেশি টাকা পাওয়ার আশায় অনেকেই এলো তাদের টাকা জমা রাখলো আমার দায়িত্বে কোম্পানিতে।আমি অফিসার দের মতোই বোঝালাম সাধারণ মানুষ কে। এইভাবে প্রতিমাসে যা টাকা পেতাম তাতে সংসার বেশ ভালো ভাবেই চলে যেতো। ছেলে মেয়ে দের লেখাপড়া তে অসুবিধা হতো না ওরাও খুশি ছিল।সংসারের সবাই খুশি ছিল।পুরুষ মানুষ হিসেবে তখন ধন্য মনে হতো নিজেকে।


কিছুদিন পর নিজের জন্য ডাক্তার দেখালাম সমস্ত রিপোর্ট করানোর পর দেখা গেলো হার্টে ব্লকেজ ধরা পড়েছে।ভারি কাজ করতে পারতাম না।ওই কোম্পানির উপর নির্ভর করেই দিন কাটছিল।ছ সাতটা বছর কেটে গেলো হঠাৎ বন্ধ হলো‌ কোম্পানি।অফিসারদের আর দেখা মেলে না।সাধারণ মানুষ প্রচন্ড রেগে গেলো সবাই বললো ওই চিটফান্ডে কোনো টাকা জমা না দিয়েই না কি আমি সব টাকা আত্মসাৎ করেছি।কিছু না করেও অপরাধী হয়ে গেলাম আমি।মাসে মাসে রসিদ দেওয়ার পরও সবাই বললো আমিই প্রতারক।ঠকিয়েছি আমি সাধারণ মানুষের।প্রতারক এক পুরুষ মানুষের তকমা পেলাম আমি।


আবার অসহায় হয়ে পড়লাম আমি।শক্তি নেই আর কাজ করার।বৌ লোকের বাড়ি কাজের জন্য লোকের হাতে পায়ে পড়তে লাগলো কিন্তু কে দেবে কাজ?ও যে প্রতারক এক পুরুষ মানুষের স্ত্রী।ছেলে মেয়ের পড়াশোনা বন্ধ হলো।হয়তো হাজার হাজার মধ্যবিত্ত সন্তানের প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় স্বপ্ন এই ভাবেই শেষ হয়ে যায় দায়িত্বের বোঝা কাঁধে নিতে গিয়ে।জানি না এই ধারাবাহিকতা কতো প্রজন্ম ধরে চলবে,কতো পুরুষ মানুষের স্বপ্ন চুরমার হবে এইভাবে।আমি চেয়েছিলাম এমন ধারাবাহিকতার বাইরে বেরিয়ে আমার সন্তানরা প্রতিষ্ঠিত হোক,খুব চেয়েছিলাম জানো?কিন্তু সেটাও আমার স্বপ্নই ছিল সত্যি নয়।


আর পারলাম না সহ্য করতে কখনো চাইনি আমার মতো আমার ছেলে কষ্ট সহ্য করুক।চিন্তায় চিন্তায় আরো অসুস্থ হয়ে পড়লাম।শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার আগে ছেলের হাত ধরে বললাম আর যাই হোস বাবা আমার মতো প্রতারক পুরুষ মানুষ হোস না।


ছেলে মুখাগ্নি করেছে আমার।চিতাটা জ্বলছে এখনো।আশেপাশের অনেক লোকজন এসেছিল দেখতে মৃত্যুর পর।হয়তো অনেক ঘৃনা নিয়েই এসেছিল মনে।কতো গরীব মানুষ নিঃস্ব হওয়ার পিছনে আমাকেই দায়ি করে।দাউদাউ করে চিতা জ্বলছে দূর থেকে কেউ কেউ দেখছে এক প্রতারক পুরুষ মানুষের দেহকে ভস্মীভূত হতে।হয়তো আমার মতোই সমাজে প্রতারকের তকমা পাওয়া অনেক পুরুষ মানুষই শেষ হয়ে যায় এই‌ভাবেই।

 

আজ সকাল থেকেই চৌধুরি বাড়িতে খুব তোড়জোড় শুরু হয়ে গেছে ৷ আর হবে নাই বা কেন এ বাড়ির একমাত্র ছেলের আজ ভাত কাপড়ের অনুষ্ঠান ৷ সারা বাড়িতে আত্মীয়-স্বজন গমগম করছে ৷ কাল রাতেই বাড়িতে নতুন বউ এসেছে ৷ বাড়িতে যেন আজ অন্যরকম শ্রী বিরাজ করছে ৷ ঘরে নতুন বউ আসায় মিনতি দেবী কাজের ফাঁকে ফাঁকে বারবার গিয়ে তার একমাত্র বৌমা লাবণ্যর সাথে দেখা করে আসছে , তার কোন কিছু দরকার কিনা তার কোন অসুবিধা হচ্ছে কিনা বারবার জিজ্ঞাসা করছে ৷ একে নতুন বউ তার উপর মিনতি দেবী বেশ ভালো করে বুঝে গেছেন যে লাবণ্য বড়ই মুখচোরা ৷ তার যতই অসুবিধা হোক না কেন সে মুখ ফুটে কিছুই বলবেনা ৷ তাই বারবার গিয়ে নিজেই তাকে দেখে শুনে আসছেন মিনতি দেবী৷

অখিলেশ চৌধুরী আর মিনতি চৌধুরীর একমাত্র পুত্র অগ্নিভোর সঙ্গে লাবণ্যর বিয়েটা দেখেশুনেই হয়েছে৷ যদিও বিয়ের আগে তিন মাস তারা বাইরে একা নিজেরা দেখা করেছে ৷ আর এই তিন মাসে তাদের মধ্যে মানে অগ্নিভো আর লাবণ্যর মধ্যে প্রেম প্রেম ভাব টাও বেশ জন্ম নিয়েছে ৷ অগ্নিভো তো বলতে গেলে একেবারে লাবণ্যর প্রেমে পড়ে গিয়েছে ৷

— কিগো গিন্নি তোমাদের সব আয়োজন হল ? ভাত কাপড়ের অনুষ্ঠানটা কখন শুরু করবে ? ( অখিলেশ বাবু )

— আহা! তুমি এত উত্তেজিত হচ্ছ কেন? এইতো আমাদের আয়োজন প্রায় শেষের দিকে ৷ (মিনতি দেবী)

— তাড়াতাড়ি কর… বেলা হয়ে যাচ্ছে যে ৷ (আখিলেশ বাবু )‍‍‌

— হ্যাঁ ঠিক আছে , তুমি এত চিন্তা করো না ৷ সব সময় মত হয়ে যাবে ৷ (মিনতি দেবী )

একটু পরেই লাবণ্য আর অগ্নিভো কে ড্রইং রুমে নিয়ে আসা হল ৷ অগ্নিভোদের ড্রয়িং রুমটা অনেকটা বড় , তাই ভাত কাপড়ের অনুষ্ঠানটা সেখানেই হবে৷ চারিপাশে আত্মীয়-স্বজন , ফটোগ্রাফাররা তাদের ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে ৷ অগ্নিভোর পিসি তরিতরকারি মাছে সাজান ভাতের থালা টি আর একখানা লাল ঢাকাই শাড়ি অগ্নিভোর হাতে তুলে দিয়ে বললেন—

— নে বাবা এবারে এগুলো তোর বউয়ের হাতে তুলে দিয়ে বল… আজ থেকে আমি তোমার ভাত কাপড়ের দায়িত্ব নিলাম ৷

— না পিসি লাবণ্য যথেষ্ট স্বাবলম্বী একজন মেয়ে ৷ ও নিজেই নিজের ভাত কাপড়ের দায়িত্ব নিতে পারবে৷ আর শুধু নিজের কেন চাইলে ও আমার এবং সাথে আমার পুরো পরিবারেরও ভাত কাপড়ের দায়িত্ব নিতে পারবে ৷( অগ্নিভো )

অগ্নিভোর কথা শুনে লাবণ্য তার দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে ৷

— ওমা ! একি অলক্ষনে কথা অগ্নি ? তোর বউ চাকরি করে বলে তুই তোর বউয়ের কোন দায়িত্ব নিবি না ? একথা তো বাপের জন্মেও শুনিনি রে বাবা ৷ (পিসি )

— আমি তো একবারও বলিনি পিসি যে আমি লাবণ্যর দায়িত্ব নেব না ৷ (অগ্নিভো )

এবার মিনতি দেবী বেশ বিরক্তির সুরে বললেন—

— দেখ বাবু এটা কিন্তু ফাজলামি করার সময় নয়৷ একেই অনেক বেলা হয়ে গেছে ৷ এসব আচার অনুষ্ঠান শেষ করে নতুন বউ বড়দের পাতে ঘি ভাত বাদ দেবে তারপরে সবাই খাবে ৷ তুই আর দেরি করিস না তো বাবু ৷ নে নে তাড়াতাড়ি কর ৷( মিনতি দেবী)

— আরে মা আমি কোথায় ফাজলামি করলাম ? আচ্ছা ঠিক আছে , পিসিম নাও তো এসব ধরো ৷( অগ্নিভো)

এ বলে অগ্নিভো তার পিসির হাতে ভাতের থালা আর কাপড়টা ধরিয়ে দিল ৷

— আরে আরে… কি করিস কি ? এসব আমায় দিচ্ছিস কেন ? এগুলো তোর বউয়ের হাতে তুলে দে আর বল… আজ থেকে আমি তোমার ভাত কাপড়ের দায়িত্বে নিলাম ৷ (অগ্নিভোর পিসি )

— ওহো ! পিসি আমিতো তোমাকে আগেই বললাম যে লাবণ্য নিজের ভাত কাপড়ের দায়িত্ব নিজেই নিতে পারবে ৷( অগ্নিভো )

— দেখ বাবু এখন কিন্তু বেশি বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে৷ (মিনতি দেবী )

— মা এখন কিন্তু তোমরাই কথা বলে দেরি করে দিচ্ছ৷ আমাকে আমার কাজটা করতে দাও প্লিজ ৷ (অগ্নিভো)

তারপর অগ্নিভো লাবণ্যর ডান হাতটি ধরে নিজের দুই হাতের মুষ্টিবদ্ধ করল ৷ আর সঙ্গে সঙ্গে তার পিসি বলে উঠলেন —

— লজ্জার কি মাথা খেয়েছিস অগ্নি ? এখানে সব বড়রা দাঁড়িয়ে রয়েছে আর তুই এ সব কি করছিস কি ? (পিসি )

চারপাশ থেকে আরও কয়েকজন আত্মীয় স্বজন বলে উঠলো —

— সত্যি বাবা! আর কত আধিখ্যেতা যে দেখব ?এখনকার ছেলেমেয়েরা হয়েছেই এরকম ৷ছোট-বড় কাউকে মানে না ৷

আর এদিকে লাবণ্যও অগ্নিভোর এরূপ অদ্ভুত আচরণে বেশ অস্বস্তি বোধ করছে আর সাথে লজ্জাও পাচ্ছে ৷

তবে অগ্নিভো চারপাশের লোকজনের এসব কথায় কর্ণপাত না করে লাবণ্যর হাতটা নিজের দুই হাতে আরো শক্ত করে মুষ্টিবদ্ধ করে লাবণ্যর চোখের দিকে তাকিয়ে বলল—

— লাবণ্য আজ থেকে আমি তোমার সকল সুখের পাশাপাশি সব দুঃখেরও ভাগীদারি হওয়ার দায়িত্ব নিলাম ৷ তোমার সকল ইচ্ছা-অনিচ্ছাকে প্রাধান্য দেওয়ার দায়িত্ব নিলাম ৷ তোমার সকল রাগ অভিমান ভাঙ্গানোর দায়িত্ব নিলাম ৷ তোমার প্রত্যেকটা আবেগ অনুভূতিকে শ্রদ্ধা করার দায়িত্ব নিলাম ৷ সকল পরিস্থিতিতে তোমার পাশে থাকার দায়িত্ব নিলাম৷ আজ থেকে আমাদের একসাথে নতুন করে পথ চলা শুরু হল ৷ আমরা সুখে দুখে সব সময় একে অপরের পাশে থাকবো ৷ (অগ্নিভো )

এখন ওই ঘরে নিরাপত্তা বিরাজ করছে ৷ অগ্নিভো তার কথার দ্বারা সবাইকে চুপ করিয়ে দিয়েছে৷ অগ্নিভোর বাবা-মার মুখে আজ বিশ্ব জয়ের হাসি ৷ না তারা পেরেছে…. তারা পেরেছে নিজের ছেলেকে একজন মানুষের মতো মানুষ করতে ৷ একজন আদর্শ পুরুষ তৈরি করতে ৷ একজন নারীকে সম্মান ও যথাযথ মর্যাদা দেওয়ার মধ্যেই তো একজন আদর্শ পুরুষের পরিচয় পাওয়া যায় ৷

লাবণ্যও অবাক হয়ে অগ্নিভোর দিকে তাকিয়ে আছে৷ আর অজান্তেই তার চোখ দিয়ে জল পড়ে যাচ্ছে ৷ এই কয়দিনে অগ্নিভোর সাথে দেখা করে…. কথা বলে লাবণ্য এটা বুঝতে পেরেছিলো যে অগ্নিভো খুবই ভালো একজন মানুষ ৷ কিন্তু আজকে সকলের সামনে তাকে এতটা সম্মান দিয়ে অগ্নিভো প্রমাণ করে দিল যে তিনি সত্যিই একজন অমায়িক মানুষ ৷ আজ লাবণ্যর নিজেকে বড়ই সৌভাগ্যবতী মনে হচ্ছে ৷ অগ্নিভোর মত একজন জীবনসঙ্গী পেয়ে সে সত্যিই ধন্য ৷

একটু পরে চারিপাশে সবাই হাততালি দিয়ে উঠলো৷ এমনকি একটু আগে যেসব আত্মীয়-স্বজনেরা অগ্নিভোর কীর্তিকলাপের সমালোচনা করছিল , তারাও এখন হাততালি দিয়ে তাকে বাহবা জানাচ্ছে৷ আর অগ্নিভোর বন্ধুরা অগ্নিভোর নামে চেয়ার আপ করতে থাকলো ৷ অগ্নিভোর পিসিও হাসিমুখে অগ্নিভোর মাথায় হাত বুলিয়ে বলল —

— বেঁচে থাক বাবা ৷ তোরা অনেক সুখী হ ৷ (পিসি)

সত্যিই অগ্নিভ আজকে একটা নতুন পথের… নতুন দিকের সূচনা করলো ৷

প্রার্থনা করি যাতে ওদের পরবর্তী জীবন খুব সুখের হয় ৷ আর এভাবেই যেন ওরা সারা জীবন একে অপরের পাশে থাকতে পারে ৷ আপনারাও ওদের আশীর্বাদ করবেন ৷

সমাপ্ত

এটা আমার লেখা প্রথম গল্প ৷ মনে যা ছিল তাই লিখে ফেলেছি ৷ তাই সকল ভুল ত্রুটির জন্য আমাকে ক্ষমা করবেন ৷ আর এই ছোট্ট গল্পটা পড়ে কেমন লাগলো তা অবশ্যই জানাবেন ৷ আপনাদের অনুপ্রেরণা পেলে আগামী দিনে গল্প লিখতে আরো উৎসাহিত হবো৷ আশা করি আপনারা আমার পাশে থাকবেন ৷

ধন্যবাদ

পরিতৃপ্তি ##
কলমে – মৌমিতা হৃষিকেশ মণ্ডল
২০/০৬/২০

সন্ধ্যা সাতটার অ্যালার্ম টা বাজতেই বিছানায় ধড়মড় করে বসে পড়লো মনোজ। সিগারেট টা দু টান মেরে ফেলে দিয়েই, গায়ে জামা গলিয়ে পারফিউম টা লাগিয়ে নিল। ওই পারফিউম টা যেকোনো লাস্যময়ী কে এক মুহূর্তে মনোজের কাছে,আরো অনেক কাছে নিয়ে আসে। মনোজ সরকার পেশাতে রঙিন জগতের নামকরা জিগোলো। না পেশাটা খুব গোপনীয় হলেও কিছু মানুষের খুব পরিচিত এক মুখ যারা মনোজ কে শয়নে স্বপনে চিন্তা করে। শুধু একটা ফোন কল, মনোজ হাজির তাদের সমস্ত না পাওয়া পরিতৃপ্তি নিয়ে।
যদিও আজকাল এই দুনিয়ায় বেশ নামডাক মনোজের। আজকাল ফোন করে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিতে হয় ওর থেকে। এরকমই একটা বুকিং হয়েছে প্রায় দশ দিন আগে থেকে। ক্লায়েন্টের নাম রাত্রি চ্যাটার্জি। সাধারণত এভাবে এতদিন আগে বুকিং কেউ করে না। মনোজ প্রথমে খুব অবাক হলেও পরে ভেবেছিল একটু ডিমান্ড থাকতেই পারে।

গাড়িতে বসেই একবার বুকিং নম্বরে ফোন করে মনোজ। ফোন টা ধরেই একটা রাশভারী পুরুষালি গলা শুনে খানিক থমকে যায়। এইসব ফোন খুব সাবধানে অ্যাটেন্ড করতে হয় মনোজকে। যদিও এসব লিগ্যাল সংস্থা থেকে করে ও তাও সামলে নিয়ে কিছু বলে ওঠবার আগেই ঐপার থেকে গলা শোনা যায়।

– আমি অভীক চ্যাটার্জি বলছি, আপনার আসতে আর কতক্ষন? রাত্রি তো রেডী। একটু তাড়াতাড়ি আসুন প্লিজ। বেশি রাত হলে আবার…..

বলতে বলতেই ফোন টা কেটে যায়। একটা টেক্সট মেসেজে এড্রেস টা আসে।

ঠিক জায়গায় গাড়ি থামিয়ে গাড়ি টা পার্ক করে মনোজ। ডোরবেল বাজিয়ে অপেক্ষা করে দেখে দশ মিনিট লেট। দরজা খুলেই দেখে একজন লোক, একমুখ অবিন্যস্ত দাড়ি, চোখের তলায় অ্যালকোহলিক ফ্যাট স্পষ্ট, জীর্ণ শরীর টা একটা হুইল চেয়ারে এলানো। বয়স বছর পঞ্চাশের দিকে হবে।

ওনাকে কিছু বলার আগেই উনি বললেন,
– রাত্রি ওপরে আছে, সিঁড়ি দিয়ে উঠেই ডানদিকে তিন নম্বর ঘর।
অবাক হয়ে একটা থ্যাংক ইউ বলে ওপরে উঠে যায় মনোজ।

নির্দিষ্ট ঘরে ঢুকেই মনোজ দেখে ড্রেসিং টেবিলের সামনে একটা সিগারেট হাতে বসে আছেন রাত্রি চ্যাটার্জি। পরনে একটা কালো রঙের আধুনিক হাউস কোট। গায়ের রং অত্যন্ত ফর্সা, বয়স পয়তাল্লিশের কাছাকাছি, কিন্তু এখনো নির্মেদ টানটান শরীর, আর যেকোনো যুবতীকে হার মানাতে পারেন।

নরম গলায় কাছে ডাকল মিসেস রাত্রি।
একটা সিগারেট অফার করলে মনোজ না করে দেয়। রাত্রির নরম হাতে উষ্ণ স্পর্শ ছোঁয়ায় মনোজ।

– একটু অপেক্ষা করুন, এত অধৈর্য হবেন না!
থমকে গেলো মনোজ। খানিকটা ইতস্তত বোধ করে একটু সরে এলো।

মনোজ আগেও এরকম বয়সের ক্লায়েন্ট পেয়েছে। এসব পেশায় এরকম হয়। তাও মনোজ এখন না করে দেয়। এরকম বয়সে যারা এভাবে জিগোলো ডাকেন মানসিক অবসাদ কে সঙ্গী করে পাগলের মত মনোজ দেরকে খোঁজে। আজকের ব্যাপার একদম অন্যরকম। বেশ মোটা টাকার অঙ্ক ওর একাউন্টে অ্যাডভান্স করা হয়েছে ১০ দিন আগেই। সামনের মাসেই ফ্ল্যাট টা কিনতে হবে ওকে। এসব দাঁড়িয়ে একমনে ভাবছিল মায়াবী চোখে মিসেস চ্যাটার্জির দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখেই।

সিগারেট টা শেষ করেই রাত্রি চ্যাটার্জি বলে উঠলো,
– আপনার হাতে ঠিক কুড়ি মিনিট আছে। তার মধ্যেই…

কথা শেষ হবার আগেই মনোজ এসে চুম্বনালিঙ্গনে আবদ্ধ করে রাত্রিকে। যেনো চাতক পাখির মত অপেক্ষায় ছিল রাত্রির শরীরের সমস্ত জলকণা শুষে নেবে বলে। তারপর আস্তে আস্তে বিছানায়, নাইট ল্যাম্পের আলোতে রাত্রির শরীরের প্রতিটি লোমহর্ষক আবেগ এক নিশ্বাসে পরাজিত করতে থাকে। মিনিট কুড়ি পর একটা স্তব্ধ গরম নিশ্বাস মনোজকে থামিয়ে দেয়।

রাত্রি উঠে চাদর টা টেনে নেয়, হাতের সিগারেট টা ধরিয়ে বললো,
– আপনার বাকি টাকাটা।

এই ৩০ মিনিটে তিনটে কথার একটারও জবাব দেয়নি মনোজ। ওর সবকিছু অবাক লাগছিল আর অন্য ক্লায়েন্টদের থেকে। অন্য সব জায়গাতেই ওই সব মহিলাদের ভ্যাজানো দুঃখের জীবনকাহিনী শুনতে হয়, কারো পাগলামি, কেউ অতিরিক্ত আবেগী। টাকাটা পকেটে ঢুকিয়ে সন্তর্পনে দরজাটা ভেজিয়ে নিচে নামতে থাকে মনোজ।

অর্ধেক নেমেই দেখে নিচে হুইল চেয়ারে বসে অভীক চ্যাটার্জি। মুখে হাসির রেশ টেনে বললেন,
– কেমন আছে আমার রাত্রি? ও খুশি তো? আপনি পেরেছেন আমার রাত্রিকে একটু স্বস্তির নিশ্বাস উপহার দিতে? এখন ও ঘুমোবে অনেকক্ষন। কাল সকালে অনেক কাঁদবে। কিন্তু স্বামী হিসেবে আমার কিছু কর্তব্য আছে তো নাকি! কি বলুন ইয়ংম্যান?

কথাগুলো শুনে চমকে গেলো মনোজ। ও কিছু বলে ওঠার আগেই হাতে করে একটা চেয়ার এগিয়ে দিলেন অভীক বাবু।
– একটু বসো ইয়াংম্যান। একটা ড্রিঙ্কস নাও।

এবার মনোজের অন্যরকম লাগলেও মনে হলো ড্রিঙ্কস টা দরকার। তাই হাতে একটা গ্লাস তুলে নিলো।
– থ্যাংকস।

– আরে ইটস ওকে ইয়াংম্যান। জানেন রাত্রি আমার স্ত্রী। একদম আমার মনের মত,ওকে নিয়ে কোনো অভিযোগ নেই আমার। সবসময় ওর ভালোবাসা দিয়ে আগলে রেখেছে আমায়। আমার যত্নআত্তির এতটুকু ত্রুটি রাখে না ও। আসলে আমাদের বিয়ে হলো আজ তেইশ বছর পেরিয়ে গেছে। পনেরো বছর হলো আমার একটা অ্যাকসিডেন্ট হয়ে কোমর থেকে নীচ অব্দি প্যারালাইসিস হয়ে গেছে। আমি রাত্রিকে শারীরিক সুখ দিতে অক্ষম। জানি প্রতিটা মেয়ের একটা শারীরিক চাহিদা থাকে। রাত্রি তার ব্যতিক্রম নয়। তাই ওর অনিচ্ছা সত্বেও প্রতি তিন মাস অন্তর আমি এই সংস্থা থেকে ফোন করে ডাকি একজনকে। কিন্তু প্রতিবার এক নতুন মুখ,এক নতুন শরীর চাই আমার রাত্রির জন্য। আজ যেমন আপনি এক নতুন মুখ। ড্রিঙ্কস টা শেষ করো ইয়াংম্যান। অবাক হবার কিছু নেই।

– না মানে। আপনি এভাবে….

মনোজকে মাঝপথে থামিয়ে দিয়েই উনি বললেন,
– কাল সকাল হলেই রাত্রি আমার বুকে আছড়ে পড়বে। কেনো আমি আবার ওকে উত্যক্ত করলাম, তার জবাব চাইবে কেঁদেকেটে। কিন্তু আমি জানি ওর এই সুখটাও প্রয়োজন ছিল। তাই প্রতিবারের মত আমি মাথায় হাত রেখে বলবো,
কেঁদো না রাত্রি, তোমার চোখের জল আমার অন্ধকার জীবনে আরো কালো নিকষ আঁধার নামিয়ে আনে।

মনোজ ড্রিঙ্কস এর গ্লাস টা নামিয়ে রাখে। দেখে
মিস্টার চ্যাটার্জির চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়ছে।
– এবার আমি আসি মিস্টার চ্যাটার্জি।

কিছু বলার মত কথা মনোজের আসছে না এই মুহূর্তে, ওর এই জগৎ টা একদম আলাদা, সহানুভূতি, আবেগ সবকিছুই টাকার অঙ্কে কেনা। তবুও ভেতরটা গুলিয়ে উঠল মনোজের। এটা কেমন ভালোবাসা? এটা কেমন প্রেম?

রাত এগারোটা বেজে দশ। অঝোরে বৃষ্টি নামলো, সব ভুলে যাচ্ছে মনোজ, রাত্রি চ্যাটার্জির শরীরের ভাঁজ, মুখ, অভীক বাবুর চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়া জল সব অপরিষ্কার হয়ে মিলিয়ে যাচ্ছে। টিং টিং করে মেসেজ ঢুকলো একটা নতুন অ্যাপয়েন্টমেন্টের ঠিকানা।

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে গাড়িতে স্টার্ট দিল মনোজ।

আজ আবার শুরু হলো। এই সমাজসেবীদের জন্য মাথা খারাপ লাগে সুবিমলের। নির্বিবাদী সুবিমল কোনদিনই কোন কিছুর জন্য খুব একটা প্রতিবাদ করে না। তবে এবার মনে হয় এর একটা বিহিত হওয়া দরকার। মনে মনেই গজরাতে থাকে সে। রোজ রোজ সমাজ সেবার নামে তাদের ফল, মিষ্টি বিতরণ, মেডিসিন ক্যাম্প, এগুলোকে জাষ্ট নেওয়া যাচ্ছে না! এখন আবার পূজার আগে ঠাকুর দেখাতে নিয়ে যাওয়ার ধুম! আরে বাবা, বৃদ্ধাশ্রমে থাকা মানেই সে করুণার পাত্র নয়! রাগ কমাতে একটু ঘাড়ে,মাথায় জল দিয়ে, বারান্দার ইজিচেয়ারে বসে সুবিমল। সূর্য্য তখন অস্তে যাওয়ার মুখে।আরাম করে চোখ বন্ধ করতেই সুবিমলের চোখের সামনে পুরনোদিনগুলো ভেসে ওঠে। চার ভাই আর এক বোনের সবার বড় সুবিমল। বাবা মারা যাওয়ার পর ভাইদের মানুষ করা, বোনকে বিয়ে দেওয়া, সবকিছু দায় দায়িত্বের সিংহভাগই এসে পরে সুবিমলের উপর। এই সব করতে গিয়ে কেটে যায় জীবনের অনেকগুলো বসন্তই। তাও যখন বিয়ে করবে ঠিক করে সেই সময়ই ওর বোন ছন্দা বিধবা হয়ে ওদের বাড়ীতে এসে ওঠে। আদরের ছোট বোন একাকী জীবন কাটাবে, আর সে বউ নিয়ে সংসার করবে, এই ভাবনাটা তখন তাকে বেজায় পীড়া দিচ্ছিলো। ফলে, বিয়ে করে সংসারী হওয়ার ইচ্ছেটাই তখন চলে গিয়েছিলো সুবিমলের। তবে ছোটভাইদের বিয়ে দিয়ে সংসারী করেছেন। আর তিনি হয়ে উঠেছেন সংসারের সবার গার্জিয়ান। এতো সব কিছুর মধ্যেও তার প্রধান শখ ছিলো ট্রেকিং করা। নিজে খুব ভালো রোজগার করতেন। তাই শখপূরণে খুব একটা অসুবিধে হতোনা। ট্রেকিং করতে গিয়েই বন্ধুত্ত হয় অমলেন্দুর সাথে। হাসি খুশি, আলাপি অমলেন্দুর সাথে বন্ধুত্ত গাঢ় হতে খুব বেশীদিন লাগেনি সুবিমলের। অমলেন্দুরা নিঃসন্তান। অমলেন্দুর বউ শিবানীকেও ছোট বোনের চোখেই দেখতেন সুবিমল। হটাৎ করেই শিবানী সেলিব্রাল অ্যাটাকে মারা যায়। অমলেন্দু একা হয়ে পরে। সে সময় সুবিমল খুব করেছিলো অমলেন্দুর জন্য। তারপর অমলেন্দুই আর একা থাকতে না পেরে চলে আসে এই ‘অস্তরাগ’ বৃদ্ধাবাসে। সুবিমল তখন থেকেই এখানে আসতো। এর বছর তিনেক পর সুবিমলের বোন ছন্দাও মারা যায়। ছন্দার ছেলের সংসারে কিছুদিন,অন্য ভাইদের সংসারে কিছুদিন, থাকলেও কোথাও যেনো আর সেভাবে মন বসছিলো না সুবিমলের। তখন অমলেন্দুই জোর করে এখানে নিয়ে আসে। এখন এখানে নিজের সমবয়সী লোকেদের মধ্যে থেকে দিনগুলো বেশ কেটে যায় ওর। তবে আজও পরিবারের সবাই সুবিমলকে যথেষ্ট সন্মান করে।পালা, পার্বণে সুবিমল ভাইদের বাড়ীতেই কাটায়। সে বৃদ্ধাশ্রমে আছে বলে নিজেকে কখনো অবহেলিত বলে মনে হয়নি। কিন্তু এই উড়তি সমাজসেবীর দল তাদেরকে অবহেলিত না বানিয়েই ছাড়বেনা। এইসব ভাবনার মাঝেই সুবিমলের মনে পড়ে যায়, যে ওর বই আনতে লাইব্রেরীতে যেতে হবে। বৃদ্ধাশ্রমেই একটা লাইব্রেরী আছে। সুবিমল সেখান থেকে নিয়মিত বই এনে পড়ে।
লাইব্রেরীতে ঢুকেই সুবিমলের সাথে দেখা হয়ে গেলো রত্না বোসের সাথে। এই রত্না বোস এক কালে একটি নামকরা কলেজের প্রিন্সিপাল ছিলেন। নানা বিষয়ে ওনার অগাধ জ্ঞান। এখনও প্রায় সময়ই দেশে, বিদেশে অসংখ্য সেমিনারে অংশ গ্রহণ করেন। তবে স্বামী মারা যাওয়ার পর নিজের বাড়ীতে একা থাকাটা নিরাপদ মনে করেন নি বলেই এখানে চলে এসেছেন। ওনার ছেলেমেয়েরা বিদেশে থাকে। বছরে এক বার করে তিনি তাদের কাছে যান। অন্যান্য দিন দেখা হলে নানা ব্যাপারে কথা বলেন উনি সুবিমলের সাথে। কিন্তু আজ ওনার থমথমে মুখটা দেখে বেশ খারাপ লাগলো সুবিমলের। কি হয়েছে জিজ্ঞাসা করবে কি না যখন ভাবছে, তখনই বৃদ্ধাশ্রমের আর এক আবাসিক সমর গুহর সাথে দেখা। সমর গুহরও মুখে বিরক্তির ছাপ। তাও তিনি রত্না বোসকে বললেন,” খুব খারাপ ঘটনা দিদি। ” কৌতূহল চাপতে না পেরে কি হয়েছে সেটা জিজ্ঞাসা করেই ফেললো সুবিমল।প্রত্যুত্তরে রত্না বোস যা বললেন তার সারমর্ম হলো, গতকাল উনি একটা কনফারেন্স সেরে দিন সাতেক পর বৃদ্ধাশ্রমে ফেরেন। উনি ঢোকার সাথে সাথেই কয়েকটি ছেলেমেয়ে ওনাকে বৃদ্ধাশ্রমের ভেতরে যে মেডিকেল ক্যাম্প ওরা করেছিলো সেখানে নিয়ে যায়।রত্নাদেবী কদিন না থাকায় এই ক্যাম্পের বিন্দুবিষর্গও জানতেন না। উনি কিছু বোঝার আগেই ছেলেমেয়েগুলো তার হাতে কতগুলো ফলমিষ্টি তুলে দিয়ে ছবি তোলে, তারপর সেই ছবি সোশাল মিডিয়ায় পোষ্ট করে,লিখেছে, “ছেলেমেয়েরা বিদেশে থাকে। মায়ের কোনো খোঁজ নেয় না। মা অসুস্থ্য, বৃদ্ধাশ্রমে রয়েছে। আমরা স্বেচ্ছাসেবীরা ‘অস্তরাগে’ মেডিকেল ক্যাম্প করাতে ওনার চিকিৎসা হলো। অসুস্থ্য মানুষকে খাওয়ার ফলও আমরা দিলাম।” এই লেখার সাথে ওনার ছবি। রত্নাদেবী ছবিগুলো দেখিয়ে প্রায় কেঁদেই ফেললেন। তারপর বললেন, “জানেন এর জন্য আমার কতো সন্মান নষ্ট হলো! আমার ছেলেমেয়েরাও খুব কষ্ট পেয়েছে। ছেলে তো বারবার আমাকে ওর কাছে নিয়ে যেতে চেয়েছিলো। আমিই যাই না। তাছাড়া আমার মেয়েও ওর বাবা মারা যাওয়ার পর কলকাতায় ফিরে আসতে চেয়েছিলো। আমিই বারণ করেছি। মেয়ে আমার বিদেশে গবেষণা করছে। আমার জন্য ওর গবেষণার ক্ষতি হোক, তা আমি চাইনি। সত্যি বলতে কি আমি চেয়েছিলাম ওরা আমাকে নিয়ে যেনো অযথা চিন্তা না করে। আমি বাড়ীতে একা থাকলে ওরা দুঃশ্চিন্তা করতোই। তাই আমি এখানে চলে আসি। আর এখানে তো আমি ভালোই আছি। বাড়ীর জন্য মাঝে মাঝে খারাপ লাগে ঠিকই,তবে আপনাদের সবার মাঝে থেকে মন খারাপ করার সুযোগ কোথায় বলুন? আপনারা তো আপনজনের মতো আগলে রেখেছেন। আর আজ এই ঘটনায় আমার মান সন্মান আর রইলো না। আমার মেয়ে এবার সব ছেড়ে চলে আসবে। জানেন, ওর এই গবেষণাটা নিয়ে আমার কতো স্বপ্ন ছিলো! আমি পারিনি। আমার মেয়ে করছিলো। কিন্তু এই ঘটনার পর সবাই আমার ছেলেমেয়ের দিকে আঙ্গুল তুলছে। আমাকে ওরা বার বার বলছে, কেনো আমি আমার অসুস্থ্যতার কথা, তাদের জানাই নি? উফ্, কি যে অশান্তি!” একটানা কথাগুলো বলে হাঁফাতে থাকে রত্না বোস। সুবিমল একটা ছোট্ট দীর্ঘশ্বাস ফেলে লাইব্রেরীর বাইরে আসে। এই সময়ই সুবিমলের ভাগ্নে সৌরভ, তাকে ফোন করে। সুবিমল ফোনটা ধরলে সৌরভ বলে,”মামা, তুমি আমাদের কাছে চলে এসো প্লিজ।” সুবিমল হকচকিয়ে বলে,”কেনো? কি হলো?” সৌরভ বলে, “কিছু মনে করোনা মামা, তুমিই তো আমাকে বাবার অভাব কোনওদিন বুঝতে দাওনি। সেই আমিই তোমাকে মা মারা যাওয়ার পর বৃদ্ধাশ্রমে পাঠিয়ে দিলাম।আমাদের ক্ষমা করো মামা। সুবিমল এবার বলে, “আমি নিজেই এখানে এসেছি। তোমরা তো পাঠাওনি?? কি হয়েছে বলবে? ” ফোনের ওপার থেকে সৌরভ বলে,” মামা, তোমাদের ওখানে কে একজন ভদ্রমহিলা অসুস্থ্য,তার ছেলেমেয়েরা বিদেশে থাকে,দেখেনা।এইসব খবর পেলাম। তাই খুব চিন্তা হচ্ছে।” এবার সুবিমল বুঝলো, দুঃশ্চিন্তার উৎসটা। রাগে মাথা দপ্ দপ্ করতে লাগলো সুবিমলের।

প্রতিদিনই রাতের খাবার সময় আবাসিকরা ডাইনিংরুমে আড্ডা জমায়। সারাদিন কে, কি করলো সেই সব গল্পই হয়। আজ সেই আড্ডাটায় অন্যদিনের মতো খুশির ছোঁয়া নেই, বরং সবার রাগই প্রকাশ পেলো। বেশীর ভাগই স্বাধীন ভাবে জীবনের প্রান্তবেলাটা কাটাবে বলে এখানে এসেছে। মাস গেলে অনেকগুলো টাকা বৃদ্ধাশ্রমকে দেয়। এই বৃদ্ধাশ্রমে বেশীরভাগ অর্থবান মানুষরাই থাকে। তাই ফ্রি মেডিকেল চেকআপ, ফল বিতরন, এগুলো তাদের প্রয়োজন নেই। অথচ কিছু মানুষের অদ্ভূত মানসিকতার জন্য অকারণেই দয়ার পাত্র তারা হচ্ছেন। যেটা তাদের আত্মসন্মানে যথেষ্ট আঘাত করছে। বৃদ্ধাশ্রমের কর্তৃপক্ষের সাথেও এ বিষয়ে কথা হয়েছে। তারা জানিয়েছে, সেদিন যারা মেডিকেল ক্যম্প, ফল বিতরণ করেছিলো, তারা এলাকার প্রভাবশালী রাজনৈতিক দল। সামনে ভোট, তাই এদের সমাজসেবার ধুম পড়েছে। এদের কথা অমান্য করার সাহস কর্তৃপক্ষের হয়নি। না করতে দিলে হয় তো রাত বিরেতে এসে ঝামেলা করতো। তখন এই বৃদ্ধ মানুষগুলোকে নিয়ে তারা কি করতো? তবে ওই ঘটনার জন্য রত্নাদেবীর কাছে তারা ক্ষমা চেয়ে নিয়ে ঘটনাটার ধামাচাপা দিলো।
আজ পূজার সপ্তমী। বৃদ্ধাশ্রমে আজ সাজ সাজ রব। কারণ বৃদ্ধাশ্রমের সকল আবাসিকরা আজ ঠাকুর দেখতে যাবে। অমলেন্দু তার এক পরিচিত ট্রাভেল এযেন্টের কাছ থেকে দুটো বড়ো ভলভো বাস ভাড়া করেছে। একটিতে তারা উঠেছে। অপরটি ফাঁকা। রত্নাদেবীর এক ছাত্রী একটি নাম করা নিউজ চ্যানেলের সিনিয়র জার্নালিষ্ট।রত্নাদেবী তাকে আজ ডেকেছেন ওদের আজকের কর্মকান্ড কভার করার জন্য। একে একে বৃদ্ধাশ্রমের প্রায় সব আবাসিকরা একটি বাসে উঠলো। বাস চলতে শুরু করলো। তার পিছনের ফাঁকা বাসটিও আগের বাসকে অনুসরণ করলো। বাস এসে দাঁড়ালো ওদের বৃদ্ধাবাসে ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প করা, স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার নেতার পূজা প্রাঙ্গনে। সেখানে তখন হরেক রকম পোষাক পরে সেচ্ছাসেবী সংস্থার সদস্যরা আড্ডা দিচ্ছিলো। অমলেন্দুরা ওখানে গিয়ে ওদের বললো বাসে এসে বসতে। ওরা প্রথমে না করেও পরে অমলেন্দুদের অনুরোধে বাসে গিয়ে বসলো। তখন রত্না দেবী উঠে সবার হাতে একটা করে খাবারের প্যাকেট দিয়ে মাইক হাতে বলতে থাকেন,”আমাদের সমাজে বেকার সমস্যা একটা বড় সমস্যা। কিন্তু বেকারদেরও ইচ্ছে করে আরামদায়ক গাড়ীতে চড়ে ঠাকুর দেখতে, ভালো খাবার খেতে। তাই তো আমরা সবাই মিলে চাঁদা তুলে আজ আমাদের পাড়ার বেকার যুবক যুবতি যারা সমাজের চোখে অবহেলিত, তাদের নিয়ে ঠাকুর দেখতে চলেছি। খাবারও খাওয়াচ্ছি।” বাসের মধ্যের সব কিছুই ওই সাংবাদিক মহিলাটি ছবি তুলছিলেন। রত্নাদেবীর কথা শুনে বাসের ছেলেমেয়েরা খুব রেগে যায়। একজন তো চিৎকার করে বললো, “কে বললো আমরা বেকার? আর যদি বেকার হয়েও থাকি তাতে আপনার কি অসুবিধে? আপনারা আমাদের একটা করে খাবারের প্যাকেট দিয়ে এই ভাবে অপমান করতে পারেন না! জানেন আমরা কতো রকম সেবার কাজ করি! ” এবার অমলেন্দু মুখ খুললো, “জানি তোমরা সমাজ সেবা করো। তাই তোমাদের কাছে একটা প্রশ্ন ছিলো, সমাজসেবার আগে কোনোদিন কি জিজ্ঞাসা করেছো যাকে সেবা দিচ্ছ, তার সত্যি সত্যি সেবা লাগবে কি না?? সে সত্যি অবহেলিত কিনা? এই যে তোমরা সেদিন আমাদের বৃদ্ধাবাসে মেডিকেল ক্যাম্প করে, আমাদেরকে অবহেলিত করে দিলে তাতে আমাদের কেমন লেগেছে তার খোঁজ নিয়েছো? বৃদ্ধ মানেই সে অবহেলার পাত্র, এ কথা তোমাদের কে বললো?? ” ছেলেমেয়েরা মুখ নীচু করে বসে রইলো। তখন সুবিমলই বললো, “তোমারা আমাদের মতো বুড়োদের জন্য ভেবেছো, তার জন্য মেডিকেল ক্যাম্প,ফল মিষ্টি দিয়েছো, তাও ঠিক আছে, মেনে নিলাম। কিন্তু তোমরা যে সমাজ সেবা করলে, সেটাকে এতো ছবি তুলে লোক জানানোর দরকার কি ছিলো বলো? একটি মেয়ে মৃদু স্বরে বলে,” ছবি না তুললে তো আমরা যে সমাজসেবা করি সেটা লোকে জানতেই পারবে না।” বৃদ্ধা ডলি দেবী বললেন,” লোকে না জানুক মা।ভগবান তো জানতো। ভালো কাজ করে প্রচার করলে তার কোন মাহাত্ম্য থাকে না।” তারপর বৃদ্ধ বৃদ্ধারা সেদিনের ঘটনার ফলে তাদের কতোটা অসন্মানের মুখে পড়তে হয়েছে সেটা বলেন। এও বলেন বৃদ্ধাশ্রম নিয়ে প্রচলিত ধারণা ভাঙ্গার সময় এসেছে। এখনো মানুষ অতটা খারাপ হয়নি যে, তারা তাদের গুরুজনদের বৃদ্ধাশ্রমে ফেলে দিয়ে দায়িত্ব সারবে। তাই অকারণে বৃদ্ধাশ্রমটাকে সমাজসেবার জায়গা না বানানোই ভালো। তারপর বলেন, ভালো কাজ করলে মানুষ জানবেই। অকারণে তার প্রচার করতে গিয়ে অন্যকে বিপদে না ফেলাই ভালো। সব শুনে বাসের ছেলেমেয়ের দল নিজেদের ভুলটা বুঝতে পারে। তখন তারা বলে আজকের ঘটনা যদি নিউজে দেখায় তো তাদেরও সন্মানহানি হবে। রত্নাদেবী সবাইকে অভয় দিয়ে বলেন, এই সব ছবি সবই ডিটিট করে দেওয়া হবে। তোমরা যে বুঝতে পেরেছো এতেই আমরা খুশি। সেই শুনে বাসের ছেলেমেয়েরা বাস থেকে নামতে যায়। তখন অমলেন্দু বাধা দিয়ে বলে, ” আরে যা হয়েছে ভুলে যাও। আজ উৎসবের দিন। তোমাদের জন্যই বাস ভাড়া করলাম। আর তোমরাই চলে যাবে?? তোমরাও আমাদের সাথে চলো। আমরা নেমে অন্য বাসটায় আছি। আজ আর প্রবীন আর নবীনে কোন বিরোধ নেই। এক সাথে আমরা ঠাকুর দেখবো।” তখন একটি মেয়ে এসে রত্নাদেবীর হাত ধরে বলে, ” আমাকে ক্ষমা করে দিন। ওই দিন, ছবিটা আমিই তুলে সোশ্যাল সাইটে দিয়েছিলাম। কিছু না বুঝেই আপনার অপমান করেছি।” রত্নাদেবী সন্মতি সূচক ঘাড় নাড়িয়ে বললেন, “দিলাম ক্ষমা করে।” তারপর সবার সাথে বাস থেকে নেমে অপর বাসটায় বসলেন। দুটো বাস পর পর প্রবীন ও নবীনদের নিয়ে শরৎ এর কাশফুল ভরা মাঠের পাশ দিয়ে, শিউলির গন্ধ মেখে উৎসবে সামিল হওয়ার জন্য রওনা হলো।

সকাল থেকেই রুম অন্ধকার করে চুপচাপ শুয়ে আছি। মন টা বিশেষ ভালো নেই। আজকের দিনে দিদি কে খুব মিস করি। ছোটবেলার কথা গুলো মনে আসছে। কি ভালো ছিলো ছোটবেলার দিন গুলো। দিদির সাথে দোকানে গিয়ে পঞ্চাশ পয়সার দুটো রাখি কিনে আনতাম। বাবা রাখির জন্য ওই এক টাকা ই বরাদ্দ করেছিলো। দিদি নিজের স্কুলের টিফিনের পয়সা বাঁচিয়ে আমার জন্য চকলেট কিনে আনতো। রাখি পরিয়ে ওই চকলেট টা আমাকে দিতো উপহার হিসেবে। তখন অভাব ছিলো কিন্তু ওই অল্পতেই খুব খুশি ছিলাম আমরা। সামর্থ্য তেমন ছিলো না…চাহিদাও ছিলো সামান্য।

দিদির বিয়ে হয়ে গেছে পাঁচ বছর হলো…অজয় দা দিদিকে এক বিয়ে বাড়িতে দেখেছিলো.. প্রথম দেখাতেই পছন্দ হয়ে যায়। ওদের কোনো দেনাপাওনা ছিলো না। বাবা তাও সামর্থ্য মতো দিয়েছিলো। বিয়ের পর প্রথম বছর রাখি তে দিদি এ বাড়ি এসেছিলো। তারপর আর আসতে পারে না। ওদের একান্নবর্তী পরিবার। অনেক দায়িত্ব দিদির ওপর। সংসার ছেড়ে কি আর আসা যায়….. খুব ব‍্যস্ত এখন। বছরে একবার আসে জামাইষষ্ঠী তে একদিন থেকে চলে যায়….আমাদের বেশি ব‍্যতিব‍্যস্ত করতে চায় না। আমি আমার রুম টা ওদের ছেড়ে দিয়ে বারান্দায় গিয়ে শুয়ে থাকি,দিদির ভালোলাগেনা সেটা।

শেষবারে আমাকে যাওয়ার আগে আড়ালে ডেকে নিয়ে গিয়ে বলেছিলো,” রাকেশ এবারে একটু চাকরির চেষ্টা কর। বাবার তো বয়স হচ্ছে। তোকেই তো সংসারের হাল ধরতে হবে। টিউশন পড়িয়ে যা পাস বেশিরভাগ তো ওই বাচ্চা গুলোর পেছনে খরচ করিস। এবার তো নিজের কথা ভাব”। এই বলে কিছু টাকা দিতে চেয়েছিলো….
আমি ফিরিয়ে দিয়ে বলেছিলাম, ” টাকা লাগবেনা রে…তুই মাঝে মধ্যে আসিস তাহলেই হবে। তুই ভালো থাকিস”। আমার কথার মধ্যে এমন কিছু ছিলো যে দিদি ও আর জোর করেনি।

চাকরির চেষ্টা তো আমি করছি। টিউশন পড়িয়ে মোটামুটি ইনকাম হয়। কিছু টাকা বাবাকে দিয়ে বাকি টাকাতে ওই পেছনের বস্তির বাচ্চা গুলোর জন্যে খাতা বই পেন এসব কিনে দিই। মাঝে মধ্যে কিছু খাবার ও কিনে দিই। ওদের সপ্তাহে তিনদিন করে পড়াতেও যাই। লোকে বলে যার নিজের এই অবস্থা সে আবার অন‍্যকে সাহায্য করছে। যতসব আদিখ্যেতা। আমি গায়ে মাখিনা। রাধা,গঙ্গা, রাজু,মন্টু, যমুনা, তপন ওদের মুখ গুলো দেখলে, পড়ার প্রতি আগ্ৰহ দেখলে সব ভুলে যাই। বড্ড ভালোবাসে আমায়। ইচ্ছে আছে ভবিষ্যতে চাকরি পেলে অসহায় বাচ্চাদের জন্য কিছু করার। অসহায় ছাত্র ছাত্রী দের বিনামূল্যে পড়ানোর জন্য কোচিং সেন্টার খুলবো। দেখি কবে স্বপ্নপূরণ হয়।

এমন সময় মায়ের ডাকে হুঁশ ফিরলো…..দোকান থেকে কিসব আনতে হবে। কিছু টাকা আর ব‍্যাগ নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। বস্তির কাছে আসতেই বাচ্চা গুলো “এই তো রাকেশ দা এসেছে” বলে ঘিরে ধরলো।
গঙ্গা বললো, “এতক্ষণে এলে কাল যে বলেছিলাম সকালে একবার আসবে সব ভুলে গেছো বলো।”
–ইসসস্ একদম ভুলে গেছি রে। খুব ভুল হয়ে গেছে।
রাধা বলে উঠলো,” হ‍্যাঁ আমাদের কথা তো ভুলে যাবেই। যাক ছাড়ো তুমি চোখ বন্ধ করো তো!”
— কেনো রে কি হলো হঠাৎ?? এসব আবার কি??
রাজু বললো,” উফফ্ করোই না।”
আমি চোখ বন্ধ করতেই ওরা আমার হাতে কি যেনো একটা বেঁধে দিলো,রাখি মনে হয়! চোখ খুলে দেখলাম সত্যি তাই…. এত বড়ো একটা ফুলের রাখি। তারপর সবাই মিলে আমাকে চকলেট দিলো।

কান্নাভেজা গলায় মুখে হাসি এনে বললাম,” তোরা কি করেছিস এসব? এত টাকা খরচা করেছিস কেনো শুধু শুধু?”

মন্টু বললো, ” তুমি যে আমাদের জন্য এত কিছু করো তারবেলা?? আমরা এটুকু করতে পারবোনা তোমার জন্যে? গতবছর তোমার মন খারাপ ছিলো এই দিনে। আমরা সব বুঝেছিলাম। সেই বছর কিছু করতে পারিনি। তখনই আমরা ভেবে রেখেছিলাম এই বছর তোমায় সারপ্রাইজ দেবো। তাই অনেক দিন ধরে একটু একটু করে টাকা জমিয়েছি। তোমার ভালোলেগেছে তো? আর মন খারাপ নেই তো তোমার??”

–খুব খুশি রে আমি খুব। এরপরও আর মন খারাপ থাকে বল। কিন্তু তোরা এত বড়ো রাখি কেনো কিনতে গেলি? আমাকে ভালোবেসে যাই দিতিস তাই আমার কাছে শ্রেষ্ঠ উপহার হতো। তোরা আমাকে এত ভালোবাসিস আর কি চাই আমার?? কিন্তু তোদের তো একটা গিফট দিতে হয়। নে আজ সন্ধেবেলা আমি তোদেরকে অশোক দার দোকানের চাউমিন খাওয়াবো। আজ তোদের পড়া ছুটি। নে যা এখন। কত দেরি হয়ে গেলো আমার। দোকান যেতে হবে। তোরা তৈরী থাকিস কিন্তু।

“ইসস্ কি মজা! আজ ছুটি। তুমি না খুব ভালো রাকেশ দা।”-এই বলে ওরা ছুটতে ছুটতে চলে গেলো……

এক লহমায় আমি আজ আমার শ্রেষ্ঠ উপহার পেয়ে গেছি। হৃদয় আজ কানায় কানায় পূর্ণ। আর কি চাই আমার…. নিজের অজান্তেই চোখের কোণ দুটো ভিজে গেলো….

সমাপ্ত……..

আজ আবার অফিস বেরোনোর আগে তুমুল ঝগড়া আরম্ভ করে শ্রীতমা। আহির কিছু না খেয়েই অফিস বেরিয়ে যায়। মাথা গরম থাকায় খুব স্পিডেই গাড়িটা ড্রাইভ করছিল সে, শ্রীতমার বলা কথা গুলো কাঁটার মত বিঁধছিল তার গলায়।
নাহ! আর এই সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার কোনো মানেই হয় না। আহির তো মনে প্রাণে চেষ্টা করেছে শ্রীতমাকে ভালো রাখার কিন্তু যেই সম্পর্কে ভালোবাসার চারা গাছটাই উপড়ে পড়ে গেছে অভিমান আর অভিযোগের ঝড়ে, সেই সম্পর্ক মিথ্যে বয়ে বেড়ানো যুক্তিহীন। রোজ রোজ একটু একটু করে শেষ করার থেকে চিরতরে সব শেষ করে দেওয়াই শ্রেয়।
পাশের সিটে পড়ে থাকা ফোনটা নিয়ে হোয়াটস অ্যাপটা খোলে আহির, চোখে পড়ে শ্রীতমার নামটা অনেক নামের ভিড়ে কোথাও যেন হারিয়ে গেছে। একসময় দুজন দুজনের থেকে কত দূরে থেকেও এই হোয়াটসঅ্যাপে কত কথা শেয়ার করত ভাবলেও হাসি পায় আর এখন?
সারাদিন একটা ঘরে দুজন দুজনের এত কাছে থেকেও মনের কথা বলার সময় পায়না ওরা বা হয়তো ইচ্ছেটাই হারিয়ে গেছে। শ্রীতমার চ্যাট বক্সটা খুলে একটা মেসেজ টাইপ করে আহির “আমি তোমায় আর জোড় করে বেঁধে রাখতে চাইনা নিজের সাথে, তাই ঠিক করেছি আজই তোমায় মুক্তি দিয়ে দেবো এই জীবন থেকে। বিকেল ৫টায় আমার অফিসে চলে এসো, ডিভোর্সের ব্যাপারটা আজই ঠিক করে নেবো। আশা করছি সবকিছু খুব তাড়াতাড়ি হয়ে যাবে।” মেসেজটা সেন্ড করেই আহিরের চোখদুটো ছলছল করে ওঠে। একটু অন্যমনস্ক ভাবেই গাড়িটা ড্রাইভ করছিল সে, হঠাৎ একজন বৃদ্ধ গাড়ির সামনে এসে পড়ে। কোনরকমে একটা বড়ো অ্যাকসিডেন্ট হওয়ার হাত থেকে নিজেকে বাঁচায় আহির কিন্তু গাড়িটা গিয়ে ধাক্কা লাগে একটা গাছের সাথে। কয়েক সেকেন্ডের জন্য সব ঝাপসা লাগে চোখের সামনে, তারপর নিজেকে একটু সামলে গাড়ি থেকে নেমে ছুটে যায় বৃদ্ধ লোকটার কাছে। কিন্তু কোথায় সে? এখানে তো কেউ নেই। তবে ও যে স্পষ্ট দেখল একজন বৃদ্ধ লোককে গাড়ির সামনে এসে পড়তে, তাহলে কি মনের ভুল? শ্রীতমার জন্য কি এবার পাগল হতে বসেছে ও? আহির কোনো প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পায় না। পেছন থেকে কেউ একজন ওর পিঠে হাত রেখে বলে,
– আমাকে খুঁজছিলে বুঝি?
আহির পেছন ফিরে দেখে সেই বৃদ্ধ লোকটাই দাঁড়িয়ে আছে।
– হ্যাঁ! এইতো আপনি। দিব্যি দাঁড়িয়ে আছেন আমার সামনে আর আমি এতক্ষন নিজেকে পাগল ভাবছিলাম আপনার জন্য।
– আমার জন্য না নিজের গিন্নির জন্য? ফিক ফিক করে কেমন হেসে ওঠে লোকটা।
আহির কথাটা শুনে চমকে ওঠে। ইনি কিভাবে জানলেন শ্রীতমার কথা? কি জানি হয়তো অনুমান করেছেন, যতই হোক পুরুষ মানুষ তো আর সব বিবাহিত পুরুষের জীবনে এই একই ঘটনা।
– যাই হোক। আপনি ঠিক আছেন তো? চলুন আপনাকে হাসপাতালে নিয়ে যাই, একবার চেক আপ করিয়ে নেওয়া ভালো।
– নাহ! বাপু, আমি আর যাচ্ছিনা হাসপাতালে, ওরা বড্ড ব্যথা দেয়। আমি বরং যাই এবার, আমার গিন্নির আসার সময় হয়ে গেছে। আমি যেতে দেরি করলে খুব রাগ করবে।
আহির মনে মনে খুব হেসে নেয় একচোট।
– ভারী মজার মানুষ তো আপনি, এই বয়সেও বউকে এত ভয় পান?
– এখনই তো আরও বেশি ভয় তাকে হারিয়ে ফেলার। তুমিও চল আমার সাথে ওই সামনের পার্কে গিয়ে কিছুক্ষণ বসবে আর আমার গিন্নির সাথেও আলাপ করিয়ে দেবো তোমায়।
– না আসলে আজ আমায় অফিস যেতে হবে, পরে একদিন নাহয় আলাপ করব।
– অফিসে কি আজ মন বসবে তোমার? আর গাড়িটারও তো বারোটা বাজিয়ে বসে আছো দেখছি।
সত্যি তো! গাড়িটার কথা একদম মাথা থেকেই বেরিয়ে গিয়েছিল ওর। গ্যারেজে ফোন করে গাড়িটা নিয়ে যেতে বলে দেয় আহির। অগত্যা পার্কে গিয়েই এখন বসতে হবে কিছুক্ষণ তাকে।
– আপনি কি রোজ আসেন এখানে? বাড়ি ছেড়ে এখানে এসে দেখা কেনো করেন আপনারা?
– বাড়িতে যে খুব ভিড়, অনেক লোকজন এসেছে তাইতো আমরা লুকিয়ে এখানে চলে আসি রোজ।
আহির পকেট থেকে ফোনটা বের করে হোয়াটসঅ্যাপটা খোলে একবার। হুম! মেসেজটা সিন করেছে শ্রীতমা কিন্তু কোনো উত্তর নেই, তার মানে ও সহমত।
– গিন্নির ফোন নিশ্চয়ই? কি বলছে বাড়ি যেতে?
– নাহ! তার ফোন করার সময় নেই শুধু ঝগড়া করার সময় আছে। ছাড়ুন বাদ দিন আমার কথা। আপনি বলুন আপনাদের কি লাভ ম্যারেজ?
– হ্যাঁ! লাভ ম্যারেজই বটে। যেদিন প্রথম ওনার বাড়িতে গেলাম ওনাকে দেখতে, পর্দার পেছন থেকে বারবার উকি মারছিলেন উনি। আমার চোখে চোখ পড়তেই লজ্জায় মুখটা লাল হয়ে উঠল, দৌড়ে চলে গেলেন ঘরের ভেতর। তারপর আবার দেখা হয় সোজা বিয়ের পিড়িতে। আমি কিন্তু প্রথমদিনই প্রেমে পড়েছিলাম ওনার আর ওই যে প্রেমে পরলাম, আজ অব্দি উঠতে পারলাম না।
আহিরের ভীষণ মনে পড়ছে ওর আর শ্রীতমার বিয়ের দিনটা। কি অপরূপ সুন্দর দেখাচ্ছিল শ্রী – কে বিয়ের সাঁজে, ঠিক যেন রূপকথার রাজকন্যে।
– বিয়ের কথা মনে পড়ছে বুঝি?
– হ্যাঁ! কিন্তু কি লাভ? আজই সব শেষ হয়ে যাবে। আমাদের এত বছরের সম্পর্ক, একসাথে দেখা সমস্ত স্বপ্নগুলো ভেঙে যাবে আজ। আজই মিউচুয়াল ডিভোর্স ফাইল করবো আমরা।
– কি করে জানলে মিউচুয়াল? সর্বদা নিরবতা সম্মতির লক্ষণ নাও হতে পারে।
– কিন্তু ওর মনে আমার জন্য যে ভালোবাসা ছিল সে বহুদিন হল শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেছে। রোজ রোজ এই অশান্তি আমি আর নিতে পারছিনা। একটু একটু করে জমতে জমতে যে অভিমানের দেওয়াল গড়ে উঠেছে আমাদের মাঝে, সেই দেওয়াল আর ভাঙা যাবেনা।
– তোমাদের মাঝে দূরত্ব বেড়েছে কিন্তু ভালোবাসা এখনও আগের মতোই আছে।
গত বিয়াল্লিশ বছর ধরে আমি আর আমার স্ত্রী সংসারটাকে আগলে রেখেছি, হিসেব করে বলা যাবেনা ঠিক কতবার আমরা দূরে চলে যাবো ভেবেও আরো কাছে চলে এসেছি দুজন দুজনের কারণ আমাদের মধ্যে একটাই জিনিস মিউচুয়াল ছিল সেটা হল ভালোবাসা।
একবার ভালো করে ভেবে দেখো তো? সে যদি তোমাকে ভালোই না বাসে তাহলে তার সমস্ত অভিমান আর অভিযোগে তুমি কেনো থাকো?
সে যদি তোমায় ভালোই না বাসে তাহলে দিনের শেষে কেনো আজও তোমার জন্য খাবার আগলে বসে থাকে? কেনো নিজের পছন্দ অপছন্দ গুলোকে ভুলে শুধু তোমার জন্য বাঁচে, তোমার হয়ে বাঁচে?
এক নিমেষে আহিরের মনের ভেতর যেন কাঁচ ভাঙার মত শব্দ হয়। সত্যিইতো শ্রীতমা আজও রোজ ওর জন্য খাবার টেবিলে সাজিয়ে বসে থাকে কিন্তু আহির তো রোজ অফিস থেকে ফিরে ওর খাবারটা নিয়ে নিজের ঘরে চলে যায়, ঘুরেও তাকায় না শ্রীতমার দিকে।
আহির জানত শ্রীতমা মাছ খেতে খুব ভালোবাসে, বিয়ের আগে একদিনও ওর মাছ ছাড়া চলত না কিন্তু বিয়ের পর মেয়েটা হঠাৎ মাছ খাওয়া বন্ধ করে দেয়।
আহির তো কোনদিন জানতে চায়নি কেনো? কিন্তু আজ ও বুঝতে পারছে কারণটা। ও মাছ খেতে ভালোবাসে না বলেই শ্রীতমা নিজের ভালোলাগাটাও অনাহাসে পাল্টে ফেলেছে। তাহলে সব দোষ ওরই, ও না বুঝে এতদিন ধরে শ্রী – কে কষ্ট দিয়ে যাচ্ছে এভাবে আর দোষটাও ওর ওপরই চাপিয়ে দিচ্ছে।
– যাও বাড়ি যাও। পারলে একটা লাল গোলাপ কিনে নিয়ে যেও গিন্নির জন্য, মেয়েরা গোলাপ খুব ভালোবাসে। এই দেখো আমিও এনেছি গিন্নির জন্য।
আহির দেখল লোকটার পকেটে একটা লাল গোলাপ।
– আজকে দুজনে কোনো কথা বলবেনা, শুধু চোখের দিকে তাকিয়ে থাকবে। একে অপরের চোখে নতুন রুপে আবিষ্কার করবে নিজেদের।
ওইযে আমার গিন্নিও এসে গেছে। আজ বরং আমি আসি। আবার যেদিন দেখা হবে আমাদের সেদিন আলাপ করাবো তোমায় আমার ভালোবাসার সাথে।
– কিন্তু আপনি থাকেন কোথায়?
– আমি? এইতো এই বড়ো রাস্তাটা পেরোলেই ডান হাতের গলিটার ভেতর দ্বিতীয় বাড়িটাই আমার। “সুদর্শন ভিলা”।
কথাগুলো বলে লোকটা হাঁটতে হাঁটতে চলে যায়। আহির দেখে উনি যেন কারোর সাথে কথা বলতে বলতে এগিয়ে যাচ্ছেন কিন্তু অনেক দূর অব্দিও কাউকে দেখতে পায়না সে। তাহলে কি উনি ওনার স্ত্রী-কে কল্পনা করেন?
হঠাৎ হাতের ঘড়িটার দিকে চোখ যায় তার। ৫:৪৫ বেজে গেছে। ফোনটা বের করে দেখে শ্রীতমার ২০টা মিসড কল, ফোন করে তাকে কি বলবে ভেবে উঠতে না পেরে সে ফোনটা আবার পকেটেই রেখে দেয়। গাড়িটা গ্যারেজ থেকে নিয়ে সোজা বাড়ির পথে রওনা হয়। রাস্তায় যেতে যেতে ফুলের দোকান থেকে একটা লাল গোলাপ কিনতেও ভুল হয়না তার।

আহিরের অফিসে গিয়ে শ্রীতমা দেখে সেখানে সে নেই এবং জানতে পারে যে সে আজ অফিস আসেইনি। এতবার ফোন করেও তাকে না পেয়ে শেষে বাড়িতে ফিরে আসে শ্রীতমা। মনের মধ্যে সন্দেহরা বাসা বাঁধতে শুরু করে তার “নিশ্চয়ই অন্য কোনো সম্পর্কে জড়িয়েছে আহির, তাইতো ও ডিভোর্স চাইছে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব”।
লিফট থেকে বেরিয়ে ফ্ল্যাটের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে শ্রীতমা। ঘরের দরজা হা করে খোলা। সাহস করে ভেতরে ঢোকে, পুরো ঘরটা অন্ধকার। কোনরকমে হাতরে হাতরে লাইটের সুইচটা টেপে।
“সারপ্রাইজ!” বলে চিৎকার করে ওঠে আহির।
সে ঘরটাকে অনেক যত্ন করে মোমবাতি আর বেলুন দিয়ে সাজিয়েছে।
– এসব কি ডিভোর্সের আনন্দে করছো?
আহির বুঝতে পারে শ্রীতমা এখনো রেগে আছে তার ওপর। এবার সে আলতো করে শ্রীতমাকে কাছে টেনে কপালে একটা চুমু এঁকে দেয়।
– শ্রী আমাদের যেন শুধু ঝগড়াই হয়, বিচ্ছেদ যেন না হয় কোনোদিন।
আজ কতদিন পর আবার সেই চেনা ডাকনামে আহির ডাকল ওকে, “শ্রী”। শ্রীতমা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না, শক্ত করে জড়িয়ে ধরল আহিরকে যেন এই মুহুর্তেরই অপেক্ষায় ছিল ও এতদিন।

অনেকদিন পর ওরা দুজন অভিমানের সেতু পেরিয়ে কাছাকাছি আসে, ভালোবাসে। একে অপরের চোখে নতুন করে আবিষ্কার করে নিজেদের।
আহির সব কথা জানায় শ্রীতমাকে এবং ওরা ঠিক করে আগামীকাল ওই লোকটার বাড়ি গিয়ে ধন্যবাদ জানিয়ে আসবে ওনাকে কারণ আজ উনি না থাকলে ওরা দুজন আবার এক হতে পারত না।
পরদিন সকালেই ওরা পৌঁছে যায় সুদর্শন ভিলাতে। কলিং বেল বাজতেই একজন মাঝ বয়সী লোক বেরিয়ে আসে, সম্ভবত ওনার ছেলে।
– নমস্কার! বলুন কি ব্যাপার?
– আসলে এই বাড়িতে একজন বয়স্ক ভদ্রলোক থাকেন….
– হ্যাঁ! উনি আমার বাবা। কিন্তু আপনারা?
– আমরা ওনার সাথেই দেখা করতে এসেছি। উনি আমাদের অনেক বড়ো উপকার করেছেন তাই একবার যদি ডেকে দিতেন ওনাকে…
– হুম! আসুন আপনারা ভেতরে আসুন। নিশ্চয়ই আপনাদেরকেও বিবাহ বিচ্ছেদের হাত থেকে বাঁচিয়েছেন উনি। কিন্তু আপনারা বোধহয় আসতে একটু দেরি করে ফেলেছেন।
– দেরি? কেনো? উনি কি বাড়িতে…
কথাটা বলতে গিয়ে মুখের কথা মুখেই আটকে যায় আহিরের। এতক্ষণে তার চোখ যায় দেওয়ালে ঝোলানো ছবিটার দিকে। বিদ্যুৎ বেগে সোফা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে পড়ে আহির, এই লোকটার সাথেই তো কাল এতটা সময় কাটিয়েছে সে কিন্তু এটা কি দেখছে ও? লোকটার ছবিতে মালা ঝুলছে?
– ওনার ছবিতে মালা কেনো? উনি কি….
– হ্যাঁ! বাবা মা – কে খুব ভালোবাসতেন। মা মারা যাওয়ার পর থেকেই উনি কেমন একটা হয়ে গিয়েছিলেন, যখন তখন বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতেন কাউকে কিছু না বলে। কিছু জিজ্ঞেস করলে বলতেন মায়ের সাথে দেখা করতে যাচ্ছেন। এক মাস আগে এমনই একদিন বেরিয়ে যান তিনি, আর ফিরে আসেননি। বড়ো রাস্তায় একটা অ্যাক্সিডেন্ট হয় বাবার। হাসপাতালে নিয়ে গিয়েও আর বাঁচানো যায়নি। বেঁচে থাকাকালীন বাবা এরকম অনেকের সংসার ভাঙার থেকে বাঁচিয়ে ছিলেন, আপনাদের মত তারাও আসত বাবার কাছে কিন্তু এখন আর….
– আপনার বাবা আমায় সারাজীবনের জন্য ঋণী করে দিয়ে চলে গেলেন, যেই ঋণ আমি হয়তো কোনোদিনই শোধ করতে পারবো না।

দরজা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার আগে একবার পেছন ফিরে তাকায় আহির ছবিটার দিকে। মনে হল ছবির ওপার থেকে তিনি যেন আহিরকে “অল দ্য বেস্ট” জানালেন।

আজকেও অনি বাড়ি ফিরতে লেট করলো। আজ আমাদের anniversary তবুও আজ অনি এতো লেট। ঘর ভর্তি গেস্ট সবাই অনির অপেক্ষায় কিন্তু অনির এখনো ফেরার সময় হয়নি। যাই হোক অনিকে ছাড়াই অনুষ্ঠান সম্পূর্ণ হলো। সব গেস্টরাও একে একে বিদায় জানিয়ে চলে গেছে। রাত তখন বারোটা। ঘর অন্ধকার করে আমাদের বিয়ের অ্যালবামটা ঘাটতে ঘাটতে কখন যেন ঘুমিয়ে পরেছিলাম।

অনির কাছে আর একটা এক্সট্রা চাবি থাকেই কখন ঘরে ঢুকেছে জানিও না। ঘরে ঢুকেই অঙ্কনা এই অঙ্কনা সারা বাড়ি অন্ধকার করে রেখেছো তোমার কি কোনো কালে বুূ্দ্ধিশুদ্ধি হবেনা গো। বলা মাত্রই আমি জেগে যাই। কটা বাজে অনি? মনে আছে আজকের দিনটার কথা? আর তুমি কিনা এখন মদ্যপান করে ঘরে এসে আমাকেই জিগ্যেসা করছো আমার বুদ্ধিশুদ্ধির কথা। ওহ আজকে কিযেন আমাদের anniversary তাই না। sorry baby আমি একদমি ভুলে গেছিলাম গো। actually আমি অফিসের কাজেও আজ একটু ব্যস্ত ছিলাম।

এই plzz অনি তোমার এই কাজের দোহাই আর কতো দেবে। কাজের নামে অফিসের কলিগ কি যেন নাম মেয়েটার তৃষা ওর সাথেই তো কাটাও সময় আমি কি জানিনা কিছুই নাকি। এই জাস্ট সেট-আপ ওর নামে আমি তোমার কাছ থেকে আমি কিছু জানতে চাইনা। ওর সাথে নিজের কমপেয়ার করোনা। কে করছে কমপেয়ার শুধু বলেছি এই কাজের দোহাই নাটক গুলে বন্ধ করো।

নিশ্চই ভাবছেন আমাদের দেখাশোনা করে বিয়ে হয়েছে। তবে আপনি একেবারে ভুল। আমাদের আটবছর প্রেম সেই কলেজ লাইফ থেকে তারপর বিয়ে। যদিও বিয়েটা করেছিলাম বাড়ির সবার অমতেই। শুধু ভালেবাসার মানুষটার উপর ভরসা করে ওর হাত ধরে বেড়িয়ে এসছিলাম আর বাড়িতে বলেছিলাম আমার ভালোবাসার যেখানে সম্মান নেই সেখানে আমিও থাকতে পারবোনা। অনেক দিন আগেই অনিকে ছেড়ে চলে যেতে পারতাম তবুও ভাবতাম একদিন হয়তো সব ঠিক হয়ে যাবে কিন্তু এখনের অবস্থাটা এমনি ওকে ছেড়ে যাওয়া যায় কিন্তু যাবোটা কোথায়। বাপের বাড়ি যাওয়ারও উপায় নেই। যার জন্য এতো কিছু আর এখন সেই ভালেবাসার মানুষটার কাছে আমারি সম্মান নেই।

বিয়ের দু থেকে তিন বছর আমাদের ভালোই যাচ্ছিলো। আমরা একই অফিসে যব করতাম। কিন্তু আমি ছিলাম ওর উচ্চপদস্থ কর্মচারি। আর এটাই ছিলো ওর সবচেয়ে বড়ো প্রব্লেম। যেদিন আমি প্রমোশান পাই ওকে সবার প্রথমে ওকেই জানিয়ে ছিলাম কিন্তু সেদিন ও খুশি হয়নি বরং প্রমোশান এর খবরটা শোনার পর আমায় বলেছিলো অফিসের বসের সাথে নোংরামো করলে এরখম প্রমোশান অনেক পাওয়া যায়। সাথে আরো নোংরা নোংরা অকথ্য ভাষায় অনি আরো অনেক কথা বলেছিলো আমায়। দিন দিন ও যেন কেমন হয়ে যেতে লাগলে। চেনা মানুষটা কেমন যেন অচেনা হতে লাগলো ক্রমশ। অবহেলা,সন্দেহ, প্রতিদিন মদ খেয়ে এসে গায়ে হাত তোলা পর্যন্ত বাদ দেয়নি। শুধু ভেবে গেছি একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে।
অগথ্যা আমি ওর সন্দেহ সব ভুল ভাঙার জন্য চাকরিটাও ছেড়ে দিই। চাকরি ছেড়ে দেওয়ার দু থেকে তিন মাস আমি যেন আমার আগের অনিকে ফিরে পেলাম। ওর চাইতে আমার কাছে মূল্যবান আর কিছুই ছিলোনা।

#অনিশ্চেয়তা সম্পর্ক#
পার্ট-২
শেষ পার্ট

পিউ দও

ওর চাইতে আমার কাছে মূল্যবান আর কিছুই ছিলোনা। তার কিছুদিন বাদে ওর ব্যবহার আবার পরিবর্তন হতে লাগলো। দেরি করে বাড়ি ঢুকতো যদি কারন জিজ্ঞেসা করতাম একটাই উওর আসতো কাজের প্রেশার ছিলো। ওর সাথে খাবো বলে ওর অপেক্ষায় থাকতে থাকতে কখনো কখনো ঘুমিয়ে পরতাম খাওয়ার কথা জানতে চাইলে বলতো অপেক্ষা করে কেন থাকো? ছুটির দিনগুলো ফোনে মুখ গুজে বসে থাকতো। যেন আমি ওর কাছে সামান্য একটা বোঝা ছাড়া আর কিছুই নয়।

আমার মন খারাপ থাকলেই অনেক সময় সামনের বাচ্চাদের পার্কটাতে গিয়ে বসে থাকি। বাচ্চাদের হোইউল্লোর দেখি। মনটা খুব ভালো হয়ে যায়। আমিও অনিকে অনেকবার বলেছিলাম আমাদের একটা বেবির কথা কিন্তু ও সবসময় বলতো এখনি আমি এসবের মধ্যে জড়িয়ে পরতে চাইনা। আর একটু সময় দেও। সময় দিতে দিতে বিয়ের তিনটে বছর কেটে গেছে তাও ওর সময় হয়নি। অন্ধকার নামাতে বাড়ি ফিরে দেখি দরজাটা ভেজানো কিন্তু আমিতো দরজা লক করেই গেছিলাম তাহলে কি ঘরে কেউ ঢুকেছে। আমার ঘরে ঢুকতেই অনি তুমি ছিঃ… তুমি এই মেয়েটাকে নিয়ে আমারি ঘরে এই অন্তরঙ্গ অবস্তায় ছিঃ। তুমি এতোটা নীচে নেমে গেছো।

কি এটা তোমার ঘর? অঙ্কনা তুমি ভুলে যাচ্ছো ঘরটা আমার আর আমার বাড়িতে আমি কাকে আনবো না আনবো এটা আমার ব্যাপার। তৃষা তুমি বাড়ি যাও। আমি তোমায় পরে ফোন করে নিচ্ছি। এই বলে ওকে বাড়ি পাঠিয়ে দেয়।
আমি সিদ্ধান্ত নিলাম এর পরও যদি আমরা এক সাথে থেকে যাই তবে আমি অনির কাছে বোঝা ছাড়া আর কিছুই নয়। যেখানে ভালোবাসা নেই সেটা আর যাই হোক সংসার হতে পারেনা। শুধু আমার ফোনটা নিয়েই বেড়িয়ে পরেছিলাম। জানিনা কথোয় যাবো কি করবো।

সারা রাতটা একটা স্টেশনেই কাটিয়ে ছিলাম। না অনি আমার খোঁজ নেওয়ার জন্য একটা বার ফোনও করেনি। নিজের মধ্যে নিজে প্রচন্ড ভেঙে পরেছিলাম। আমার বেঁচে থাকার কোনো কারন খুঁজে পাচ্ছিলাম না। এ জীবন রাখার চাইতে না রাখা অনেক ভালো। সেই উদ্দেশ্যেই ছুটতে থাকি ট্রেন লাইনের দিকে। পেছন দিক থেকে কে একজন আমায় ধাক্কা মেরে ঠিক আপনার মতোই একটা মানুষকে খঁজছিলাম বললো।
মানে কে আপনি? আমি যেই হোই তার আগে আপনি বলুন নিশ্চয়ই আপনার জীবনে বাঁচার কোনো আগ্রহ নেই। হ্যাঁ তা না হলে নিশ্চয়ই কোনো মানুষ মরতে আসেনা। কিন্তু আপনি আমায় বাঁচালেন কেন? কি চাই আপনার? আপনাকে…সত্যি বলছি দিদি আমার আপনাকে চাই আর কিচ্ছু না। সব বলবো তার আগে চলুন কোথাও বসা যাক।

এবার বলুন তো আপনি মরতে কেন যাচ্ছিলেন? আমি কি বোলবো বুঝে উঠতে পারছিলাম না। আমার অনিচ্ছা দেখে…আচ্ছা আপনার যদি বলতে অসুবিধে হয় তবে না বললেও চলবে।আমি আপনার ব্যক্তিগতো ব্যপার জানতে ইচ্ছুক নই। তবে আমি ঠিক এমন একটা মানুষকেই খুঁজছিলাম যার জীবনে বাঁচার ইচ্ছে নেই। আর সেই সমস্ত মানুষেরই এমন অবস্থা হয় যাদের পিছু টান বলতে কিছু থাকেনা। জানেন দিদি আমার একটা বোন ছিলো যে খুব অল্প বয়সে মারা যায় ঠিক আপনারি মতো সুইসাইড এর অবস্থার জন্য। আর চিঠিতে লিখে গেছিলো বোনের একটা ছেলের সাথে প্রেম ছিলো আমার বোন প্রেগন্যান্ট ছিলো কিন্তু ছেলেটি সেই মুহূর্তে বোনকে বিয়ে করতে রাজি ছিলোনা আর তাই বোন…

আমি খুঁজছিলাম ঠিক আপনারি মতো কোনো মেয়েকে যার ঘুরে দাড়ানোর কোনো জায়গা নেই। যেই মানুষটার বাঁচার কোনো ইচ্ছে নেই। কারন তারা বাঁচতে চায় কিন্তু কিছু সময়ে তাদের পরিস্থিতি বাঁচার চাইতে মৃত্যু সোজা হয়ে যায়। আমি এরকম মানুষ বিগত কয়েক মাস ধরে খঁজে যাচ্ছিলাম কিন্তু কাল বাড়ি ফেরার পথে এতো রাতে একা একটা মহিলা আপনাকে বসে থাকতে দেখে একটু অবাকই হয়েছিলাম আর তাই আপনার পিছু ছাড়লাম না তবে সবটাই আড়ালে থেকে। আর আপনি যখন অনবরত কেঁদে যাচ্ছিলেন আমি তখনই বুঝে গেছিলাম কিছু একটা অসুবিধে তো আছেই আর আজ তো সবটা বোঝাই গেল।

আমার বোন মারা যাওয়ার পর আমি আমার বোনের একটা জীবনি নিয়ে একটা সিনেমা বানাতে চাই। আমি এই কাজই করি। কিন্তু আমি অতি সাধারন সমাজে লাঞ্চিত নতুন মেয়ের মুখই খুঁজে চলেছিলাম। কথা বলতে বলতে কখন যেন ছেলেটার চোখ বেয়ে জল ঝরছিলো। দিদি আপনি আমার সিনেমায় কাজ করবেন? আমি জানি আপনি হয়তো আমায় বিশ্বাস করতে পারছেন না কিন্তু বিশ্বাস করুন কখনও কখনও চেনা সম্পর্কের চাইতে অচেনা সম্পর্ক বিশ্বাস যোগ্য হয়। করবেন দিদি আমার কাজ বলুন না করবেন…

কিন্তু ভাই আমি তো এর আগে কখনও অভিনয় করিনি।
বাস্তব জীবনের অভিনয়টাই নয় সমাজের কাছে ফুটিয়ে তুলবেন। আমি জানি আপনি পারবেন। বাদবাদি আমি বুঝিয়ে দেবো।
জীবনে তো সবই হারিয়েছি আর একবার নয় অচেনা মানুষকে বিশ্বাস করেই দেখি কি হয়। আমিও সেদিন তার কাজে সম্মতি দিয়েছিলাম। সেদিনের পর থেকে আমাকে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি।

আজ সন্ধ্যায় আমি আমার ব্যালকনিতে বসে চা খাচ্ছি আর আমার নেক্সট ফিল্মের স্ক্রিপ্ট দেখছি হটাৎ একটা আচেনা নম্বরে কল আসে। হ্যাঁলো অঙ্কনা বলছো।
হ্যাঁ কিন্তু আপনি কে যদিও গলা খুব চেনা লাগছিলো…আমি অনি বলছি একটু কথা বলা যাবে। বলো কি বলতে এতো দিন পর…

জানি তুমি এখন অনেক বড়ো সেলেব্রিটি কিন্তু সব কিছু ছেড়ে কি আমরা আবার আগের মতো সংসারটা করতে পারিনা।
অনি আপনি ভুল নম্বরে ফোন করেছেন। আপনি যেই অঙ্কনাকে চিনতেন সে অনেক দিন আগেই মারা গেছে। ভবিষ্যৎ এ আর এই নম্বরে ফোন করবেন না।

ফোনটা রেখে নম্বটা ডিলিট করে দিই। আর অতীতের কথা গুলো ভেবে একটু হাসলাম আর ভাবি কিছু মানুষকে সত্যি হয়তো ক্ষমা করা যায়না আর তাদেরকে ক্ষমা করলে হয়তো জীবনে বেঁচে থাকা সম্ভব হয়না। মাঝে মাঝে জীবনে একা চলার অভ্যাসটাও করতে হয়।

error: