WhatsApp Image 2020-08-24 at 12.09.46 PM

আজ ৫ই সেপ্টেম্বর শিক্ষক দিবস।মনীষ বাবুর কাছে আজ একটা বিশেষ দিন। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তিনি স্কুলে চলে এসেছেন।আজ তো শিক্ষক দের দিন। স্কুলে প্রোগ্ৰামের আয়োজন করেছে ছাত্রছাত্রীরা।প্রাক্তন ছাত্র ছাত্রীদেরকেও দেখা যাচ্ছে।সবাই মিলে মঞ্চ সাজাতে ব্যস্ত,কেউ ছুটছে ফুল আনতে,কেউ গিফট কিনতে।প্রত্যেকটা ক্লাসের ছেলেমেয়েরা তাদের নিজের নিজের ক্লাসরুম সুন্দর ভাবে সাজিয়ে ফেলেছে।বাচ্ছাদের কোলাহলে মুখরিত হয়ে আছে স্কুল চত্বর।আজ কোনো শাসন নেই শাস্তি নেই শুধু আনন্দ।কোনো কোনো ক্লাসরুম থেকে হারমোনিয়ামের আওয়াজ ভেসে আসছে নাটকের রিহার্সাল ও চলছে রুমে রুমে, ছোট ছোট মেয়েগুলোকে বড়ো দিদিরা শাড়ি পরিয়ে দিচ্ছে,একেবারে অনুষ্ঠান শুরুর আগের মূহূর্তের প্রস্তুতি চলছে আর কি।মেয়েরা অনেকেই শাড়ি পরে এসেছে আর ছেলেরা পাঞ্জাবি যেনো রঙের হাট বসেছে স্কুল জুড়ে।আজ যেনো একটা অন্যরকম দিন।ছাত্র-ছাত্রীদের খিলখিলানি হাসি আর আনন্দে মাতোয়ারা দেখে সব শিক্ষক শিক্ষিকারা খুশি। শিক্ষিকারা সবাই তাদের পছন্দ মতো সুন্দর শাড়ি পরে,হালকা সাজে টিচার রুম আলোকিত করে রেখেছেন।


মনীষ বাবু এই দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন হাই স্কুলের গনিতের শিক্ষক।গত পনের বছর ধরে তিনি চেষ্টা করে এসেছেন সমস্ত ছাত্রছাত্রী দের সঠিক শিক্ষায় শিক্ষিত করতে।তিনি ছাত্রছাত্রী দের সাথে বন্ধুর মতোই মেশেন‌ আবার পড়াশোনার সময় ভুল করলে তিনি শাস্তি দিতেও পিছপা হন না,তারপর মন খারাপ করলে আবার পরম স্নেহে তিনি বুকে টেনে নিয়ে মান ভাঙাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন।এহেন মনীষ বাবুকে সমস্ত ছাত্রছাত্রীরা শ্রদ্ধা করে।তাদের কাছে মনীষ বাবু এক ভালোবাসার শিক্ষক।মনীষ বাবু সমসময় চেষ্টা করেন পড়াশোনায় দুর্বল ছাত্রছাত্রী দের কেও উৎসাহিত করে তাদের প্রতিষ্ঠিত করতে।বহু ছাত্রছাত্রী স্কুল থেকে বেরিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।আজ এই দিনটাতে সবাই ছুটে আসে ঠিক,তাদের সব কাজ ফেলে।


মনীষ‌ বাবু বাড়িতে সকালে বিকেলেও টিউশনি পড়ান।বহু দূর দূর থেকে ছাত্রছাত্রীরা আসে।মনীষ বাবু সবাইকে শেখাতে পেরে আনন্দিত হন।মনীষ বাবু গরীব ছাত্র ছাত্রীদের সম্পুর্ন বিনামূল্যে শিক্ষা দান করেন।সবসময় খেয়াল রাখেন লেখাপড়া করতে কারো যেনো সমস্যা না হয়।বই কেনার টাকার সমস্যা থেকে স্কুল ফিস যে কোনো সমস্যাতে এলাকার সব ছাত্র ছাত্রীদের ভরসা মাষ্টারমশাই।পাড়ায় হাটে বাজারে সব মানুষ তাকে শ্রদ্ধা করে। সবার ভালোবাসার ‌মানুষ তাদের প্রিয় মাষ্টারমশাই।


একে একে শিক্ষক শিক্ষিকা দের স্টেজে ডাকা হচ্ছে তাদের সম্মান প্রদান আর তার সাথে তাদের উপহার তুলে দিচ্ছে ছাত্রছাত্রীরা।হাততালি তে গমগম করছে গোটা স্কুল চত্বর।তার সাথে চলছে ছাত্রছাত্রীদের বিভিন্ন উপস্থাপনা শিক্ষক দিবস উপলক্ষে।এবার ডাকা হলো শ্রীযুক্ত মনীষ কুমার দাস মহাশয়কে।বহু ছাত্রছাত্রীরা আসছে স্যারের থেকে আশির্বাদ নিচ্ছে উপহার তুলে দিচ্ছে তাদের প্রিয় শিক্ষকের হাতে।স্যার বুকে টেনে নিচ্ছেন তার স্নেহের ছাত্রছাত্রীদের কে।


আমরা এখন আমাদের প্রিয় মাষ্টারমশাই মনীষ বাবুকে তার ছাত্র জীবন থেকে শিক্ষক জীবনের অভিজ্ঞতা নিয়ে কিছু বলতে অনুরোধ করবো।একজন প্রাক্তন ছাত্রের অ্যানাউন্সমেন্টে তাদের প্রিয় শিক্ষক বলতে শুরু করলেন।


আমি তোমাদের গনিতের শিক্ষক মনীষ কুমার দাস জন্মেছিলাম এক গরীব মুচির পরিবারে।বাবার ছিলো জুতো সারাইয়ের একটা ছোট্ট দোকান।ওই দোকান ছিল আমাদের জীবন নির্বাহের একমাত্র সম্বল। আমি আর আমার বোন তখন ছোট আমরা দেখতাম সারাদিন কাজ করার পর রাতে ফিরে বাবা লেখাপড়া করতেন বলতেন লেখাপড়ার নাকি শেষ নেই। আমরা হাঁ করে শুনতাম শুধু।পাশের লাইব্রেরী তে বাবার ছিল রোজের যাতায়াত দোকান রেখে এক ফাঁকে গিয়ে বাবা বই আনতেন লাইব্রেরী থেকে তারপর রাত জেগে বই পড়তেন।ঠাকুমা বলতেন লেখাপড়া তে নাকি বাবার খুব মনোযোগ ছিল বহুদূরের এক স্কুলে বাবা নাকি রোজ পায়ে হেঁটে স্কুলে যেতেন।গরীবের ছেলের এতো জেদ দেখে মাষ্টারমশাই রাও খুব ভালোবাসতেন বাবাকে‌।এইভাবে পড়াশোনা করে যাচ্ছিলেন বাবা কিন্তু ম্যাট্রিক পরীক্ষা আর দেওয়া হয়নি নাকি বাবার।হঠাৎ দাদু কলেরায় মারা গেলেন সারা গ্ৰামে মড়ক লাগলো বাবা আর কি করেন তিন চারটে ছোট ছোট ভাই-বোন আর বিধবা মায়ের মুখে দু মুঠো ভাত তুলে দিতে ওই বয়সেই সংসারের সমস্ত দায়িত্ব তুলে নিলেন নিজের কাঁধে।বসলেন দাদু র জুতো সারাইয়ের দোকানে।


বাবা সবসময় আমাদের দু ভাই বোনকে বলতেন যে সমাজের অন্ধকার কাটাতে শিক্ষার আলো খুবই দরকার।একটু বড়ো হওয়ার পর বাবা আমাদের রাতে এসে দু ভাই বোনকে পড়াতেন।তখন সবে সবে গ্ৰামে নতুন স্কুল হয়েছে তাই সকাল থেকে বাবার দোকানের একপাশে বসেই বীজগণিত জ্যামিতি করে যেতাম কিছু বুঝতে না পারলে বাবা বলে দিতেন। সবসময় চেষ্টা করতাম বাবার স্বপ্ন টাকে পূরণ করতে যে কোনো ভাবে।আমি আর বোন সবসময় পড়াশোনা নিয়েই থাকতাম। বাবা মা এতে খুব খুশি হতেন।হঠাৎ বিপদ এলো জীবনে আমার ছোট বোনটা অসুস্থ হয়ে পড়লো বাবা মা অনেক কান্নাকাটি করলেন হাসপাতালে নিয়ে গেলেন।কিছুদিন পর জানা গেলো মারন রোগ ক্যান্সার বাসা বেঁধেছে ওই ছোট্ট শরীরে। ট্রিটমেন্টে চললো দিন দিন অসুস্থ হয়ে পড়তে লাগলো বোন।আর স্কুলে যেতে পারে না ও।আমি একাই যাই স্কুলে মনটা হু হু করতো আমার।বোনটা আমার বড়ো আদরের ছিল।দু’বছর পর ছোট বোনটা ওর দাদাকে একা রেখে চলে গেলো এক অজানা গন্তব্যের উদ্দেশ্যে। বাবা মা ভেঙে পড়লেন।তখন একমাত্র সম্বল আমি। সবসময় চাইতাম বাবা মা কে খুশি রাখতে।


আমি মাধ্যমিক দিলাম ভালো রেজাল্ট করে,বাবা মায়ের মুখে হাসি ফুটলো।আমি তার মধ্যে ও দেখেছিলাম বাবার চোখে জল।বাবাকে বললাম অঙ্ক নিয়ে পড়াশোনা করবো। ভর্তি হলাম গ্ৰাম থেকে দূরের একটা স্কুলে।স্কুলের মাষ্টারমশাইরা আমাকে সাহায্য করতেন বড়ো দাদা দিদিরা তাদের বই দিতো পড়ার জন্য।বাবা একটা পুরনো সাইকেলের ব্যবস্থা করে দিলেন অনেক কষ্ট করে।রোজ সাইকেল চেপে স্কুল যেতাম।উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা দিলাম এবার কলেজে ভর্তির পালা।

বাবা এতো কষ্টের মাঝেও নিজের একমাত্র সম্বল এক চিলতে জমি টুকু বেচে দিয়ে আমাকে কলেজে পড়তে শহরে পাঠালেন। আমি আপত্তি করেছিলাম বাবা বলেছিলেন তুই শিক্ষিত হয়ে সমাজের আরো মানুষ কে শিক্ষার আলো দেখাবি। সমাজের জন্য আমাকে তো কিছু করতে হবে।শহরে মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা শুরু করলাম অঙ্কই আমার ধ্যান জ্ঞান। অঙ্কের সমুদ্রে ঝাঁপ দিলাম আমি।দুটো বছর কেটে গেছে বাবা অসুস্থ হয়ে পড়েছেন কিন্তু কখনো আমাকে জানতে দেননি।


ফাইনাল ইয়ারের পরীক্ষা চলছে তখন বাবা শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করলেন।কিন্তু আমাকে একবারের জন্য ও জানতে দিলেন না পাছে আমার পরীক্ষার ক্ষতি হয়।শেষ বারের জন্য ও বাবার মুখ দেখতে পেলাম না,বাবা মায়ের একমাত্র সম্বল হয়েও।পরীক্ষা শেষ হলে সব জানলাম। বাবার ছবির সামনে গিয়ে হাউমাউ করে কেঁদে ফেললাম ভীষণ শ্রদ্ধা করতাম বাবাকে।তারপর মাকে নিয়ে চলে এলাম শহরে।উঠলাম একটা ভাড়া বাড়িতে।টিউশনি করে দুটো পেট চলে যেতো। কলেজের স্কলারশিপ আর টিউশনির জমানো কিছু টাকায় আরো পড়াশোনা করলাম।তারপর চাকরি নিয়ে এলাম তোমাদের এই স্কুলে।তারপর থেকে এই স্কুল ছেড়ে আর যাইনি। চেষ্টা করেছি সবসময় তোমাদের প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত করতে।


পুরো স্কুল নিঃস্তব্ধ প্রতিটা ছাত্রছাত্রী শিক্ষক শিক্ষিকার চোখে জল।মনীষ বাবু বললেন তোমাদের আমরা শাসন করি এই শাসনের মাঝে আছে আমাদের অফুরন্ত ভালোবাসা আর তোমাদের ভবিষ্যত উজ্জ্বল করার প্রচেষ্টা।তোমাদের বাবা মায়ের মতো আমরা প্রতিটা শিক্ষক শিক্ষিকা চাই তোমাদের সাফল্য,যাতে তোমরা ভালো থাকো।আর তোমরাও তোমাদের শিক্ষার মাধ্যমে সমাজের অন্ধকার দূরীকরণে সামিল হও।

SyaaheeF

‘হ্যাঁ আপনি বলুন কী বই পড়তে চান।’

-‘ ‘দ্য নোটবুক’ আছে?

-‘না দাদা।বুঝতেই তো পারছেন গ্রামীন লাইব্রেরি।
ইংলিশ বুক এর খুব একটা স্টক নেই।বাংলায় অনেক ভালো ভালো নোভেল আছে।নতুন এসেছে।ওগুলো পড়তে পারেন।’

-‘নতুন বুক মানে..কোথায়..?’

-‘ওই তো ওই কোনের দিকের র‍্যাকটায় দেখুন।’

-‘আচ্ছা।থ্যাঙ্কস।’

লাইব্রেরিয়ান ভদ্রলোকটি অনির্বাণকে কিঞ্চিৎ হাসি
মুখে লাইব্রেরির পূর্ব দিকের কোনেতে আঙুলের
ইশারা করে দেখিয়ে দিলেন নতুন যে বাংলা বই গুলো আনা হয়েছে,সেগুলো ঠিক কোন র‍্যাকটায় আছে।অনির্বাণ তেনার ইশারা মত সে দিকে এগিয়ে গেলো।

অনির্বাণ ব্যাঙ্গালোরে থাকে কাজের সূত্রে।অফিসের
প্রায় সমস্ত ক্লায়ন্টদেরকে তাকে যখন এটেন্ড করতে হয়,তাদের সঙ্গে ইংরেজিতে কথা বলে বলে তাই
ইংরেজিটাই তার বেশ অভ্যস্ত হয়ে গেছে।বাংলা যে
বলে না- তা নয়।বাড়িতে ফোন করলে বা ওখানে
ওর বাঙালী যে সব পরিচিতরা আছে তাদের সঙ্গে বাংলাতেই বলতে বেশি পছন্দ করে।কিন্তু,বাংলা বই
বা নিউজ পেপার পড়ার তেমন সুযোগ হয় না বলে-
অগত্যা,ইংরেজি।

দিন পনেরোর জন্য ছুটি নিয়ে প্রায় মাস ছয়েক পর
বাড়ি এসেছে।পুরানো বন্ধু বান্ধবদের সঙ্গে তেমন
আর যোগাযোগ নেই।একমাত্র অমিতের সঙ্গে মাঝে
মধ্যে চ্যাট হয়।আর অমিতের বোনের বিয়ে উপলক্ষে এবং অনেকদিন বাড়ি না ফেরার ছুঁতোয় অনির্বানকে ছুটিটা করতে হয়েছে।অমিত বোনের বিয়ের কাজে ব্যস্ত।তাই একা একা কতক্ষনই বা বাড়িতে বসে বসে সময় কাটে।অতএব,খোঁজ খবর করে একদম সোজা লাইব্রেরিতে এসে উপস্থিত সে।

-‘এক্সকিউজ মি।’ কথাটা অনির্বাণ নতুন বাংলা বই
এর কালেকশন সাজানো র‍্যাকের সামনে গিয়ে
অচেনা একজন মাঝবয়সী মহিলাকে বলতে মহিলা
টি একটু সরে গিয়ে অনির্বাণকে জায়গা করে দিলো।যে সব লেখকদের বই সারি দিয়ে সাজানো ছিলো সে বেশিরভাগজনের নামের সঙ্গেই পরিচিত।দু এক জন নতুন লেখক ছাড়া।ভীনরাজ্যে বাংলা পড়বার সুযোগ পায়না তো কী,বাঙালি লেখকদের খবর সে রাখে।কিন্তু,কোন বইটা যে বাছাই করবে, সেটা চয়েস করে উঠতে পারছিলোনা।তার এই বইটা ওই বইটা ঘাঁটা লক্ষ্য করে ঠিক তার পিছন দিক থেকে বছর পঁচিশের একজন খয়েরি রঙের শাড়ি পড়া মেয়ে তার ঠিক পাশটায় এসে হাতে করে একটা বই র‍্যাক থেকে তুলে নিয়ে-‘এটা পড়তে পারেন।’ মিষ্টি করে বলে তার হাতে বইটা ধরিয়ে দিলো।অনির্বান বইটা হাতে নিয়ে ফ্রন্ট এ নামটা দেখে বলল-‘দোয়েল সাঁকো।স্মরনজিৎ চক্রবর্তী।’ মেয়েটা বলল-‘হুম।দোয়েল সাঁকো।পড়ুন।আপনার ভালো লাগবে।’ অনির্বাণ বলল-‘মেনি মেনি থ্যাঙ্কস।
সো কাইন্ড অফ ইউ।’

মেয়েটা একটা বই হাতে ঘরের মধ্যে নিরিবিলি এক
কোনে ফাঁকা টেবিল দখল করে বসে পড়লো।আর
অনির্বান মেয়েটার থেকে সামান্য কিছু দূরত্বে অন্য
একটা শূন্য টেবিলে জায়গা করলো।প্রায় আধ ঘন্টা
হয়ে গেছে তখন।মেয়েটা জলের বোতলের ছিপি
খুলে চুমুক দিতে যাবে,আড়চোখে দেখে অনির্বাণ তার দিকে তাকিয়ে কিছু যেন তাকে জিজ্ঞেস করতে চাইছে,তবু কিন্তু কিন্তু বোধ করে পারছেনা।মেয়েটা
দু ঘোট জল খেয়ে অনির্বাণের দিকে চেয়ে বলল-
‘কিছু বলবেন?’ অনির্বান সামান্য থতমত সুরে বলল
-‘না..মানে..’ মেয়েটা বলল-‘না,মানে না করে পড়ুন।’
অনির্বান বলল-‘না মানে ছোটো একটা ডাউট তৈরি
হয়েছে।’মেয়েটা বলল-‘কী বলুন।’ অনির্বান বলল
-‘ওখানে একবার যেতে পারি?’মেয়েটা বলল-‘ এখানে?হ্যাঁ,আসুন না।’ অনির্বান বইটা সঙ্গে করে
নিয়ে মেয়েটার টেবিলে গিয়ে বলল-‘এই শব্দটার
মানে কী বোঝায়?’মেয়েটা প্রথমে হেসে ফেলল।
হাসি থামিয়ে বলল-‘সরি,সরি।ছা-পোষা মানে জানেননা?’ অনির্বান বলল-‘ছা-পোষা মানে কী…?’ মেয়েটা বলল-‘ঠিকই জানেন।’ অনির্বান বলল- ‘এটাই খুব কনফিউশানে ছিলাম।আসি।প্লিজ কনটিনিউ ইওর স্টাডি।সরি ফর ডিসটারবিং।’
মেয়েটা বলল-‘কোনো অসুবিধে হয়নি।’

সাঁইত্রিশ পাতা পর্যন্ত পড়ে অনির্বাণ টেবিল থেকে
উঠে গিয়ে র‍্যাকে যেখানে বইটা ছিলো সেখানে রেখে দিয়ে লাইব্রেরিয়াম ভদ্রলোকটিকে বলল- ‘আমার পুরোটা তো পড়া হলোনা।কাল পাবো কী আবার?’লাইব্রেরিয়ান ভদ্রলোকটি বলল-‘নিঃশ্চই।বইয়ের নাম আর আপনার নাম এখানে লিখে দেন।আমি অন্যকাউকে দেবোনা।’অনির্বাণ বইয়ের নাম এবং নিজের নাম খাতায় এন্ট্রি করিয়ে দিলো।যাওয়ার আগে একবার ঘাড় বাড়িয়ে দেখলো সেই মেয়েটা কী করছে।দেখলো তখনও পড়ছে।সে লাইব্রেরি থেকে বাইরে বেরিয়ে এসে বাইকের পাশে দাঁড়িয়ে সিগারেট জ্বালালো।অনেকক্ষন পড়ছিলো।মাথা জট হয়ে গেছে।আচমকা মেয়েটাকে ভেতর থেকে হেঁটে আসতে দেখে সিগারেটটা ফেলে দিলো।

মেয়েটা তাকে দেখে এগিয়ে এসে বলল-‘পুরোটা কমপ্লিট?’অনির্বান ভাবলো সিগারেটের কথা বলছে।সে লজ্জা বোধ করে বলল-‘আপনি আসছিলেন তাই ফেলে দিয়েছি।’ মেয়েটা আবার হেসে ফেললো-‘আরে না না, আমি উপন্যাসটা কমপ্লিট করেছেন নাকি বললাম।’ অনির্বান বলল- ‘আবার কাল আসতে হবে।করতে পারিনি।’মেয়েটা বলল-‘ওকে।চলুন।কাল হয়তো আবার দেখা হবে।’ মেয়েটা চলে যেতে পা বাড়িয়েছে অনির্বাণ পিছু ডেকে বলল-‘আপনি কী স্কুল টিচার?’মেয়েটা থেমে বলল-‘সহজ বাংলা শব্দটার মানে বলে দিয়েছি বলে একদম স্কুল টিচার ভেবে বসলেন?’অনির্বাণ বলল-‘তা কেনো?আসলে আপনাকে দেখে তাই মনে হয়।’মেয়েটা বলল-‘বড্ড তাড়াতাড়ি মানুষ
চিনে ফেলেন তো..।’ অনির্বাণ বলল-‘তাহলে কারেক্ট
বলেছি?’ মেয়েটা বলল-‘হুম।পার্শ্বশিক্ষিকা,ইংরেজি’
অনির্বান বলল-‘পার্শ্ব..?’মেয়েটা বলল-‘ল্যাটারাল
টিচার।বাংলা একদমই পড়েন না দেখছি।’ অনির্বাণ
বলতে গেলো,কিন্তু মেয়েটা তাকে থামিয়ে দিয়ে বলল-‘বাইরে থাকেন।বুঝেছি।’অনির্বান বলল- ‘ব্যাঙ্গালোর। অনির্বাণ দত্ত।মেকানিকাল ইঞ্জিনিয়ার।’মেয়েটা বলল -‘আরশি রায়।আর পেশা তো জেনেই গেছেন।’

বাড়ি ফিরে যাওয়ার পর অনির্বাণ এর বারবার মেয়েটার হাসিটা খুব মনে পড়ছিলো।সে অনেক বাঙালি অবাঙালি মেয়েকে দেখেছে জীবনে,কিন্তু অমন মিষ্টি হাসি বোধহয় কোনো মেয়ের ঠোঁটে আগে কখনো খেয়াল করেনি।আরশির লম্বাটে মুখের ছোট্ট হাসিটা যেন যে কোনো মেয়ের হাসিকে ফিকে করে দেয়। তাই হয়তো আরশির হাসিখানা একদিনমাত্র দেখেই অনির্বাণের সোজা বুকে গেঁথে গিয়েছিলো।পরদিন লাইব্রেরিতে আরশির সঙ্গে ফের দেখা।কপালে লেখা থাকলে যা হয়।সাক্ষাৎ হতেই আরশি আবার সেই পুরানো হাসিটা ঠোঁটের ওপরে এনে বলল-‘কেমন লাগলো উপন্যাসটা জানাবেন।’অনির্বাণ বলল-‘হ্যাঁ,অবশ্যই।’সেদিন দুজনের বই পড়া একসঙ্গে শেষ হলো।অনির্বাণ আরশির দিকে তার হাতটা বাড়িয়ে দিয়ে বলল- ‘থ্যাঙ্ক ইউ।’ হ্যান্ডশেকটা না করলে কেমন লাগে,তাই আরশি হাত মিলিয়ে বলল-‘তাহলে আমি আপনার জন্য ঠিকঠাক বইটাই বেছেছিলাম বলুন।’অনির্বাণ বলল-‘এপ্রিসিয়েট করার মত।এর জন্য আমার আপনার কাছে রিকোয়েস্ট আছে একটা।’আরশি বলল-‘আজ একসঙ্গে কোথাও বসে যদি কফি..’ কথা শেষ হলোনা।অনির্বাণের বলা পুরো হলোনা।আরশি বলল-‘কফি আমি খাইনা।সামনের ওই মোড়টায় ফুচকা পাওয়া যায়।আপত্তি না থাকলে সেটা খেতে পারি।’অনির্বাণ বলল-‘ফুচকা?
তা অনেকদিন খাওয়া হয়নি..চলুন।’

ফুচকাওয়ালা ফাঁকা ছিলোনা।খানিক্ষন অপেক্ষা করতে হলো।লাইন দিয়ে জায়গা হতে দুজনে পাশা
পাশি দাঁড়ালো।দুটো ফুচকা সবে গালে পুড়েছে মাত্র
অনির্বাণ ঝালে হু হা করছে বুঝে আরশি ফের হেসে
উঠলো।অনির্বাণ হাঁ হু হা করতে করতেই আরশির
দিকে তাকালো।আরশির হাসিতে অনির্বাণের ঝাল
লাগা খানিকটা কমলো।আরশি হাসতে হাসতেই
বলল-‘বিয়ে হয়নি না আপনার।ঠিক ধরেছি।’এ ঠিক কেমন ধরনের কথা অনির্বাণ ভাবলো।-‘ঝালের সঙ্গে বিয়ের কী সম্পর্ক শুনি?’ সে জিজ্ঞেস করলো।
আরশি বলল-‘বিয়ে করুন।নিজেই বুঝে যাবেন।’
আবার আরশি হাসতে শুরু করলো।না,এবার আর
সামলানো যাচ্ছেনা।-‘একটা কথা বলবো?’-অনির্বাণ
প্রশ্ন করলো।আরশি বলল-‘করে ফেলুন।’ অনির্বাণ
বলল-‘আপনার প্রেমিক সবসময় আপনার হাসির
ভীষন প্রশংসা করে তাই না?’আরশি বলল-‘এত
জটিল করে জানতে চাওয়ার কী আছে যে আমার
প্রেমিক আছে কিনা?’অনির্বাণ বলল-‘ভুল বুঝলেন।
আপনার হাসিটা এক্সট্রাঅর্ডিনারী।’ আরশি বলল
-‘ঢপ দিচ্ছেন?’অনির্বাণ বলল-‘আপনার যা মনে হয়।’

ফেরার পথে আরশি বলল-‘সময় স্পেন্ড করে সত্যিই ভালো লাগলো আপনার সাথে।আশা করি কখনো ফের দেখা হয়ে যাবে।’অনির্বাণ বলল- ‘কেনো?কাল লাইব্রেরিতে আসছেন না?’আরশি বলল-‘দিন চার আমি থাকবোনা বাড়িতে।আপনি কবে ব্যাঙ্গালোরে ফিরে যাচ্ছেন।’অনির্বাণ বলল- ‘নেক্সট উইক মে বি।’আরশি বলল-‘ওকে।আসি তাহলে।’ চলে যাওয়ার আগে আরশি তার হৃদয় কাড়া হাসি দিয়ে অনির্বাণের একা বুকটায় যেন কোন এক অজানা সমুদ্রের অজানা ঢেউ তুলে দিয়ে গেলো।অজান্তেই যে সে আরশিকে অন্তর দিয়ে বসেছে সেটা সেই মুহুর্তে টের না পেলেও পরদিন লাইব্রেরিতে আরশিকে চোখের বারান্দায় না পেয়ে কেমন জানি অভাববোধ অনুভব করেছিলো।আরও একবার আরশির সেই গোঢূলির রক্তিম আকাশটার মত টকটকে হাসিটা সে দেখবে বলে ব্যাকুল হয়ে ওঠে।ক্রমে দুদিন,তিনদিন গেলো।ছটফট করছে সে, অস্থিরতায় হাত পা স্থির হচ্ছেনা তার।ভালোলাগা যে অনেকটা শীতের গরম পোশাকের মত,যাকে জড়িয়ে থাকতেই বড় ইচ্ছে করে।কিছুতেই ছেড়ে ফেলতে সায় দেয়না-না শরীর না মন।সারাটাক্ষন, অবিরাম উষ্ণতা নিতেই জেদ করে।

চঞ্চলতা যে শেষে এইভাবে মিটবে তা অনির্বানের
জানা ছিলোনা।বন্ধু অমিতের বোনের বিয়েতে গিয়ে
আরশির সাক্ষাৎ পেলো অনির্বাণ।আরশির দাদার
সঙ্গেই যে অমিতের বোনের বিবাহ।ইশ্বরের মতন
বড় উপন্যাসিক,গল্পকার কোত্থাও যে কেউ নেই।
ওনার লেখার প্লট এক পৃথিবীকে কেন্দ্র করে চলছে
আবহমানকাল ধরে।অনির্বাণ,আরশি এরা তো সব
কয়েকটা চরিত্র তেনার উপন্যাসে।অনির্বাণ আবেগ
তাড়িত ভাবেই আরশির দিকে এগিয়ে গেলো।দুজনে মুখোমুখি হতে প্রথমে আরশি বলল- ‘ব্যাপারটা কী বলুন তো?আমায় কী চুরি করবার মতলবে আছেন না কি?’ অনির্বাণ বলল-‘আমি আমার বন্ধুর বোনের বিয়েতে এসেছি।আপনি এখানে কীভাবে?’ আরশি বলল-‘আমি তো আমার দাদার বিয়েতে এসেছি।’ অনির্বাণ বলল-‘তবে চুরি করবার আইডিয়াটা মন্দ নয় দিদিমনি।’আরশি বলল-‘অত সোজা?যদিও,আপনার মত না বলে কারো হাসি চুরি করিনা আমি।’ অনির্বাণ বলল- ‘কোথায় চুরি করেছি দেখান।’আরশি বলল-‘চোখে কালশিটে দাগগুলো কী আর এমনি এমনি পড়েছে?’ অনির্বান বলল-‘মোটেও না।’আরশি বলল-‘তাহলে আসি আমি।’ অনির্বাণ যে সাহস করে আরশির হাতটা টেনে ধরবে উপায় নেই।চারদিকেই লোকজন। আরশি,অনির্বাণের অবস্থা বুঝে বলল-‘আজকের রাতটা সুযোগ দিলাম।দেখুন যেটা পারছেননা সেটার সাহস করে উঠতে পারেন কি না।’ অনির্বাণ তখন তার হাত ধরবার সাহস না দেখালেও বলবার সাহস দেখালো। -‘বলছি,চুরির দায় তো চাপিয়েই দিলেন,তা চুরি যাওয়া জিনিসটা কি আপনাকে ফেরত দিতে হবে?’আরশি হেসে বলল-‘ভেবে দেখবো।’ অনির্বাণ বলল-‘ভাবুন তবে।
আমি আর একটু চুরি করে নিলাম।’

অনির্বাণের ব্যাঙ্গালোর ফেরার আগের দিন লাইব্রেরি তে আরশি,অনির্বাণকে ব্যাগ থেকে ‘দ্যা নোটবুক’ বইটা বের করে হাতে দিয়ে বলল-‘এই যে,এইটাই তো প্রথম দিন এসে খুঁজছিলেন।এটা আপনার জন্য।’ অনির্বান বলল -‘এটা না খুঁজে পেয়ে যেটা খুঁজে পেয়েছি,সেটা যদি আমার কাছে রাখি ক্ষতি আছে?’আরশি হেসে বলল-‘সেটাতো আপনি চুরি করেছেন।’অনির্বান বলল-‘আচ্ছা চুরির বদলে এই বইটা যদি লাইব্রেরিতে দান করি।চোরের কী শাস্তি কমবেনা?’আরশি বলল-‘তোমাকে দিয়েছি।তুমি যা ইচ্ছে করতে পারো।তোমার জিনিস এখন।’অনির্বাণ বলল-‘এখন তোমার আর আমার বলে আলাদা কী?’ আরশি বলল-‘এখনো ভাবিনি।আর ক’দিন বুঝি এই চোর বিশ্বস্ত কতখানি..।’ অনির্বাণ বলল-‘ফুচকা খাবে?’আরশি বলল-‘ঝাল চলবে তো?’ অনির্বান বলল -‘তোমার মিষ্টি হাসিটার ভরসায় যাওয়াই যায়।’আরশি বলল-‘চোর কোথাকার।’দুজনে হাসতে হাসতে ফুচকা খেতে বাইরের রাস্তা নিলো।

যাওয়ার আগে ‘দ্যা নোটবুক’ বইটা তারা লাইব্রেরিতে রেখে গিয়েছিলো উপহার স্বরুপ।সেই উপহারটা তাদের জন্য,যারা এই বইয়ের খোঁজে এসে প্রেমিক বা প্রেমিকা না খুঁজে পাক,বইটা পড়ে প্রেম খুঁজে পাবে।ভালোবাসা জিনিসটা অতিথির মত হঠাৎ আগুন্তুক-যা না বলেই কখন যে চলে আসে।

WhatsApp Image 2020-08-24 at 12.11.34 PM

একটু সরে বসবেন প্লিজ’-বছর পঁচিশেকের ছেলেটার আবেদনে বই থেকে চোখ ফিরিয়ে তরুনী জানলার দিকের সীটটায় সরে গেলো।ছেলেটা শান্ত ভাবে তরু-নীর ছেড়ে দেওয়া সিটটায় বসে কাঁদের ব্যাগটা কোলের কাছে নিয়ে ব্যাগের সামনের চেনটা খুলে ভেতর থেকে টিফিন বক্সটা বের করলো।কেমন একটা মিষ্টি গন্ধ ছাড়ছে না?ছেলেটা,গন্ধটা যে কীসের তা আন্দাজ করতে পারলোনা।অগত্যা,
টিফিন বক্স এর কৌটোটা খুলে রুটি আর আলুভাজা গুলো খেতে আরাম্ভ করলো।দেড় দু ঘন্টা লেগে যাবে বর্ধমান পৌছোতে।এতটা রাস্তা সে কীভাবে যাবে?পাশে একজন চেনা কেউ থাকলে,চেনা না হলেও যদি অপরিচিতও একজন এমন কেউ থাকতো যার সঙ্গে গল্প করতে করতে যাওয়া যেত।কিন্তু,তার পাশে যে মেয়েটি বসে আছে সে তো বই এর থেকে চোখই তুলছে না।কথা কী বলবে?বলবে না মনে হয়।

বাস বেশ গতিতে ছুটছে।বাইরের হাওয়ায় মেয়েটার
ডানদিকের চুলগুলো তার চোখে মুখে জড়িয়ে গিয়ে
তার পড়ার একটু বিরক্ত করছে।সে বইয়ের পাতা সামলাবে না চুলের ঝাপটা!ছেলেটা মিনিট পাঁচেক
ধরে মেয়েটার দিকেই বারবার আড়চোখে তাকাচ্ছে,
আজকালকার দিনে এত বই পাগল মেয়ে হয় নাকি! ছেলেটা অন্তত দেখেনি।কিন্তু সে যে মেয়েটা কে লক্ষ্য করছে সেটা মেয়েটা বইয়ের দিকে যতই চোখ রাখুক না কেনো মেয়েটা কিন্তু নজর রেখে চলেছে।মিনিট পনেরো পর মেয়েটা বইয়ের পাতা থেকে চোখ না সরিয়েই নরম ভাবেই বলল-‘আপনি মেয়ে দেখেন নি কখনো?’ছেলেটার মধ্যে তখন হঠাৎ একটু ইতস্তত ভাব জন্মেছে মেয়েটাকে কী উত্তর দেবে।সে একটু মিথ্যে বলার চেষ্টা করল-‘না,মানে কৈ..আপনাকে দেখছি কোথায়।আমি তো জানালার বাইরের দিকে তাকিয়ে..’
মেয়েটা ছেলেটার উত্তর শুনে আচমকা
জিজ্ঞেস করলো-‘দেখুন তো আমার খোঁপাতে লাল
ক্লিপটা আছে না পড়ে গেছে।’ ছেলেটাও অত শত না ভেবে চট করে উত্তর দিলো-‘লাল ক্লিপ তো খোঁপায় ছিলো না আপনার।’মেয়েটা তখন প্রথম তার দিকে তাকিয়ে বলল-‘আপনি যে বললেন দেখেন নি আমায়?’-মেয়েটা তাকে ধরে ফেলেছে দেখে ছেলেটা লজ্জা পেলো।কিছু উত্তর দিলোনা।মেয়েটা বলল-
‘থাক আর লজ্জা পেতে হবেনা।’ ছেলেটা আলতো
স্বরে কাঁচুমাচু হয়ে বলল-‘সরি।’মেয়েটা বলল-
‘এতটা রাস্তা চুপ করে একা একা বসে থেকে যাবেন
কীকরে?আমি তো গল্প টল্প করতে পারবোনা।’
ছেলেটা মুখের ভাবভঙ্গিমায় মেয়েটাকে বোঝাতে
চাইলো যে সে বিরক্ত হবে,তবে যা হোক করে চলে
যাবে।মেয়েটা তার মুখের ভাষা বুঝতে পেড়ে বলল-
‘আসুন বই পড়বেন।একসঙ্গে পড়া যাবে।বেশ ভালো ভালো কবিতা আছে।’ছেলেটা কবিতা অতটা ভালো বাসেনা তবু মেয়েটার বলায় আর না করতে না পেরে অগত্যা দুজন মিলে একটা বই দুদিকটা ঠিক ভাগ করে ধরে পড়তে আরাম্ভ করল।

ছেলেটা তার কথা রাখতে বই ভাগাভাগি করে পড়ছে দেখে মেয়েটার মনে হলো আর পাঁচটা ছেলের থেকে
সেই ছেলেটা একটু হলেও আলাদা।সে আড়চোখে
তাকে দেখছিলো এটা যদি তার দোষ হয় তবে তার
একবার বলায় সে কবিতা পড়তে লেগেগেলো এটা
তার বড় একটা গুন।মনের মধ্যে ছেলেটার প্রতি
অন্যরকম একটা ইম্প্রেশন জন্মালো মেয়েটার।
একটা করে কবিতা দুজনে পড়ে,একে অপরকে আড়চোখে দেখে,দুজনেই বুঝতে পারে,তবু কেউ কাউকে বারণ করে না।একটা কবিতা পড়ে পাতা উল্টে মেয়েটা খেয়াল করলো ‘আবার দেখা হবে’ কবিতাটির পাতায় তার ফোন নাম্বার লেখা আছে।
প্রথমে ছেলেটার দিকে আড়চোখে তাকাতে গিয়ে
খেয়াল পড়েনি,তাই খেয়াল পড়তেই সে টপ করে
পাতাটা আবার উল্টে দিলো।ছেলেটার ততক্ষনে
কবিতাটা পড়া হয়ে গেছে।ক্রমে বই শেষ হলোনা
বাস এসে বর্ধমান পৌছালো।আস্তে আস্তে দুজনেই
বাস থেকে নামল।মেয়েটা পুনরায় চলে যাবে দুর্গাপুর ছেলেটা ফিরে আসবে আরামবাগ।আর হয়তো তাদের কোনোদিন দেখা হবে না।কিন্তু,এই কয়েক ঘন্টার সাক্ষাৎ এ তাদের মধ্যে তেমন বেশি কথা না হলেও তারা একে অপরকে ভুলে যাবে কি।
চোখের ইশারায় দুজনে তখন বিদায় নিয়েই নিয়েছিলো।মেয়েটা দুর্গাপুরগামী বাসে উঠতে যাবে
কী আবার পিছু ফিরে ছেলেটাকে সারা দিলো।ছেলেটাও যেন এই সারাটার অপেক্ষা করছিলো।
সে মেয়েটার সারা পেয়ে দৌড়ে এলো।মেয়েটা ছেলেটার চোখের দিকে না তাকিয়ে করবোনা করবোনা ভাবতে ভাবতে জিজ্ঞেস করেই ফেলল
-‘আবার কবে দেখা হবে?’ছেলেটার বুকের ভেতরে
তখন যেন রামধনু খেলে গেলো।ছেলেটা হাসি মুখে
বাসে বসে পড়া সদ্য একটা কবিতার শেষ লাইনকটা দিয়ে উত্তর দিলো-‘..বেঁচে থাকলে তোমার সঙ্গে আবার দেখা হবে।’বাস এর ড্রাইভার হর্ণ দিলো।মেয়েটা বাসে উঠতে উঠতে জিজ্ঞেস করলো -‘আমায় খুঁজে পাবেন কীভাবে?’ছেলেটা চেঁচিয়ে-‘৯৭৩২০১…’ মেয়েটা অবাক হয়ে গেলো।এ যে তার নম্বর।ছেলেটা পেলো কোথায়?তারপর তার মনে পড়লো কবিতার বইয়ে।মেয়েটা বাসের ভেতর থেকে তার হাতটা বের করে ইশারায় বুঝিয়ে দিলো-‘একদম ঠিক আছে।’

Syaahee F

ইসস্..যা জ্যামের মধ্যে পড়লাম না।আমরাই সবার লেট হয়ে যাবো মনে হচ্ছে।’

সম্রাট কথাটা সেঁজুতিকে বলতে বলতেই হর্ন দিতে লাগলো ঘনঘন।সেঁজুতি ঠোঁটে একটা বিরক্তিসূচক শব্দ করে বললো-

-‘কোথায় সাতটার মধ্যে চলে যাবার কথা।আর এখন এখানেই তো সাতটা বেজে গেলো।রিসেপশনের পার্টি এতক্ষনে স্টার্ট হয়ে গেলো বোধহয়।’

সম্রাট ও সেঁজুতি দুজনেরই বন্ধু সায়কের বিবাহের রিসেপশন আজ।লজে বিরাট আয়োজন।যাকে বলে খানা পিনা,নাচা গানা সবের আয়োজন করেছে বন্ধু।দেরী হ’য়া মানে নিশ্চই বুঝতে পারছেন।সবই কপাল।

লজের পার্কিং প্লেসে গিয়ে যখন ওদের গাড়ি থামলো তখন রিস্টওয়াচে পৌনে আটটা।সেঁজুতি বঁকে হাতে নিয়ে তড়িঘড়ি নামতে গিয়ে গাড়ির গেটে,এককোনে
জুতোর লেসটা আটকে গিয়ে টান পড়তেই গেলো ছিঁড়ে।নিজের দিকের দরজা টেনে দিয়ে সম্রাট যখন সেঁজুতির দিকটা লক করতে এলো,এসে দেখে-ও মা এ কী কান্ড ঘটিয়েছে সেঁজুতি।সম্রাটকে দেখা মাত্রই
সেঁজুতি মুখ ভার করে বললো-

-‘কী করবো এখন আমি?ছেঁড়াটাকে পরে ওপরে যাব কীকরে?’

সম্রাট তখন সেঁজুতিকে বললো-

-‘তুই ওগুলো গাড়িতে খুলে রেখে দিয়ে খালি পায়েই ওপরে চল।একেই দেরী হয়ে গেছে।এখন ফের নতুন কিনতে গেলে আরও দেরী হবে।সায়ক আরও রেগে
যাবে আমাদের ওপর।’

লেহেঙ্গা পরে,দু হাতে মেহেন্দি করে শেষ মেষ পায়েতে হিল ছাড়া রিসেপশনে যেতে সেঁজুতি কেমন কেমন যেন একটা করতে লাগলো মনে মনে।সম্রাট তখনই সেঁজুতির মনের আওয়াজ শুনতে পেলো।সে করলো
কী,নিজের পায়ের জুতো মোজা সব খুলে সেঁজুতিকে বললো-

-‘চল,এবার আলগা পায়ে যেতে নিশ্চই ব্যাড ফিলিং হবেনা?’

সম্রাটের এই এটিচিউডটাই সেঁজুতিকে অবাক করে বারবার।ভালোবাসার মানুষকে কোনটাতে প্রসন্ন করা যায়,সেটা সম্রাটের মত কেউ হয়তো এতটা জানেনা।

সেঁজুতির মনে এতটুকু দ্বিধাসংকোচবোধ রইলোনা।রিসেপশন রুমে পৌছানো মাত্রই সায়ক ওদের দেখামাত্র দেরীর জন্য রাগ দেখানোর বদলে বলে বসলো-

-‘খ্যাপা নাকি?তোরা দুজনে জুতো খুলে কেন ভেতরে এসেছিস?বাইরে কোথাও লেখা আছে-জুতা খুলিয়া প্রবেশ করিবেন।’

উত্তরটা সেঁজুতি দিলো।জবাব শুনে সায়ক সম্রাটের দিকে ফিরে হাসি মুখে বললো-

-‘বউকে খুশি করা কেউ তোর কাছ থেকে শেখে..।’

সম্রাট বললো-

-‘আপনিও কাল থেকে শিখে যাবেন অঙ্কের মাস্টার মশাই।’

একটু হাসাহাসি হওয়ার পর,সায়কের সহধর্মিণী ওদের মাঝখানে এসে সায়ককে বললো-

-‘আরে চলো,ওখানে ছবি তোলবার জন্য সবাই যে দাঁড়িয়ে আছে।’

তারপর সম্রাট আর সেঁজুতিকে বললো-

-‘আপনারা দেরী করে এসেছেন।এর শাস্তিটা তোলারইলো।এখন চলুন, আপনাদের আজ আসর জমাতে হবে।শুনেছি দুজনেই দারুন নাচেন।’

কিছুক্ষনের মধ্যেই আসর জমে গেলো।আজকাল বিয়েতে এই এক নতুন ট্রেন্ড শুরু হয়েছে।ব্রাইডের সাথে সকলের নাচা চাই চাই।ড্রিঙ্কসের সাথে গানের তালে পা মেলালো প্রায় সকলেই।এমন সময় জুসের
গ্লাস হাতে অরিক্তা মানে ইমনের স্ত্রী এবং সেঁজুতির বান্ধবী,সে সেঁজুতির পাশে এসে বললো-

-‘সম্রাট কিন্তু ভালোমত ড্রিঙ্কস নিচ্ছে।তুই কিছু বলিস না ওকে?’

সেঁজুতি বিয়ারের গ্লাসে চুমুক দিয়ে হালকা মেজাজে বললো-

-‘কেন,ইমন নিচ্ছেনা?’

অরিক্তা বললো-

-‘ওকে ড্রিঙ্কস করতেই দিইনা।আমার দিব্যি দেওয়া আছে,ড্রিঙ্কস করলে সোজা ডিভোর্স দিয়ে দেবো।’

সেঁজুতি ফের হালকা সুরেই বললো-

-‘তাহলে আর কী,জুসই খাক।’

অরিক্তা বললো-

-‘তোর না সম্রাটের ওপর কোনো জোর নেই।আরে আজকালকার ছেলে,হাতে না টিপে রাখলে কখন বেহাত হয়ে যায় তার ঠিক আছে।’

এবার অরিক্তার কথাটা সেঁজুতির গায়ে লাগলো বেশ তাই সে নরম সুর ছেড়ে একটু শক্ত করে উত্তর দিলো

-‘এক আধদিন বন্ধুদের সাথে পাল্লা দিচ্ছে।আমিও তো বিয়ার খাচ্ছি।মাতলামো তো করছেনা।আমার ওর ওপর সে বিশ্বাস আছে ও ড্রিঙ্কস করে বাওয়াল মাচাবে না।ওর লিমিটেশন ও বোঝে।তাছাড়া,তোর
মত বরকে হাতে রাখাতে আমি বিশ্বাস করিনা ভাই।যে যার নিজের স্পেস থাকাটা জরুরি।’

সেঁজুতির কথাগুলো অরিক্তা ঠিক ঘিঁটতে পারলোনা তাই সে সেঁজুতিকে এভোয়েড করে দূরে চলে গেলো।অতঃপর সেঁজুতি এবং সম্রাটের জুটির নাচ উপস্থিত
সকলের নজর কাড়লো।অবশেষে খাওয়া দাওয়া সব মিটলে ‘পর বাই বাই করতে এসে সায়ক,সম্রাটকে জিজ্ঞেস করলো-

-‘গাড়ি চালিয়ে যেতে পারবি তো?’

উত্তরটা পাশ থেকে সেঁজুতি দিলো-

-‘আমি ড্রাইভ করবো।’

সায়ক বললো-

-‘তুই?’

সেঁজুতি বললো-

-‘আরে আমি জাস্ট একটা বিয়ার নিয়ে ছিলুম।’

সেঁজুতি ড্রাইভিং সীটে বসে গাড়ি ছাড়লো।সম্রাটের চোখ ঢুলে আসছিলো।কিছুটা রাস্তা যাওয়ার পরে সেঁজুতি সম্রাটকে জিজ্ঞেস করলো-

-‘ওকে তো?’

সম্রাট বললো-

-‘আরে নেশা নেই এখন।তখন একটু নিয়েছিলো ঠিক কিন্তু,ও সব নাচানাচিতেই কেটে গেছে।ফাটিয়ে নেচেছি বল আমরা?’

সেঁজুতি বললো-

-‘নাচতে না জানলে তোকে বিয়ে করতুম নাকি তুই ভাবছিস?’

সম্রাট বললো-

-‘আচ্ছা,তাই বুঝি?আমি তো জানতাম আমরা ভালোবেসে বিয়ে করেছি।’

সেঁজুতি হাসলো।সম্রাটও হাসলো।তারপর সেঁজুতি বললো-

-‘জানিস,আজকে অরিক্তা তোর আমার মধ্যে ঝগড়া লাগাতে চেষ্টা করছিলো।কলেজ থেকেই ওকে চিনি,শুধু এর ওর সাথে ঝগড়া লাগিয়ে দেওয়ার ধান্দা।ওর জন্য বৈভব আর রিমিতার সম্পর্কটা ভাঙলো।’

সম্রাট অরিক্তার ব্যাপারটা এড়িয়ে যেয়ে বললো-

-‘বৈভব।আপনি যার কবিতার প্রেমে একেবারে হাবু ডুবু খেয়ে সাঁতার কাটছিলেন,উনি তো?’

সেঁজুতি ড্রাইভ করতে করতে এবার একবার তার দিকে বড় বড় চোখে করে তাকিয়ে বললো-

-‘মেরে ফেলবো তোকে কিন্তু ওই ট্রপিকটা তুললে।’

সম্রাট বললো-

-‘সে তো ফেলবেই।এদিকে চেয়ে চালালে এমনিতেই এক্সিডেন্ট হবে।আর এক্সিডেন্ট হলে তো কে মরবে সেটা জানা।তোর মাগুর মাছের জান,তুই কী আর মরবি।’

সেঁজুতি তার বাঁ হাতটা স্টিয়ারিং থেকে তুলে সোজা সম্রাটের ঠোঁটের ওপর দিয়ে বললো-

-‘কী সব আজে বাজে কথা।তোর না মুখে কোনোটাই আটকায় না।’

সম্রাট তার হাতটা নিজের হাতে কোমলতার আবেশে ঠোঁটে জড়িয়ে চুমু খেলো।তারপর বললো-

-‘জানিস,তোকে যখন প্রপোজ করবো ভেবে জানতে পারলাম তুই বৈভবকে মনে মনে চাইছিস।তোর জন্য আমিও কবি হয়েছিলাম।যদিও তোর অন্তরে জায়গা
পেতে কবিতার প্রয়োজন হয়নি।তবে সেদিন থেকেই আমি কবি হয়ে রয়ে গেছি।’

সেঁজুতি সম্রাটে এই কথাটা শুনে ভারী অবাক হলো।সে বিষ্মিত মুখে বললো-

-‘তুই কবিতা লিখতিস?মানে এখনও লিখিস?কই কখনো তো বলিসনি আমায়?’

সম্রাট বললো-

-‘আমি কী আর বৈভব সেনগুপ্ত যে আমার কবিতায় কেউ হাততালি দেবে।’

সেঁজুতি বললো-

-‘শোনা তাড়াতাড়ি।নয়তো গলা টিপে দেবো তোর।’

সম্রাট শোনাবেনা,সেঁজুতি ছাড়বে না।যদিও শেষমেষ সম্রাটের জেদই জিতলো, অভিমান হলো সেঁজুতির।বাড়ি ফেরা মাত্র সম্রাটের দুচোখে ঘুমের রেখা সমানভাবে জুড়ে গেলো চোখের ওপর।সেঁজুতি সে রাতেই আলমারি,ড্রয়ার ইত্যাদি ঘেঁটে দেখলো যদি সম্রাটের কবিতার খাতাটা খুঁজে পায়।

দিন দুয়েক পর সন্ধ্যায় ওদের বাড়ির সকলের একটা জন্মদিনের নিমন্ত্রন ছিলো।সেঁজুতি তখন সবে মাত্র শাড়িটা পরে,সখ হয়েছে পায়ে নুপুর পড়ার,একটা পায়ের নুপুরের মুখটা আঁটছিলো,এমন সময় সম্রাট কানে ফোন দিয়ে কার সাথে যেন কথা বলতে বলতে ঘরের মধ্যে এলো।তারপর ফোনে(এমন করবে যে ও
জানাই ছিলো।যাই হোক এখন রাখছি।বেরোতে হবে বুঝলি।..হ্যাঁ, হ্যাঁ,সেঁজুতিকে বলছি)

ফোনটা রাখতেই সেঁজুতিই আগে জিজ্ঞেস করলো সম্রাটকে-

-‘কার কী হয়েছে?’

সম্রাট বললো-

-‘তোর বান্ধবী অরিক্তা,বরের সাথে ঝগড়া করছে খুব নাকি।শুনছি ডিভোর্স চাইছে।’

সেঁজুতি ওই এক পায়ের নুপুরটা কোনো মতে এঁটেই সম্রাটের কাছে উঠে গিয়ে জিজ্ঞেস করলো-

-‘কেন?কী হয়েছে নাকি ওদের মধ্যে?’

সম্রাট বললো-

-‘ইমন কোথায় ড্রিঙ্কস করে এসেছিলো।অরিক্তা ওকে ধরে ফেলেছে।আর সেই জন্যই কেলেঙ্কারি বাধাচ্ছে।’

সেঁজুতি বললো-

-‘ও মেয়েটাই ওরকম।স্বামীকে ওকেসনে পর্যন্ত একটু ড্রিঙ্কস করতে দেবেনা।তো লুকিয়ে খাবেনা তো কী করবে।আরে ও এটা বোঝেনা যে সবারই ব্যক্তিগত কিছু ইচ্ছে থাকে।যদি লিমিট পেরিয়ে যায় তখন নয় বলা যায়।এন্ড ইমনকে আমি যতদূর চিনি,হি ইজ এ ফাইন গাই।খারাপ গুন খুব কম ওর।’

সম্রাট বললো-

-‘তোকে বলা হয়নি,সেই যে বার আমি বসের পার্টিতে গিয়েছিলাম।ওখানে ইমনও ইনভাইট ছিলো।আমার সাথে দুটো পেক হুইসকি নিয়েছিলো।স্রেফ দুটোই।
তারপর,সে মুখে ফ্রেসনার দিয়ে টিয়ে আগে গন্ধটা কাটালো,তারপর বাড়ি ফিরলো।এখন বুঝছি,ব’য়ের প্রেসার ছিলো ওর ওপর।’

এমন সময় পাশের ঘর থেকে সম্রাটের মায়ের হাঁক পড়লো-

-‘বাবু,হলো তোদের?দেরী হয়ে যাচ্ছে।কেক কাটা কী শেষ হয়ে গেলে যাবি।তোর সুশান্ত কাকু কিন্তু বড় রাগ করবেন নাতির কেক কাটার আগে না পৌছলে।’

মায়ের ডাকের আওয়াজ পেয়ে সম্রাট চট করে শার্ট প্যান্ট পরতে শুরু করলো।সেঁজুতি বললো-

-‘আমি মায়ের ঘরে যাচ্ছি কানেরটা পরতে।তুই শিগ্রি রেডি হয়ে,ঘরটা এঁটে দিয়ে চলে আয়।’

রেডি হয়ে ঘরের আলো বন্ধ করবার সময় সম্রাটের দৃষ্টি পড়লো বিছানার ওপরে সেঁজুতির এক পায়ের নুপুর পড়ে আছে।সে সেঁজুতিকে সারপ্রাইজ করবে বলে মনে মনে হাসতে হাসতে নুপুরটা পকেটে নিয়ে
রাখলো।তারপর ঘর বন্ধ করে গাড়ির ঘরে গেলো।

রাস্তায় যাওয়ার সময় সম্রাট গোপনে সেঁজুতির হাত স্পর্শ করলো।এমনটা সম্রাট তখনই করে যখন সে সেঁজুতির মিষ্টি মুখের দিকে আড়চোখে তাকালে সে আর চোখ ফেরাতে পারেনা।কলেজে পড়ার সময়ও
বহুবার করেছে।সেঁজুতি,সম্রাটের স্পর্শ পাওয়া মাত্র তার হাতটা সরিয়ে দিতে সম্রাট আড়চোখের ইশারায় জানতে চাইলো-

-‘কী হলো?’

সেঁজুতি চোখের ইশারাতেই বুঝিয়ে দিলো।সেদিনের সে অভিমান এখনও অনড়।সম্রাট তার লুকিং গ্লাসে পেছনের সীটের দিকে তাকিয়ে সুযোগ বুঝে আবার তার হাতটা টেনে ধরতে চাইলো তার বাঁ হাতটা দিয়ে।সেঁজুতি উল্টে সম্রাটের হাতে চিমটি কেটে বললো-

-‘সামনের দিকে চেয়ে ড্রাইভ কর।’

সম্রাট আলতুভাবে (উহু)শব্দ করে মনে মনে বললো-

-‘চলনা,গাড়ি থেকে নেমেই তোর অভিমান যদিনা ভাঙিয়েছি তো কী বলেছি।’

নিমন্ত্রন বাড়িতে পৌছে,গাড়ি থেকে সম্রাটের মা বাবা আত্মীয়ের বাড়ির দরজার দিকে এগোলো।সেঁজুতি তাদের সাথেই এগোতে যাচ্ছিলো,অমনি পিছ থেকে সম্রাট সেঁজুতির শাড়ির আঁজলটা আঙুলে জড়াতে সেঁজুতি পিছন ফিরে চাপা গলায় বললো-

-কী হয়েছে?ছাড়,কেউ দেখবে।’

সম্রাট বললো-

-‘দাঁড়িয়ে যা।নয়তো লজ্জায় পড়বি।’

সেঁজুতি শুনলোনা সম্রাটের বারণ।ভেতরে গিয়ে সে যখন একজন চেনা আত্মীয়ের বাচ্চাটাকে কোলেতে নিয়ে আদর করছিলো,তখনই প্রথম একটা মেয়ের
চোখে পড়লো সেঁজুতির একটা পায়ে নুপুর নেই।সে তার মা কে বললো-

-‘দেখো,ওই আন্টির একপায়ে নুপুর নেই।’

মেয়েটার মা তার পাশের একজনকে, এইভাবে আস্তে আস্তে অনেকেই জেনে গেলো।সেঁজুতির ব্যাপারটা যখন বোধগম্য হলো,সে দারুন লজ্জায় পড়ে গেলো।
একজন মাঝ বয়স্কা তো সেঁজুতিকে জিজ্ঞেস করেই বসলো-

-‘তুমি কী জেনেশুনে একপায়ে নুপুর পড়েছো।আজকাল কী সব ফ্যাশান না কী বেড়িয়েছে যে মেয়েরা নাকি একপায়ে নুপুর পড়ছে।’

সেঁজুতি কী উত্তর দেয় মহিলাকে।এমন সময় সম্রাট পাশ থেকে সেঁজুতির দিকে এগিয়ে এসে তার পকেট থেকে অন্য নুপুরটা বের করে একঘর লোকজনের
সামনে হাসি মুখে সেঁজুতির পায়ের সামনে হাঁটু ভাঁজ করে নুপুরটা পরিয়ে দিলো।সেঁজুতির কিছু বলবার আগেই সম্রাট ঘটনাটা ঘটালো।কোলে বাচ্ছা ছিলো তাই বাধা দেওয়াও হলোনা।আশেপাশের লোক জনে এ দৃশ্য দেখে অবাক হয়ে গেলো।এমন ছেলেও হয় যে তার বউয়ের এত খেয়াল রাখে।তারা নানা কথা বলাবলি আরম্ভ করলো সম্রাটকে নিয়ে।সেঁজুতির
ভেতরে তখন এমন ইচ্ছে করছে যে সম্রাটকে বুকে টেনে নেয়।সে সম্রাটের দিকে গভীরে আবেগের সাথে তাকালো।সম্রাটও ওর দিকে একপলকে চেয়ে হাসি
হাসি মুখে গলার স্বর নামিয়ে বললো-

“আমি প্রেমিক,আমি ভালোবাসতে জানি
তখনই তোর মান ভাঙাই,যখন তুই অভিমানি..”

কার কবিতা লেখা?সম্রাট লিখেছে? -সেঁজুতির মনে এই প্রশ্নটাই জোয়ারের নদীর মত ফুলে ফেঁপে উঠতে আরম্ভ করলো।চার পঙক্তির কবিতাটা শেষ হতে না হতেই সেঁজুতি উৎফুল্ল কন্ঠে না বলে পারলোনা-

-‘তোর লেখা তো?এত ভালো লিখিস তাও আমাকে কোনোদিন শোনাসনি কেন?’

সম্রাট বললো-

-‘অভিমান ভাঙানোর কবিতা,অভিমান ভাঙানোতেই কাজে লাগে।বৈভবের মত না হলেও ওর কাছাকাছি হয়েছে তো লেখাটা?’

সেঁজুতি তার কোলের বাচ্ছাটার মাথায় আদর দিয়ে সম্রাটকে বোঝালো-

-‘তোকে এমনই একটা উপহার দিতে পারবো যেদিন সেদিনই এই লেখাটার জন্য মর্যাদা দেওয়া যাবে।’

দুজনে একসঙ্গে একবার দুজনের দিকে তাকিয়ে চোখের দৃষ্টি বন্ধ করে সেই সুখের মুহুর্ততে একসাথে সফর করে আসলো।

বিশ্বাসে যে বস্তু মিলায়,তারই নাম ভালোবাসা।

WhatsApp Image 2020-08-24 at 12.12.36 PM

কাল রূপসার প্রথম জন্মদিন। বাড়িতে কত লোকজন। দুপুর বেলায় কলকাতা থেকে মামা মামী আসবে। রূপসার মা তনুজা আজ ভীষণ ব্যস্ত ।কী কী রান্না হবে? জলখাবার কী হবে ?গোটা বাড়ী কিভাবে সাজানো হবে এই নিয়ে চলছে নানা আলোচনা।রূপসার বাবা সমর রা তিন ভাই,তিন বোন । রূপসার বাবা ই ছোট। সকলের ছেলে ,কারো দুটি বা কারো একটি।আর মেয়ে বলতে শুধু ই রূপসা।দেখতেও ভারি মিষ্টি।ঘর আলো করে কন্যা সন্তান জন্ম নিলো বসু পরিবারে।ঠাকুর দা আদর করে নাম রাখলেন রূপসা। মেয়েজন্ম হয়েছে শুনে রূপসার মা তনুজা একটু ভয় পেয়ে গিয়েছিল,এই হয়তো সবাই বলবে মেয়ে!!না তার ঠিক উল্টো টা হলো।সবাই মিলে কি করবে ঠিক পাচ্ছেনা।জেঠু রা তো হসপিটালে সবাই কে মিষ্টি খাওয়া চ্ছে।আর রূপসার বাবা মেয়ে হয়ে ছে শোনা মাত্র আয়া মাসিদের টাকা দিচ্ছে।আর ঠাকুমা ঠাকুর ঘরে ডুকে জোরে জোরে শাঁখ বাজাচ্ছেন।এ যেনো বসু পরিবারে লক্ষী আগমন। সত্যি লক্ষী আগমন রূপসার জন্মের পর ব্যবসায় খুব উন্নতি করে রূপসার বাবারা। রূপসা দের বাড়ি ছিল জলপাই গুঁড়ি,আর ওদের ছিল কাঠের বহু পুরনো ব্যবসা। হসপিটাল থেকে ছুটি হলে বাড়ি আসে তনুজা কোলে রূপসা।জেঠিরা বরণ করে লক্ষী ঘরে তোলে। সকলের খুব সাধ ছিল ধুমধাম করে অন্নপ্রাশন দেয় কিন্ত তনুজার মা জানান কন্যা সন্তান এর অন্নপ্রাশন দিতে নেই।তাই সবার মন ভেঙে গেল। রূপসারঠাকুর দাদা বলেন জন্মদিন হবে ধুমধাম করে। তাই এই জন্মদিনের আয়োজন।
দুপুর বেলায় মামা মামী মাসী মনিরা সবাই এসে হাজির। সকলের কোলে কোলে ঘুরে বেড়াচ্ছে রূপসা রাণী। অনেক রাত পর্যন্ত সবাই মিলে কতগান ,নাচ,কত গল্প। ভোর থেকে সাজোসাজো রব। গোটা বাড়ী নানা রং এর বেলুন রকমারি রঙিন ফুলের কাগজ সাজানো হয়েছে।কত লোক জন কত উপহার রূপসা শুধু কেঁদে ই চলে,এত অপরিচিত মুখ দেখে। কিছু তেই মা কে ছাড়েনা। মায়ের বুকে জাপটে থাকে।যেন মাই শুধু ওর পরিচিত।আর সবাই অপরিচিত। অনেক রাত পর্যন্ত অনুষ্ঠান চললো। খুব মজা করল সবাই।কেক কাটা ছবিতোলা সবকিছুই হল। সবাই মিলে এক সাথেখেয়ে ।এক জায়গায় বিছানা করে রাতে কিছুক্ষণ হৈহৈ করে সবাই ঘুমিয়ে পরলো।
পরের দিন সকাল থেকে এত কাজ তনুজা দাদা বৌদি র সাথে একটুও গল্প করতে পারলনা।পরের দিন ই দাদরা চলে যাবে। তনুজা সমর কে গিয়ে বললো আজ একটু বিকালে বেরবে সবাই মিলে?একটু মার্কেটিং করবো। দাদারা আবার কবে আসবে? ওদের জন্য কি ছু কিনবো।সমর বললো বেশ তো চলো সবাই মিলে। দুপুর বেলায় খেয়ে উঠতেই অনেক দেরি হলো। তারপর সন্ধ্যায় সবাই মিলে মার্কেটিং এগেলো।
প্রচুর কেনাকাটা করে খাওয়া দাওয়া করে ফিরছে, বাস থেকে সবাই নামল। রূপসা দের বাড়ি টা একদম বড়ো রাস্তার ধারে । তনুজা মেয়ে কে বড়ো ঝা প্রীতির কোলে দিয়ে বললো বড়দিভাই তুমি রূপসা কে নেও । রূপসা বড়ো জে্্যঠিমার খুব নেওটা ছিল।আমি প্যাকেট গুলো নেই। তনুজা র হাতে অনেক প্যাকেট সবাই আগে আগে যাচ্ছে। তনুজা অনেক টা পিছনে।সমর কাছে এসে বললো আমাকে দেবে নাকি প্যাকেট গুলো। তনুজা বলে না না আমি পারবো। সবাই কে বলো রাস্তার এক পাশে দিয়ে হাঁটতে প্রচুর বড়ো গাড়ী আসছে।সমরগলির মুখে ঢুকতেযাবে এমন সমযবড়ো গাড়ীর চাকা ফেটে যাওয়ার এক বিরাট শব্দ। সবাই পিছনের দিকে তাকিয়ে দেখে চাকা ফেটে যাওয়ার সাথে সাথেই গাড়ীটা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে এসে ধ্বাক্বা মারল তনুজা কে। তনুজা ছিটকে গিয়ে পরলো রাস্তার ধারে। চারিদিক থেকে কত লোক জন ছুটে এলো তনুজা অচৈতন্য হয়ে পড়ে আছে। সঙ্গে সঙ্গে তনুজা কে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলো,ডাক্তার জানায় তনুজা মারা গেছে।শিড়দাড়ার হাড়টা ভেঙে লান্সে বুকে গেছে।আর কিছুই করা গেল না।রাস্তা জুরে ছিটিয়ে রয়েছে বাড়ির জন্য কেনাতনুজার গীফ্ট।
বাড়িতে কান্নার রোল পড়ে গেল।কেউ যেন তনুজা র মৃত্যু টা মেনেই নিতে পারলনা।সমর যেন একটা পাথরের মুর্তি। ছোট্ট রূপসা কিছু ই বুঝলনা।কখন তার মা তাকে ছেড়ে চলে গেছে। পোস্টমর্টেম হয়ে কত রাতে মৃত দেহ বাড়ি নিয়ে আসা হলো।তখন ছোট্ট রূপসা ঘুমিয়ে কাদা।পরের দিন ঘাট কাজ শেষ হয়ে গেল।
কদিন পর তনুজা র দাদা রা বাড়ি ফিরে এলো। ছোট্ট রূপসা এদিকে ওদিকে চায় আর কি যেন খোঁজে।আর শুধু ই কাঁদে।সমর ও আস্তে আস্তে ব্যবসা র কাজে ব্যস্ত হয়ে পরে।
এই ভাবেই দিন চলে। জেঠু জেঠিমাদের আদরে বড়ো ,হতে থাকে রূপসা।রোজ মা র ছবির সামনে গিয়ে কাঁদে।এক দৃষ্টিতে ছবির দিকে তাকিয়েদেখে।এই বার রূপসার স্কুলে ভর্তি র দিন এগিয়ে আসছে। জেঠিমারা রূপসার জন্য একজন দিদিমণি খুঁজছে।খবর এর কাগজে বিজ্ঞাপন দেয়। তাই দেখে অনেক মহিলাই আসে ।রোজ ই রূপসার দাদু ইন্টারভিউ নেন। হঠাৎ করে একদিন সেখানে উপস্থিত হয় অমৃতা বলে একজন মহিলা। অমৃতার মা ছোট বেলায় মারা গেছে অমৃতা দিদিমার কাছে মানুষ। খুব কষ্ট করে বড়ো হয়েছে।সব শুনে রূপসার ঠাকুর দা অমৃতা কে রূপসার পড়াশুনোর করানো র দায়িত্ব দেন।
অমৃতা পরেরদিন সকাল থেকে রূপসা দের বাড়ি আসা শুরু করে। প্রথম দিন অমৃতা দেখে রূপসা পর্দা আড়াল থেকেঅমৃতাকে দেখছে। কিছু তেই অমৃতা র কাছে আসছে না। অমৃতা একটু চিন্তা তেই পরে যায়,কি করে ওকে কাছে আনবে?এমন সময় সমর রূপসা র বাবা ঘরে আসে।এ সেই রূপসা কে বললো কি ব্যাপার আন্টির কাছে আসছো না কেন? চলে এসো আন্টির তোমার জন্য বসে আছেন।এসো এসো চলে এসো। অমৃতা বললো রূপসা ঠিক আসবে। রূপসা তো ভালো মেয়ে। লক্ষী মেয়ে। তাই না রূপসা?অমনি মাথা নেড়ে রূপসা বলে রুপসা তো খুব গার্ল। অমৃতা আর সমর হো হো করে হেঁসে ওঠে। তারপর রোজ ই একটুএকটু করে অমৃতা রূপসা র খুব প্রিয় পাত্রী হয়ে ওঠে।আন্টির হাতে দুধ খাওয়া।আন্টির সাথে পার্কে যাওয়া।সব কিছু তেই আন্টির কে দরকার।বাড়ীর সকলে অমৃতা কে পেয়ে খুব খুশি। অমৃতা খুব ভালো গান গায়।এখন রূপসা কে গান শেখানোর দায়িত্ব ও অমৃতা র।
সামনের জানুয়ারি মাসে রূপসার ইন্টারভিউ। রূপসা এখন অনেক কিছু শিখেছে।কত ছড়া কত ই্ংরেজী রাইমস সব বলতে পারে। কিন্তু একটা ই মুস্কিল কিছু বলতে গেলেই আন্টি কে লাগে।একা কিছুই বলে না।বাড়ীর সবাই লক্ষ করে রূপসা আন্টি র অপর খুব নির্ভর শীল হয়ে পরেছে। দেখতে দেখতে সে ই ইন্টারভির দিন এসে গেল। রূপসা র বাবা যাবে রূপসা র সাথে ইন্টারভিউ দিতে। কিন্তু রূপসা আন্টি ছাড়া তো যাবেনা। কিন্তু কি মুস্কিল আন্টি তো বাড়ীতে।এখন কে যাব আন্টি কে আনতে? রূপসা কেঁদে ই চলেছে আন্টি যাবে আমার সাথে। এদিকে ইন্টারভিউ র সময় এগিয়ে আসছে,অগত্যা জেঠু গিয়ে আন্টি কে নিয়ে এলো।আন্টিআর বাবার সাথে রূপসা ইন্টারভিউ দিতেগেল।। স্কুলে র কাছে এসে রূপসার একটু ভয় ভয়করছে।আন্টি ওরা কি আমাকে বকবে?ওরা ভালো? অমৃতা শুধু রূপসা কে সাহস দিচ্ছে কেউ বকবে না। তুমি তো ভালো মেয়ে তুমি তো সব পারবে। সবাই তোমাকে খুব ভালবাসে।
সবাইএকে একে ইন্টারভিউ দিয়ে বেরিয়ে আসছে। এবার রূপসা র পালা। অমনি এক জন এসে ডাকলো রূপসা বসু। রূপসা উঠে দাঁড়িয়ে বললো এই তো আমি।চলো আন্টি আমাদের ডাকছে। ঘরে ঢুকেই রূপসা গুডমর্নিং, আমি রূপসা বসু। টেবিলে বসে থাকা সকলে বলে উঠলো ওমা তাই নাকি তুমি রূপসা বসু বা্ঃ খুব সুন্দর নাম তো। তুমি কার সাথে এসেছো? রূপসা বললো বাবা আর আন্টির সাথে।সঙ্গে সঙ্গে ম্যডাম বললেন তুমি মাকে আন্টি বলো? রূপসা অবাক হয়ে বাবার দিকে তাকিয়ে থাকে।সমর একটু ইতস্তত হয়ে বল রূপসার মা নেই।একটু দূর্ঘটনায় মারা গেছে।

সঙ্গে সঙ্গে হেডম্যডাম বললেন দুঃখিত ফর্মে লেখা আছে।।সব প্রশ্নের ঠিক ঠাক উত্তর দিয়ে রূপসা রা বাড়ি ফিরে আসে। কদিন বাদে লিষ্ট বের হয় রূপসা স্কুলে চান্স পেয়ে যায়। বাড়িতে সবাই খুব খুশি।স্কুল যাওয়া শুরু হলো।রোজ ই জেঠিমারা রূপসা কে স্কুল যাওয়া র জন্য তৈরী করে দেয়। হঠাৎ একদিন স্কুল থেকে ফিরে রূপসা খুব কাঁদছে । সবাই জানতে চায় কি হয়েছে?ম্যডাম বকেছে? কিছু বলছে নাখাওয়া দাওয়া কিছুই করছে না।

‌‌
শুধু কেঁদে ই চলেছে। সন্ধ্যায় অমৃতা পড়াতে এসে দেখে জেঠিমা জল পট্টি দিচ্ছে । অমৃতা বলে কি হয়েছে ওর। রূপসা র জেঠিমা জানান স্কুল থেকে ফিরে এসে থেকে ই কাঁদছিল কিছু খায়নি এখন দেখছি খুব জ্বর এসেছে। অমৃতা রূপসা র মাথায় হাত

দিতেই হাতটা চেপে ধরলো। অমৃতা কী হয়েছে সোনা? ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে রূপসা, আন্টি সবার মা স্কুলে আনতে যায়। আমার মা কে ন যায়না। আমি আর স্কুলে যাবো না । আমি মা’র কাছে যাবো। বলে কেঁদে ই চলেছে। অমৃতা বলে থার্মোমিটার আছ?জ্যেঠিমা বলে কিছু ক্ষন আগে দেখলাম ১০২’অমৃতা থার্মোমিটার দিয়ে দেখে১০৪’জ্বর বেড়ে ই চলেছে। বাড়িতে ডাক্তার এলো অনেক ওষুধ ইনজেকশন দিয়ে ও জ্বর কমছে না। অমৃতা কে কিছু তেই ছাড়ছে না। হাতচেপে ধরে আছে। অমৃতার মন ও খুব খারাপ। অনেক রাত হয়ে গেল অমৃতার আর সেই রাতে বাড়ি ফেরা হলো না। সারা রাত রূপসা র মাথায় জলপট্টি দিচ্ছে ওষুধ খাওয়া চ্ছে বাড়ির সকলে ঘুমিয়ে পড়েছে। সকাল হতেই রূপসার দাদু রূপসার ঘরে এসে দেখে রূপসা ঘুমিয়ে আছে।আর অমৃতা মাথার কাছে বসে আছে। অমৃতা তুমি ঘুমাও নি মা? অমৃতা চুপ করে থাকে। তুমি একটু ঘুমিয়ে নাও মা আমি বসছি। অমৃতা বলে না না কাকু ঠিক আছে আমার কোন অসুবিধা হচ্ছে না। আপনি ঘরে গিয়ে বিশ্রাম নিন। আস্তে আস্তে বাড়ীর সকলের ঘুম ভাঙ্গলো সবাই একবার করে চুপি দিয়ে যাচ্ছে। রূপসা র ঠাকুমা এক কাপ চা হাতে ঘরে এলেন। অমৃতা নাও মা একটু চা খাও। না না কাকিমা ঠিক আছে।কাল রাতে ও তো কিছু খেলে না। আমি তোমার দিদিমা কে কাল রাতে খবর দিয়ে দিয়েছি। তুমি টিফিন খেয়ে একটু বাড়ী থেকে ঘুরে এসো। উনি হয়ত চিন্তা করছেন। সমর ঘরে ঢুকে মেয়ের মাথায় হাত দিয়ে দেখল। জ্বর টা তো এখনও ভালো ই আছে দেখছি।ডাক্তারকে আর একবার খবর দি। সমর গেছে ডাক্তার কে ফোন করতে।এমন সময় রূপসা মা মা করে চিৎকার করে উঠে ই অজ্ঞান হয়ে যায়।

সমর এর মা বৌদি সবাই ভয় পেয়ে যায়অমৃতা ছুটে গিয়ে এক বালতি জল নিয়ে আসে। রূপসা কে কোলে নিয়ে এক ধার থেকে মাথায় জল ঢালতে থাকে।সবাই অবাক হয়ে অমৃতা র দিক তাকিয়ে থাকে। অমৃতার দু চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পরছে।সমর ডাক্তার বাবু কে জানায় শিঘ্রই আসুন। রূপসা অজ্ঞান হয়ে গেছে।জল ঢালতে ঢালতে অমৃতা খেয়াল করে রূপসা আবার ওর হাত টা চেপে ধরে আছে।অমৃতার রূপসা কে দেখে নিজের কথা মনে পড়ল।মা মরা রূপসা কে খুব অসহায় লাগছিলো অম‌তার।ডাক্তর বাবু ঘরে ঢুকে রূপসা কে দেখলেন। ডাক্তর বাবু বললেন চিন্তা র কিছু নেই।সময় মত মাথায় জল না পারলে মেয়ে কে বাঁচানো যেত না। সঠিক সময় জল টা ঢালা হয়েছে। এবার আশা করছি ভালো হয়ে যাবে। তবে সমর মেয়ের কথা একটু ভেবে দেখ।ওর এত অল্প বয়সে মা মারা গেছে ওর
জীবনট খুব কষ্টের হ য়ে গেছে। সবাই তো সমান হয় না।সমর বলে আমি তো ওর কথা ভেবে ই আর বিয়ে করিনি। আমার মা বাবা বহু বার বলে ছেন। শোন সমর এতোদিন হয়তো প্রয়োজন হয় নি। এখন স্কুলে সবার মা কে দেখে হয়ত শিশু মনে আঘাত লেগেছে। সমর বলে সৎ মা সে তো আরো সাংঘাতিক। সমর এর বাবা বলেন সকলে সমান হয়না সমর। রূপসার জ্ঞান ফিরে এলো আন্টি র গলাটা জড়িয়ে ধরে আছে।কিছু ক্ষন পর রূপসা কে গরম দুধ খাইয়ে ঘুম পারালো অমৃতা। এবার সমর এর মা কে বলল কাকিমা আমি আসি দিদিমা চিন্তা করবেন। আমি বিকালে একবার আসবো।সমর এর মা বললেন টিফিন করে যাও মা।না কাকিমা বাড়িতে গিয়ে স্বান সেরে টিফিন করব। বলে অমৃতা বাড়ি চলে গেল।
কদিন পরে রূপসা ভালো হয়ে গেল। আবার স্কুল যাওয়া শুরু হল।স্কুল থেকে ফিরে মা এর ছবির কাছে দাঁড়িয়ে কাঁদে। নতুন কোন খেলনা পেলে ছুটে গিয়ে মা’র ছবিতে দেখায়।এক দিন স্কুল থেকে ফিরে খাতা নিয়ে মা’র ছবিতে দেখা চ্ছে দেখো মা আমি আজ কে গুড পেয়ে ছি তুমি আমাকে আদর করবে না। ঠাকুর দা
রমাকান্ত বাবুআড়াল থেকে সব দেখে ন।
সন্ধ্যায় সমর বাড়ি ফিরলে সমর এর বাবা সমর কে বলে তুমি বিয়ে র কথা কি ভাবছো?সমর বললো বাবা তুমি বুঝতে পারছ না সৎ মা এলে রূপসা র আরো কষ্ট হবে।তখন কি করবে তুমি?রমাকান্ত বাবু বললেন তোমার অমৃতা কে কেমন লাগে?কী বলছো বাবা?শোন আমি অমৃতার মধ্যে সেই মাতৃত্ব দেখে ছি। তুমি বোধহয় জানো না অমৃতা রোজ দুপুরে বেলায় স্কুলে র দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থেকে রূপসাকে বাড়ি নিয়ে আসে। রিক্সা ওয়ালা চরন বলছিল।এর পরেও তূমি মেয়ে টা কে চিনতে পারলে না।সমর বললোআরে ওরা দ্বিতীয় পক্ষে মেয়েরবিয়ে দেবেন কেন? রমাকান্ত বাবু বলেনসেটা তুমি আমার হাতে ছেড়ে দাও, আমি কথা বলবো।
পরেরদিন রবিবার বার রূপসার স্কুল ছুটি। সকাল সকাল দাদু নাতনি মিলে চললেন অমৃতা দের বাড়ি। রূপসা রাস্তায় গিয়ে দাদু কে জিজ্ঞেস করল দাদু আমরা কোথায় যাচ্ছি?দাদু বলেন বলবো না একটু পরে ই দেখতে পাবে। অনেক খুঁজে খুঁজে এসে পৌঁছায় অমৃতা র বাড়ি।বেলবাজার সাথে সাথেই দরজা খুলে গেল। অমৃতা কে দেখতে পেয়ে রূপসা ভীষণ খুশি।আন্টি বলে লাফ দিয়ে কোলে উঠে গেল। অমৃতা ও যেন কি করবে বুঝতে পারছে না।ভেতর থেকে অমৃতা র দিদা বলেন কে এসেছে আমু? দিদিমা রূপসা এসে ছে। ওমনি দিদিমা এসে রূপসা কে কোলে নিয়ে আদর করছেন।কী খাবে তুমি দিদি ভাই বিস্কুট খাবে। তুমি কেমন আছো রূপসা? তোমার আন্টি তো খুব চিন্তা করছিলো।
দাদু আর নাতনি অনেকক্ষন সময় কাটান অমৃতা র বাড়ি তে অমৃতার মা মারা যায অমৃতার তখন ৫বছর বয়স।এক
মাস যেতে না যেতেই অমৃতার বাবা বিয়ে করে নেন।সৎ মা অমৃতা কে খুব কষ্ট দিত।না খাইয়ে রেখে দিত, ঐটুকু মেয়ে কে দিয়ে বাড়ি র সব কাজ করার এতটাই নিষ্ঠুর ছিল।

এমনকি মা’র ধর ও পর্যন্তকরত।
এখজন পরিচিতির মুখে খবর পেয়ে অমৃতার দিদিমা অমৃতা কে নিয়ে চলে আসে। দিদিমা র পেনসন এর টাকা তে ওদের স্ংসার চলে।
সব কিছু শুনে রমাকান্ত বাবু র ধারনা হয় এই মেয়ে ই একমাত্র যোগ্য রূপসা মা হওয়ার জন্য। রমাকান্ত বাবু রূপসা কে অমৃতার কোলে দিয়ে বললেন পারবে মা তুমি আমার নাতনির সত্যি কারের মা হতে?জন্মদিলেই হয়না মাতা যদি না বুঝো সন্তানের ব্যথা। হাত জোড় করে অমৃতার দিদিমা কে বলললেন আমার নাতনি টাকে বাঁচান। আপনি আমার একমাত্র সমব্যাথি। অমৃতা রূপসা কে জড়িয়ে ধরে আদর করছে। অমৃতার দিদিমা জানান ঠিক আছে আমি একটু সময় চেয়ে নিই আপনার কাছে। আমি নাতনির সাথে একটু কথা বলি। রমাকান্ত বাবু নাতনি কে নিয়ে বাড়ি ফিরে এলেন।
দুই দিন বাদে অমৃতার দিদিমা অমৃতা কে সঙ্গে নিয়ে রূপসা দের বাড়ি এলেন। রমাকান্ত বাবু ভীষণ খুশি। অমৃতার দিদিমা জানানঅমৃতা কিছু তেই আসতে রাজি হয়নি, আমি তো একা আসতে পারিনা ,বাড়িও চিনিনা তাই অমৃতা কে নিয়ে এলাম। রমাকান্ত বাবু জানান নানা ঠিক আছে।ওর তো পড়াতে আসার কথা ছিল।দুদিন থেকে আসছেনা রূপসার তো খুবই মন খারাপ।যাও মা তুমি রূপসার কাছে যাও।
বাড়িতে সবাইছিল। সবাই এসে অমৃতার দিদিমা সাথে পরিচয় করে। তারপর চা জলখাবার খাওয়ার পর আসল কথা শুরু হল। দিদিমা জানান আমি আপনার প্রস্তাব মেনে নিলাম কিন্তু আমার সামর্থ্য খুব অল্প ,আমি তো আপনাদের সম তুল্য হতে পারবোনা। রমাকান্ত বাবু জানান নানা আপনাকে কিছু করতে হবে না শুধু মতামত জানতে চাই।সমর জানায় আমার কিন্তু অমৃতা র সাথে কিছু কথা আছে। রমাকান্ত বাবু বলেন তুমি অমৃতার সাথে কথা বলে নাও।
সমর গেল রূপসা র ঘরে সেখানে গিয়ে দেখে রূপসা কে বুকে জড়িয়ে খুব আদর করছে অমৃতা।আর রূপসা ও আন্টি কে কত চুমু দিচ্ছে সমর কখন এসেছে ওরা জানতে ই পারে নি। সমর ডাকল রূপসা। ওমনি রূপসা বলে উঠল আন্টি এখন যাবেনা।আন্টি আমার কাছে থাকবে।
অমৃতা উঠে দাঁড়িয়ে বললো কি ছু বলবেন?সমর বললো রূপসা আমার খুব আদরের। সঙ্গে সঙ্গে অমৃতা বলো সেটা খুব স্বাভাবিক।মা মরা একটি মাত্র মেয়ে আদরের তো হবেই। সমর বললোতুমি পারবে ওর দায়িত্ব নিতে? অমৃতা বললো চেষ্টা করব।তবে আপনাকে কোন অভিযোগ করতে দেব না।সমর বললো আমি তো বিয়ে করতে সাহস পাচ্ছিলাম না।সৎ মা এসে রূপসার জীবন টা কে তছনছ করে দেবে তাই ভয় পাচ্ছি। অমৃতা জানায় আমি ও মা মরা মেয়ে সৎ মায়ের অনেক অত্যাচার সহ্য করেছি ৫বছর বয়েসে। আমি রূপসা কে সেই কষ্ট পেতে দেব না।সমর বলে আমি কোন অনুষ্ঠান করে বিয়ে করবনা। তোমার কোন আপত্তি নেই তো। অমৃতা বললো আমার দিদিমা র অনুষ্ঠান করার ক্ষমতা নেই।
সমর বাবা কে গিয়ে জানায় তুমি দিন ঠিক করো ঠাকুর মন্দিরে বিয়ে হবে। অমৃতা রা বাড়ি তে ফিরে এলো। রমাকান্ত বাবু বিয়ের দিন ঠিক করলেন। সাতদিনের মধ্যে ই অমৃতা আর সমর এর বিয়ে হয়ে গেল। ফুলসজ্জার রাত সবাই সমর এর সাথে ঠাট্টা ইয়ার্কি করছে।সমর ও সকলের সাথে মজা করছে। রূপসার জেঠিমারা অমৃতা কে গিয়ে বলে চলো এবার ফুল সজ্জার ঘরে যেতে হবে। অমৃতা রূপসা কে কোলে নিয়ে ফুলশয্যার ঘরে র দিকে যাচ্ছে দেখে সবাই হেসে উঠলো,সমর অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে।সমর বললো রূপসা কে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে? অমৃতা বললো ও আজ থেকে আমাদের কাছে শোবে। সবাই তো অবাক।সমর এর দিদি বললো আজকে থাক কাল থেকে ওকে নিয়ে ঘুমাবি। অমৃতা বললো না আমার মেয়ে আমার কাছে ই ঘুমাবে।সবাই মুখ বুজে ঘরে চলে গেল।সমর ও অমৃতা রূপসা কে নিয়ে ঘরে ঢুকলো।আজ রাতে রূপসা খুব খুশি আন্টি আর বাবা র মাঝে শুয়ে আছে ।
পরেরদিন সকালে উঠে ই সান সেরেঅমৃতা শ শুরু বাড়ির সকলের জন্য চা করছে,টিফিন করছে।তার মাঝে মেয়ে কে দাঁত মাজানো খাওয়া নো সব কিছু নিয়ে ভীষণ ব্যস্ত। হঠাৎ করে রূপসা আন্টি আন্টি করে ছুটে এলোরান্নাঘরে। সঙ্গে সঙ্গে ঠাকুমা ধমক দিয়ে বললো মা বলবে আর আন্টি বলবে না রূপসা। এটা তো মা’র মা।রূপসা না এটা আন্টি,এটা মা না।মা তো আকাশে চলে গেছে। ঠাকুর মা রূপসা কে জোরে ধমক দিয়ে বললো তোমাকে আমি যেটা বলত বলছি তুমি সেটাই বলবে। রূপসা কাঁদতে কাঁদতে বললো মা বলবনা।মা একদম ভালো না আমাকে একা রেখে চলে গেছে। সঙ্গে সঙ্গে অমৃতা রূপসা কে কোলে নিয়ে বলল মা তো চলে যায়নি সোনা ডাক্তার এর কাছে গিয়ে ছিলাম অপারেশন করতে। অবাক হয়ে মা’র দিকে তাকিয়ে থাকে ছোট্ট রূপসা। অমৃতা মেয়ে কে আদর করতে করতে বলে তুমি আমাকে মাম্মা বলো কেমন?
দেখতে দেখতে আরো কয়েক মাস চলে যায়। রূপসার স্কুলে ফাইনাল পরীক্ষা।মা সারা দিন রূপসা কে পড়ায় । রূপসা খুব ভালো পরীক্ষা দেয়। একদিন অমৃতা সমর কে জিজ্ঞেস করে রূপসা র মামা বাড়ি কোথায়?সমর বলে কলকাতা।আচ্ছা পরীক্ষা র পর কলকাতা যাওয়া যায়না।সমর বলে না আমরা ওদের বাড়িতে আর যাইনা।কেন যাওনা একটু বলবে? তনুজা মারা যাওয়ার পর ওরা কোন যোগাযোগ রাখেনি। তুমি গেছিলে কোনদিন রূপসা কে নিয়ে?না জন্মের পর ও কোনো দিন মামার বাড়ি যায়নি।তবে জন্মদিনের পরেওদের মামার বাড়ি যাওয়ার কথা ছিল,সেই বুঝে টিকিট ও করা হয়েছিল তার পর তনুজা র মৃত্যু সব উল্টো পাল্টা হয়ে গেলো। আগে ওরা খুব ফোন করতে যাওয়ার জন্য বলতো কিন্ত্ত যাওয়া আর হয়ে ওঠেনি।কেন মেয়ে টা কে মামা র বাড়ি র আদর থেকে বঞ্চিত রেখেছো? আমরা যাব তুমি সব ব্যবস্থা করো।সমর বললো তুমি বাবা র সাথে কথা বলো। বাবা রাজি থাকলে আমরা যাব। অমৃতা শশু্র কে বললে উনি রাজি হয়ে যান। রমাকান্ত বাবু ফোন করে জানান সমর মেয়ে নিয়ে আপনাদের ওখানে যাচ্ছে। সঙ্গে যাচ্ছে রূপসা র নতুন মা।
সবাই তো শুনে হতবম্ব মেয়ে টার এবার খুব কষ্ট হবে।সৎ মা এলো সংসারে। রূপসা ব্যগ গুছাতে দেখে জানতে চায়
মাম্মা জামাগুলো ব্যগে কেন? অমৃতা বলে আমরা তো মামার বাড়ি যাবো। মামার বাড়ি কি মাম্মা? অমৃতা মেয়ে কে বলে । মামার বাড়ি তে মামা আছে মামী আছে দাদা আছে দিদুন আছে মাসিমনি আছে গেলে দেখবে খুব মজা হবে। তুমি যাবে? মামার বাড়ি মানে কি? অমৃতা বললো মামার বাড়ি মানে মাম্মার বাড়ি। রূপসা বললো তাহলে তোমার বড়ি? আমি যাব মাম্মা।নিঃশ্চ ই যাবে সোনা। অমৃতা বড়ো জায়ের কাছে রূপসার জন্মদিনের ছবি গুলো দেখতে চায়। বড়ো জা প্রীতি সব ছবি গুলো দেখায়। অমৃতা বলে আমাকে একটু সবাইকে চিনিয়ে দেবে বড়দিভাই? প্রীতি সবাই কে ভালো করে চিনেয়ে দেয়। প্রীতি জানতে চায় সবাই কে চিনে কী করবি তুই? আমার মেয়ে কে চেনাতে হবেনা? প্রীতি বলে তাহলে তুই তনুজা র সব এলব্যাম তোর কাছে রেখে দে।ওতে রূপসার অনেক ছবি আছে।সব এলব্যাম গুল ঘরে এনে রূপসা কে সব ছবি দেখাচ্ছে। রূপসা খুব খুশি। আমি ক ই মাম্মা?এই ছোট্ট বোনুটা।😃😃
খুব হাসি পাচ্ছে রূপসার। রূপসা বললো তুমি কোনটা মাম্মা? রূপসা কে কোলে নিয়ে তনুজা একটা ছবি দেখিয়ে বললো এই তো আমি আর তূমি। রূপসা অনেকক্ষণ মনদিয়ে ছবিটা দেখে বললো না না এটা তো ফটোর মা। তূমি কোনটা? ততক্ষণে ঘরে সমর আর ওর মা চলে এসেছে। অমৃতা বললো এটাই আমি অপারেশন করে ডাক্তার বাবু চেহারা বদলে দিয়েছে।সমর এর মা বললো কোনদিন যদি রূপসা সত্যি জানতে পারে তখন কি হবে? অমৃতা বললো সবাই তাই জানবে তনুজাএকসিডেন্টে্্য প্র প্লাস্টিক সার্জারি করা হয়েছে।কোন দিন রূপসা সত্যি জানতে পারবে না।
পরেরদিন সকালে ট্রেন বিকালে বেরিয়ে সবার জন্য জামাকাপড় সব কিনে নিয়ে এলো অমৃতা। তারপর কলকাতা র উদ্দেশ্যে রওনা হলো। পরের দিন পৌঁছল হাওড়া স্টেশনে।সমর এর খুব ইতস্ততঃ লাগছে তনুজা র মৃত্যু র পর তনুজার অবর্তমানে তনুজার বাপের বাড়ি যেতে। হঠাৎ করে সমর দেখে তনুজা দাদা আর জামাইবাবু স্টেশনে তাদের নিতে এসেছেন। রূপসা কে দেখে তারা ভীষন খুশী।আর রুপসা অপরিচিত মুখ দেখে মা’র আড়ালে লুকিয়ে পড়েছে। রূপসা এসে পড়লো মামা বাড়ি।দিদুন মাসিমনিরা,মামী ,দাদা, দিদিরাসবাই রূপসা কে আদর করছে।আর রূপসা মার কোলে উঠে মা’র গলা জড়িয়ে কাঁধে মাথা দিয়ে শুয়ে আছে। অমৃতা বললো নতুন তো তাই লজ্জা পাচ্ছে। তারপর রূপসা কে সান করিয়ে খাইয়ে ঘুম পারালো অমৃতা। তারপর নিজে সান সেরে তনুজা র বাবার ছবিতে প্রনাম করলো,মা কে প্রনাম করলো মা’র হাতে তুলে দিল সকলের জন্য কিনে আনা জামা কাপড়। তনুজার মা মাথায় হাত দিয়ে বললেন সুখী হ ও মা।অমৃতা তনুজা র মাকে জড়িয়ে ধরে বললো আজ থেকে তুমি আমার মা আর আমি তোমার হারিয়ে যাওয়া মেয়ে তনুজা। আমি তোমাকে মা বলেই ডাকবো। আমার মেয়ে যেন কোন দিন জানতে না পারে আমি ওর সৎ মা।দাদা দিদিভাইরা বৌদি তোমাদের সকলের সহযোগিতা চাই। আমি যেন আমার মেয়ে কে ভালো করে মানুষ করতে পারি।এক সপ্তাহ খুব আনন্দ করে দিন কাটলো রূপসা মামার সাথে কত জায়গা ঘুরল। আলিপুর চিড়িয়াখানায়,নিকোপাক সাইন্সসিটি। খুব আনন্দে কাটল।কত খেলনা কতজামা সব উপহার পেল রূপসা। অমৃতা যাওয়ার সময় মাকে কথাদিল প্রত্যেক বছর পরীক্ষা র পর তোমার নাতনিকে নিয়ে আমরা আসবো। তারপর অমৃতা জলপাইগুড়ি ফিরে এলো। আবার রূপসার পড়া শুনা আরম্ভ হল। অমৃতা প্রত্যেক সপ্তাহে তনুজা র মাকে ফোন করে। তনুজা র বাড়ি র লোক অমৃতা কে পেয়ে ভীষন খুশী ‌রূপসা খুব ভালো আছে ভাবলেই তাদের ভালো লাগে।
প্রত্যেক বছর একবার করে মামাবাড়ি ঘুরে যায় রূপসা।
দেখতে দেখতে অনেক দিন কেটে যায়। বাড়িতে সবার ইচ্ছে অমৃতা র নিজের একটা বাচ্চা হোক। সমর বলেরূপসার একটা ভাই হলে কেমন হয়? অমৃতা বলে আমরা একটা মেয়ে ই ভালো আর দরকার নাই।প্রসব করলেই মা হ ওয়া যায়না।
দেখতে দেখতে রূপসা বোর্ডের পরীক্ষা য় খুব ভালো রেজাল্ট করল।তারপর মেডিকেল পরীক্ষা য় পাশ করে বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজের এক জন নামকরা সার্জেন।
রূপসার বিয়ের ব্যবস্থা হচ্ছে । সারাদিন অমৃতা শুধু কাঁদে কী করে থাকবে মেয়ে র বিয়ে হয়ে গেলে।
আজ ও রূপসা জানেনা অমৃতা তার নিজের মা নয়,সৎ মা।এই হলো সেই সত্যি কারের মা।

অনেকক্ষণ হয়েছে মাকন্দ কোয়ারানটাইন উচ্চারণ করবার চেষ্টা করছে, কিন্তু পারছে না। এই ঢপের কেত্তনটা উচ্চারণ করতে গিয়ে কয়েকবার জিভে কামড়ও খেয়ে বসে আছে মাকন্দ। খুবই চিন্তার বিষয়, আজকে প্রায় ২১ দিন হয়ে গেল সবাইকে লকডাউন বলে চালিয়ে দিচ্ছে, কোয়ারানটাইন উচ্চারণ করতে পারছে না । অথচ যদি এই ভারী শব্দটা উচ্চারণ করতে পারত তা হলে মানুষ মাকন্দর কথাকে আরো গুরুত্ব দিয়ে শুনত।

এই সব কথা ভাবতে ভাবতে মাকন্দ দেওয়ালে পা তুলে, মাথা নীচের দিকে করে শুয়ে আছে। ফলে লুঙ্গীটা মুখের উপরে এসে পড়েছে আর চোখ গুলো ঢাকা পড়েছে। তাই বলেই হয়তো ঘুম ঘুম পাচ্ছে আর ওদিকে নিদারুণ ভাবে মাকন্দর যন্ত্রপাতি দেখা যাচ্ছে। আহা্,পাখার মলয় বাতাসে যন্ত্রপাতি শোভা পাচ্ছে। এই হলো এখনকার এ ঘরের দৃশ্য।

তবে মাকন্দ যখন চিন্তা করে তখনই শুধু এই পোজিশনে শুয়ে থাকে। তবে আমাদের মনে রাখতে হবে মাকন্দ একজন বিখ্যাত মানুষ তাই তার কিছু বিশেষ নিয়ম আছে চিন্তা করার, যেমন যখন এই ধ্যানটা করতে হবে শুয়ে মাথায় রাখতে হবে নীচে দিকে আর ওর পা দু’টো যেন থাকে উপরের দিকে। আর দরজা গুলো বন্ধ থাকে আর জানলা গুলো খোলা থাকতে হবে। এর বিশেষ কারণ হলো দরজা দিয়ে যাতে কেউ ঢুকতে না পারে আর জনলা দিয়ে ভাবনারা যেন প্রবেশ করতে পারে৷ তবে ভাবনারা প্রবেশ করতে পারে কি না তা জানা নেই তবে পাশের বাড়ির কুশলের বৌ দৃশ্য গুলো গোগ্রাসে গেলতে পারে। এসব আবার মাকন্দ এখনো জানতে পারেনি।

এর মধ্যেই ফোন বেজে উঠেছে, ভাবনা চিন্তা উলোটপালোট করে দিয়ে । ফোন করেছে শায়া প্রকাশনির মৃণাল দা। ল্যাদে মত্ত মাকন্দ কোনো মতে ফোনটা ধরে।

মাকন্দ – হ্যালো।

মৃণাল – দাদা আপনার মৃণাল ভাই বলছি।

মাকন্দ – হ্যা! মৃণাল বলো।

মৃণাল – বলছি দাদা দেখছি সবাই সেলেব দের পেজে ডেকে কবিতা, গল্প পাঠ করাচ্ছেন। তাই আমরাও ভাবছিলাম আপনাকে দিয়ে যদি..

মাকন্দ- আরে ব্যাটা, এই গুলো এখন আর চলে না। এই সময় কেউ কবিতা পড়ে? বল রবীন্দ্রনাথ কে কি আর কেউ পাত্তা দেয়? শেক্সপিয়ার বলতে এখন শুধু সেক্স ছাড়া আর কিছুই মাথায় আসে না এই লকডাউনে, বুঝেছ?

মৃণাল – তা কী ভাবে হয় দাদা? আপনি তো লেখক মানুষ , কবি হিসেবে আপনার খ্যাতি বিশাল। আপনি আর কবিতা লিখবেন না, দাদা?

মাকন্দ – না! —এই সবের মার্কেট এখন আর নেই বুঝেছ! আমি লাইভে আসব কিন্তু অন্য কিছু করব। বুঝলে?

মৃণাল -তা হলে কী করবেন দাদা?

মাকন্দ- শোন একটা সুন্দর দিদি লাইভে ডালগোনা নাকি বালগোনা কফি এসেছে সেটা বানাবে। আর আমি তাকে দেখতে দেখতে ছবি আঁকবো। ডিজিটাল পেন্টিং করব এই আর কি। আঁকা হয়ে গেলে ওখানে আবার একটা রবী দাদুর দু’টো লাইন লিখে দেব। দেখবে, ফলোয়ারও উঠে গেছে আর লকডাউনের জন্য ডালগোনা দিদি আমার বাল গুনতেও শিখে গেছে। ঠিক আছে বুদ্ধু রাম? শুধু দিদিমণিটা তুমি একটু চটজলদি জোগাড় করে ফ্যাল দিকি!

মৃণাল – দাদা এই বুদ্ধি না হলে কি আর কেউ বিখ্যাত হতে পারে।! আপনি গুরু আছেন বটে!

মাকন্দ- তা হলে শোন একটা জ্ঞানের কথা বলি। আমাকে নিয়ে যখন বই লেখা হবে এই সব জ্ঞানের কথা ঢুকিয়ে দেবে মনে করে। কেমন? তোমার আবার সব কিছু মনে থাকে তো? ভালো গ্রে ম্যাটার আছে তোমার?

মৃণাল – সে সব আপনারই দয়ায় স্যার।

মাকন্দ- সময়টাকে কেউ বুঝতে পারছে না বুঝলে? এক মাত্র রবীন্দ্রনাথ বুঝতে পেরেছিলেন আর আমি বুঝতে পারছি এখন। ব্যাপারটা কখনো লক্ষ করেছ, আমাদের দাদু কবিতা, গান, গল্পের মাঝে ছবি এঁকে দিতেন। কেন আঁকতেন ভেবে দেখেছ?

মৃণাল – না দাদা, এ কথা তো কখনো ভেবে দেখিনি।

মাকন্দ – ভাববে কোথা থেকে, তার জন্যে তো গ্রে ম্যাটারের প্রয়োজন! আর সেটা তো তোমার নেই। শোন, দাদু মার্কেটটা ঠিকই বুঝত। যদি কবিতা মার্কেটে চলা বন্ধ হয়ে যায় তা হলে ছবি এঁকে দিয়েই চালিয়ে দেবেন মার্কেটে, এই ছিলো তার চিন্তাধারা।
আর একটা গোপন কথা শুনে রাখ মৃণাল , এই কথাটা আমাকে আবার ব্যাঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন। কবি গুরুর প্ল্যান ছিল, যদি গীতাঞ্জলি না চলে, একটা আঁকার খাতা পাঠিয়ে দেবেন। যদিও লিখেই নোবেলটা বাগাতে পেরেছিলেন। আর তাই এই ম্যাদামারা মার্কেটে আমি এখনো নোবেলের স্বপ্ন দেখি। লিখে না হলে ছবি এঁকেই সই । আনতেই হবে বুঝলে মৃণাল!

মৃণাল- দাদা আপনার কত জ্ঞান,কত পড়াশোনা। আপনিই পারবেন। তা বলছি দাদা, আপনি তো ‘মোনালিসা’, ‘দা স্ট্যারি নাইট ‘আর ‘গুয়ের ইটা'(guernica) না কি যেন একটা আছে এগুলো
তো জলে ঘুলে খেয়েছেন বটে!

মাকন্দ- তোমার মাথাটাই নষ্ট। বুঝলে মৃণাল?

মৃণাল – আজ্ঞে স্যার।

মাকন্দ- এসব শুধু জ্ঞান দেওয়ার সময় নাম গুলো মুখস্ত রাখলেই হয়। বাকি পাশের পাড়ার সোনালিসা কে স্ট্যারি নাইট যে ভাবে দিয়েছিলাম না, এখনো কি তা ভোলা যায় মৃণাল, কী আবেগ,আহা্।শুধু একটু গু লেগে গেছিল এই আর কি।

মৃণাল – স্যার, মানে?

মাকন্দ- ওই একটা অ্যানাল ক্লাস নিয়েছিলাম এই আর কি।

মৃণাল – আপনি যখন বলছেন স্যার জ্ঞানের ক্লাসই হবে হয়ত। তো স্যার আপনি লাইভে এসে কী আঁকবেন?

মাকন্দ – ভাবছি একটা হাতির শুঁড় বেড়িতে আছে, যেন পুরুষের যৌনাঙ্গ আর দাত দুটো তো বুঝতেই পারছ।

মৃণাল – আহা্। কি উচ্চ ভাবনা চিন্তা স্যার আপনার!

মাকন্দ – বুঝলে মৃণাল, আমি ওই এবস্ট্রাকট ফ্রাক্ট আঁকি না, যাই আঁকি সবই কন্সেপ্টচুয়াল। বুঝেছ?

মৃণাল – হ্যাঁ স্যার আপনি গুরু মানুষ। তা হলে কাল বিকেল ৫ টায় লাইভ স্যার? এখন রাখি?

মাকন্দ- শোন, আমি এখন ফেসবুকে আঁকছি বুঝলে? এঁকে কালেরগ্রাফি না বালেরগ্রাফি হয় ওটা করে দিচ্ছি দারুণ শেয়ার হচ্ছে। আর বিশেষ করে যে ছবি গুলোর পোঁদে নস্টালজিক গান গুঁজে দিচ্ছি তার তো রিচই আলাদা। বুঝলে? লাইক আর শেয়ার করে দিস মনে করে আমার পেজটা ‘ মাকন্দর তুলি’ – ‘তুললে আর নামাতে নাইকো ভুলি ‘ এটা হলো আমার ট্যাগ লাইন, বুঝেছিস? এটা হলো আঁকার যুগ, হাগা আর আঁকায় কোনো তফাত থাকবেনা। তরুণ শিল্পীরা সব তফাত ঘুচিয়ে দেবে, মৃণাল। এটাই আঁকার যুদ্ধ। বুঝেছিস?

মৃণাল – হ্যাঁ স্যার বুঝেছি। রাখছি তা হলে?

মাকন্দ – আরে দাঁড়াও না, এতো তাড়া কিসের? টাকাপয়সা দিবি না লাইভ করব?

মৃণাল – আরে দাদা লকডাউনে টাকা কোথায়? আপনাকে বরং পুজো বার্ষিকীতে অতিথি লেখক করে দেব স্যার।

মাকন্দ- ঠিক আছে। রাখ।

বলেই ফোনটা রেখে দেয়। মুখটা কাঁচুমাচু করে আবার ভাবনার প্রসাধনের দিকে এগিয়ে যায়। পা দু’টো আগের মতোই উপরে দেওয়ালের দিকে উঠিয়ে দেয়। লুঙ্গীটা আবার মুখে উপ এসে পড়ে, মাকন্দর চোখ আবার বন্ধ হয়ে আসে । ছাদে দাঁড়ানো কুশলের বৌ আবার জানলার শিকলের ফাঁক দিয়ে চোখ বড়ো বড়ো করে কি যেন হাঁ করে গিলবার চেষ্টা করে।

অস্ত্রের বায়না দিয়ে ফেরার পথে, চন্দ্রবর্মা অনসূয়াকে জিজ্ঞেস করলেন, “অনসূয়া, তোমার কখনো সংসার করতে সাধ হয় না?”
অনসূয়া বললো, “আমার তো সংসার রয়েছে মহারাজ। স্বামী রয়েছেন, তাঁর প্রতি কর্তব্য রয়েছে… ”
চন্দ্রবর্মা অনসূয়ার দিকে তাকিয়ে তার মনোভাব বোঝার চেষ্টা করলেন। সেই একইরকম কৌতুকোজ্জ্বল চেহারা। কটাক্ষ দুটি কেবল অতিরিক্ত চঞ্চল। কিছুতেই রাজার চোখের ওপর স্থির হচ্ছে না।
মহারাজ বললেন, “আমি আর পাঁচটা সাধারণ নারীর সংসারের কথা বলছি, অনসূয়া।”
অনসূয়া বেশ খানিক হাসলো, তারপর বললো, “মহারাজ কি সত্যিই জানেন না, নাকি জেনেও কৌতুক করছেন?”
“অর্থাৎ?”
“আমি তো সাধারণ নারী নই, মহারাজ। আজ থেকে দশ বছর আগেই আমি সাধারণত্ব হারিয়েছি। মা মারা যাবার পর পিতা ঠিক করলেন, পুনর্বিবাহ করবেন। আমার তখন মাত্র সাত বছর বয়স। পিতার কাছে আমি তাঁর নতুন সংসারের গলগ্রহ। তাই এক পূর্ণিমা তিথিতে তিনি আমাকে মহেশ্বরের নিকট সম্প্রদান করে গেলেন। বেদমন্ত্র উচ্চারণ করে পাথরের লিঙ্গমূর্তির সাথে আমার বিবাহ হয়ে গেল। তারপর থেকে তিনিই আমার স্বামী, তিনিই আমার দেবতা। আর আমি তাঁর দেবদাসী।”
এতটা বলেও অনসূয়ার কণ্ঠ থেকে একটিও দীর্ঘশ্বাস পড়লো না। কণ্ঠস্বরের অপার কৌতুকরস খানিকটা ম্লান হয়ে গেলেও চেহারার ওপরের আনন্দ-আচ্ছাদনটা অবিকৃতই ছিল। চন্দ্রবর্মা অবাক হয়ে শুনলেন সবটা। তিনি আন্দাজ করেন নি, এমনটা নয়। প্রথম দিন মন্দিরের গর্ভগৃহে অনসূয়ার অলোকসামান্য নৃত্যকলা দেখেই তাঁর এই কথাটা মনে হয়েছিল। কিন্তু বনমাঝের এই নির্জন মন্দিরেও যে দেবদাসী থাকতে পারে, তা তিনি সম্পূর্ণ মেনে নিতে পারেন নি।
কিছুক্ষণ চুপচাপ হাঁটার পর চন্দ্রবর্মার মনে পড়লো, দেবদাসীদের প্রথম সম্ভোগকর্তা হন মন্দিরের প্রধান পুরোহিত। তবে কি আচার্যদেব ….?
অনসূয়া নিজেই চন্দ্রবর্মার সন্দেহের অবসান ঘটালো, সে যেন আপনমনেই বললো, “পিতার মুখ এখন আমার স্মৃতিতেও আসে না। পিতা বলতে আমার আচার্যদেবের মুখটাই মনে পড়ে। তাঁর স্নেহচ্ছায়াতেই তো বড় হলাম। তিনি আমাকে পড়তেও শিখিয়েছেন। আমি বেদ পড়েছি। রামায়ণ মহাভারত পড়েছি। সব তিনিই শিখিয়েছেন।”
চন্দ্রবর্মা উত্তর করলেন না। কেবলমাত্র একটি মানুষের নির্দয়তার কারণে এই অনন্যসাধারণ প্রতিভাধর যুবতীর এত বড়ো জীবনটা এই বনভূমির দেবমন্দিরে, এক পাথরের মূর্তির সাথে সংসার করার কষ্টকল্পনায় কেটে যাবে। তার সুপুষ্ট যৌবন, তার আশ্চর্য বুদ্ধিমত্তা, তার এতখানি চারিত্রিক জোর- এই ভগ্নপ্রায় দেবালয়ের প্রাচীরের মতো, সময়ের ক্ষয়কার্যে ক্রমশ জীর্ণ হতে থাকবে। চন্দ্রবর্মার মনটা হঠাৎ বিষাদে ভরে উঠলো। অনেকক্ষণ পর তিনি বললেন, “অনসূয়া, এই স্থান তোমার উপযোগী নয়। একেবারেই নয়।”
অনসূয়া একইরকম ভাবে হেসে জবাব দিল, “তবে? আমার উপযুক্ত স্থান কোথায়? কে সেখানে আমাকে পৌঁছে দেবে?”
“যদি বলি, আমি পৌঁছে দেবো?” রাজা অকপটে বললেন।
অনসূয়া হেসে বললো, “পারবেন না।”


বিদ্রোহের নির্ধারিত দিন ক্রমশ এগিয়ে আসতে লাগলো। এর মধ্যে গাঁ-গঞ্জ থেকে বিদ্রোহের নেতাদের দূত দেবমন্দিরে এসে বেশ কয়েকবার শলা করে গেছে। রাজাও ছদ্মবেশে গঞ্জে গিয়ে বিদ্রোহীদের আশ্বাস অর্জন করে এসেছেন।এমনকি চন্দ্রবর্মা তাঁর পুরাতন ভৃত্য মারফত রাজধানীর ভিতরকার খবর নিতেও সক্ষম হয়েছেন। ভূমিকম্পের স্পন্দনতরঙ্গ ইমারতের প্রত্যেকটি প্রস্তরে সঞ্চারিত হতে পারলেই, গগনচুম্বী অট্টালিকা চক্ষের নিমেষে ধূলিসাৎ হয়। চন্দ্রবর্মা ও তাঁর সহচররা শত্রু অধিকৃত রাজ্যের সুরক্ষা ব্যবস্থার প্রত্যেকটি স্তরে বিদ্রোহের তরঙ্গ ছড়িয়ে দিতে শুরু করেছিল। ধ্বংসের দুন্দুভিবাদ্য বেজে ওঠা তখন কেবল সময়ের অপেক্ষা।
মন নামক যে বস্তুটি নিয়ে যুগযুগান্তের কবিরা ছন্দের আর প্রেমিকেরা প্রস্তরের সৌধ নির্মাণ করে এসেছেন, সেই অত্যাশ্চর্য অ-শারীরিক বস্তুটি বোধকরি সংখ্যায় মাত্র একটি নয়। মানব হৃদপিণ্ডের চারটি প্রকোষ্ঠের মতোই এই মন নামক বস্তুটিও সময়বিশেষে বহু অস্তিত্বে প্রকটিত হতে জানে। চন্দ্রবর্মার মন যেমন এখন দ্বিভাজিত অস্তিত্বে, তাঁকে অস্থির করে তুলছে। এক মনে তাঁর রণোন্মাদনা, হারানো রাজ্য ফিরে পাবার আকাঙ্ক্ষা; অন্য মনে তাঁর বিচ্ছেদবেদনা, এই বনমন্দিরের প্রশান্ত বাতাবরণের নায়িকা অনসূয়ার থেকে চিরকালের ন্যায় দূরে চলে যাবার বেদনা। রণভেরীর উত্তেজক আহ্বানের নেপথ্যে কেউ যেন করুণ সুরে বিষাদের বাঁশি বাজিয়ে চলেছে অনবরত।
চন্দ্রবর্মা নিশ্চিত জানেন, এই বনমন্দিরে সর্বহারা মানুষের বেশে তিনি আর কোনোদিন ফিরতে পারবেন না। যুদ্ধে যদি জয় হয়, তবে তিনি রাজা, সমগ্র রাজ্যের পরমভট্টারক; মন্দিরে আবার ফিরতে হলে তাঁকে রাজবেশে সপার্ষদ আসতে হবে। আর যদি পরাজয় হয়, তবে হয় তিনি শত্রুর হাতে বন্দি নতুবা বীরগতিপ্রাপ্ত। একবার পলায়নে সক্ষম হয়েছেন বলে বারবার হবেন, এমনটা না ভাবাই সমীচীন। অর্থাৎ আর মাত্র কয়েকটা দিন, তারপর এই ভগ্নপ্রায় দেবালয়ের আতিথেয়তার পরিসমাপ্তি। চন্দ্রবর্মার সমস্ত ব্যস্ততার মাঝেও এক অদৃশ্য ঘোষক যেন অনুক্ষণ এই পরিসমাপ্তির নির্দয় ঘোষণা করে চলেছে।
অনসূয়াকে চন্দ্রবর্মা এখন আর ঠিক করে বুঝে উঠতে পারেন না। সে একইরকমভাবে একগাল হাসি হেসে, চন্দ্রবর্মার পর্ণকুটিরে আহারের পাত্র নিয়ে আসে। আহার সাজিয়ে দিয়ে রাজার পাশে উপবেশন করে। রাজা যতক্ষণ খান, ততক্ষণ নীরবে বসে থাকে। কোনো কোনো দিন, রাজা তার মুখের দিকে চেয়ে অনুভূতির অনুসন্ধান করেন। অনসূয়া হেসে বলে, “দাসীর মুখে এত কী দেখছেন, মহারাজ?”
রাজা উত্তর করেন, “মুখ না মুখোশ, তাই বোঝার চেষ্টা করছি।”
অনসূয়া খিলখিলিয়ে হাসে। তারপর ছদ্ম দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, “আমি ভাবলাম বুঝি প্রেমদৃষ্টি। হা অদৃষ্ট!”
অনসূয়া রসিকতার মধ্যে এতটুকু কৃত্রিমতা থাকে না। তা সত্ত্বেও রাজার সন্দেহ দূর হয় না।
তারপর একদিন রাজাকে খেতে দিয়ে, অনসূয়া বলে উঠলো, “আর মাত্র কয়েকটা দিন!”
চন্দ্রবর্মা ভাবলেন, এইবার তিনি তাকে ধরে ফেলেছেন। যে বিরহযন্ত্রণায় তাঁর হৃদয় কাতর হচ্ছে, সে একই যন্ত্রণার নিশান আজ অনসূয়ার কণ্ঠস্বরেও বার হয়ে গিয়েছে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “কীসের?”
অনসূয়া বললো, “এই যে রাজভোগ ছেড়ে বিস্বাদ শাকান্ন আহার করছেন, স্বর্ণপালঙ্কের বদলে কঠিন চৌকিতে শয়ন করছেন… এই সবের ইতি হতে বাকি আর অল্পকয়টি দিন। ”
চন্দ্রবর্মা বললেন, “আর?”
অনসূয়া বললো, “আর? ক্ষমা করবেন, কিন্তু মহারাজ, আর তো কিছু নয়।”
চন্দ্রবর্মা কান পেতে রইলেন। অনেক সময় প্রবল হৃদয়োচ্ছ্বাস ভীষণভাবে আড়াল করতে গেলে, মৃদু দীর্ঘশ্বাস বার হয়ে আসে। কিন্তু, নাঃ। অনসূয়া সত্যিই অসামান্যা।


সময় যেন চোখের পলক। অপরিচিতা তরুণীর কোলের ওপর আহত, অবসন্ন শরীরে শুয়ে থাকার সেই দিন আর আজকের দিনের মধ্যে যেন এক পলকমাত্র ব্যবধান। মধ্যের এতগুলো টুকরো টুকরো ঘটনার সমস্তই এই একনিমেষ কালের একেকটি অতি ক্ষুদ্র ভগ্নাংশ। আগামীকাল প্রভাতে চন্দ্রবর্মা রণসাজে সজ্জিত হয়ে, বিদ্রোহী প্রজাদের সেনাপতি হিসেবে যুদ্ধযাত্রা করবেন। পশ্চাদে রেখে যাবেন এই দেবালয়ে কাটানো দিনগুলিকে, অনসূয়াকে। একবার তিনি ভাবলেন, অনসূয়ার সেই অসম্ভব রসিকতাকেই চিরজন্মের মতো সত্য করে দেবেন। এই পবিত্র দেবালয়ে দাঁড়িয়ে অনসূয়ার সমস্ত সুখ, সমস্ত দুঃখ ও সমস্ত প্রেমের শরিক হবার অঙ্গীকার করে যাবেন। কিন্তু, যদি তিনি ফিরতে না পারেন, যদি যুদ্ধক্ষেত্রে তাঁর মৃত্যু হয়? তবে এই চিরবঞ্চিতা একাকিনী নারীর জীবনে নতুন করে দুঃখের আমদানি ঘটে যাবে না? তার চেয়ে জয়ী হয়ে, রাজা হিসেবেই তিনি এই বনে ফিরবেন। নিশ্চয়ই ফিরবেন।
মধ্যাহ্নে ভোজনের পাত্র হাতে, অনসূয়া রাজার কুটিরে এল। চন্দ্রবর্মা সাজিয়ে-দেয়া খাবারের সম্মুখে নিঃশব্দে এসে বসলেন। অনসূয়ার চেহারায় এখনও যে হাসিটা ছড়িয়ে আছে, চন্দ্রবর্মার চোখে তা মলিনই দেখালো। যেন শিশির-সিক্ত ঘাসের ওপর শীতের সকালের ম্লান রৌদ্র। সৌন্দর্যের ঔজ্জ্বল্য বিষাদের আবছায়ায় কোনোরকমে ফুটে আছে। চন্দ্রবর্মার বড়ো ভালো লাগলো। অনসূয়ার চেহারার এই বিষণ্ন ভাবটা যে তাঁর নিজেরই কল্পনা, এ কথা তিনি একবারও ভাবলেন না।
অনসূয়া একটিও কথা বললো না। রাজার আহার সমাপ্ত হলে, সে পাত্রাদি সংগ্রহ করে চলে যেতে উদ্যত হল। চন্দ্রবর্মার প্রতীক্ষার সীমা এইবার লঙ্ঘিত হল। তিনি বললেন, “আজও কিছু বলবে না অনসূয়া?”
অনসূয়া দাঁড়ালো। একটু সময় নিয়ে বললো, “কী বলবো, মহারাজ?”
“কাল আমি চলে যাবো অনসূয়া!”
“জানি মহারাজ। আপনি জয়ী হবেন। আমার শুভকামনা… ”
“আঃ!” রাজা তাকে থামিয়ে দিলেন।
“ক্ষমা করুন, মহারাজ।” অনসূয়া মাথা নামিয়ে বললো।
“আমি যদি বিজয়ী হই, তবে তুমি আমার সাথে যাবে?”
“কোথায় যাবো, মহারাজ?”
“রাজধানীতে। আমার রাজপুরীতে।”
“মাপ করবেন, মহারাজ। কিন্তু তা হয় না।”
“কেন হয় না?”
“আমি দেবদাসী। দেবালয়ের বাইরে কোথাও আমার যাবার উপায় নেই।”
“যদি তোমাকে আমি বিবাহ করি?”
“মহারাজ বোধহয় ভুলে যাচ্ছেন, আমি বিবাহিতা।”
“আমি এইসব মানি না, তুমি জানো।”
“আপনি মানেন না। কিন্তু আমি মানি। আপনার প্রজারা মানে। যে প্রজাদের সহায়তা নিয়ে, কাল আপনার হারানো রাজ্য পুনরুদ্ধার করতে যাচ্ছেন, সেই প্রজাদের সংস্কারের বিরুদ্ধে গিয়ে আপনার এই চিন্তাও অত্যন্ত অনুচিত।”
“অনসূয়া!”
“পাঁকের পদ্মফুল পাঁকেই মানায়, মহারাজ। পূজার উপকরণ হতে হলে ফুলের গাছটিকেও পবিত্র স্থানে জন্মাতে হয়।”
অনসূয়া উচ্ছিষ্টের পাত্র হাতে কুটির ত্যাগ করলো।
অনসূয়ার চারিত্রিক দৃঢ়তা চন্দ্রবর্মাকে আরও একবার মুগ্ধ করেছে। তাঁর রাজঅবরোধে যে দুজন পরমাসুন্দরী রানি ছিলেন, অনসূয়ার দৃঢ় চরিত্রের কেশাগ্রভাগ যদি তাঁদের চরিত্রেও থাকতো, তবে চন্দ্রবর্মার পরাজয়ের খবর পেয়ে তাঁরা অগ্নিতে আত্মাহুতি দিতেন। ক্ষমতা আর ঐশ্বর্যের প্রলোভনে পড়ে এইভাবে শত্রুর অঙ্কশায়িনী হতেন না। (বিশ্বস্ত অনুচর মারফত রাজঅন্তঃপুরের খবরও চন্দ্রবর্মা নিয়েছিলেন)। চন্দ্রবর্মা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। পথের ধারের ঘাসফুলেও কখনো কখনো এতখানি সহজাত স্নিগ্ধতা থাকে যে, বাগানের সযত্নলালিত গোলাপের রূপও আরোপিত বলে বোধ হয়। তথাপি সেই ঘাসফুল তুলে এনে ঘর সাজানো যায় না। চাইলেও যায় না।

সেই রাত্তিরে চন্দ্রবর্মার অনেকক্ষণ ঘুম এলো না। তাঁর ঠিকভুলে ভর্তি অতীত, জাপটে-ধরে রাখতে চাওয়া বর্তমান এবং অনিশ্চিত ও অনাগত ভবিষ্যৎ রাজার বন্ধ চোখের পাতার নীচে একের পর এক মঞ্চদৃশ্যের অনুষ্ঠান করে যেতে লাগলো। মহারাজ কাঠের চৌকির ওপর পাতা আরামহীন বিছানায় শুয়ে বারবার এপাশ ওপাশ করতে করতে, একসময় তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়লেন।
কতক্ষণ পর পায়ের ওপর উষ্ণ স্পর্শে তাঁর ঘুম ভাঙলো। তিনি নিঃশব্দে উঠে বসলেন। কুটিরের মধ্যে তখন তরল অন্ধকার। কুটিরের একমাত্র প্রদীপ হৃদয়ের সমস্ত তৈলসুধা উজাড় করে একাকী জ্বলতে জ্বলতে কখন যেন নির্বাপিত হয়ে গেছে।
চন্দ্রবর্মা ডাকলেন, “অনসূয়া!”
রাজার পায়ের ওপর এতক্ষণ যে মাথাটি উপুড় হয়ে পড়েছিল, অন্ধকারে রাজার কণ্ঠ পেয়ে তা এখন সোজা হল। তারপর ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালো। বললো, “মহারাজ, আমাকে ক্ষমা করুন। আপনার নিদ্রার ব্যাঘাত ঘটাতে আমি চাই নি। কেবল… ” অনসূয়া চুপ করে গেল।
চন্দ্রবর্মা বললেন, “কেবল কী? বলো?”
“আমি আসি মহারাজ। আপনি নিদ্রা যান।” অনসূয়া চলে যেতে উদ্যত হল।
“দাঁড়াও।” চন্দ্রবর্মা ততক্ষণে চৌকির থেকে নেমে দাঁড়িয়েছেন। অনসূয়ার গমনোদ্যত চরণযুগল চন্দ্রবর্মার ডাকে কুটিরের দ্বারের নিকটে এসে থেমে গিয়েছে। মহারাজ ক্ষীণ নক্ষত্রালোকে হেঁটে, অনুসূয়ার সম্মুখে দাঁড়ালেন। তারপর নিজের দুইটি হাতের মধ্যে অনসূয়ার নরম উষ্ণ কপোলদুটি নিয়ে কোমল কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন, “অনসূয়া, তুমি কাঁদছো?”
ভেঙে গেল। এতগুলো দিন ধরে যে দৃঢ়তার রজ্জু দিয়ে বেঁধে, অনসূয়া নিজের হৃদয়াবেগ বক্ষের শক্ত প্রাকারে লুক্কায়িত করে রেখেছিল, আজ এই রাত্রির শেষ প্রহরে চন্দ্রবর্মার সামান্য স্পর্শে সেই রজ্জুবন্ধন, সেই প্রাকারবেষ্টন- ভেঙে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেল। অনসূয়া এই অন্ধকারেও তার ক্রন্দনসিক্ত মুখটি রাজার সম্মুখে রাখতে পারলো না। চন্দ্রবর্মার প্রশস্ত বক্ষের বেষ্টনে ধরা দিয়ে সে অঝোরে অশ্রুপাত করতে লাগলো। রাজাও তাঁর পুরুষ্টু বাহুর আবর্তে অনসূয়ার সমস্ত কান্না নিংড়ে নিতে আরম্ভ করলেন।
সেই বাহুবেষ্টনে, রাজার প্রাণস্পন্দনে কান পেতে, তাঁর শরীরের পুরুষালী সৌরভে মাতোয়ারা হয়ে, অনসূয়া নিজেকে দুষতে লাগল। কী কুক্ষণে রাত্রির শেষ প্রহরে চন্দ্রবর্মাকে একবার কাছ থেকে দেখার সাধ হয়েছিল তার! কোন দুর্বুদ্ধিতে ঘুমন্ত রাজাকে দেখেই সে চলে যায় নি! কীসের প্রলোভনে একবার, সেই প্রথম দিনের পরে শেষবারের মতো রাজাকে স্পর্শ করার বাসনা হয়েছিল তার! হায়! যে বন্ধন থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখার জন্যে তার এত অভিনয়, এত দৃঢ়তা, আজ চন্দ্রবর্মার নিজের দুইখানি বাহু দিয়ে অনসূয়ার শরীরের চারিদিকে সেই বন্ধনই এঁটে দিলেন। এই বন্ধন থেকে সে কি আর কোনোদিন মুক্তি পাবে?
কতক্ষণ এইভাবে কেটেছিল, ওরা জানে না। অনসূয়ার ক্রন্দনবেগ স্তিমিত হয়ে এসেছিল। রাজার হৃদস্পন্দন ক্রমশ শান্ত হয়ে গিয়েছিল। ওরা দুইজন পূর্ব আকাশে শুকতারা জেগে ওঠার আগে অবধি এক দেহ এক প্রাণ হয়ে, কুটিরের শীতল ভূমির ওপর শুয়ে, রাত্রি জেগে ছিল। পাথরের দেবতার নিকট জীবন উৎসর্গ করা এক দেবদাসী এই প্রথমবার হৃদয়ের দেবতার সমীপে শরীর নিবেদন করতে সমর্থ হলো। দেবমন্দিরের বহুভোগ্যা দেবদাসীদের কয়জনের ভাগ্যে এমন রাত্রি আসে!


সেবারে বিদ্রোহী প্রজাদের সহযোগিতায় চন্দ্রবর্মা সহজেই তাঁর রাজসিংহাসন পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছিলেন। কিছুকাল পরে তিনি অনুচর পাঠিয়ে বনমাঝের সেই দেবমন্দিরের প্রভূত সংস্কারের ব্যবস্থাও করে দিয়েছিলেন। কিন্তু মন্দিরে তিনি আর কোনোদিনই ফেরেন নি। ঐশ্বর্যবান মানুষ কখনোই তার পুরাতন অসহায়তার দিনগুলিকে স্মরণ করতে চায় না।
আর অনসূয়া? সে পরমভট্টারক শ্রীমন্মহারাজ চন্দ্রবর্মার দাক্ষিণ্যে পুনরায় বিখ্যাত হয়ে ওঠা মহামায়া-মহেশ্বর মন্দিরের খ্যাতনামা দেবদাসীতে পরিণত হয়েছিল। কিন্তু সেই রাতে রাজ্যহীন চন্দ্রবর্মা তাকে যে বন্ধনে বেঁধে গিয়েছিলেন, সেই বন্ধন থেকে কোনোকালেই তার মুক্তি ঘটে নি। যতদিন সে দেবদাসী ছিল, ততদিন নৃত্যের পরিভাষায়, নূপুরের ছন্দে জগজ্জননীর নিকট একটিই প্রার্থনা করে গেছে, ‘জননী, মুক্তি দাও।

পল্টু ঠিক করেছে, শ্রাবণীকে ও বিয়ে করবে তারপর বিয়ের পর চাঁদে হানিমুন করতে যাবে. একশো বছর পরের পৃথিবীর কথা তো, তখনকার পৃথিবীতে হানিমুন করতে চাঁদে যাওয়া তেমন কোন বড়ো কথা নয়. খরচ একটু বেশি হবে, এই যা. পল্টু হিসাব করে দেখল, সব মিলিয়ে যা খরচ হবে তাতে ওর BANK BALANCE টা অর্ধেক হয়ে যাবে.

শ্রাবনীকে ও বলেছে, চাঁদে যাওয়ার কথা, শ্রাবনী তো আনন্দে উৎফুল্ল. হানিমুন করতে চাঁদে যাওয়া তো সবার ভাগ্যে জোটে না.
পল্টুর বাবা সব শুনে মুখটা হাড়ির মতো করে বলল, “এসব ছাড়ো, ব্যবসায় মন দাও.”
পল্টুর মা মুখটা বাংলার পাঁচের মতো করে বলল, “বিয়ে করে সংসার করবে, তা না হানিমুন করতে চাঁদে যাবে.”
যে যাই বলুক না কেন, পল্টু যখন ঠিক করে ফেলেছে চাঁদে যাবে তো চাঁদে যাবেই. কে কি বলল তাতে কিছু যায় আসে না ওর.
চাঁদে যাওয়ার জন্য প্রথমে VISA নিতে হবে. সেইজন্য শ্রাবনীকে সঙ্গে করে নিয়ে যেতে হবে. VISA পেতে কোন অসুবিধা হবে না. পল্টু সব ঠিক করে রেখেছে. চাঁদে তো ওরা PERMANENT ভাবে থাকতে চাইছে না. দুই মাস থেকে হানিমুন কাটিয়ে চলে আসবে.
তবে চাঁদ যদি খুব ভালো লেগে যায়, শ্রাবনী যদি চাঁদ থেকে আসতে না চায়, চাঁদে যদি ভালো একটা কাজ পাওয়া যায়, তবে অন্য কথা. নয়তো পল্টু শ্রাবনীকে নিয়ে চাঁদে দুমাস হানিমুন কাটিয়ে ফিরে আসবে.
চাঁদে যাওয়ার আগে পল্টু ও শ্রাবনী, দুজনেরই MEDICAL TEST করাতে হবে.

তারপর সাতদিন চলবে TRAINING, সেখানে সবকিছু শেখানো হবে, যাতে চাঁদে গিয়ে ওদের কোন অসুবিধা হবে না হয়.
চাঁদে মধ্যাকর্ষণ শক্তি পৃথিবীর ছয়ভাগের এক ভাগ. তাই ওখানে পল্টু আর শ্রাবনী কত জোরে দৌড়োতে পারবে, কত উঁচুতে লাফ দিতে পারবে, যখন ওরা চাঁদ থেকে পৃথিবীকে দেখবে, তখন কেমন লাগবে. ভাবতেই গা টা শিরশির করে উঠল পল্টুর. চাঁদে ওরা কত মজা করবে. চাঁদে বাতাস নেই তাই ওখানে ইথার-তরঙ্গের মাধ্যমে কথা বলতে হয়. মানে দুজনেরই কানে ফোন লাগানো থাকবে. তাই কোন অসুবিধে হবে না.
হোটেলের রুমগুলিতে অবশ্য ঠাসা-ঠাসা করে বাতাস ভর্তি করা আছে. সকাল সন্ধ্যায় সেই বাতাস পরিশোধন ও করা হয়. রুম গুলোর মধ্যে টবে অদ্ভুত-অদ্ভুত সব গাছ লাগানো থাকে. তাই সব সময় বিশুদ্ধ বাতাস পাওয়া যায়.
পল্টু TOURISM বিভাগে গিয়ে খোঁজ নিয়ে দেখেছে চাঁদে পাঁচ তারা, সাত তারা আর সতেরো তারা এই তিন ধরনের হোটেল আছে. পল্টু একটা পাঁচ তারা হোটেলের একটা রুম বুক করল.
পল্টু আর শ্রাবনী যখন চাঁদের মাটিতে পা দেবে, সঙ্গে সঙ্গে ওই হোটেলের লোকজনেরা ফুলের মালা নিয়ে ছুটে আসবে. তারপর কত আদর করে ওদের হোটেলে নিয়ে যাবে.
কিন্তু সবার আগে আজকে শ্রাবনীর বাড়ি যেতে হবে. শ্রাবনীকে সঙ্গে করে নিয়ে VISA অফিসে যেতে হবে.
পল্টু শ্রাবনীর বাড়ির কলিংবেল টিপলো, এমন সময় হঠাৎ পল্টুকে কে যেন পেছন থেকে একটা ধাক্কা মারলো. পল্টু তাড়াতাড়ি বিছানা থেকে উঠল. এতক্ষণ ও স্বপ্ন দেখছিল. সামনে মা দাঁড়িয়ে. পল্টু মার ওপর কপট রাগ দেখিয়ে বলল, “মা দিলে তো এত সুন্দর একটা স্বপ্ন ভাঙিয়ে. কি সুন্দর একশো বছর পরের পৃথিবীতে আমি শ্রাবনী কে বিয়ে করে হানিমুন করতে চাঁদে যাওয়ার প্ল্যান করছিলাম.

মা হেসে ফেলল, বলল, “শ্রাবনী ড্রইংরুমে অনেকক্ষণ ধরে তোমার জন্য WAITকরছে. তোমাদের আজকে নাকি নন্দনে মুভি দেখতে যাওয়ার কথা ছিল”.

পল্টু মাথায় হাত দিল, ইস একদম ভুলে গেছি. কেন যে দুপুর বেলায় ভাত খাওয়ার পর ঘুমিয়ে পড়ল.
পল্টু উঁকি মেরে দেখতে পেল, শ্রাবনী ড্রইংরুমে মুখ গোমড়া করে বসে আছে. আজকে পল্টুর কপালে চাঁদ না থাকলেও শনি অবশ্যই আছে.

error: