“-মামনি আসছি।Late হয়ে গেল গো।
-সাবধানে যাস।মাথা ঠান্ডা রাখিস।একদম ভয় পাসনা।”
অবনীশ আর ওলি বেরিয়ে যাবার পর দরজাটা ভেজিয়ে ওলির ঘরে এল শ্রীতমা।ভেজা চোখে ওলি আর সমুর ফটোটার দিকে একদৃষ্টে চেয়ে রইল কতক্ষন।সেই তো কয়েকমাস মাত্র বিয়ে হয়ে এসেছিল মেয়েটা।হাসিখুশি,প্রানবন্ত,ছটফটে।সারাদিন মাতিয়ে রাখতো।বোঝাই যেত না সে এবাড়ির নতুন বউ।হঠাৎ ঝড়ে সবকিছু কেমন এলোমেলো হয়ে গেল।রোড এক্সিডেন্টে ছেলেটা চলে গেল।আর সেই থেকে প্রানবন্ত ওলি পরিনত হল নিষ্প্রাণ পাথরে।
“-আমাদের সাথে ফিরে চল ওলি।তোর এখনও সারাটা জীবন পড়ে আছে।নতুন করে আবার সব শুরু করবি।
-তোমরা ফিরে যাও বাবা।সমু তো ফাঁকি দিয়ে দায়িত্বমুক্ত হয়ে গেছে।এবার আমাকে আমার দায়িত্ব পালন করতে দাও।সমু তো চলেই গেছে।আমিও যদি ফিরে যাই ওই মানুষদুটো কি নিয়ে থাকবে বলতো?”
কত চেষ্টা করেছিল ওলির বাবা-মা মেয়েকে ফেরৎ নিয়ে যেতে।নাঃ ওলি যায়নি।থেকে গেছিলো এই বাড়িতেই।কত লোক কত কথা বলেছিল।কারও কথাই কানে তোলেনি সে।সেই থেকে মেয়েটাকে আগলে আগলে রেখেছে শ্রীতমা আর অবনীশ।
“-ওই মেয়েকে আর বাড়িতে রাখিসনা দাদা।অলক্ষী একটা।ওর পাপেই আমাদের সমু চলে গেল।
-এসব কথা এবাড়িতে যেন আর কখনও না শুনি।জন্ম-মৃত্যু কারো হাতেই নেই।সমুর এক্সিডেন্টটা হবার ছিল তাই হয়েছে।খামোখা ওলিকে দোষী করিসনা।এইটুকু বয়সে কম ঝড়ঝাপটা যাচ্ছেনা মেয়েটার উপর।ওকে নিয়ে তোদের আর না ভাবলেও চলবে।ওলির এবাড়িতে থাকা নিয়ে তোদের যদি কোনোরকম সমস্যা থাকে তাহলে তোরা চাইলে না আসতে পারিস এখানে।”
দৃঢ় গলায় নিজের বোনকে কথাগুলো বলে ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করল অবনীশ।একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে সে পাথর।তবুও ওই একরত্তি মেয়েটার উপর কোনো ঝড়ের আঁচ আসতে দেবে না সে।বিদ্ধস্ত শ্রীকেও বারবার বুঝিয়েছিল ছেলের মৃত্যুটা নেহাতই একটা এক্সিডেন্ট।এতে ওলির লক্ষী-অলক্ষী হওয়া বা পাপ-পুণ্যের কোনো যোগ নেই।
সময় আস্তে আস্তে সব ক্ষত শুকিয়ে দিয়েছিল।শ্রীতমা আস্তে আস্তে ছেলের শোক অনেকটাই কাটিয়ে উঠেছিল।নিজেদের মত করে গুছিয়ে উঠছিল তিনটে মানুষই।শুধু সবার মুখ থেকে হাসিগুলো মুছে গিয়েছিল।
“-ওলি তুই তো পড়াশুনাটা আবার শুরু করতে পারিস।সময়ও আছে হাতে।মনটাও ভালো থাকবে।আমাদেরও ভালো লাগবে রে।”
অবনীশের কথা শুনে ওলি কিছু বললো না।শুধু একবার তাকালো শ্রীএর দিকে।
“-আমরা দুজনে মিলেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি রে।সমু তো আর ফিরবে না।তুইই বা কেন এমন থেমে থাকবি? নতুন করে সবকিছু শুরু কর ওলি।তোকে সুখি দেখতে চাই আমরা।প্রতিষ্ঠিত হ জীবনে।তুই ভালো থাকলে আমরাও ভালো থাকবো।”
শ্রীতমার কথাগুলো শুনে আর থেমে থাকতে পারলো না ওলি।এতদিনের জমানো কান্নাগুলো বাঁধ ভাঙলো সেদিন।নিজেকে সামলে নিতে দুটো দিন সময় নিয়েছিল সে।
“-বাপি নতুন করে শুরু করতে চাই আমি।”
সেদিন রাত্রে খাবার টেবিলে অবনীশকে বলেছিল ওলি।
“-আমরা এরকম একটা সিদ্ধান্তই তোর কাছ থেকে আশা করেছিলাম ওলি।আমি কালই খোঁজখবর নিচ্ছি।”
সবকিছু নতুনভাবে শুরু করার কথা বললেও ভেতরে ভেতরে ওলি ভীষন নার্ভাসই ছিল।নিজেকে বারবার প্রশ্ন করেছিল সত্যিই পারবে তো মানুষদুটোর ইচ্ছের দাম দিতে?চাকরির পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য অবিনাশ ওলিকে একটা কোচিং সেন্টারে ভর্তি করে দিয়েছিল।একটা একটা করে দিন পেরোচ্ছিল আর তিনটে মানুষ নিজেদের মত করে নিজের সাথেই লড়াই চালিয়ে যাচ্ছিল।সমুর স্মৃতিগুলো আস্তে আস্তে ধূসর হয়ে আসছিল ওলির কাছে।ওর তখন একটাই লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছিল যেভাবেই হোক নিজের সাথে এই লড়াইতে ওকে জিততেই হবে।একদিকে এই সব হারানো মানুষদুটো আর একদিকে ওর লক্ষ্য এই দুইয়ের মাঝেই নিজেকে বিলীন করে দিয়েছিল ওলি।
মাঝে বেশ কয়েকবার ওলির বাবা-মা এসে মেয়েকে বোঝানোর চেষ্টা করেছিল সব ভুলে আবার বিয়ে করে সংসার শুরু করতে।অবনীশ আর শ্রীতমাও একপ্রকার বাধ্য হয়েই ওনাদের কথায় সায় দিয়েছিল।কিন্তু ওলি নিজের সিদ্ধান্তে অনড়।দৃপ্তভাবে জানিয়েছিল সে এই বাড়ি ছেড়ে কোথাও যাবে না।একে একে চাকরির পরীক্ষাগুলোয় বসতে লাগলো।একটার পর একটা পরীক্ষা দেবার পর একদিন খুশির খবর এলো বাড়িতে।ওলি একটি সরকারি দপ্তরে জয়েন করলো।অবিনাশ আর শ্রীতমা একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো।যাক মেয়েটাকে এবার আস্তে আস্তে জীবনের মূলস্রোতে ফিরিয়ে আনা যাবে।অতীতের ক্ষতগুলো সবারই মন থেকে আস্তে আস্তে মুছে যেতে লাগলো।
সকাল হলেই শ্রী এর আবার সেই রান্নাঘরে তাড়াহুড়ো শুরু।ওলি ঠিক ন’টায় বাড়ি থেকে বেরোয় অফিসের জন্য।
কোনোরকমে চারটি নাকে মুখে গুঁজেই দৌড় দেয় সে।শ্রী খাবার নিয়ে বাচ্চাদের মত বকতে থাকে ওলিকে,ঠিক যেমন সমুর বেলায় করতো।কে বলবে ওলি একসময় এবাড়ির বউ হয়ে এসেছিল! এখন তো সে ওদের মেয়েই হয়ে উঠেছে।
“-একটু তো সাজগোজ করতে পারিস এখন ওলি।বাইরে বেরোচ্ছিস,পাঁচজনের সাথে মিশছিস।কেমন যেন বিবর্ন দেখায় রে তোকে।
“-সব রং তো তোমার ছেলে সাথে নিয়ে চলে গেল মামনি।তাছাড়া আমার ভালো লাগেনা বেশি সাজতে।এই বেশ ভালো আছি।”
কথাটা শ্রীকে বলে ওলি নিজেই একটু অপ্রস্তুতে পড়ে গেল।ইসস্ কেন যে সমুর কথা তুলতে গেল এখন।বেশ তো ওরা নিজেদের জগৎ গড়ে নিয়েছে।
ছেলের কথায় মনটা একটু ভিজে উঠলেও বাইরে তা প্রকাশ করলো না শ্রী।নিজের আলমারী থেকে একটা আকাশনীল রংয়ের শাড়ি নিয়ে এসে ওলির হাতে ধরিয়ে দিল সে।
“-আজ তুই এটা পরেই বেরোবি ওলি।কোনো কথা শুনবো না আমি।
-মামনি আমি অফিসে যাচ্ছি,কোনো পার্টিতে যাচ্ছিনা।তুমি তুলে রাখো শাড়িটা।
-না আমি কিছুই শুনবো না।আজ তুই এটা পরেই যাবি ব্যাস।”
অগত্যা শ্রীয়ের জেদের কাছে হার মেনে ওলি ওই শাড়িটাই পরলো।আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে যেন আবার সেই কয়েকবছর আগের ওলিকে খুঁজে পেলো।এই কয়েকটা বছর নিজেকে ওই ফ্যাকাসে রংগুলোতে দেখতে দেখতে নিজের মনটাকেও বিবর্ন করে তুলেছিল সে।আজ যেন ওলি নিজেকে নয়,নতুন কাউকে দেখছে আয়নায়।
মেঘের অবস্থা আজ খুব একটা ভালো ঠেকছে না।বাড়ি ফিরতে ফিরতে নির্ঘাত কাকভেজা হয়ে যাবে।এইসব ভাবতে ভাবতেই অফিস থেকে বেরিয়ে বাসস্টপের দিকে এগোতে লাগলো ওলি।কয়েক পা এগোতেই ঝমঝম করে বৃষ্টি নামলো।ছুটে গিয়ে পাশের চা দোকানে আশ্রয় নিল সে।একবার আড়চোখে ভালো করে দেখে নিল আশেপাশের লোকগুলোকে।নাঃ অফিসের চেনা কাউকে চোখে পড়লোনা তার।এমনিতেই কারো সাথে খুব একটা মেশে না সে।বাইরে সামান্য ভদ্রতা দেখিয়ে চললেও ভেতরে ভেতরে একটা নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখেই চলে সে।
“-চা টা খুব একটা মন্দ নয় ম্যাডাম।এই ওয়েদারে এক কাপ খেয়ে দেখতে পারেন।ভালোই লাগবে।”
কথাটা শুনতে পেয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলো ওদের অফিসেই নতুন জয়েন করা ছেলেটা,ঋদ্ধি না কি যেন নাম,বসে আছে দোকানের ভেতর।হাতে চা এর গ্লাস।
ভদ্রতাবসত মুখে একটু হাসি এনে ওলি বললো,
“-থ্যাঙ্ক ইউ।আমি চা পছন্দ করি না।
-আপনার যা ইচ্ছে।”
নিজের চায়ের গ্লাসে মন দিল ঋদ্ধি।
এরপর থেকে অফিসে চোখাচোখি হলেই দুজনের মধ্যে ভদ্রতাস্বরূপ হাসি বিনিময় হতো।দু-একটা টুকটাক কেজো কথা ছাড়া আর কোনো কথা হত না তাদের।আসলে ওলি নিজেকে নিজের একটা নির্দিষ্ট গন্ডির মধ্যে বেঁধে ফেলেছিল।সমুর স্মৃতির পাতাতে ধূলো জমলেও নিজের অতীতের অস্তিত্বে কখনও ধূলো জমতে দেয়নি সে।
কয়েকদিন ধরেই ওলির শরীরটা ভালো যাচ্ছেনা।বর্ষা নামলেও ভ্যাপসা গরমে সবারই নাজেহাল অবস্থা।রোদে-গরমে ডেলি প্যাসেন্জারি করে করে ওলির শরীর আর টানছিল না।সেদিন অফিসে এসে শরীরের অবস্থা বেগতিক দেখে একটু তাড়াতাড়িই বেরিয়েছিল অফিস থেকে।বেরিয়েই পড়লো মহাবিপদে।আবার সেই ঝমঝম বৃষ্টি শুরু ।ভাগ্যিস ঋদ্ধিটা ছিল সেদিন।ওলির শরীরের অবস্থা দেখে ওলির থেকে অবনীশবাবুর নম্বরটা নিয়ে ফোন করে বলেছিল ওলির কথা।ডেকেছিল অফিসের সামনে।কিছুক্ষনপর অবনীশ এসে ওলিকে বাড়ি নিয়ে যায়।
সেদিনের পর থেকে আস্তে আস্তে ওদের মধ্যে একটা বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে।প্রানচঞ্চল ছেলেটা সবসময় অফিসে মাতিয়ে রাখতো সবাইকে।ওদের মধ্যেকার “আপনি”টা ” তুই”তে নেমে আসতে বেশি সময় নেয়নি।ঋদ্ধিকে বন্ধু হিসেবে পেয়ে ওলিও যেন একটুকরো আকাশ খুঁজে পেয়েছিল।বন্ধুত্ব ক্রমাগত দানা বাঁধছিলো।
“-আচ্ছা ওলি আমরা ঠিক কেমন বন্ধু বলতো?
-কি সব বলছিস! মাথাটা গেছে নাকি?কেমন আবার! বন্ধু যেমন হয় ঠিক তেমনই বন্ধু।
-আমার মাথা ঠিকই আছে।তোর বুদ্ধির দৌড় চেক করছিলাম একটু।” বলেই হো হো করে হাসতে লাগলো ঋদ্ধি।
ওলি মুখে কিছু না বললেও ঋদ্ধির চোখের ভাষা পড়তে ভুল করেনি।আর সেটা ভেবেই ভেতরে ভেতরে এক অজানা আশঙ্কায় রীতিমত ঘামছিল সে।
“-শোন আজ একটু তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরতে হবে রে।মামনিকে নিয়ে বেরবো একটু।
-যাঃ! চা খাবিনা তাহলে?
-না রে আজ একটু তাড়া আছে।অন্যদিন খাব।”
বলেই দ্রুত অফিস থেকে বেরিয়ে বাড়ি এলো ওলি।
“-কি রে আজ এত শুকনো লাগছে কেন তোকে? শরীর ঠিক আছে তো?
-হ্যাঁ মামনি।মাথাটা একটু ধরেছে।ঠিক হয়ে যাবে।”
হাতে চায়ের কাপ নিয়ে অবনীশের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলো ওলি।অবনীশ ফিরতেই তাকে ঋদ্ধির কথা আর ওর নিজের আশঙ্কার কথা বললো।
“-নিজেকে আড়াল করে সমস্যা সমাধান করা যায়না ওলি।তুই ঋদ্ধির সাথে কথা বল।ওকে সবটা জানা।সব জানার পর দেখ ও কি বলে।নিজেকেও তুই একটু ভালোভাবে বোঝার সুযোগ দে।জীবনটা ছোটো নয় ওলি।আমরা আর ক’দিন।তোর ভয়েই কোনোদিন মুখ ফুটে এসব বলতে পারিনি।আজ যখন কথা উঠলো তখন জানিয়ে রাখি,তোকে আমরা নিজের মেয়েই মানি।তোর নতুন জীবন শুরু হলে আমরা খুব খুশি হব রে।”
এসব শুনে ওলি পড়লো আরেক ভাবনায়।ও তো যাতে বন্ধুত্বটা রাখতে পারে সেই বিষয়ে পরামর্শ চেয়েছিল বাপির কাছে।বাপি এসব কি বলে গেল।
বেশ ক’দিন এড়িয়ে চলার পর একদিন ঋদ্ধির সামনাসামনি পড়লো ওলি।
“-তোর কি হয়েছে রে? ক’দিনই দেখছি এড়িয়ে চলছিস।
-কই কিছু না তো।এমনিই অফসের স্ট্রেস এত বেশি…”
না আর কিছু বলতে দেয়নি ঋদ্ধি।হাত ধরে সোজা টেনে নিয়ে গেছিলো ওদের সেই চায়ের আড্ডার দোকানে।নিঃসংকোচে ওলি ওর অতীতের সবটা বলেছিল।শেষে জানতে চেয়েছিল এরপরও ঋদ্ধি ওদের বন্ধুত্বটা রাখতে চায় কিনা।ওলিকে অবাক করে দিয়ে ঋদ্ধি জানালো যে সে সবকিছু অনেক আগেই জেনেছে।আর সবটা জানার পর ওলির প্রতি ওর শ্রদ্ধা অনেকগুন বেড়ে গেছে।এবার ওলি যদি চায় তাহলে ওদের বন্ধুত্বটা একধাপ এগোতে পারে।
বরাবর confused ওলি এবারও কয়েকদিন সময় নিয়েছিলো নিজেকে জানতে।সেই সাথে বাপি-মামনিকেও সবটা জানিয়েছিল।
“-জীবন যখন আবার একবার সুযোগ দিয়েছে আর নিজেকে সবকিছু থেকে বঞ্চিত রাখিসনা।বিশ্বাস রাখতে শিখ নিজের উপর।
-কিন্তু আমি যে অন্যভাবে নিজেকে গুছিয়ে নিয়েছি বাপি।আমাদের এই তিনজনের জগতে আর কাউকে চাইনা আমি।”
-তোকে জোর করবোনা আমরা।শুধু বলবো বাইরের এই শক্ত আবরনটা ছেড়ে একটু নরম মনটা দিয়ে বিবেচনা করিস।ঋদ্ধি নিঃসন্দেহে ভালো ছেলে,তাই সবটা জানার পরও নির্দ্বিধায় জীবনের এত বড় সিদ্ধান্তে তোকে পাশে চেয়েছে।এবার তুই কি feel করিস সেটা নিজেকেই বুঝে উঠতে হবে।আমরা আমাদের মতামত জানালাম ওলি।কিন্তু নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত তোকে নিজেকেই নিতে হবে।তুই যা ই সিদ্ধান্ত নিস না কেন আমদের তোর পাশে পাবি।”
নাঃ আর থেমে থাকেনি।অনেক দ্বিধা-দ্বন্দ কাটিয়ে,নিজের সাথে অনেক লড়াই করে শেষে নিজেকে আর একবার সুযোগ দিয়েছিল ওলি।সাড়া দিয়েছিল ঋদ্ধির ডাকে।অবনীশও আর দেরী করেনি।ওলির মা-বাবাকে জানিয়ে তাদের অনুমতি নিয়ে কন্যাদানটা নিজেই সেরেছিল এই বাড়িতেই।হাসিমুখে কনকাঞ্জলি নিয়ে ওলিকে ঋদ্ধির হাতে তুলে দিয়েছিল শ্রীতমা।

আবর্তনই জীবনের নিয়ম।এভাবেই নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছিল ওদের সবার জীবনে। এভাবেই এগিয়ে চলুক “ঋদ্ধি-ওলি” রা।

-মে আই কাম ইন স্যার?।
-ইয়েস কাম ইন…
ভেতরে ঢুকেই চমকে গেল অন্তরা!
টেবিলের ওপাশে অনিকের চোখ কম্পিউটার স্ক্রিনে থাকায় এখনও দেখেনি অন্তরাকে!চোখ তুলতেই সামনে যেন ভূত দেখার মত দেখে অন্তরাকে!
তৎক্ষণাত সামলে নিয়ে বলে প্লিজ হাভ ইয়োর সিট।
পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার জন্য বলে ‘তু-তুমি এখানে!’
অন্তরা বলে, ‘হ্যাঁ।’
-যাইহোক তোমার শুধু ডিগ্রিটা বলো বাকিটা আমি দেখব…
– কম্পিউটার সায়েন্স এ গ্রাজুয়েশন।
-আজ কত্তদিন পর দেখা! তাও ইন্টারভিউ এ!
-হ্যাঁ ৬-৭ বছর পর তো হবেই।আর কিছু জিজ্ঞাসার নেই আপাতত তোমাকে।বাকিটা আমি দেখছি। আচ্ছা অন্তরা আরও কিছু ক্যান্ডিডেট আছে,ওদের ডাকতে হবে। তুমি অফিসের লাউঞ্জে অপেক্ষা কর ৩০ মিনিট পর আসছি। এত্তদিন পর দেখা, অনেক গল্প হবে।
“ঠিক আছে”, বলে বেরিয়ে যায় অন্তরা।
অনিকের স্কুলের ১ বছরের জুনিয়র ছিল অন্তরা। এইচ.এস এর পর অনিকের বাবার রিটায়ারমেন্টের পর অনিকরা ফিরে আসে তাদের দুর্গাপুরের বাড়িতে।তারপর অনিক ভর্তি হয় দুর্গাপুরের কলেজেই।
সব ইন্টারভিউ শেষ করে অনিক গেল লাউঞ্জে।ইশারায় বাইরে ডেকে নিল অন্তরা কে। জিজ্ঞেস করল, “কিছুক্ষণ সময় হবে?”
হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়তেই অন্তরাকে নিয়ে গেল পাশেই এক্সাইড হলদিরামে।
মনোমত একটা টেবিল নিয়ে বসতেই অন্তরা জিজ্ঞেস করল, “তাহলে তুমিই এই কোম্পানির সিনিয়র এক্সিকিউটিভ অফিসার?”
অনিক সহাস্য জবাব দেয়, “তাই তো মনে হচ্ছে!
যাই হোক তোমার কথা বলো,তোমার মার্কস তো অনেক ভালো আছে দেখলাম, এতদিনে তোমার তো অনেক ভালো পজিশনে থাকার কথা!”
একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে অন্তরা বলল, “সেসব বলছি, আগে তোমার কথা শুনি।” কফিতে চুমুক দিতে দিতে অনিক বলতে শুরু করে, “আমার তেমন কিছু নেই, কি আর বলব! এমবিএ করেছি তারপর এই কোম্পানি জয়েন করি। কিছুদিন কাজ করার পর সিইও আমার কাজে খুশি হয়ে প্রোমোশন দেয় এই পোস্টে।”
কথা শেষ হতে না হতেই অন্তরা বলে, “ফ্যামিলির কি খবর?”
অনিক জানায় সবাই ভালো, ছোটো ভাই আইআইটি কানপুরে আছে, দিদির বিয়ে হয়েছে আর্মি অফিসারের সাথে।
“আর তোমার ওয়াইফ?”, জিজ্ঞেস করে অন্তরা।
সহাস্য জবাব অনিকের, “আরে ধুর!এখনও ওসব বিয়েটিয়ে করার বয়স হয়নি।” লাজুক ভাবে তাকায় অনিক।
অন্তরা বরাবরই স্পষ্টভাবে কথা বলতে পছন্দ করে, হঠাৎই তাকে জিজ্ঞেস করে, “আচ্ছা অনিকদা আমি তো তোমাকে পছন্দ করতাম, আমার বন্ধু সুমিত তোমাকে সম্ভবত সেকথা জানিয়ে দেয়। তুমি আমাকে কিছু জানাওনি কেন?” এই প্রশ্নটার জন্য তৈরী ছিলনা অনিক।বলে, “আসলে আমি সত্যি বলতে বরাবরই পড়ায় সিরিয়াস ছাত্র ছিলাম,তাই সেই মুহূর্তে কিছুতে জড়াতে চাইনি,তাছাড়া বাবার ভয়তো ছিলই।আর তখন কিছুতে জড়ালে এইচএসে জেলায় প্রথম হওয়া হতনা, তাইনা!”
লাজুকভাবে জবাব গুলো দেয় অনিক।
তারপর বলে, “ছাড়ো সেসব কথা।তুমি সামনের সোমবার থেকে অফিস জয়েন করো।তার মাঝে নিয়মরক্ষার একটা ফোন যাবে আমাদের অফিস থেকে।” কথাটা যেন নিজের কানেও বিশ্বাস করতে পারছে না অন্তরা।কিছুক্ষণ চুপচাপ থাকার পর বলে, “সত্যিই এবার আমি পাচ্ছি চাকরিটা?” অন্তরাকে থামিয়ে অনিক বলে, “আরে!আমি যখন বলছি তার মানে হবেই হবে।”
-কি বলে যে ধন্যবাদ দেবো তোমাকে…
কথাটার রেশ কাটার আগেই অনিক বলে, “ওসব ফর্মালিটির কোনো দরকার নেয় তো!এটা আমার কর্তব্য। তাছাড়া তোমার যা সিভি দেখলাম তাতে তুমি এর থেকে ভালো জব ডিসার্ভ করো,আমি তোমাকে তোমার যোগ্যতায় দিচ্ছি, সুতরাং এটা মনে করবে না আমি কৃপা করছি।” বলেই হাতঘড়িটার দিকে তাকায় অনিক, “আজ আর বসা যাবে না মনে হচ্ছে। উঠতে হবে,তোমারও বাড়ি ফেরা দরকার। তাহলে এবার! আগামী সোমবার থেকে আমরা এক অফিসের কলিগ, আর টিফিন ব্রেকে খাবার শেয়ারের বন্ধু”, বলে হেসে ওঠে অনিক, সঙ্গে অন্তরাও।তারপর ফেরার বাসে তুলে বেশ কিছু পুরোনো কথা মনের চোখের সামনে ভেসে উঠে, সেদিনের খলনায়ক সুমিতের জন্যই অন্তরা জানতে পারেনি আসল কথা।পরে অনিক জানতে পারে সুমিতই অন্তরাকে পছন্দ করত। সেই সব বলার বা জানানোর সময় এখন নয়, কিন্তু সব কথা বলতেও আর হয়ত বেশি দেরী নেয় এইসব ভাবতে ভাবতে নিজের অজান্তেই একটু মুচকি হেসে ফেলে সে।
।ক্যাবিনে ঢুকে অন্তরা সিভির পেছনে লেখা ফোন নংটা সেভ করে নেয়। ফ্ল্যাটে ফিরে ভাবে একবার ফোন করলে মন্দ হয়না অন্তরা কে।কিন্তু দোটানায় পড়ে যায়। শেষমেশ ডায়েল করেও কেটে দেয়। দুদিন পর অফিস থেকে ফোন যায় অন্তরার কাছে, অনিকের নির্দেশে, জানানো হয় নির্ধারিত সোমবারেই আসতে।
অফিস শেষে ফ্ল্যাটে ফিরে এইবার ফোন করেই ফেলল, জিজ্ঞেস করে অফিস থেকে ফোন গিয়েছিলো কিনা, যাতে বুঝতে না পারে ফোনটা তারই নির্দেশে গেছে।তারপর তার মা এর খোঁজ খবর নিয়ে রেখে দেয়। শেষে বলে, “দেখা হচ্ছে সোমবার।”

আজ সোমবার অন্তরার অফিস জয়েন এর দিন। অন্তরার আসার সময় ছিল ১১ টায়, আর অনিকই তাকে যাবতীয় দায়িত্ব বুঝিয়ে দেবে। ১০ টায় অফিস পৌছে যেন সময়টা কাটছেই না,বারবার দেখছে হাতঘড়ির দিকে।
-মে আই কাম ইন স্যার?
বুঝতে বাকি নেই এটা অন্তরা।
“ইয়েস কাম ইন”, বলেই একঝলক দেখে নিল অন্তরা কে। হালকা কালারের কোর্তার সাথে খোলা চুল, হাতে একটা ঘড়ি, বেশ মানাচ্ছে। বসতে বলেই খোঁজ নেয়, মা কেমন আছেন,আস্তে কোনো অসুবিধা হয়েছে কিনা।
তারপরই বলে, “আমাদের অফিসের বাস চেতলা হয়ে আসে, আমি বলে দেব তোমাকে পিক-আপ/ড্রোপ করবে সামনের দিন থেকে।আর সমস্ত দায়িত্ব বুঝিয়ে দেয় তাকে।” আজ তার ডিউটি নেই, কাল থেকে ডিউটি। মনে মনে অন্তরা অনেক ধন্যবাদ দিচ্ছে ভগবানকে আর অবশ্যই অনিককে। জয়েনিং ফর্মালিটি শেষ করে আজ সে বাড়ি ফিরছে কালিঘাট হয়ে, ইচ্ছা ছিল জব পেলে কালিঘাটে পুজো দেবে। সেই ইচ্ছাটাই পূরণ হল আজ তার।অফিস শুরুর পর থেকে প্রতিদিন রাতে অন্তরার ডিউটি ছিল অনিক কি খাবে ব্রেকে সেটা জেনে নেওয়া, কারণ সেও জানত ব্যাচেলারদের খাওয়ার কষ্ট, টাকা থাকলেও যে সব সময় ভালো খাবার জুটবে তা তো নয়।আর যত্ন করে রান্নার একটা আলাদা স্বাদ থাকে যেটা রান্নার মাসিদের দ্বারা পাওয়া খুব মুশকিল, তাই সেও চাইত অনিকের পছন্দের কিছু বানাতে।এভাবে কয়েকমাস চলতে চলতে দুজনেই বুঝতে পারে, দে আর ইন লাভ উইথ ইচ আদার। জুনিয়ার থেকে কলিগ,কলিগ থেকে হ্যাজবান্ড-ওয়াইফ হতে আর বেশি সময় লাগেনি তাদের।

-সমাপ্ত-

 

-‘মৌলি,বেরোলাম..।’
-‘কোথায় পড়ানো আছে?ছাতা নিয়েছো সঙ্গে করে?’
-‘হ্যাঁ,নিয়েছি।আজ আসতে একটু রাত হবে।দরজাটা
এঁটে দিয়ে যাও।’ কথাটা শেষ করে সৌম্য বিকেলের টিউশনটা পড়াতে বেরিয়ে গেলো।পরপর দুটো বাড়ি পড়িয়ে,সন্ধ্যে সাড়ে সাতটা থেকে তাকে আজকে আবার কানের ডাক্তারবাবুর চেম্বারে এক ঘন্টা পেসেন্ট দের নাম লেখার কাজটাও করতে হবে।তারপর বাড়ি ফেরা।ফেরার পথে সমিতির ম্যানেজার যদি চায়ের দোকানে বসে থাকে তাহলে তার সঙ্গে দেখা করে তবে ফিরবে।

সৌম্যর আসল পেশা টিউশনি।কিন্তু,সংসারের খরচ খরচা আর ভবিষ্যতের কথা ভেবে সে অনেকরকম
কাজের সাথে যুক্ত আছে।এই যেমন হপ্তায় দুদিন
ডাক্তারবাবুর চেম্বারে রুগির নাম লেখার কাজটা,
সমিতির কিছু কিছু কাজ,কিম্বা পাড়ার সাইবারক্যাফ
এ যেদিন কাজের চাপ থাকে,কিছু টাকা পেলে সে
সেই কাজও করতে ছাড়েনা।কোনো কাজই ছোটো
নয় তার কাছে,শুধু বিয়েবাড়িতে ক্যাটারিং এর জন্য
কেউ বললে যায়না।টিউশনি পড়ালেও তো শিক্ষক।
একটু সম্মানে লাগে।

সব কাজ মিটিয়ে সৌম্য যখন বাড়ির দরজার এসে
টোকা দিচ্ছে,মৌলি ঘড়ির দিকে চেয়ে দেখলো পৌনে
দশটা।মৌলি দরজা খুলে দিতে সৌম্য সাইকেলের
হ্যান্ডেল থেকে একটা ব্যাগ বের করে মৌলির হাতে
দিয়ে বলল-‘সাবধানে,ডিম আছে।’ মৌলি বলল-
‘ডিম আনতে গেলে কেনো,বাড়িতে তো ডিম ছিলো।’
-‘আরে,তুমি বলছিলে না,হাঁসের ডিম পেলে আনতে।’
মৌলি একগাল হেসে ব্যাগটা খুলে দেখে বলে উঠলো
-‘হাঁসের ডিম।উফফ,আজ দুটো ভাজবো?’
-‘ভাজো না।আমি কি বারণ করবো?’

ঘরের ভেতরে প্রবেশ করে সৌম্য শুনতে পেলো রেডিওতে গান বাজছে।-‘এই মৌলি,কোথায় রেডিও
বাজছে?’ -‘শোবার ঘরে।’ মৌলি রান্নাঘর থেকে সারা
দিয়ে বলল।সৌম্য শোবার ঘরে গিয়ে দেখে মেঝেয়
কাপড়,পুঁথি,আঁঠা ইত্যাদি সব সরানো।সে রেডিওটা
বন্ধ করে দিয়ে রান্না ঘরে মৌলির কাছে গিয়ে তাকে
বলল-‘তুমি আবার জরির কাজ নিয়েছো?’মৌলি
বলল-‘জরি কোথায়?ওতো শুধু কাপড়ের ডিজা ইনের ওপর আঁঠা দিয়ে পুঁথি বসানোর কাজ।একটা
কাপড়ে একশো ষাট টাকা দেবে বলেছে।’সৌম্য বলল
-‘তোমায় কী টাকা রোজগার করতে বলেছি।’ মৌলি
একটু আদর ভরা সুরে বলল-‘করি না।আমাদেরই
তো থাকবে টাকাগুলো।’ সৌম বলল-‘আচ্ছা বাবা,
করো।’ মৌলি বলল-‘সন্ধ্যেয় টিফিন করেছিলে?’
-‘হ্যাঁ,ওই দত্তদের বাড়িতে মুড়ি দিয়েছিলো।তারপর
ঘোষেদের বাড়িতে চা বিস্কুট….তুমি খেয়েছিলে?’
-‘হুম।চলো এবার খেতে বসে পড়ি শিগ্রি,রাতে সানডে
সাস্পেন্স শুনতে হবে।আজকে বড়দার গল্প ছিলো। শোনা হয়নি ওবেলা।’ -‘আরে,তুমি ডিম ভাজলেনা? ‘
-‘কাল দুপুরে গরম গরম হাতা ভাজা করবো।তুমিও
তো হাতাভাজা ডিম খেতে ভালোবাসো।’

খাওয়ার থালায় রুটি আর সোয়াবিন কষা দেখে সৌম্য খুশিতে গদগদ কন্ঠে বলল-‘সোয়াবিন রেঁধেছো
জমে যাবে রুটি খেতে আজ।বেশি করে রুটি করেছ
তো?’ -‘হ্যাঁ..হ্যাঁ..আমি জানি তুমি সোয়াবিন কষা দিয়ে ছ সাতটা রুটি খাবে।’খাওয়া শেষ হতে,মৌলি
দুবেলার খাবার বাসনগুলো মেজে মেজে দিলো,
সৌম সব ধুয়ে রান্না ঘরে নিয়ে গিয়ে রাখলো।

রাত এগারোটা তখন।দুজনেই ঘরের বাতি নিভিয়ে
রেডিও টা টেবিলে চালিয়ে দিয়ে,মির্চিতে বড়দার
গল্প শুনতে মন দিলো।প্রথম ব্রেকের সময় সৌম্য
বলল-‘ওষুধগুলো ঠিক করে খাচ্ছো তো?’ মৌলি
একটু মন খারাপের সুরে বলল-‘আমাদের কী সত্যি
সন্তান হবেনা?’ -‘ডাক্তারবাবুর নির্দেশমত সময়ে সময়ে ওষুধগুলো খাও।আর একটু বিশ্বাস রাখো।’
-‘কত টাকা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে বলো?’ -‘নষ্ট কীসের?
এত পরিশ্রম করা কীসের জন্য?ঠাকুর ঠিক মুখ
তুলে চাইবেন দেখো।’

গল্প ফের আরাম্ভ হলো।ক্রমে ভয় ভাবটা যত বেশি ঘনীভূত হতে লাগলো,মৌলি তত যেন সৌম্যর বুকের মাঝখানটাকে উত্তেজনায় শক্ত করে আঁকড়ে ধরতে লাগলো, উত্তেজনার শেষ হলো,গল্প শেষের পর।ইলেকট্রিক নিভে গেছে। মৌলি সেই জন্য হয়ত আরও ঘেমে গেছে।সৌম্য বলল-‘যত বলি ভূতুড়ে গল্প শুনবেনা..
চলো,বাইরে যাবে?’ মৌলি সম্মতি জানালো।বাইরে
আসতে মৌলির মুখের ঘাম রাতের স্নিগ্ধতায় মুহুর্তে
মুছে গিয়ে তার ভয়ার্ত মুখখানা চাঁদের নরম আলোয়
কোমলতা পেলো।সৌম্য বলল-‘ভীতুর ডিম একটা।
তাও ভূতের গল্প শুনবে।’মৌলি কথায় হার মানবেনা মনে মনে স্থির করে বলল-‘আমি ভীতু না তুমি ভীতু?’
সৌম্য তখন -‘পিছনে কে দেখো?’ মৌলি -‘ও মা গো..
বলে চীৎকার করে লাফিয়ে উঠে সৌম্যকে জাপটে শক্ত
করে ধরতে সৌম্য মুখের মধ্যে চাপা হেসে বলল-
‘ভয় কীসের?আমি আছিতো..।’

পরদিন সৌম্য বউয়ের হাতের তৈরি গরম গরম আলুর তরকারি আর কাঁচা পেঁয়াজ দিয়ে মুড়ি মেখে
খেয়ে সমিতির কাজে বেরিয়ে গেলো।দুপুরে যখন
বাড়ি ফিরলো,এসে দেখে মৌলি তখনও রান্নাঘরে
রান্না করছে।সে হাত মুখ ধুয়ে রান্না ঘরে গিয়ে তাকে
জিজ্ঞেস করলো-‘কী গো?আজ এত দেরী কেনো?
শরীর খারাপ নাকি?’ মৌলি বলল-‘এমনি,অন্য কাজ সারতে দেরী হয়ে গেসলো।তুমি বসো,আমি এখুনি
ভাত দিচ্ছি।’ সৌম্য,মৌলিকে ভালোকরে তাকিয়ে
দেখে বলল-‘আজ জামা কাপড় কেচেছো নিঃশ্চই?’
মৌলি বলল-‘না না..।’ -‘মিথ্যে বলছো কেনো?চুলে
শ্যাম্পু করেছো দেখছি।তুমিতো জামাকাপড় কাচার
দিন অবশ্যই শ্যাম্পু করো।’ মৌলি ধরা পড়ে গেছে
বুঝে বলল-‘ওই সামান্য কয়েকটা।’-‘সামান্য কয়েকটা
মানে কী?তোমার না শরীর খারাপ।তুমি একটুখানি
কথা শুনবেনা আমার।’ মৌলি বলল-‘ঠিক আছে,
এবার থেকে শুনবো।কথাটা বলে মৌলি দুটো হাঁসের
ডিম আর হাতাটা হাতে করে রান্না ঘর থেকে উনুন
চালায় যেতে যাবে,সৌম্য তার হাত থেকে ডিম আর
হাতাটা নিয়ে বলল-‘চলো,আজ আমি তোমায় গরম
ডিম ভেজে খাওয়াবো।’

মৌলি রান্নাঘর থেকে ভাতের হাঁড়ি,আর ডালের ছোট্ট গামলাটা ধরে নিয়ে গিয়ে দালানে দুজনের জায়গা
করলো।নুন,তেলের জায়গা আর ডিমভাজা নিয়ে
সৌম্য দালানে এসে আসনে বসে পড়লো।সৌম বলল
-‘নাও,এবার ভাত বেড়ে ফেলো?আজ কি ভাতে ভাত
করেছো?’ মৌলি বলল-‘হুম।’ কথাটা বলে ভাত বাড়তে গিয়ে খেয়াল হলো থালা আনতে ভুলে গেছে।
সৌম্যকে বলল-‘একবার উঠে গিয়ে দুজনের থালা আনবে?’ সৌম্য রান্না ঘরে গিয়ে একটা মাত্র থালা
দেখতে পেয়ে-‘এই মৌলি থালা কোথায়?’ মৌলির
মনে পড়লো,সে সকালের মুড়ি খাওয়া থালাগুলো
ধুতে ভুলে গেছে।-‘এখুনি ধুয়ে আনছি’-বলে মৌলি
থালা ধুতে উঠেছে,সৌম্য রান্না ঘর থেকে বেরিয়ে
এসে বলল-‘বসো,একটা থালাতেই দুজনের হয়ে
যাবে।’ স্বামীর হাতের গরম হাঁসের ডিমভাজা
খেয়ে মৌলির প্রানটা জুড়িয়ে গেলো।

একদিন দুপুর থেকে দারুন বৃষ্টি আরাম্ভ হয়েছে বাইরে।সৌম্যর পড়ানো ছিলো,কিন্তু অত বৃষ্টিতে যাওয়া সম্ভব হলোনা।জানালার পাশে দুজনে চা
নিয়ে বসলো।-‘আমি হাজার দুয়েক টাকা জমিয়েছি,
চলোনা এবার পুজোর সময় কোথাও বাইরে বেরিয়ে
আসি।’-মৌলি,সৌম্যর কাছে আবদারের ভঙ্গিতে কথাটা বললে,সৌম্য বলল-‘কোথায় যাবে বলো?’
মৌলি বলল-‘দার্জিলিং যাবে?আমার মাসি মনিরা
গিয়েছিলো আগের বছর।মাসিমনি বলছিলো, সেখানে নাকি হাতে করে মেঘ ধরা যায়?’ সৌম্য
মনে মনে ভাবলো,পাহাড়ে গেলে অনেক খরচ।সে
তবু মৌলিকে বলল-‘আচ্ছা,বেশ।ভেবে দেখবো।’

সন্ধ্যের একটু আগে বৃষ্টিটা বন্ধ হতে,সৌম্য বলল-
‘যাই,অনেকদিন ক্লাবে যাওয়া হয়নি।’ মৌলি বলল
-‘একটা কথা বলবো?’ -‘কী বলোনা?’ -‘আজকে
ওবেলার জল ঢালা ভাত আছে,তুমি আলুর চপ
নিয়ে আসবে?’ -‘ওহ,এই কথা,ঠিক আছে আনবো।’
সৌম্য মনে করে ফেরার সময় আলুর চপ কিনে আনলো।ঠান্ডা ঠান্ডা আবহাওয়ায় আলুর চপ দিয়ে
আলুভাতে মেখে জল ঢালা ভাত খেতে বসে সে দুজনের মধ্যে যেন কাড়াকাড়ি লেগে গেলো।সেই
ছেলেমানুষীপনার পর রাতে তাদের ঘুমটাও হলো
সুখের।

কয়েকদিন পর তারা দুজনে ডাক্তারখানায় গেলো
কারন মৌলির কিছু টেস্ট করানোর তারিখ ছিলো।
ঠিক টেস্টের রিপোর্টের দিন মৌলিকে ডাক্তারখানায়
ছেড়ে সৌম্য পড়াতে বেরিয়ে গেলো।তার আবার সেদিন সাইবার ক্যাফেতেও কাজ আছে।সন্ধ্যেয়
সাইবার ক্যাফে কাজ মিটিয়ে কম্পিউটার এর সুইচ
গুলো অন্যমনস্কভাবে টিপতে টিপতে তার মৌলির
কথা মনে পড়লো।রিপোর্ট যদি খারাপ হয়,তবে সে
মৌলিকে কীকরে সামলাবে।সন্তানের মা না হতে
পারাটা যে বড়ই কষ্টের।সে একটা চেষ্টা করতে পারে
মৌলির মুখে হাসি দেখতে।নিউ জলপাইগুড়ির দুটো
টিকিট নিয়ে নিলো।রাতে বাড়ি ফিরতেই,দরজা খুলে
মৌলি সোজা ভেতরে চলে গেলো।সৌম্য বুঝলো
রিপোর্ট ভালো আসেনি।সে মৌলির মন ঠিক করতে
টিকিটগুলো পকেট থেকে বের করে কোমরের পিছনে দুহাত দিয়ে লুকিয়ে ঘরের মধ্যে যেতে মৌলি
তাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেললো।সৌম্য বলল-
‘আরে,পাগলি কান্না কেনো?দেখো,কী এনেছি তোমার জন্য..’বলে টিকিটগুলো তাকে দেখিয়ে বলতে যাবে যে তারা পুজোয় দার্জিলিং যাবে,মৌলি
তখন ডাক্তারের রিপোর্ট গুলো তার বুক পকেটে
গুঁজে দিয়ে কাঁদতে কাঁদতেই বলে উঠলো-‘তুমি বাবা
হতে চলেছো সৌম্য।’কথাটা শুনে সৌম্যর যেন এক
মুহূর্ত নিজেকে বিশ্বাস হলোনা।সে অজান্তে হাতের
টিকিটগুলো পকেটের মধ্যে চালান করে মৌলিকে
বুকে তুলে দিয়ে গালে,কপালে কাঁদতে কাঁদতে অজস্র চুম্বন করতে আরাম্ভ করলো।আসলে সব
কান্নাই মন ভাঙার কান্না হয়না।গভীর আনন্দেও
মানুষ কাঁদে।

পরদিন সৌম্য একরাশ আনন্দ বুকে তখন টিউশন
পড়াতে বেরোচ্ছে।মৌলি,সৌম্যর প্যান্টটা সাবান জলে কাচছে দেখে সৌম্য তার হাত ধরে কলতলা থেকে তুলে তাকে বলল-‘এখন আর এসব তোমাকে
করতে হবেনা।’মৌলি হাসি মুখে স্বামীর কাছে একটা
আবদার করে বসলো-‘একজোড়া উল আর কুরুশ
কিনে আনবে?’ সৌম্য জিজ্ঞেস করলো-‘কেনো?’
মৌলি বলল-‘তোমার জন্য একটা সয়টার বুনবো।
দার্জিলিং যাবে তো..।’ তখন সৌম্যর ফের মনে
পড়লো সে দার্জিলিং যাওয়ার দুটো টিকিট কেটেছিলো।কালকের খুশির খবরটা শুনে সে একদম ভুলেই গিয়েছিলো।সৌম্য বলল-‘কোথায়
পেলে?’ মৌলি বলল-‘তোমার প্যান্টের পকেটে।’
সৌম্য বলল-‘তুমি খুশি তো?’ মৌলি ঠোঁটের ইশারায় ‘হুম’ বুঝিয়ে দিয়ে ঘুরে সৌম্যকে জিজ্ঞেস করলো-‘তুমি?’

 

error: